somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

অনলাইনে ইসলাম বিরোধীদের সাথে কেমন হওয়া উচিত আমাদের আচরণ

০৬ ই আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ অন্তর্জাল।

অনলাইনে ইসলাম বিরোধীদের সাথে কেমন হওয়া উচিত আমাদের আচরণ

বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম যেমন- ফেইসবুক, ইউটিউব, ব্লগ, ওয়েব পেইজ, ওয়েব পোর্টাল, টুইটার, হোয়াটসএ্যাপ, ইমু, টিকটক, মেসেঞ্জারসহ নানাবিধ মাধ্যম এখন জনপ্রিয়। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে উল্লেখিত এসব মাধ্যমসহ আরও অনেক অনলাইন মাধ্যমে আমাদের আসতে হয়। প্রয়োজনীয় নানাবিধ কাজ যেহেতু এখন অনলাইনেই করতে হয়। তাই কাজের প্রয়োজনেই অনলাইনভিত্তিক এসব মাধ্যম ব্যবহারের জন্য আমাদের আসার প্রয়োজন দেখা দেয়। কদাচিত এসবের কোথাও ইসলামবিরোধী কন্টেন্ট চোখেও পরে থাকে আমাদের। স্বাভাবিকভাবেই আমরা তখন ব্যথিত হই। ব্যথিত হওয়াটা দোষের নয়। ধর্ম কিংবা ধর্মীয় বিষয়াদিকে বিদ্রুপাত্মকভাবে তুলে ধরা হলে, শ্লেষাত্মক মন্তব্য করা হলে ধার্মিক মাত্রেরই ব্যথিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমনসব বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে মাঝে মধ্যে আমরা কেউ কেউ আমাদের ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সাধ্যানুসারে প্রতিবাদেরও চেষ্টা করে থাকি। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদের উদ্দেশ্যেই হয়তো হয়ে থাকে আমাদের এই প্রতিবাদ। কিন্তু এই ক্ষেত্রে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়, আমরা এই জাতীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেদের কথাবার্তা এবং আচরণের ক্ষেত্রেও ভুলে যাই মাত্রা জ্ঞান। হারিয়ে ফেলি ভাষা জ্ঞানের মাত্রা পরিমাত্রা; এমনকি ভুলে যাই ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের সীমারেখাও। অশ্লীল গালিগালাজসহ প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের গ্রহণযোগ্য কিংবা গ্রহণের অযোগ্য যত প্রকারের সুযোগ থাকতে পারে, চেষ্টা করতে থাকি তার সবগুলোরই প্রয়োগ করে বিরোধীপক্ষকে কাবু করতে। বস্তুতঃ আমাদের জেনে রাখা উচিত, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা, গালিগালাজ করা কিংবা কাউকে কটাক্ষ করা ইসলামের আদর্শ নয় কোনভাবেই। প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহারের এই যে মাত্রা এবং পরিমিতিবোধের অভাব, ইসলামের আদর্শ, সৌন্দর্য্য এবং শৃঙ্খলার প্রতি এই যে ভ্রুক্ষেপহীনতা- এগুলোই একটা সময়ে এসে সীমালঙ্ঘন করিয়ে দেয় আমাদেরকেও। অর্থাৎ, একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অবলীলাক্রমে, জেনে অথবা না জেনে, চেতনে কিংবা অবচেতন মনে আমরা নিজেরাও জড়িয়ে যাই অনাকাঙ্খিত অন্যায়ের ঘেরাটোপে। ইসলামের আদর্শের পক্ষাবম্বন করতে গিয়ে, ইসলাম ধর্মের সম্মান রক্ষার লক্ষ্যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে আমাদের দ্বারাই শেষমেষ লঙ্ঘিত হতে থাকে ইসলামের সত্যিকারের আদর্শ। এটাই এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতা। বস্তুতঃ এসবের ফলাফল কি দাঁড়ায়? ফলাফল তো হয় এই যে, এ যেন ইসলামবিরোধী চক্রের অসৎ উদ্দেশ্যকেই যেন আমি এবং আমরা জেনে বা না জেনে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলাম! তাদের তো উদ্দেশ্যই ইসলাম এবং মুসলিমদের চরিত্রকে নিন্দিতভাবে সবার সামনে তুলে ধরা! আর আমাদের ভুলভাবে করা প্রতিবাদের কারণে তাদের সে পথটিকেই প্রকারান্তরে খোলাসা করে দিচ্ছি কি না আমরা।

