somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

রাতযাপনে ইসলামী শরীয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনাঃ

২৪ শে আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৪:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ অন্তর্জাল।

রাতযাপনে ইসলামী শরীয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনাঃ

প্রত্যেক মুমিন সর্বক্ষণ আল্লাহর জন্য নিবেদিত। প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত। তাই মুমিনের জীবনের প্রত্যেক অংশ আল্লাহর স্মরণ-জিকির ও তার বিধান মোতাবেক অতিবাহিত হতে হবে। ফলে মুমিন ব্যক্তি তার জীবনের প্রতিটি কাজে-কর্মে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুণ্য ও সওয়াব লাভে ধন্য হয়। আল্লাহ তাআলা রাতকে বিশ্রামের উপযোগী করেই বানিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا

আমি কি তোমাদের ঘুমকে এক ধরনের ক্লান্তি দূরকারী বিরতি, রাতকে একরকম আবরণ এবং জীবিকা অন্বেষণের জন্য দিনকে তৈরি করে দিইনি? -সূরা আন-নাবা, আয়াত ৯-১১

বস্তুতঃ নিদ্রা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অতুলনীয় এবং বিরাট এক উপহার। সৌরালোক কিংবা ভূমন্ডলজুড়ে বাতাসে ভেসে বেড়ানো অপরিমেয় অক্সিজেনের মত ঘুমকেও তিনি সকলের জন্য অবাধ করেছেন। ধনী, গরিব, জ্ঞানী, মূর্খ, কালো, ধলো নির্বিশেষে সকলকে সমানভাবে নিদ্রার মত উপকারী এই উপহার ভোগ করার অধিকার এবং সুযোগ তিনি অবারিতভাবে দান করেছেন। বরং ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, এই উপহারটি তিনি গরিবদেরকে বেশি দিয়েছেন ধনবান ব্যক্তিদের থেকে। সম্পদশালী অনেকেই আছেন, যারা তাদের আলিশান বাড়িতে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, আরাম আয়েশের নরম বিছানায়, দু-তিনটা বালিশ দিয়েও শান্তিতে একটু ঘুমুতে পারেন না। শত চেষ্টা করেও ছটফট করে করে পেরিয়ে যায় রাত। দুই চোখের পাতা এক করতে পারেন না। সামান্য ঘুমের জন্য নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হয় তাদের।

পক্ষান্তরে গরিবরা রাতভর নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমান। তাদের ঘরে দামি খাট পালঙ্ক নেই। মূল্যবান আসবাব পত্র নেই। ঘর শীতল করে দেয়া আরামদায়ক এসি নেই। কুঁড়ে ঘরের মাটিতে মাদুর পেতে শক্ত বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন তারা। তাদের বিছানায় যেতে দেরি, ঘুম আসতে দেরি হয় না। রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে দু'চোখের পাতায়। আহ! কি আরামদায়ক ঘুম! আরাম করে সারারাত ঘুমান তারা।

