somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
আলহামদুলিল্লাহ। যা চাইনি তার চেয়ে বেশি দিয়েছেন প্রিয়তম রব। যা পাইনি তার জন্য আফসোস নেই। সিজদাবনত শুকরিয়া। প্রত্যাশার একটি ঘর এখনও ফাঁকা কি না জানা নেই, তাঁর কাছে নি:শর্ত ক্ষমা আশা করেছিলাম। তিনি দয়া করে যদি দিতেন, শুন্য সেই ঘরটিও পূর্নতা পেত!

মাহে রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য (পূর্বে প্রকাশিত)

২৬ শে এপ্রিল, ২০২১ সকাল ৯:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ অন্তর্জাল।

মাহে রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সমস্ত প্রশংসা, শোকর, ছানা, হামদ সেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যিনি রমজানকে শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে নির্ধারন করেছেন এবং সে সময় মু'মিন মুসলিমের প্রত্যেক ভাল কাজের প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। আহ! আমাদের সময়গুলো কতই না দ্রুত কেটে যাচ্ছে। চলন্ত মেঘমালার ন্যায় দিনগুলো গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে দূরন্ত গতিতে! বছর কতই না দ্রুত কেটে যাচ্ছে! আর আমরা জীবন চলার পথে বেখবর-অলস সময় কাটাচ্ছি! হায়, আমাদের চেতনা কবে ফিরে আসবে! আমরা কখন জাগব! আমাদের মধ্যে কম সংখ্যক লোক এমন আছেন যারা বাস্তবতা ও পরিণতি নিয়ে চিন্তা করছেন অথবা তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করছেন। রমজানুল মোবারক আমাদের দ্বারে উপনীত। স্বাগতম প্রিয় মাহে রমজান!

আলহামদুলিল্লাহ। মানব জীবনের সংক্ষিপ্ত এবং নির্ধারিত বয়স ও অল্প সময়ের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তার জন্য অধিক পরিমান সওয়াব লাভের জন্য ভাল কাজের কিছু মৌসুম রেখেছেন। তার জন্য স্থান এবং কালের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন কখনও কখনও। যে কাল ও স্থানের মাধ্যমে সে তার ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। সেসব বিশেষ মৌসুমের মধ্য থেকে অন্যতম একটি মৌসুম হল পবিত্র রমজান মাস।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ [البقرة:183].

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।' -সূরা বাকারা, ১৮৩ আয়াত

রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ (يونس: 58)

বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং, এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। -সূরা ইউনুস : ৫৮

পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না। করা হলে, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :—

أتاكم رمضان شهر مبارك

তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন :—

فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. رواه النسائي

আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। -নাসায়ী

আমাদের কর্তব্য :

আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা।

রমজান মাসে মুমিন বান্দার উপরে শয়তানি প্রবৃত্তির আক্রমণ কম হয়, রাত দিনে মন নরম থাকে। একজন দেখা যায় তার গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইছে, আর একজন আনুগত্যের তাওফীক প্রার্থনা করছে। তৃতীয়জনকে দেখা যায় আল্লাহর শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছে, চতুর্থজন ভাল কাজের ফলাফল সুন্দরভাবে পাওয়ার আশা করছে, পঞ্চম জনকে দেখা যায় তার প্রয়োজনের জন্য প্রার্থনা করছে। তিনিই মহান যিনি তাদেরকে তাওফীক দেন। অনেক লোক এমন আছে যারা এ সমস্ত কাজ থেকে দুরে অবস্থান করছে।

রমজান মাসের ফজিলত:

রমজান মাস শক্তি অর্জন ও দানের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মক্কা বিজয় করেন। তখন তিনি এবং সমস্ত মুসলমান সিয়াম অবস্থায় ছিলেন। এ রমজানেই ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়ছিল। এ সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের পতাকা সমুন্বত হয়েছিল। পক্ষান্তরে বিপথগামী ভ্রান্ত পৌত্তলিকদের পতাকা হয়েছিল অবনমিত। এ মাসে মুসলমানদের অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা এবং কুরবানি সংঘঠিত হয়েছে।

রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা অধিক পরিমাণে শক্তি, সজিবতা এবং ইবাদতের জন্য ধৈর্য ধারণ করার উদ্যম অনুভব করতেন, তাইতো রমজান মাসকে সৎকাজ, ধৈর্য্য ও দানের মাস বলা হয়। রমজান দুর্বলতা, অলসতা, ঘুমানোর মাস নয়। ভীরুতা, কাপুরষতা এবং নির্জীবতারও সময় নয়। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রমজান সত্যের আলোয় জেগে ওঠার শিক্ষা দেয়। কোন কোন সিয়াম পালনকারীকে হাত পা ছেড়ে দিয়ে, দিনের বেলায় ঘুমাতে, কাজ কম করতে দেখা যায়। এমন আচরণ সিয়ামের তাৎপর্য বিরোধী। সিয়ামের উদ্দেশ্যের সাথে এগুলো আদৌ যায় না।

পূর্বেকার মুসলমানগণ রমজান যাপন করতেন তাদের অন্তর এবং অনুভূতি দিয়ে। রমজান এলে তারা কষ্ট করতেন। ধৈর্য্যের সাথে দিন যাপন করতেন। আল্লাহর ভয় এবং পর্যবেক্ষণের কথা তাদের স্মরণ থাকত। সিয়াম নষ্ট হয় অথবা ত্রুটিযুক্ত হয় এমন সব কিছু থেকে তারা দুরে থাকতেন। খারাপ কথা বলতেন না, ভাল না বলতে পারলে নিরবতা পালন করতেন।

তারা রমজানের রাত্রি যপন করতেন সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনুসরণ করেই।

সিয়ামের উপকার অথবা ফজিলত অনেক। তা গণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে খেলাধুলা ও রং তামাশায় মত্তব্যক্তিরা কিংবা অলস শ্রেণির লোকজন, যারা সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায় এবং রাত্রে বাজারে ঘুরে বেড়ায় তারা রমজানের এসব ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকবে।

সিয়াম আগুন থেকে রক্ষাকারী ঢাল:

ইমাম আহমাদ রহ. তার কিতাবে জাবের রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

{ إنما الصيام جنة، يستجنّ بها العبد من النار }.

সিয়াম প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বাঁচার জন্য ঢাল। এর মাধ্যমে বান্দা আগুন থেকে মুক্তি পায়।

ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج، فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج، ومن لم يستطع فعليه بالصوم، فإنه له وجاء } [أخرجه البخاري ومسلم].

হে যুবকেরা! যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা, তা দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে এবং যৌনাঙ্গের হিফাজত করে। যে বিবাহের সামর্থ রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা এটি তার জন্য সুরক্ষা। -বুখারী মুসলিম

সিয়াম জান্নাতের পথ:

ইমাম নাসাঈ রহ. আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে প্রতিদান দেবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি অসাল্লাম বলেন:

{ عليك بالصيام فإنه لا مثل له }.

তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর কোন তুলনা নেই।

জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। সেখান দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সাহল ইবনে সাআদ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ إن في الجنة باباً يقال له: الريّان، يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال: أين الصائمون، فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا أغلق، فلم يدخل منه أحد } [أخرجه البخاري ومسلم].

জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামত দিবসে সেখান দিয়ে সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সে দরজা দিয়ে অন্য কেহ প্রবেশ করবে না। বলা হবে: সিয়াম পলনকারী কোথায়? তারা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া আর কেহ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর কেহ সে স্থান দিয়ে প্রবেশ করবে না। -বুখারী মুসলিম, ১৮৯৬

সিয়াম পালনকারীর জন্য সিয়াম সুপারিশ করবে:

ইমাম আহমদ রহ. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন:

{ الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام: أي رب منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفّعني فيه، ويقول القرآن: منعته النوم بالليل فشفّعني فيه، قال: فيشفعان }.

সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী হবে, সিয়াম বলবে, হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা বলবেন: তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল।

সিয়াম গুনাহের ক্ষমা এবং কাফফারা হিসাবে গৃহিত হয়:

কেননা ভাল কাজ অন্যায়কে মুছে দেয়। আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহ তাআ'লা আনহু রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ من صام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه } [رواه البخاري ومسلم].

যে রমজানে ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। -বুখারী মুসলিম

সিয়াম ইহকাল এবং পরকালের সৌভাগ্যের কারণঃ

আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহ তাআ'লা আনহু রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{وللصائم فرحتان: فرحة حين يفطر، وفرحة حين يلقى ربه، ولخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك } [رواه البخاري ومسلم].