এই ক্ষে্ত্রে অনেকেরই প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামবিরোধী মিথ্যাচার, ইসলামের নামে অপপ্রচার কিংবা ইসলামবিরোধী কন্টেন্ট, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআ'লা এবং তাঁর প্রেরিত নবী রাসূলগণকে নিয়ে, ধর্ম বিশ্বাস বা ধর্মীয় বিষয়ে বিষোদগারমূলক প্রচারণা, রাসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে কুরুচিপূর্ণ বিদ্বেষপ্রসূত মন্তব্যসহ ইত্যাদি যদি এসব অনলাইন মাধ্যমে দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে আমাদের করণীয় কি? আমাদের কি এসবের প্রতিবাদ করা উচিত? না কি, এসব দর্শনে নিরবতা অবলম্বন করাই আমাদের জন্য সঠিক কাজ?

নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এবং খুব ভালোভাবে অনুধাবন করার ও উপলব্ধিতে নেয়ার মত প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার কাছে বিনীতভাবে এই বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনামূলক কথাগুলো উপস্থাপন করার তাওফিক প্রার্থনা করছি।

প্রথমতঃ রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী এবং আদর্শ ধারণ করা, তাওহিদ তথা একত্ববাদের বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত একজন ব্যক্তি কখনো বিক্ষিপ্ত এবং খিটখিটে মেজাজের হতে পারেন না। কারণ, মুমিন ব্যক্তি কেমন হবেন, কোন কোন গুণাবলীতে তিনি গুণবান হবেন, এর বিস্তারিত বর্ণনা কুরআনুল কারিম এবং হাদিসের কিতাবগুলোয় যথেষ্ট পরিমানে বিদ্যমান। ইসলামের সোনালী যুগে ঘটে যাওয়া বাস্তবতার প্রেক্ষিতেও রয়েছে এর বিস্তর উদাহরণ ও উপমা।

দ্বিতীয়তঃ পারস্পারিক আচরণে অশ্লীল, অকথ্য ভাষার ব্যবহার একটি লজ্জাষ্কর বিষয়। এমন চরিত্র কোনক্রমেই একজন বিশ্বাসী মুমিন ব্যক্তির হতে পারে না। তাতে তার প্রতিপক্ষ যত আপত্তিকর কথাই বলুন না কেন। কারণ, কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করেন,

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

মুমিন বাজে কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে। -সুরা মুমিনুন: আয়াত: ৩

তিনি আরও বলেন,

وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ

‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ বর্জন করো, যারা পাপ করে, অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে। -সুরা আল আনআম: আয়াত : ১২০

বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে মুসলিম ব্যক্তির চরিত্র বিশেষতঃ তার আচরণ কেমন হবে সেই বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ দু'টি হাদিস দেখে নিই, চলুন-

সুনানে তিরমিযি এবং মুসনাদ ইমাম আহমাদ রহ. এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلاَ اللَّعَّانِ وَلاَ الْفَاحِشِ وَلاَ الْبَذِيءِ ‏"‏

'মু’মিন ব্যক্তি মানুষের ভুলত্রুটি নিয়ে কটাক্ষকারী (ট্রলবাজ), অভিসম্পাতকারী, অশ্লীলভাষী ও অভদ্র হতে পারে না।' -সুনানে তিরমিযি, হাদিস : ১৯৭৭

সুনানে তিরমিযি বর্ণিত অপর এক হাদিস আবু দারদা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু সূত্রে এসেছে। সেই হাদিসে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

عَنْ أَبِىْ الدَّرْدَاءِ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ أَثْقَلَ شَىْءٍ يُوْضَعُ فِىْ مِيْزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خُلُقٌ حَسَنٌ وَإِنَّ اللهَ يَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِىءَ.