অপরদিকে কিছু মানুষের জীবনে অর্থ, বিত্ত আর প্রাচুর্যের শেষ নেই, সীমা পরিসীমা নেই, চাকচিক্যময় বিলাসবহুল শানশওকতের জীবন তাদের। কিন্তু একটি রাত ঘুমানোর জন্য এমন কোনো চেষ্টা প্রচেষ্টা নেই যে তারা করছেন না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘুমের পিল খেয়ে যাচ্ছেন, রাতে কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য। কিন্তু তবু কাজ হচ্ছে না। একটা সময়ে দেখা যায়, সেই পিলও আর কাজ করে না।ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে পড়েন তখন তারা নিজেদের জীবনের প্রতি, হতাশায় ডুবে গিয়ে নিত্য নতুন পথ খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না তাদের। আহ! ঘুম যে কত বড় একটি নেআমত, মানব জীবনে সুস্থতার জন্য ঘুমের প্রয়োজনীয়তা যে কতটাই গুরুত্বপূর্ণ- এ কথা সম্ভবতঃ একমাত্র তারাই উপলব্ধি করে থাকেন যারা এই নেআমত হারিয়ে ফেলেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা কুরআনুল কারিমে ঘুমকে سبات সুবাত, অর্থাৎ বিরতি, থামা বা বন্ধ করা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সারা দিনের কাজকর্মের ধ্বকল শেষে ক্লান্ত দেহ-মনকে পুনরায় সতেজ করার জন্য ঘুমের বিকল্প নেই। ঘুমের মাধ্যমে শরীর-মন যেভাবে সতেজ ও সজিবতা লাভ করে - চা, কফি, এনার্জি ড্রিঙ্ক, কোল্ড ড্রিংক বা এই জাতীয় যা কিছুই মানুষ পান করুক না কেন, ঘুমের সাথে কোনও কিছুই তুলনীয় নয়। হাদিসে বর্ণিত কাইলুলা বা দুপুর বেলার সামান্য পরিমান ঘুম বাকি দিন এবং সন্ধ্যায় দেহ-মন যতটা সতেজ, চাঙ্গা রাখে; এর ফলে মাথা এবং ব্রেইন যতটা ঠাণ্ডা থাকে; চিন্তাভাবনা যতটা পরিষ্কার হয় - তা অন্য কোনো বিকল্প পানীয় বা ওষুধ সেবন কিংবা পদ্ধতি অবলম্বন থেকে পাওয়ার চিন্তা করারও সুযোগ নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা কুরআনুল কারিমের অন্যত্র ইরশাদ করেন-

فَالِقُ الْإِصْبَاحِ وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ

তিনি প্রভাত রশ্মির উন্মেষক। তিনি রাত্রিকে আরামদায়ক করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসেবের জন্য রেখেছেন। এটি পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নির্ধারণ। -সূরা আল আনআম, আয়াত ৯৬

তন্দ্রা, নিদ্রা ও ঘুমকে একইভাবে আমাদের জন্য আরামদায়ক করে দেয়া হয়েছে। নিদ্রা মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়। সারাদিনের মানসিক চাপ, কর্মব্যস্ততা এবং পরিশ্রমের পর রাতের বেলা যখন ঘুমিয়ে পরে, পরেরদিন জেগে উঠে সেই চাপ এবং অশান্তি অনেকখানি দূর হয়ে মন শান্ত হয়ে যায়। আজকে পৃথিবীতে লক্ষ মানুষকে নানা ধরনের ওষুধ এবং পানীয় পান করে মন শান্ত করতে হয়, অস্থিরতা কমাতে হয়। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা মানুষকে ঘুম দিয়েছেন প্রতিদিন নানা ব্যস্ততার মাঝে শান্তি এবং স্থিরতা খুঁজে পাওয়ার জন্য। প্রশান্তির পরশপ্রাপ্তির জন্য।

বস্ততঃ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো রাত্রিযাপনেও ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে অনন্য কিছু আদব ও শিষ্টাচার। হাদিসের আলোকে মুমিনের রাতযাপনের সংক্ষিপ্ত সে আদব ও শিষ্টাচারগুলোই তুলে ধরা হলো আলোচ্য নিবন্ধে।

ঘুমানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিঃ

ঘুমানোর আগে সতর্কতা স্বরূপ প্রয়োজনীয় কয়েকটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাদিসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা রাতে পানাহারের পাত্রগুলো ঢেকে রেখো। ঘরের দরজাগুলো বন্ধ রেখো। আর সন্ধ্যাবেলায় তোমাদের বাচ্চাদের ঘর থেকে বের হতে দিও না, কারণ এ সময় জিনেরা ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো কিছুকে দ্রুত পাকড়াও (প্রভাব ফেলে) করে। ঘুমের আগে বাতিগুলো নিভিয়ে দেবে। কেননা অনেক সময় ছোট ক্ষতিকারক ইঁদুর প্রজ্বলিত সলতেযুক্ত বাতি টেনে নিয়ে যায় এবং ঘরের লোককে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। ’ -বুখারি, হাদিস নং: ৩৩১৬

