
একজন সুখী মানুষের চলে যাওয়া এবং...
লেখাটা আগে কখনো পড়িনি। অজকেই প্রথম চোখে পড়লো। জানাজা নামাজের পূর্বে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে জনৈক মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের বলা কিছু কথা তুলে ধরা হয়েছে লেখাটিতে। তবে ঘটনাটা যে সত্যিকারার্থে কোন লোকের ছিল এবং এ ঘটনাটির বিবরণ যিনি লিখে আমাদের জানার সুযোগ করে দিয়েছেন- তাদের কাউকেই চিনি না, চেনার সুযোগ হবে কি না তাও জানি না, কিন্তু পুরো লেখাটি পাঠ করে অন্তরে একটা অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করলাম।
আমাদের তো চাওয়া পাওয়া এবং প্রত্যাশার অন্ত নেই। একটা পেলে আরেকটা চাই। আরেকটা পেলে আরও চাই। আরও চাই। না পাওয়ার বেদনায় নিরন্তর হাহাকার, অনুতাপ আর অভিযোগেরই যেন এই দুনিয়া! তবে এখানেও যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়, এখানেও যে অল্পেতুষ্টির মত মহান গুণ ধারণ করার মাধ্যমে কৃতজ্ঞতার পাল্লাও কারও কারও অনেক ভারী হয়ে যায়, তারই বাস্তব দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে স্ত্রীর জানাজার পূর্বে স্বামী ভদ্রলোকের বলা কথাগুলোয়। আমাদের অনেকের জন্য ঘটনাটি উপদেশ গ্রহণের মাধ্যম বিবেচনায় এখানে তুলে ধরলাম-
"রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি ছোট মসজিদে আসরের নামায শেষ করার পরপরই ইমাম সাহেব ঘোষনা দিলেন যে, এখনই একটি জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। সবাই যেন একটু অপেক্ষা করি।
একটু টেনশনে পড়ে গেলাম। গাড়িটা খুব ভালো জায়গায় পার্ক করে আসিনি। আশেপাশে কয়েকটা বখাটে টাইপ ছেলেকে আড্ডা দিতে দেখে এসেছি। সাইড মিরর দুইটা খুলে নিয়ে গেলে অনেকগুলো টাকা নেমে যাবে।
হাদিসে আবার জানাজার নামাজ পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। জানাজার নামাজ মানে নিজের জন্য একটা সেলফ রিমাইন্ডার। তাই হঠাৎ মনে হল জানাজাটা পরেই যাই, আল্লাহ ভরসা।
ইমাম সাহেব জানালেন, একজন মহিলা মারা গিয়েছেন। ভদ্রমহিলার স্বামী আপনাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলবেন।
একজন সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক লোক। সাদা পাঞ্জাবি পরা, দাঁড়িগুলোও ধবধবে সাদা।
ভদ্র লোক শুরু করলেন........
আসসালামু-আলাইকুম,
আপনারা হয়ত আমাকে চিনবেন না। আমি এলাকাতে নতুন এসেছি। আমার স্ত্রী আজ সকালে ফজরের নামাজের পর আল্লাহর কাছে চলে গেছেন।
আমরা একসাথে গত ৪৫ বছর ধরে সংসার করছি। একটা ছোট সরকারী চাকরী দিয়ে আমি সংসার জীবন শুরু করেছিলাম।
সারা জীবন চেষ্টা করেছি সৎ থাকার জন্য। আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে পারি, জীবনে কোনদিন এক টাকা অসৎভাবে আয় করিনি।
সৎ থাকার কারণে আমাদের সংসারের আয় রোজগারও ছিল খুবই সামান্য। আমাদেরকে আল্লাহ তাআ'লা তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে দান করেছেন। তাদের সকলের ভরণপোষনের সাথে সাথে গ্রামের বাড়িতে থাকা আমার বাবা-মাকেও কিছু টাকা পয়সা পাঠাতে হতো। কখনো কখনো এমনও হতো যে, মাস শেষ হওয়ার আগে আমার বেতনের টাকা ফুরিয়ে যেত।
আমার সহকর্মীদের মধ্যে সম্ভবত: আমিই ছিলাম সবচেয়ে গরীব। কিন্তু আমার স্ত্রীর কারণে আমি এটা কখনোই উপলব্ধি করতে পারিনি। উনি যে কিভাবে সবকিছু ম্যানেজ করতেন, একমাত্র উনিই জানেন।