আবু দারদা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সর্বাপেক্ষা ভারী যে জিনিসটি রাখা হবে, তা হল উত্তম চরিত্র। আর আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীলভাষী দুশ্চরিত্রকে ঘৃণা করেন’। -সুনানে তিরমিযী, মিশকাত হা/৫০৮১

হাদিসের মূল ভাবঃ

হাদিসের আলোকে আমরা মুমিন মুসলিমের চরিত্র যা দেখলাম তাতে তার চরিত্রে মানুষের ভুলত্রুটি নিয়ে কটাক্ষকরণ (ট্রলবাজি), অন্যদের অভিসম্পাত প্রদান, অশ্লীল ভাষাভাষী কিংবা অভদ্র হওয়ার সুযোগ আছে কি? বলা বাহুল্য, আদৌ নেই। মুমিন ব্যক্তির চরিত্রে এইসব বদ স্বভাব থাকতেই পারে না। অথচ, নিতান্ত দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশী এক শ্রেণীর ইসলামমনা মানুষ যেন অশ্লীলতাকে নিজেদের কর্তব্য ও ইবাদত জ্ঞান করছেন আজকাল। কেউ ইসলামবিরোধী কোনো লেখা বা আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের স্বার্থ কিংবা বিশ্বাসের বিরোধী মনে হয় এই ধরণের কিছু লিখে যদি কমেন্টবক্স উন্মুক্ত রাখে, তাহলে তার কমেন্টবক্স অবধারিতভাবে অশ্লীল গালিগালাজে ভরে যায়। আরও আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে, এদের গালিগালাজ শুধু ইসলামবিরোধীদের উদ্দেশেই বর্ষিত হয় না, ভিন্ন মতামত পোষণকারী মুসলিমগণও তাদের অশ্লীলতার হাত থেকে রেহাই পান না।

তাদের অশ্লীল বাক্যবানে জর্জরিত হন নারী মডেল, অভিনেত্রী, মিডিয়া কর্মী বা চলচ্চিত্র কর্মীরাও। গালিগালাজ প্রদানকারী এইসব ব্যক্তিগণ সাধারণতঃ উপরোক্ত পেশা ও কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের পাপাচারে লিপ্ত রয়েছেন মনে করে থাকেন এবং সেই বিবেচনায় তাদেরকে অবজ্ঞা এবং অপমানসূচকভাবে গালিগালাজগুলো করে থাকেন। আমরা ধরে নিতে চাই, গালিগালাজ প্রদানকারী ব্যক্তিগণ চলচ্চিত্র-নাটক ইত্যাদি দেখেন না। এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, তারা যদি এসব না-ই দেখে থাকেন তাহলে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং অন্যান্য বিষয় সম্মন্ধে এত কিছু জানার প্রয়োজনবোধ কেন করেন? চলচ্চিত্রকর্মী বা অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন, তালাক, বিয়ে ইত্যাদি সব বিষয়ে তাদের প্রবল আগ্রহ ও কৌতূহলও যথারীতি লক্ষ্য করার মত! বলি, চলচ্চিত্র বা নাটক যেহেতু তারা দেখেন না, সুতরাং তারা উপরোল্লেখিত ব্যক্তিদের পেজ ফলো করবেন না- এটাই তো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তারা ঘুরেফিরে তাদের পেইজগুলোতে যান কেন? তারা কেন তাদের পেজে গিয়ে তাদের সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাবেন?

তাহলে এসব কাজ করার সুযোগ আছে কি?

বস্তুতঃ এখানে একাধিক অন্যায়কে একত্রিত করে চলেছেন এই শ্রেণির গালিগালাজ প্রদানকারী ব্যক্তিগণ। একদিকে তারা যাদের গালিগালাজ করেন তাদেরকে খুব আগ্রহের সাথে ফলো করেন, যেটি তাদের পরিচয় এবং দাবির সাথে যায় না। অন্যদিকে নিয়মিত গালিগালাজ করাকে তারা নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করে থাকেন, যেটি আরেকটি গর্হিত অন্যায়।

বাস্তবিকপক্ষে একজন মুসলমানের প্রতিটি কথা হওয়া উচিত সুন্দর। তার মুখ থেকে কথা বলার পূর্বেই সে চিন্তা ভাবনা করে নিবে যে, সে কি বলছে। কারণ, মুখের কথা মানুষকে জাহান্নামে টেনে নিতে পারে বলে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে হাদিসে-

মু’আয বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আমি নিবেদন করি: হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কাজ বলুন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