শোয়ার স্থান নির্বাচনে সতর্কতাঃ

নির্জন কোনো ঘরে একাকী রাত যাপনের বিষয়ে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো ঘরে একাকী রাতযাপন ও একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন। ’ -আহমাদ, হাদিস নং: ৫৬৫০

বাসা-বাড়ির উম্মুক্ত ছাদে শোয়া অনুচিতঃ

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বেষ্টনীবিহীন ছাদে রাতে ঘুমায়, (কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে) তার সম্পর্কে (আল্লাহর) কোনো জিম্মাদারি নেই। ’ -আবু দাউদ, হাদিস নং: ৫০৪১

এশার পরে অপ্রয়োজনে রাত্রি জাগরণ নিন্দনীয়ঃ

এশার নামাজের পর অনর্থক গল্পগুজব এবং দীর্ঘ রাত পর্যন্ত অহেতুক জেগে থাকা মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপছন্দ করতেন। তবে দ্বীনি শিক্ষা দিতে তিনি কখনো কখনো রাত জাগতেন। মুসলমানদের সম্পর্কে কল্যাণকর পরামর্শের জন্য অনেক সময় রাতে তিনি আবু বকর (রা.) -এর বাসায় যেতেন। -তাহাবি শরিফ, হাদিস নং : ৭২০৩

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের রাতের গল্পগুজবে মত্ত হতে নিষেধ করতেন। -ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২৪৩৫

আয়েশা (রা.) বলেন, তিন ধরনের মানুষের জন্য রাত জাগার অনুমতি রয়েছে: বিয়ের রাতে নবদম্পতি, মুসাফির ও নফল নামাজ আদায়কারী। -মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস নং : ৪৮৭৯

যারা কর্মব্যস্ত কিংবা যাদের রাতে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তারা রাত জাগায় কোনো অসুবিধা নেই। বরং দায়িত্বের প্রতি তাদের নিষ্ঠাবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইসলাম।

বিছানা পরিস্কার করা বা ঝেড়ে নেয়াঃ

শয্যা গ্রহণের আগে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া উচিত। নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যদি তোমাদের কেউ শয্যায় যায়, তখন সে যেন তার লুঙ্গির দ্বারা বিছানাটা ঝেড়ে নেয়। কারণ সে জানে না যে বিছানার ওপর তার অনুপস্থিতিতে পীড়াদায়ক কোনো কিছু আছে কি না।

ঘুমের আরও কতিপয় আদব এবং বিধানঃ

নিদ্রা যাওয়ার বিষয়টি মানব জীবনের অতিব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শারীরিক সুস্থতার এটি অপরিহার্য অনুসঙ্গ। তাই এ বিষয়টিতে ইসলামী শরিয়ত বিশেষ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে।

অধিক রাত্রি জাগরণ অপছন্দনীয়ঃ

অধিক রাত্রি জাগরণ না করে যথাসম্ভব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার নামাযের পূর্বে ঘুমানো এবং নামাযের পর অহেতুক গল্প-গুজব করাকে খুব অপছন্দ করতেন । -সহিহ বুখারি : ৫১৪,

কিন্তু ভাল ও নেক কাজের জন্য এশার পরে জাগ্রত থাকাতে কোন ক্ষতি নেই। যেমন- মেহমানের সাথে কথা বলা অথবা ইলমী আলোচনা করা, অথবা, পরিবারকে সময় দেওয়া ইত্যাদি। মোটকথা, যে জাগ্রত থাকা কোন ক্ষতির কারণ হবে না, যেমন- ফজরের নামায নষ্ট হয়ে যাওয়া, সে জাগ্রত থাকাতে কোন ক্ষতি নেই।

তাড়াতাড়ি ঘুমানোর কিছু উপকারিতাঃ

ক) সুন্নতের অনুসরণের মাধ্যমে প্রভূত সাওয়াব লাভের সুযোগ গ্রহণ করা।

খ) শরীরকে আরাম দেওয়া, কেননা দিনের ঘুম রাত্রের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।