সিয়াম পালনকারীর দুটি খুশি, প্রথম খুশি যখন সে ইফতার করে, আর এক খুশি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে। সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অধিক প্রিয়। -বুখারী মুসলিম

রমজানে সুযোগ কাজে লাগানো:

এ বছর রমজান মাস কি আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসার মৌসুম হবে, এবং নিজের হিসাব নিকাশের সুযোগ করে দেবে, আর আল্লাহর সামনে নিজের গোনাহের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ করে দেবে?

সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য সত্যিকারভাবে ইসলামী জীবন যাপন করার সুযোগ এনে দেবে কি এ মহান মাস?

দ্বীনের পথে দাওয়াতদানকারীগণ এ মাসকে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। এ কথা চিন্তা করে যে, তারা সর্বোত্তম দাওয়াতের দায়িত্বপালনকারী এবং তারা অতি উত্তম উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন। তারা নিজের সত্তার চিন্তা এবং তার জন্য ঘোরাফেরা করা থেকে মুক্ত হয়ে শুধু আল্লাহ তাআ'লার নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী মনে করে কাজ করবেন।

এ মাসটিকে প্রত্যেক মুসলমান তার মুসলমান ভাইকে সাহায্য করার মাস হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন। হোক না সে অত্যাচারী অথবা অত্যাচারিত। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, উৎসাহিত করে সর্বোপরি প্রতিরোধ গড়ে তুলে সাহায্য করবে। আর অত্যাচারিতকে সাহায্য করবে সাহায্য, সহযোগিতা এবং দয়ার হাত তার প্রতি সম্প্রসারিত করে দেয়ার মাধ্যমে। ফলে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নির্দেশিত এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের স্বার্থক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজের সর্বত্র তৈরি হবে সৌহার্দ্যপূর্ণ জুলূম অত্যাচারবিহীন ভ্রাতৃত্বের কাঙ্খিত পরিবেশ।

ধনী দরিদ্র সকলের জন্যই রমজান উপকারলাভের মাধ্যমঃ

এ মাস ধনী এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপনকারীদের জন্যও সাওয়াব অর্জনের মহাবরকতময় সুযোগ। তাদের অনুভূতিকে সজাগ করে তুলতে রমজানের বাস্তব প্রায়োগিক শিক্ষার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তারা দরিদ্রদের প্রয়োজন ও ব্যাথা মরমে অনুভব করতে পারেন। পারেন নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও। আল্লাহ তাআ'লা যে পথে ব্যয় করতে সম্পদ দান করেছেন সে পথে তারা সম্পদ ব্যয় করার প্রকৃত প্রেরণালাভ করতে পারেন। উম্মাহর ক্ষুধার্তদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেন তারা। তারা যদি তাদের ক্ষুধার্তদেরকে না খাওয়ায়, বস্ত্রহীনদেরকে বস্ত্র না দেয় আর দুর্বলদেরকে সাহায্য না করে- তাহলে মনে করতে হবে, তাদের ঈমান বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। হাদিসের মর্মানুযায়ী, ঈমানের প্রকৃত পরিপূর্ণতা তো নিজের জন্য যা কল্যানকর বা পছন্দনীয় মনে করা হয়, অপরের জন্যও তাকে কল্যানকর বা পছন্দনীয় ভাবার শিক্ষার মধ্যে। সেই মহান শিক্ষা রমজানের বাস্তব প্রয়োগের ভেতরেই নিহিত রয়েছে।

রমজান আমাদের নিজেদের জন্য এমন একটি পদ্ধতি অবলম্বনের সুযোগ এনে দেয় যার মাধ্যমে ইসলামী ভাবধারায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারি। রোজার প্রকৃত শিক্ষা শুধু সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপোস থাকা নয়; বরং, রোজাদারের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গও রোজার বাস্তবিকতায় ধন্য হবে। রোজাদারের হাত, পা, চোখ, কান, জিহবাসহ প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গেরও রোজা রয়েছে। যখনই এ সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ নড়া-চড়া করবে, ব্যবহার করবে- রোযাদার ব্যক্তিকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তিনি একজন রোযাদার। মহান সৃস্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় নিষিক্ত থাকবে রোযাদারের প্রতিটি আমল। মহান মালিকের ইচ্ছানুযায়ী তিনি ব্যবহার করবেন তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

{ وما يزال عبدي يتقرّب إليّ بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها } [رواه البخاري].

আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, আমি তাকে ভালবাসি। যখন আমি তাকে ভালবাসি সে আমার কান হয়ে যায়, যা দিয়ে সে শোনে। আমার চক্ষু হয়ে যায়, যা দিয়ে সে দেখে। হাত হয়ে যায়, যা দিয়ে সে ধরে। পা হয়ে যায়, যা দিয় সে চলে। -বুখারী

এই হাদিস যদিও নফল আমলের ফজিলত বিষয়ক, কিন্তু এসব নফল আমল শেখার উত্তম শিক্ষালয়ও রমজান। ইবাদাতের বসন্ত খ্যাত সেই মাহে রমজানের পাঠশালায় এ সমস্ত কিছুই অর্জন করা সম্ভব, যে রমজান আমাদেরকে দৃঢ়তা অবলম্বন ও সত্য গ্রহণের শিক্ষা দেয়। যার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তির সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। খারাবির সমস্ত ইচ্ছের জলাঞ্জলির মাধ্যমে কল্যানের ফল্গুধারা বইতে থাকে মনে ও মননে।

রোযাদার ঝগড়া করবে নাঃ

সে দৃঢ়তা এবং সুক্ষ্ম নিয়ম কি? যার মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীর মুমিনদেরকে দেখা যায় যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত হচ্ছেন, আবার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে পানাহার করছেন। অত:পর নিজের নফসকে কুপ্রবৃত্তির মধ্যে পতিত হওয়া অথবা পথভ্রষ্টতার বাতাসে ভেসে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছেন। রোযাদার ব্যক্তি তো তিনিই, যিনি কুপ্রবৃত্তি এবং কামনার উদ্রেককারী প্রত্যেক বিষয়কে 'না' বলে দিবেন। আর তার এই 'না' বলা হতে হবে আল্লাহ তাআ'লার সন্তুষ্টি অনুযায়ী, তাঁর সন্তোষলাভের উদ্দেশ্যে। রোযাদার অশ্লীল কাজ করবেন না। ঝগড়া করবেন না। এমনকি, উচু স্বরে কথাও বলবেন না। কোন মূর্খ যদি তার অনুভূতিকে আহত করে ও তার ভেতরের খারাপ জিনিসকে জাগিয়ে তোলে, প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে তবুও তিনি বলবেন, 'আমি সিয়াম পালনকারী'।

আর মানুষতো নিজের অভ্যাসের গোলাম। যতই সে চেষ্টা করে ফিরে আসতে পারে না নফসের গোলামী থেকে। কেননা, অভ্যাসের বিরাট প্রভাব রয়েছে অন্তর ও নফসের উপর। আমাদের অনেকের পানাহার, ঘুমানো, জাগ্রত হওয়া ইত্যাদির ব্যাপারে অনেক রকম অভ্যাস রয়েছে তার থেকে সে বিরত হতে পারে না। সিয়াম এই সমস্ত অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বিরাট উপকারী। মুসলমান ইচ্ছা করলে এর মাধ্যমে অনেক অভ্যাস থেকে নাজাত পেতে পারে কোন কষ্ট এবং ক্ষতি ছাড়াই। অত:পর যে সমস্ত অভ্যাস তার ক্ষতি করে সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। যেমন, রাত্রি জেগে অনুষ্ঠান উপভোগ করা, গোনাহ হয় এমন অনুষ্ঠানে যাওয়া, কারো সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা, বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদির অভ্যাস করা। অর্থাৎ এ জাতীয় যত ধরণের নেশা জাতীয় অভ্যাস আছে তা পরিত্যাগ করা। মূলত এ সমস্ত কিছু হয় দুর্বল মানসিকতার কারণে, অথবা এগুলোর নিকট আত্মসমর্পনের কারণে। সুস্থ, ভদ্র ও বিবেকবানরা কখনও এমন কাজ করতে পারে না। যদি সিয়াম পালন করতে চাও তবে হিংসা, গোনাহ এবং অন্যায় থেকে বিরত থেকে সিয়াম পালন কর। সিয়াম অবস্থায় জিহবাকে অহেতুক কথা থেকে, দৃষ্টিকে হারাম থেকে বিরত রাখ। অনেক সিয়াম পালনকারী আছেন তার সিয়াম উপবাস এবং পিপাসিত থাকা ছাড়া আর কোন উপকারে আসে না। সে ঐ ব্যাক্তি যে আহার বাদ দিল, কিন্তু গীবতের মাধ্যমে নিজের ভাইয়ের গোস্ত খাওয়া থেকে বিরত হতে পারল না। পান করা থেকে বিরত থাকল কিন্তু মিথ্যা, ধোকা, মানুষের উপর অত্যাচার থেকে বিরত হল না।