তিনি বললেন: “তুমি এক বৃহৎ বিষয়ে প্রশ্ন করেছ। এটা তার জন্য খুবই সহজ আল্লাহ্ যার জন্য সহজ করে দেন। তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, নামায প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত দাও, রমযানে রোযা রাখ এবং (কা’বা) ঘরে হজ্জ কর”।
তারপর তিনি বলেন: “আমি কি তোমাদের কল্যাণের দরজা দেখাব না? রোযা হচ্ছে ঢাল, সাদকাহ্ গোনাহেক নিঃশেষ করে দেয় যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়; আর কোন ব্যক্তির গভীর রাতের নামায”।

তারপর তিনি পড়েন: تتجافي جنوبهم عن المضاجع হতে يعلمون পর্যন্ত। যার অর্থ হলো: “তারা শয্যা পরিত্যাগ করে তাদের রবকে ভয়ে ও আশায় ডাকে এবং আমরা তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তাদের কর্মের জন্য যে চক্ষু শীতলকারী প্রতিফল রক্ষিত আছে তা তাদের কেউই জানে না”। -সূরা আস্-সাজদাহ্: ১৬-১৭

তিনি আবার বলেন: “আমি তোমাদের কর্মের মূল এবং তার স্তম্ভ ও তার সর্বোচ্চ চূড়া বলবো কি”?

আমি নিবেদন করি: হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন।

তিনি বললেন: “কর্মের মূল হচ্ছে ইসলাম, তার স্তম্ভ হচ্ছে নামায এবং তার সর্বোচ্চ চূড়া হচ্ছে জিহাদ”।

তারপর তিনি বলেন: “আমি কি তোমাকে এসব কিছু আয়ত্তে রাখার জিনিস বলবো না”?

আমি নিবেদন করি: হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন।

তিনি নিজের জিভ ধরে বললেন: “এটাকে সংযত কর”।

আমি জিজ্ঞেস করি: হে আল্লাহর নবী! আমরা যা বলি তার হিসাব হবে কি?

তিনি বললেন: “তোমার মা তোমাকে হারাক, হে মু’আয! জিভের উৎপন্ন ফসল ব্যতীত আর কিছু এমন আছে কি যা মানুষকে মুখ থুবড়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে”। -তিরমিযী: ২৬১৬ এবং তিনি বলেছেন: এটা হাসান (সহীহ্) হাদীস

এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, কথা বলার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহবাকে সব কিছুর মূল বলেছেন এবং জিহবা-ঘটিত পাপ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে বলেও কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। অশ্লীল-অভদ্র-অভব্য ভাষা শয়তানের ভাষা। চরম নেতিবাচক কিছু দেখলেও একজন মুমিনের মুখ থেকে শয়তানের ভাষা বের হতে পারে না। রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা আল্লাহ এবং পরকালের উপরে ঈমান রাখে তারা যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। -বুখারী, মুসলিম

আরে ভাই! মুমিনের চরিত্র তো হওয়া চাই হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে সেরকমই। হাদিসে 'হয় উত্তম কথা নয়তো নিরবতা'র উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। এক হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَبِـيْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْراً أَوْ لِيَصْمُتْ متفق عَلَيْهِ

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে। -বুখারী ৬০১৮, মুসলিম ১৮২

আরেক হাদিসে তো চুপ থাকার বিনিময়ে নাজাতলাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَن صَمَتَ نَـجَا

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে চুপ থাকে, সে পরিত্রাণ পায়। -সহীহ তিরমিযী ২৫০১, সহিহ সনদ

ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকাঃ

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিতঃ রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তীতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই প্রকৃত বাহাদুর, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।” -বুখারীঃ ৫৬৮৪ ইঃফাঃ

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গিয়ে বলল- আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন -‘তুমি রাগ করো না।’ লোকটি কয়েকবার আরও অন্য অসিয়ত করতে বললে রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকবারই বললেনঃ ‘রাগ করো না।” -বুখারীঃ ৫৬৮৬ ইঃফাঃ