আমার সাধ্যের বাইরে জীবনে কখনো কোনদিন উনি কিছু দাবি করেননি। জীবনে কখনো আমাকে এটা বলেন নি যে, আপনি আমাকে এটা দিলেন না, ওটা দিলেন না। কখনো আমাকে আমার সামর্থ্য নিয়ে কষ্ট দিয়ে উনি কোনো কথা বলেননি। আজীবন ওনাকে শুধু সন্তুষ্টই দেখেছি।
আমার সৌভাগ্য যে, বাবা-মা মৃত্যুবরণ করার পূর্বে তাদের জীবনের শেষ ৪-৫ টি বছর আমাদের সাথেই কাটিয়েছিলেন। আমাদের সাথেই থেকেছিলেন তারা। আমার স্ত্রী সেই সময়টিতে আমার মা-বাবারও যথেষ্ট খেদমত করেছেন। কখনো আমাকে এটা বলেন নি যে, আপনার মা-বাবার খেদমত করা তো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
সত্যি কথা বলতে, পেনশনের টাকা পাওয়ার পরে একমাত্র হজে নিয়ে যাওয়া ছাড়া সারা জীবনে আমি উনাকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। তারপরও উনি কোনদিন আমাকে কষ্ট দিয়ে কোন কথা বলেননি।
আমার স্ত্রী একজন নেককার মানুষ ছিলেন। উনি উত্তম আচরণের অধিকারী ছিলেন। আত্মীয়তার হক রক্ষা করেছেন। পরোপকারী ছিলেন, স্বামী-সন্তানদের হক আদায় করেছেন। উনাকে আমি কখনো কোন নামায কাযা করতে দেখিনি, আজীবন পর্দা রক্ষা করে চলেছেন। উনি ধৈর্যশীল ছিলেন এবং অল্পেতুষ্টির গুণ তার ভেতরে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল।
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে ভদ্রলোক যেন একটু দম নেয়ার জন্য থামলেন।
এরপর আবার বলতে শুরু করলেন তিনি, আমি আসলে আমার স্ত্রীর হয়ে আপনাদের কাছে মাফ চাওয়ার জন্য এখানে কথা বলছি না। যে নারী ৪৫ বছর ধরে তার স্বামী-সন্তান এবং আত্মীয়দের হক রক্ষা করে চলেছেন, তিনি অন্য কারো হক নষ্ট করতে পারেন, সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
আসলে একজন জান্নাতি নারীর মধ্যে যে যে বৈশিষ্ট্য এবং গুণাবলী থাকা প্রয়োজন তার সবই আমার স্ত্রীর মাঝে ছিল। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু তাআ'লা উনাকে জান্নাত নসিব করবেন।
আমি নিজে জান্নাতে যেতে পারবো কি না, আমার জানা নেই। আপনাদের কাছে আবেদন, আপনারা শুধু এই দোয়া করবেন আমি যেন আমার স্ত্রীর সাথে জান্নাতে একত্রিত হতে পারি। পুনরায় মিলিত হতে পারি। সেখানেও তার মত উত্তম চরিত্রের নারীর সান্নিধ্যলাভের কিসমত লাভ করতে পারি।
আর অদ্যকার জানাজায় উপস্থিত প্রিয় মুসল্লি ভাইয়েরা, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি আমার স্ত্রীর উপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তাআ'লা যেন উনাকে ক্ষমা করে দেন। জান্নাতে আপন সান্নিধ্যে মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন। ভদ্রলোক চোখ মুছতে মুছতে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে কথাগুলো বলা শেষ করলেন।
পুরো মসজিদভর্তি মুসল্লী একসাথে বলে উঠলেন, আমিন, আমিন, ছুম্মা আমিন।
সাধারণত: জানাজার নামাজের আগে মৃতের আ্ত্মীয় স্বজন সর্বোচ্চ ৩০ সেকেন্ড থেকে এক দুই মিনিটের বেশি বক্তব্য দিতে পারেন না, বা দেন না। এই ভদ্রলোক টানা চার-পাঁচ মিনিট তার স্ত্রী সম্পর্কে একনাগারে বলে গেলেন। অনেকের চোখ আর্দ্র হয়ে উঠেছে এই অল্প সময়ের ভেতরেই। অশ্রুসজল চোখে সবাই সম্মোহিত হয়ে শুনলেন তার কথাগুলো। ঠিক যেন সত্যিকারার্থে একজন জান্নাতি নারীর বাস্তব জীবনের গল্প শুনছিলেন তারা। সমবেত মুসল্লীদের কেউ একজনও এতোটুকু বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো এমন করে যাদের জীবনকাহিনী হৃদয়ে দাগ কাটে, অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয় এমন জান্নাতি নারী, এমন বিরল গুণাবলীর অধিকারী পুরুষ আজকের সমাজে ক'জনই বা পাওয়া যায়!