গ) ফজরের নামাযের জন্য খুব সহজে এবং পূর্ণ শক্তি ও চাঞ্চল্যতার সাথে জাগ্রত হওয়া যায়।

ঘ) তাহাজ্জুদের নামাযের জন্য শেষ রাতে জাগ্রত হতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য এটি বড় সহায়ক ।

ওযু অবস্থায়ই ঘুমাতে চেষ্টা করাঃ

প্রত্যেক মুসলমানকে সব সময় ওযু অবস্থায়ই ঘুমাতে চেষ্টা করা উচিত। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারা ইবনে আযেব রা.-কে বলেছিলেন- " যখন তুমি বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওযুর মত ওযু করবে।" -সহিহ মুসলিম : ৪৮৮৪

ডানদিকে পাশ ফিরে ঘুমানো সুন্নাতঃ

ডানদিকে পাশ ফিরে ঘুমাবে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "অতঃপর ডান কাত হয়ে ঘুমাও।"

উপুড় হয়ে ঘুমানো মাকরূহঃ

উপুড় হয়ে ঘুমানো মাকরূহ। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "এটি এমন শয়ন, যাকে আল্লাহ তাআলা খুব অপছন্দ করেন।"

আযকার ও দোয়া পাঠ করা উচিতঃ

ঘুমানোর সময় হাদীসে বর্ণিত আযকার ও দোয়া থেকে সাধ্যানুযায়ী পড়ার চেষ্টা করবে। যিকির তথা আল্লাহর নাম নেয়া ব্যতীত ঘুমানো মাকরূহ। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত― "যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির ছাড়া শুয়ে পড়বে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আক্ষেপের বিষয় হবে।" -আবু দাউদ : ৪৪০০

সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াতঃ

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যদি কেউ রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করে, তবে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। ’ -বুখারি ও মুসলিম

সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত-

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

রসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। আপনারই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন। -সূরাহ আল বাক্কারাহ, আয়াত ২৮৫

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছেন। হে আমাদের প্রভূ! এবং আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করাবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের প্রভু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্যে করুন। -সূরাহ আল বাক্কারাহ, আয়াত ২৮৬

সূরা কাফিরুন, ইখলাস, নাস ও ফালাক পড়ে ফুঁ দেয়াঃ

সূরা কাফিরুন, এখলাস ও নাস-ফালাক পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া সুন্নত। নাওফাল আল-আশজায়ি (রা.) বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, তুমি সূরা ‘কাফিরুন’ পড়ে ঘুমাবে, এতে শিরক থেকে তুমি মুক্ত থাকবে। ’ -তিরমিজি ও আবু দাউদ

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন দুই হাত একত্রিত করে তাতে সূরা এখলাছ, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁক দিতেন। অতঃপর মাথা ও চেহারা থেকে শুরু করে যত দূর সম্ভব দেহে তিনবার দুই হাত বুলাতেন। ’ -বুখারি, হাদিস নং: ৫০১৭

নিদ্রার দোআ পড়ে ঘুমানোঃ

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি শয়নের পর আল্লাহর নাম নেয় না, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বঞ্চনা নেমে আসবে। ’ -আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৫৬

হাদীসে বর্ণিত (ঘুমানোর সময়ের) কিছু দোয়াঃ

ক) সূরা আল বাক্কারার ২৫৫ নং আয়াত, অর্থাৎ, আয়াতুল কুরসী পাঠ করা। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তুমি যখন শয্যা গ্রহণ করবে, তখন ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়বে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বদা তোমার জন্য একজন রক্ষক থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। ’ -বুখারি, হাদিস নং: ২৩১১

আয়াতুল কুরসী-

اللَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। -সূরা আল বাক্কারাহ, আয়াত ২৫৫