সিয়াম পালনকারীর জন্য নসিহতঃ

প্রিয় রোযাদার ভাই বোন, রমজান আমাদের কি শেখায়? রমজানের প্রকৃত শিক্ষা এবং আদর্শ কি? আসুন, শপথ নিই। আগত রমজানে আমরা আমাদের মনকে প্রশস্ত করি, জিহবাকে খাটো করি, অন্যায় এবং ঝগড়া থেকে দুরে থাকি। যদি বিচ্যুতির পথ সামনে এসে যায়, তবে নিজেকে সামলে নিই। ভাইদের থেকে যদি কষ্ট পাই তাহলে ধৈর্য ধারণ করি। কেউ যদি আমার সাথে ঝগড়া শুরু করে, তবে আমি তার মত করবো না। বরং আমি বলবো, 'আমি সিয়াম অবস্থায় আছি।'

রমজান মাসের বরকতঃ

রমজান মাসের অন্যতম বরকত হল, এ মাসে ভাল কাজের প্রতিদান বহু গুণে বেড়ে যায়। রোযা একমাত্র আল্লাহর জন্য, আর রোযার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজে দিবেন। শুধু আল্লাহর ভয়েই বান্দা পানাহার, যাবতীয় যৌন কামনা বাসনা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে। অন্যথায়, পৃথিবীর এমন কোন শক্তি কি, যা তাকে গোপনে এক ঢোক পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারে? রোযাদার পিপাসায় কাতর অবস্থায় ওযু করার জন্য মুখে পানি নেন, কুলি করে মুখভর্তি পানি আবার ফেলে দেন, কিন্তু এক ঢোক পানি কন্ঠনালীর নিচে নামতে দেন না।

কার ভয়ে? কার প্রেমে? কার ভালোবাসায়? কোন সত্তার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে কুরবানির এই নজরানা? কার মুহাব্বতে ত্যাগের এই উপস্থাপনা? কার সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্ষুধা পিপাসার এই কষ্ট সহ্য করা? বস্তুতঃ একমাত্র আল্লাহ তাআলার ভয়ে, আল্লাহ তাআলার মুহাব্বতে, আল্লাহ তাআলার ভালোবাসায় বিগলিত হৃদয়ই রোযার কষ্ট সহ্য করে করে তাঁর প্রিয়পাত্র হওয়ার যোগ্য। কেউ দেখছে না, কিন্তু আল্লাহ তাআ'লা তো দেখছেন। কেউ জানছে না, কিন্তু আল্লাহ তাআ'লা তো জানছেন। আহা! জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি এই অনুভূতি লাভ করতে পারতাম! এজন্যই তো রোযার প্রতিদান দিবেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। বান্দার চাহিদা মাফিক নয়, বরং মহান রব্বে কারিম নিজের শান অনুযায়ী।

হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনী আদমের প্রতিটি আমলের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি হতে থাকে, ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ, এমনকি আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও বেশি দেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তবে রোযার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, রোযা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি স্বয়ং এর প্রতিদান দিব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকে। রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ : এক. ইফতারের মুহূর্তে দুই. রবের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তে। আর রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম। -সহীহ মুসলিম হাদীস : ১১৫১

রমজানের আরও কিছু আমলঃ

রাত্রে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা রমজানের অন্যতম উত্তম একটি আমল। কারণ, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

{ من قام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه } [رواه البخاري ومسلم].

যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমজানের রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। -বুখারী মুসলিম

এ মাসে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন:

{ كان النبي - صلى الله عليه وسلم - أجود الناس بالخير، وكان أجود ما يكون في رمضان حين يلقاه جبريل } [رواه البخاري ومسلم]،

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। রমজানে যখন তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করতেন আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। -বুখারী মুসলিম

দান সদকা করা অতি উত্তম কাজগুলোর একটি। বিশেষ করে রমজান মাসে বেশি করে করা। রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা, পূর্বসূরীরা রমজান মাসে নামাজে এবং নামাজ ব্যতীত অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।

ই'তিকাফ রমজানের অন্যতম সুন্নত আমলঃ

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদে থেকে ইবাদত বন্দেগী করার নাম ই'তিকাফ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

{ كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يعتكف العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله } [رواه البخاري ومسلم].

রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করেছেন। -বুখারী মুসলিম

রমজান মাসে উমরা করার অনেক ফজিলত রয়েছে। বুখারী ও মুসলিম ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে এ বিষয়ে তাদের কিতাবে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

সিয়াম পালনকারীর জন্য সাহরী খাওয়া উত্তমঃ

ইমাম আহমাদ রহ. আবু সাইদ খুদরী রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন-

{ السحور أكله بركة، فلا تدعوه ولو يجرع أحدكم جرعة من ماء، فإن الله عز وجل وملائكته يصلون على المتسحربن }.

সাহরী বরকতের খাবার। তা খাওয়া থেকে বিরত হবে না। কেহ যদি এক ঢোক পানিও পান করে তবুও সে সাহরী খেল। কেননা, আল্লাহ তাআলা এবং ফেরেশতাগণ সাহরীতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন।

ইফতার তাড়াতাড়ি করা এবং তখন দুআ করা উত্তমঃ

ইমাম তিরমিজি রহ. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন-

{ثلاثة لا ترد دعوتهم: الإمام العادل، والصائم حتى يفطر، ودعوة المظلوم.. }.

তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এক. ন্যায়পরায়ন ইমাম, দুই. রোযাদার যেই পর্যন্ত ইফতার না করে এবং তিন. অত্যাচারিত।

কুরআন নাজিলের মাসঃ

রমজান হল কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ : البقرة : 184

রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। -সূরা বাকারা : ১৮৪

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কুরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কুরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ. -এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলসহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। -সহি আল-জামে

এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দু'বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।

জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়ঃ

রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وأغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين. وفي لفظ : (وسلسلت الشياطين) رواه مسلم

যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-শয়তানের শিকল পড়ানো হয়। -মুসলিম

তাই শয়তান রমজানের পূর্বে যে সকল স্থানে অবাধে বিচরণ করত রমজান মাস আসার ফলে সে সকল স্থানে যেতে পারে না। শয়তানের তৎপরতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় ব্যাপকভাবে মানুষ তওবা, ধর্মপরায়ণতা, ও সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয় ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে। তারপরও কিছু মানুষ অসৎ ও অন্যায় কাজ-কর্মে তৎপর থাকে। কারণ, শয়তানের কু-প্রভাবে তারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।

রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদরঃ

আল্লাহ তাআলা বলেন :—

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿3﴾ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ﴿4﴾ سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ ﴿5﴾ (القدر: 3-5)

লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনি উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। -সূরা আল-কদর : ৩-৫

রমজান মাস দোয়া কবুলের মাসঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

لكل مسلم دعوة مستجابة، يدعو بـها في رمضان. رواه أحمد

রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। -মুসনাদ আহমদ

অন্য হাদিসে এসেছে –

إن لله تبارك وتعالى عتقاء في كل يوم وليلة، (يعني في رمضان) وإن لكل مسلم في كل يوم وليلة دعوة مستجابة. صحيح الترغيب والترهيب.

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। -সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব

তাই প্রত্যেক মুসলমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের কল্যাণের জন্য যেমন দোয়া-প্রার্থনা করবে, তেমনি সকল মুসলিমের কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করবে।

রমজান পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাসঃ

যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসূল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :

.. رغم أنف رجل، دخل عليه رمضان، ثم انسلخ قبل أن يغفر له. .رواه الترمذي

ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। -তিরমিজি

বস্তুতঃ সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।

রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাসঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

إذا كان أول ليلة من رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار، فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب، وينادي مناد كل ليلة : يا باغي الخير أقبل! ويا باغي الشر أقصر! ولله عتقاء من النار، وذلك في كل ليلة. رواه الترمذي

রমজান মাসের প্রথম রজনির যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। -তিরমিজি