সুলাইমান ইবনে সুরদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিতঃ একবার রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনেই দু’ব্যক্তি গালাগালী করছিল। আমরাও তাঁর কাছেই বসে ছিলাম, তাদের একজন অপরজনকে এত রাগান্বিত হয়ে গালি দিচ্ছিল যে, তার চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল। তখন রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমি একটি কালেমা জানি, যদি এ লোকটি তা পড়তো, তাহলে তার ক্রোধ চলে যেত।’ অর্থাৎ, লোকটি যদি ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশশাইত্বানির রাজীম’ পড়তো।” -বুখারী ৫৬৮৫ ইঃফাঃ

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জিহবা হতে অপর মুসলমান নিরাপদ। -সহিহ মুসলিম, খন্ড ১, হাদিস নং ৬৫

রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মুসলমানকে গালমন্দ করা গুনাহর কাজ এবং তার সাথে মারপিট করা কুফরী। -মুসলিম:১২৫

হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ সাবধান! মন্দ ধারণা হতে দূরে থাক।কেননা মন্দ ধারণা অনুমান সবচেয়ে বড় মিথ্যা। -বুখারী ও মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন-১৫৭৪

আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (খোঁজখবর নেয়া ছাড়াই) তাই বলে বেড়ায়। -মুসলিম ৫, মিশকাত তাহক্কীক আলবানী হা/১৫৬

রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: বনি আদমের উপর ব্যভিচারের অংশ লিখিত রয়েছে, তা অবশ্যই সে পাবে । দুই চোখের ব্যভিচার হল দৃষ্টিপাত করা। দুই কানের ব্যভিচার হল শ্রবন করা। জিহবার ব্যভিচার হল বলাবলি করা। হাতের ব্যভিচার হল ধরা বা স্পর্শ করা। পায়ের ব্যভিচার হল হেটে যাওয়া। অন্তরের ব্যভিচার হল কামনা ও বাসনা করা। আর গুপ্তাঙ্গ তা বাস্তবায়িত বা অবাস্তব প্রতিপন্ন করে। -মুসলিম অনুবাদ: হাদিস:৬৫১৫

রসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “এক মুসলিম আর একজন মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করে না এবং তাকে শত্রুর হাতে সমর্পনও করে না এবং যে তার ভাইয়ের অভাব মিটিয়ে দিবে, আল্লাহ পাক তার অভাব পূরণ করে দিবেন এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ পাক তার বিনিময়ে কেয়ামতের দিন তাকে বিপদমুক্ত করবেন। যে ব্যাক্তি মুসলমানের দোষত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ পাক রোজ কিয়ামতে তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন।“ -সহিহ মুসলিম, হাদীস ৬৩৪৪

আল্লাহ বা তাঁর রাসূল অথবা দ্বীন নিয়ে হাসি ঠাট্টা করার হুকুম কি?

এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে. এই কাজটি অর্থাৎ, আল্লাহ তাআ'লা কিংবা তাঁর প্রিয়তম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা কুরআন অথবা দ্বীন ধর্ম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা কুফরী। যদিও তা মানুষকে হাসানোর নিয়তে হয়ে থাকে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে এ রকম বিদ্রুপের ঘটনা ঘটেছিল। একদা মুনাফেকরা তাঁকে এবং সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলল, আমরা এ সমস্ত লোকদের চেয়ে অধিক পেট পূজারী, অধিক মিথ্যুক এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে এদের চেয়ে অধিক ভীতু আর কাউকে দেখিনি। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআ'লা বলেনঃ

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ

“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে যে, আমরা কেবল হাসি-তামাসা করছিলাম।” -সূরা তাওবাঃ ৬৫

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যখন অভিযোগ আসল, তখন তারা বলল, পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য যে সমস্ত কথা-বার্তা বলা হয়, আমরা শুধু তেমন কিছু কথাই বলছিলাম। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনিয়ে দিলেন।

قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ

“বলুন! তোমরা কি আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে হাসি-তামাসা করছিলে? তোমরা এখন ওযর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান প্রকাশের পর কুফরী করেছো।” -সূরা তাওবাঃ ৬৫-৬৬