খ) সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়া অন্যতম একটি আমল। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন প্রতিরাতে শয্যাগ্রহণ করতেন তখন ‘কুল হুআল্লাহু আহাদ’ ‘কুল আউযু বিরব্বিল ফালাক’ ও ‘কুল আউযু বিরব্বিন নাস’-এ তিনটি সূরা পাঠ করে দম করতেন তারপর যতদূর সম্ভব দুহাত দিয়ে শরীর মুছে নিতেন। প্রথমে মাথা তারপর মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশ এভাবে তিনবার করতেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৫৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪০২

এ হাদীসের এক বর্ণনায় আরো আছে যে, মৃত্যু শয্যায় যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্ট খুব বেড়ে গেল তখন আমাকে (আয়েশা রা.-কে) আদেশ করলেন, আমি যেন এ তিন সূরা পাঠ করে নিজের হাতে দম করে তাঁর শরীর মুবারকে মুছে দিই। নির্দেশমত আমি তাই করতাম।

সূরা ইখলাস-

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ - اللَّهُ الصَّمَدُ - لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ - وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ

বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।

সূরা ফালাক-

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ - مِن شَرِّ مَا خَلَقَ - وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ - وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ - وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।

সূরা নাস-

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ - مَلِكِ النَّاسِ - إِلَـٰهِ النَّاسِ - مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ - الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ - مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ

বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের মা’বুদের, তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্নগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।

গ) اللهم باسمك أموت وأحيا ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূ-তু ওয়া আহ্ইয়া-’ অর্থাৎ, 'হে আল্লাহ আপনার নামে মৃত্যবরণ করলাম এবং আপনার নামেই জীবিত হব' দোআটি পড়া। -সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৩১৪

কারো যদি ঘুমের সময়ের অন্যান্য দুআ মুখস্থ করা কঠিন হয়, তাহলে কমপক্ষে এ তিনটি সূরা তো পড়তে পারেন। তাদের জন্য এটাও কম কী! কমপক্ষে এটুকু অভ্যাস তো সহজেই করা যায়। যারা এটুকু করতেও যত্নবান হন না, তাদের নিদ্রাকালীন আমলগুলো নিঃসন্দেহে চরম অবহেলার শিকার। -মাআরিফুল হাদীস পৃ. ১২৯ খন্ড-৫

ঘ) নিম্নোক্ত দোআটি পড়া-

হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, তুমি যখন ঘুমুতে যাও তখন নামাযের মত ওযু করবে তারপর ডান কাতে শোবে এবং বলবে,

اللّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لاَ مَلْجَأَ وَلاَ مَنْجَأَ مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، اللّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ.

অর্থ : হে আল্লাহ আমি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিয়েছি। আমার বিষয় আপনার কাছে সোপর্দ করেছি। আমার পিঠ আপনার সাহায্যে দিয়েছি আপনার প্রতি আশা এবং ভয় নিয়ে, আশ্রয় নেয়ার ও আপনার শাস্তি থেকে বাঁচার মত জায়গা আপনি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি ঈমান এনেছি আপনার অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি এবং আপনার প্রেরিত নবীর প্রতি।

এ দুআ শিক্ষা দিয়ে বলেন, তুমি যদি এ দুআ পড়ে মারা যাও তাহলে তোমার মৃত্যু হবে দ্বীনে ফিতরতের উপর তথা ঈমানের উপর। আর এ দুআ যেন হয় তোমার ঘুমের আগের শেষ কথা। (অর্থাৎ এটা পাঠ করার পর আর কোনো কথা যেন না বলা হয়।) -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩১১, ৫৮৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১০

ঙ} হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, তুমি যখন ঘুমুতে যাও তখন বল,

اللَّهُمَّ أَنْتَ خَلَقْتَ نَفْسِي وَأَنْتَ تَتَوَفَّاهَا، لَكَ مَمَاتُهَا وَمَحْيَاهَا، اللَّهُمَّ إِنْ تَوَفَّيْتَهَا فَاغْفِرْ لَهَا، وَإِنْ أَحْيَيْتَهَا فَاحْفَظْهَا، اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ .

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আপনিই আমার প্রাণ সৃষ্টি করেছেন, আপনিই তা উঠিয়ে নিবেন। আমার জীবন-মৃত্যু আপনারই এখতিয়ারে। ইয়া আল্লাহ! যদি আমাকে মৃত্যুদান করেন তাহলে ক্ষমা করে দিয়েন আর যদি বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে (সর্বপ্রকার বালা-মুসিবত ও গুনাহ থেকে) আমাকে হেফাযত করুন। ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি নিরাপত্তা। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৫৪১

এ সংক্ষিপ্ত দুআটি আবদিয়াত ও দাসত্বের আবেগানুভূতিতে পরিপূর্ণ। আর আল্লাহ তাআলার দরবারে দাসত্ব ও দীনতা এবং বিনয় ও অক্ষমতা প্রকাশই তাঁর রহমত টেনে আনার বড় উপায়। বিশেষ করে ঘুমের সময় কোনো বান্দার এই ধরনের দুআর তাওফিক লাভ করা- তার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ কৃপাদৃষ্টিরই আলামত।

চ} হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, আল্লার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে শয্যা গ্রহণের সময় তিনবার এ দুআ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে যাদিও তা বৃক্ষের পাতার সমানও হয়। (প্রসিদ্ধ মরুপ্রান্তর) ‘আলেজ’-এর বালুকণার সমানও হয় অথবা দুনিয়ার দিনসমূহের সম-সংখ্যকও হয়-

أَسْتَغْفِرُ اللّهَ َالَّذِيْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ.

অর্থ : আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি আল্লাহর কাছে, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, যিনি চীরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক।

-জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৩৯৭

এ হাদীসে ঘুমের সময় উপরোক্ত কাজসমূহের দ্বারা তওবা ও ইস্তিগফার করার উপর সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কত বড় সৌভাগ্যের কথা হবে, যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ নির্দেশের উপর আমল করার প্রতি যতœবান হওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, এ তওবা ও ইস্তিগফার খাঁটি অন্তরে হতে হবে। আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তর দেখেন। তাঁকে মুখের কথায় ধোঁকা দেওয়া যায় না।

নিদ্রাবস্থায় দুঃস্বপ্ন দেখলে বা ভয় পেলে করণীয়ঃ

ঘুমের মাঝে অনাকাঙ্খিত ও অপছন্দনীয় কিছু স্বপ্ন দেখলে বা ভয় পেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচটি কাজ করতে বলেছেন। যথা-

ক) বাম দিকে তিন বার থুতু ফেলবে।

খ) أعوذ بالله من الشيطان الرجيم 'আউ-যু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্ব-নির রজী-ম' বলে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাইবে।

গ) এ স্বপ্নের কথা কাউকে বলবে না।

ঘ) যে কাতে শোয়া ছিল সে কাত থেকে ঘুরে অন্য কাতে শোবে, অর্থাৎ, পার্শ্ব পরিবর্তন করে শোবে।

ঙ) নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম র. এ পাঁচটি কাজ উল্লেখ করে বলেন যে ব্যক্তি এই কাজগুলো করবে খারাপ স্বপ্ন তার ক্ষতি করতে পারবে না। বরং, এ কাজগুলো তার ক্ষতি দূর করে দেবে।

সন্তানদের বয়স দশ বছর হয়ে গেলে তাদের বিছানা আলাদা করে দেয়াঃ

সন্তানদের বয়স দশ বছর হয়ে গেলে তাদের বিছানা আলাদা করে দেয়া একান্ত আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে নামাযের আদেশ দাও যখন তাদের বয়স সাত বৎসর হবে এবং এর জন্য তাদেরকে শাস্তি দাও যখন তাদের বয়স দশ বৎসর হবে এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও। " -আবু দাউদ : ৪১৮