রমজান মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়ঃ

যেমন হাদিসে এসেছে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একটি হজের সওয়াব পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং, রমজান মাসে ওমরাহ করা আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ আদায়ের মর্যাদা রাখে। এমনিভাবে সকল ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল সৎকাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বেশি দেয়া হয়।

রমজান ধৈর্য ও সবরের মাসঃ

এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদি ও অন্যান্য সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনিভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ. الزمر:

ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেয়া হবে। -সূরা যুমার : ১০

শেষের প্রার্থনাঃ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদের সকলের সিয়াম সাধনাকে কবুল করুন। আমাদের ভাল কাজগুলোকে আমাদের জন্য নাজাতের উসিলা হিসেবে গ্রহন করুন। হে আল্লাহ! সিয়াম পালনকারীদের সিয়াম কবুল করুন, দানকারীদের দান কবুল করুন, রাত্রি জাগরণকারী ইবাদতকারীদের ইবাদত কবুল করুন, প্রার্থনা কারীদের প্রার্থনা কবুল করুন, আমাদের পূর্বের এবং পরের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, এ মাস যেন আমাদের সকলের জন্য ক্ষমার মাস হয়। আমীন! আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

লেখাটি তৈরিতে কৃতজ্ঞতা যাদের প্রতি:

১। আবদুল বারী আস-সুবায়তী রচিত রমজানের ফজিলত ও তাৎপর্য প্রবন্ধ, অনুবাদ : আখতারুজ্জামান মুহাম্মাদ সুলায়মান।
২। কুরআনের আলো ডট কম ওয়েসাইট।
৩। পবিত্র আল কুরআন।
৪। বুখারি শরীফ।
৫। তিরমিজি শরীফ।
৬। মুসলিম শরীফ।
৭। আবু দাউদ শরীফ।
৮। নাসায়ী শরীফ।
৯। ইবনে মাজাহ শরীফ।
১০। সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব।
১১। মুসনাদ আহমদ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০২১ সকাল ৯:৫২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফিলিস্তিনের পাশে দাড়ানোটা ধর্মের ভিত্তিতে নয়, মানবিকতার ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৬ ই মে, ২০২১ রাত ৯:০৫



হামাসের রকেট নিক্ষেপের জবাবে ফিলিস্তিনে ভয়াবহ হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা ১৮০ ছাড়িয়ে গেছে। ইসরাইল নাকি এই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ। শিক্ষা দীক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞানে তাদের নাকি জুড়ি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে প্রথম ১০০০০০ মন্তব্যকারী রাজীব নুর'কে অভিনন্দন!!

লিখেছেন বিজন রয়, ১৭ ই মে, ২০২১ সকাল ১১:০৪



অনেক অনেক অভিনন্দন রাজীব নুর আপনাকে।
এই ব্লগে আপনিই প্রথম এক লাখ (১০০০০০) মন্তব্যকারী!!
আপনি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন!! এটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক মূহুর্ত!!



আরো অনেক দিন ধরে আপনার এই অবিশ্রান্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদ পুরোপুরি বিদায়াত - একটা দলীল ভিত্তিক আলোচনা

লিখেছেন নীল আকাশ, ১৭ ই মে, ২০২১ সকাল ১১:৫৬



[সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি আমাদেরকে সর্বোত্তম দীনের অনুসারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক হযরত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ফিলিস্তিনের ভুমিকা ও কিছু প্রশ্ন?

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৭ ই মে, ২০২১ দুপুর ১২:০৫



আমি কারো পক্ষে বিপক্ষে কথা বলতে চাইনা। হত্যা - হত্যাই, সেটা সমর্থন করার প্রশ্নই উঠে না। আর সেটা যদি হয় অনৈতিক ভাবে।
কিন্তু আমার মনে কিছু প্রশ্ন ছিল। নিজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ঈদ সংখ্যা ২০২১ - সবাইকে আমার ব্লগ বাড়ীতে ঈদের দাওয়াৎ

লিখেছেন শায়মা, ১৭ ই মে, ২০২১ বিকাল ৪:৫৪


যদিও এখন চলছে করোনাকাল। আর এর অবসান কোথায় কবে আর কখন জানা নেই আমাদের। জানা নেই আরও কবে কাটবে এই কালবেলা কালোস্রোত। তবুও দেখলাম মানুষ যে যার মত করে আনন্দে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×