কাজেই আল্লাহ তাআ’লা, রিসালাত, অহী এবং দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত পবিত্র। এগুলোর কোন একটি নিয়ে ঠাট্টা করা বৈধ নয়। যে এরূপ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তার কাজটি আল্লাহ, তাঁর রাসূল, আসমানি কিতাব এবং শরীয়তকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রমাণ বহন করে। যারা এ ধরণের কাজ করবে, তাদের উচিৎ আল্লাহ তাআ'লার দরবারে তাওবা করে এবং ক্ষমা চেয়ে নিজেকে সংশোধন করে নেয়া। তাদের উচিৎ আল্লাহ তাআ'লার প্রতি ভয় ও সম্মান দিয়ে অন্তরকে পরিপূর্ণ করা।

হাদিসের আলোকে শ্রেষ্ঠতম মুসলিমের পরিচয়ঃ

আমাদের শুধু মুসলিম হলেই হবে না। মুসলিম পরিচয়ের সাথে সাথে ইসলাম ধর্মের উন্নত, মার্জিত, রুচিশীল, সহিষ্ণু এবং সর্বোত্তম আদর্শের আলোকে আলোকিত করতে নিজেদের। ইসলামে বর্ণিত ব্যক্তির উত্তম বৈশিষ্ট্যাবলী ও চমৎকার গুণাবলী বাস্তবিকপক্ষে নিজেদের জীবনে ধারণ করে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

وَعَنْ أَبِـيْ مُوسَى قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُوْلَ اللهِ أَيُّ المُسْلمِينَ أَفْضَلُ ؟ قَالَ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ متفق عَلَيْهِ

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! সর্বোত্তম মুসলিম কে?’ তিনি বললেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। -বুখারী ১১, মুসলিম ১৭২

অন্য হাদিসে কষ্টদায়ক বাক্যবাণ থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখাকে যথাসময়ে নামাজ আদায়ের পরপরই শ্রেষ্ঠ আমল বলা হয়েছে-

وعَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ سَأَلْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ اَلصَّلَاةُ عَلَى مِيْقَاتِهَا قُلْتُ ثُمَّ مَاذَا يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ أَنْ يُّسْلَمَ النَّاسَ مِنْ لِّسَانِكَ

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! শ্রেষ্ঠ আমল কী?’ তিনি উত্তরে বললেন, যথা সময়ে নামায পড়া। অতঃপর জিজ্ঞাসা করেন যে, ‘তারপর কী? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, তোমার জিহবা হতে লোককে নিরাপদে রাখা। -ত্বাবারানী, সঃ তারগীব ২৮৫২

নিজ অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশীকে নিরাপত্তা প্রদান জান্নাতে প্রবেশের পূর্বশর্ত বলা হয়েছে হাদিসে। ইরশাদ হয়েছে-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتّٰـى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتّٰـى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ وَلَا يَدْخُلُ رَجُلٌ الْجَنَّةَ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ

আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বান্দার ঈমান দুরস্ত হয় না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হৃদয় দুরস্ত হয় এবং তার হৃদয়ও দুরস্ত হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার জিহবা দুরস্ত হয়। আর সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা না পায়। -আহমাদ ১৩০৪৮, ত্বাবারানী ১০৪০১, সিঃ সহীহা-২৮৪১

অনলাইনে ইসলাম বিরোধী কন্টেন্ট দেখলে আমরা কী করতে পারি?

অনলাইনে ইসলাম বিদ্বেষ বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, মিথ্যে অপবাদ রটানো হচ্ছে- এ রকম ছবি, ভিডিও বা লেখা দেখলে প্রথমতঃ আমরা অধৈর্য্যের পরিচয় দিব না। ধৈর্য্যহারা হয়ে কোনোপ্রকার অসহিষ্ণু আচরণ করার চেষ্টা করবো না। এসব পরিস্থিতিকে ধৈর্য্যের পরিক্ষাক্ষেত্র মনে করে আপন বিশ্বাসের স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে অন্তরে ক্ষোভ, বিরক্তি এবং প্রচন্ড কষ্ট থাকা সত্বেও নিজেদের আচরণকে কন্ট্রোলে রাখতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ এই ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সংশ্লিষ্ট পেইজ বা মিডিয়া সেটা ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা মেসেঞ্জার যা-ই হোক না কেন, তাদের কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে পারি। বিদ্বেষী পোস্টে কমেন্ট করে সাধারণতঃ বিশেষ কোনো লাভ হয় না। তাতে ওই পোস্টের রিচই বরং বাড়ে।