ফজরের নামাযের পূর্বে জাগ্রত হওয়া গুরুত্বপূর্ণঃ

মুসলমান অবশ্যই সর্বদা ফজরের নামাযের পূর্বে জাগ্রত হবে, যেন ফজরের নামায সময়মত জামাতের সাথে ঠিকভাবে আদায় করতে পারে। এ ব্যাপারে চেষ্টা করা এবং এতে সহায়তাকারী উপকরণাদি গ্রহন করা তার জন্য রীতিমত ওয়াজিব। কোনো মুমিন ফজরের সময় অতিক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত কিংবা সূর্যোদয় ঠেকিয়ে কখনোই নিদ্রায় বিভোর থাকতে পারেন না। এই ধরণের মন্দ স্বভাব মুমিন ব্যক্তির চরিত্রে থাকতেই পারে না। প্রভাতের মৃদুমন্দ বাতাসে শরীর মন আন্দোলিত হয়। সতেজতা ও সজীবতা লাভ করে। রাত দিনের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টিতে ঘুমিয়ে থাকা একমাত্র অলস ও গাফেলদের পক্ষেই কেবল সম্ভব।

এক ব্যক্তি ফজর পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিল তার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :" ঐ ব্যক্তির কর্ণ-দ্বয়ে শয়তান প্রস্রাব করে দিয়েছে।" -নাসায়ী : ১৫৯০

ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর পাঠ করার দোআঃ

মুসলমান ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর নিম্নোক্ত দোয়া পড়া সুন্নাত-

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

উচ্চারণ- ‘আলহামদু লিল্লা-হিল লাজি- আহইয়া-না- বা’দা মা- আমা-তানা- ওয়া ইলাইহিন নুশু-র।’

অর্থ : ‘সকল প্রশংসা ওই আল্লাহর জন্য, যিনি মৃত্যুর পরে পুনরায় আমাদের জীবন দান করেছেন এবং তার দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭১১

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অনুকরণে মিসওয়াক করা অন্যতম একটি সুন্নাত।

দেরিতে ঘুমানোর কিছু অপকারিতাঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সারবিষয়ক গবেষণা বিভাগ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের তথ্য মতে, যখন সূর্যের আলো থাকে না তখন শরীরকে কাজ করতে বাধ্য করা বা জাগিয়ে রাখা শরীরে মেলাটনিন হরমোন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। আর এই মেলাটনিনই মানুষের দেহে টিউমারের বৃদ্ধিকে রোধ করে। ফলে তাদের ধারণা, রাত জাগা মানুষদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎরাতের ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি কোনোভাবেই দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যায় না।

তাই রাতের বেলা গল্পগুজব, সিনেমা, ফেসবুকিংসহ সব অহেতুক কাজ থেকেই বিরত থাকা প্রয়োজন। কারণ রাতে অহেতুক দেরি করে ঘুমানো মানুষকে শেষরাতের ইবাদত ও ফজর নামাজ থেকে যেমন বঞ্চিত করে, তেমনি এটি স্বাস্থ্যের জন্যও মোটেই শুভকর নয়। যুক্তরাজ্যের এক দল গবেষকের মতে, যারা দেরিতে ঘুমায় ও দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে, তাদের অকালমৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. পিরেঞ্জ লেভি বলেন, রাত জাগার বদ-অভ্যাস যারা গড়ে তুলেছে, তাদের ৯০ শতাংশই মানসিক রোগের শিকার। ৩০ শতাংশে থাকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। এছাড়া স্নায়বিক সমস্যা থেকে শুরু করে অন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠার অপকারিতাঃ

যুক্তরাজ্যের সুবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রোনোলজি বিভাগের অধ্যাপক জন রিচার্ডসন বলেন, ‘আমরা দেখেছি, যারা দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে তারা নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক জটিলতায় ভোগে। তাদের গড় আয়ু নিয়মিত সকালে উঠা মানুষের চেয়ে সাড়ে ছয় বছর কম। ’