তৃতীয়তঃ নিজে রিপোর্ট করার পাশাপাশি বন্ধু বান্ধবদের বড় কোনো মেসেজ গ্রুপ বা ক্লোজড গ্রুপ থাকলে সেখানে লিঙ্ক দিয়ে সবাইকে রিপোর্ট করতে অনুরোধ করা যায়। তবে, কোনোভাবেই বড় কোনো পাবলিক গ্রুপে অথবা নিজের ওয়ালে এসব পোস্টের লিঙ্ক শেয়ার করা উচিত নয়। তাতে এসব পোস্টের রিচ বাড়ে এবং মূলতঃ এই উদ্দেশ্যেই এই ধরণের নেতিবাচক পোস্ট করা হয়ে থাকে।

চতুর্থতঃ কেউ যদি যুক্তি দিয়ে ইসলামের কোনো বিধানের সমালোচনা করে এবং বোঝা যায় ব্যাপারটি নিয়ে প্রকৃতপক্ষেই তার মধ্যে ভুল ধারণা বা বিভ্রান্তি রয়েছে, তাহলে তার কমেন্টে দলিল ও যুক্তি দিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যায়। অবশ্য সেটাও আমি তখনই করবো যখন দেখবো যে, তার উত্থাপিত বিষয়ে আমার উত্তর দিয়ে তাকে বোঝানোর মত যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। যদি আমি সেই বিষয়ে অভিজ্ঞ না হয়ে থাকি, তাহলে তার সাথে তর্কে লিপ্ত হওয়া কোনো প্রকারেই আমার উচিত হবে না।

পঞ্চমতঃ সর্বোপরি, ধর্মীয় বিষয়ে ভুল ধারণা প্রচার করার নিমিত্তে কারো অপযুক্তিতে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা দেখা দিলে সেটি নিয়ে আলাদাভাবে পোস্টও দেয়া যায়। কিন্তু অশ্লীল, অশালীন এবং নীতি বিরুদ্ধ গালিগালাজ করে নিজের এবং মুসলমানদের সম্মান নষ্ট করে ইসলামের খেদমত করার ভুল প্রচেষ্টা থেকে সবার বিরত থাকা উচিত। এই কাজ কখনোই ইসলামের আদর্শের পরিচায়ক নয়। আর রাসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ এবং সুন্নাহ পরিপন্থী এই পথ ইসলামের জন্য কখনো সুফলও বয়ে আনতে পারে না।

ষষ্ঠতঃ আপনি যদি সত্যিকারার্থে নিজেকে ইসলামের পক্ষের মনে করেন এবং আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, হাদিস সর্বোপরি ইসলাম ও মুসলিমদের প্রকৃত কল্যানকামী ভেবে থাকেন তাহলে আপনার প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তাআ'লার অপরিসীম দয়া, ইহসান এবং ক্ষমার প্রতি কষ্ট করে একটু লক্ষ্য করে দেখুন। প্রিয় বন্ধু! সত্যিকারের আল্লাহ প্রেমিকের অন্তর তো হবার কথা অনেক বড়। সত্যিকারের মুক্তমনাও তো হবার কথা তাদেরই। কিন্তু প্রিয় ভাই, আপনি একটুতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন কেন? এত অল্পতেই রেগে যান কেন? সামান্য কিছু দেখলেই আপনি বিচলিত হয়ে পড়েন কেন? আপনাকে যারা ক্ষেপিয়ে তুলতে চাচ্ছেন একটিবার ভেবে দেখেছেন, আসলে তারা কারা? তারাও কি আপনার সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্ট জীব নন? এদরকেও তো রিযিক দেন আপনারই প্রিয়তম রব, তাই নয় কি? আলো-বাতাস-খাদ্য-পানীয় দেন। বাঁচিয়ে রাখেন। লালন পালন করেন। তো, যাদেরকে আল্লাহ তাআ'লা এত কিছু অকাতরে দিচ্ছেন, ক্রমাগত দিয়ে যাচ্ছেন, দিয়েই যাচ্ছেন, বঞ্চিত করছেন না, শাস্তির মুখোমুখি করছেন না, তাদের ধ্বংস করে দিচ্ছেন না, প্রিয় ভাই, প্রিয় বন্ধু, আপনি-আমি-আমরা কেন একটুতেই তাদের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে যাই? তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতি কি আমরা দেখাতে পারি না? তাদের সাথে একটু ভালো ব্যবহার আমরা করতে পারি না?

দয়াশীলের প্রতিই উপরওয়ালা দয়া করেনঃ

হাদিসে তো বৈচিত্র্যময় গোটা সৃষ্টিজগতকেই আল্লাহ তাআ'লার বৃহত্তর পরিবার বলা হয়েছে। আর যিনি বা যারা সৃষ্টিকুলের প্রতি সদয় হবেন, হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, স্বয়ং আল্লাহ তাআ'লা তার বা তাদের প্রতি দয়াশীল হবেন। তো, আল্লাহ তাআ'লার পরিবারের এরাও তো সদস্য। এদের প্রতি একটু নমনীয় হলে ক্ষতি কি? এদের প্রতি একটু ভালো আচরণ করাই তো ছিল আপনার এবং আমার দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব কি গালি দিয়ে পালন করছি না আমরা আজ?

স্বার্থান্বেষী ক্ষুদ্র মানসিকতা ইসলামের আদর্শ নয়ঃ

প্রিয় বন্ধু, আমি যদি সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করি এবং বুঝে থাকি যে, আমি ইসলামের আদর্শ গ্রহণের মাধ্যমে সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়েছি এবং জান্নাতের পথেই চলেছি, পক্ষান্তরে যিনি বা যারা বিভ্রান্তি উস্কে দেয়ার লক্ষ্যে বুঝে কিংবা না বুঝে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন এবং তিনি বা তারা এসব করে জাহান্নামের পথে চলেছেন, তাহলে প্রিয় বন্ধু, দয়া করে একটিবার ভাবুন, সামান্য একটু চিন্তা করুন, আমার বা আমাদের কি দায়িত্ব হওয়া উচিত নয়, তাকেও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা? আমি একা একা জান্নাতে যাব আর বাদবাকিরা কে কোথায় গেল, তার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন নেই- এমন স্বার্থান্বেষী ক্ষুদ্র মানসিকতা কি কখনোই ইসলামের আদর্শ হতে পারে, প্রিয় বন্ধু? দেখুন, মহান আল্লাহ তাআ'লা আমাদের কত সুন্দর করেই না শিখাচ্ছেন! ইসলামের পক্ষে যারা আহবানকারী হবেন তাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ

সমান নয় ভাল ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।

وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ

এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান। -সূরা হা-মীম সেজদাহ/ ফুচ্ছিলাত আয়াত ৩৩-৩৫

আয়াতের মূলভাবঃ

অত্র আয়াতে প্রতিপক্ষকে উৎকৃষ্ট কথা দ্বারা জবাব দিতে বলা হয়েছে। আর বলা হয়েছে যে, এর ফলে শত্রুও পরিণত হবে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে। শেষোক্ত আয়াতে এই ধরণের চারিত্রিক গুণাবলী যারা লাভ করবেন তাদেরকে ভাগ্যবান আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে যে, ধৈর্য্যশীল এবং উত্তম চরিত্রবিশিষ্ট মানুষের পক্ষেই এই মর্যাদায় সিক্ত হওয়া সম্ভব।

আহ! কতই না উত্তম কথা! কতই না উত্তম কৌশল! কতই না উন্নত আদর্শ!

শেষের প্রার্থনাঃ

আল্লাহ তাআ'লা আমাদেরকে সত্যিকারের মুসলিম হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের চরিত্রকে প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ এবং সুন্নাহ অনুযায়ী গঠন করার কিসমত দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২১ সকাল ১১:৫৫
১৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামীলীগ ও তার রাজনীতির চারটি ভিত্তি, অচিরে পঞ্চম ভিত্তি তৈরি হবে।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯০

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯



আমাদের ছোট্র বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটে।
সেই বিষয় গুলো পত্রিকায় আসে না। ফেসবুকেও আসে না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি করে না। কিন্তু তুচ্ছ বিষয় গুলো আমার ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিন বুদ্ধিজীবী

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৪




বুদ্ধিজীবী হওয়া এখন খুব কঠিন কিছু না- শুধু একটু সুন্দর করে কথা বলতে পারলেই হলো। মাথার ভেতর কিছু আছে কি নেই, সেটা বড় বিষয় না; আসল বিষয় হলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×