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার উপকারিতাঃ

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা সম্পদ ও জ্ঞানের জন্য পূর্বশর্ত। বলা যায় সফলতার চাবিকাঠি। কেননা ভোররাতে বা দিনের শুরুতে সবচেয়ে বেশি কল্যাণ থাকে। শুধু ইবাদত-বন্দেগিই নয়, দুনিয়াবি কাজের জন্যও এটি সবচেয়ে উপযুক্ত ও বরকতময় সময়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরবেলার কাজের জন্য বরকতের দোয়া করেছেন।

সখর গামেদি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য দিনের শুরুকে বরকতময় করুন। ’ এ জন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো যুদ্ধ অভিযানে বাহিনী পাঠানোর সময় দিনের শুরুতে পাঠাতেন। বর্ণনাকারী বলেন, সখর (রা.)-ও তার ব্যবসায়ী কার্যক্রম ভোরবেলা শুরু করতেন। এতে তাঁর ব্যবসায় অনেক উন্নতি হয়। তিনি সীমাহীন প্রাচুর্য লাভ করেন। -আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৬

তা ছাড়া এ সময় বান্দার রিজিক বণ্টন হয়। যারা তখন ঘুমিয়ে থাকে তারা সফলতা ও রিজিকের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সকালবেলায় রিজিকের অন্বেষণ করো! কেননা সকালবেলা বরকতময় ও সফলতা অর্জনের জন্য উপযুক্ত সময়। ’ -মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ৬২২০

ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে এসে আমাকে ভোরবেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন, তখন আমাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন এবং বললেন, মামণি! ওঠো! তোমার রবের পক্ষ থেকে রিজিক গ্রহণ করো! অলসদের দলভুক্ত হয়ো না। কেননা আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে রিজিক বণ্টন করে থাকেন। -আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ২৬১৬

খুব ভোরে উঠা মানুষগুলো সবার থেকে আলাদা ও কর্মদক্ষ হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, যারা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে কিংবা রাতে কম ঘুমায়, অন্যদের তুলনায় তাদের আইকিউ ভালো হয়।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী ভোরবেলায়ই জাগতে পারে, তারা দেরিতে জাগ্রতদের চেয়ে বেশি নম্বর পায়। তাদের জিপিএ অন্যদের তুলনায় বেশি হয়। এই সাফল্যের পেছনে তারা বাড়তি উৎপাদনশীলতা এবং ভালো ঘুম হওয়াকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ওই বান্দার ওপর রহম করুন, যে রাত্রিকালে উঠে নামাজ আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায় এবং সেও নামাজ আদায় করে। যদি সে (স্ত্রী) নিদ্রার চাপে উঠতে না চায়, তবে সে (ভালোবেসে) তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ওই নারীর ওপরও রহম করুন, যে রাত্রিতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং তার স্বামীকে ঘুম থেকে জাগায় এবং সেও নামাজ আদায় করে। যদি সে ঘুম থেকে উঠতে না চায়, তবে সে (ভালোবেসে) তার মুখে পানি ছিটিয়ে জাগিয়ে তোলে। ’ -আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫০

শেষের প্রার্থনাঃ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের বর্ণিত আমলগুলো হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের জীবনে বাস্তবে মেনে চলার তাওফিক দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০২১ সকাল ১০:৩৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামীলীগ ও তার রাজনীতির চারটি ভিত্তি, অচিরে পঞ্চম ভিত্তি তৈরি হবে।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯০

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯



আমাদের ছোট্র বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটে।
সেই বিষয় গুলো পত্রিকায় আসে না। ফেসবুকেও আসে না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি করে না। কিন্তু তুচ্ছ বিষয় গুলো আমার ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সনদ জালিয়াতি

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২


গতকাল দুটো সংবাদ চোখে পড়লো যার মূল কথা সনদ জালিয়াতি ! একটা খবরে জানা যায় ৪ জন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে জাল জন্ম মৃত্যু সনদ দেয়ার জন্য, আরেকটি খবরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×