হাদিসে এসেছে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন ঈমানদার স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নেককার স্ত্রী একজন মুসলিম পুরুষের জন্য আল্লাহ তাআ'লার পক্ষ থেকে নিয়ামতস্বরূপ। স্ত্রীর ভালোবাসা স্বামীর জন্য আল্লাহ তাআ'লার বিশেষ রহমত। এই ভদ্রলোকের কথা থেকে যেন সরাসরি এই হাদীসেরই বাস্তব প্রমাণ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হলো।
নেককার স্ত্রীর মর্যাদা ও গুরুত্ব যে কত বেশি তা নিম্নোক্ত হাদিস হতেও আমরা জানতে পারি-
হযরত ছাওবান রাদিয়াল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, ‘যখন এ আয়াত নাজিল হলো- ‘আর যারা সোনা-রূপা সঞ্চয় করে (আয়াতের শেষ পর্যন্ত); তখন আমরা নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলাম। তখন এক সাহাবি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আরজ করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! ‘এটাতো (আয়াত) সোনা-রূপা সর্ম্পকে নাজিল হলো। আমরা যদি জানতে পারতাম যে, কোন সম্পদ উত্তম, তবে তা সঞ্চয় করতাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের কারো শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো- আল্লাহর জিকিরকারী রসনা (জিহ্বা); কৃতজ্ঞ অন্তর এবং ঈমানদার স্ত্রী, যে তার ঈমানের (দ্বীনের) ব্যাপারে তাকে (স্বামীকে) সহযোগিতা করে। -মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মিশকাত
এ হাদিসে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানদার স্ত্রীর ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন ঈমানদার স্ত্রী তার স্বামীর জন্য সর্বোত্তম সম্পদও বটে। স্বামীকে স্ত্রীর সহযোগিতার মর্মার্থ হলো- ঈমানদার স্ত্রী ধর্মীয় কার্যক্রম ও দ্বীনি দায়িত্বসমূহ পালনের ক্ষেত্রে তার স্বামীকে সহযোগিতা করবে। যেমন- নামাজের সময় হলে তার স্বামীকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে; রমজান মাসের রোজা রাখার ব্যাপারে স্বামীকে সহযোগিতা করবে।
অনুরূপভাবে একজন ঈমানদার স্ত্রী তার স্বামীকে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, পরিবারের আনুসাঙ্গিক কাজকর্মসহ অন্যান্য সব ইবাদত-বন্দেগিতেও বুদ্ধি পরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে যথাসাধ্য সহযোগিতা করবে। ঈমানদার স্ত্রী বাড়িতে এমন পরিবেশ এবং আবহ সৃষ্টি করবে, যাতে স্বামী সারাক্ষণ পূণ্যকর্মে লিপ্ত থাকেন। অপকর্ম, অবৈধ উপার্জন এবং হারাম পেশা থেকে বিরত থাকেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষের জন্য ৪টি বিষয়কে শুভলক্ষণ বলেছেন। আর তা হলো- নেককার নারী, প্রশস্ত ঘর, সৎ প্রতিবেশী এবং সহজ প্রকৃতির আনুগত্যশীল-পোষ্য বাহন। পক্ষান্তরে চারটি জিনিসকে কুলক্ষণা বলেছেন। তার মধ্যে একটি হলো বদকার নারী। -হাকেম, সহিহ আল জামে
মসজিদ থেকে বের হলাম একটা অপূর্ব ভালো লাগা নিয়ে। সুখী মানুষদের কথা শোনার মধ্যেও একটা সুখ আছে। আলোচ্য ভদ্রলোক এবং তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া তার প্রিয়তমা স্ত্রী নি:সন্দেহে অত্যন্ত সুখী মানুষ ছিলেন। এই সুখ স্রষ্টা সরাসরি তাদের অন্তরে ঢেলে দিয়েছিলেন।"
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আলোচ্য ঘটনাটিতে বর্ণিত এসব উত্তম চারিত্রিক আদর্শ নিজেদের ভেতরে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। দ্বীনদার ও ঈমানদার হিসেবে কবুল করুন।
লেখা ও তথ্য সূত্র: ক্লাশমেট ব্যাংক কর্মকর্তা এক বন্ধুর ফেসবুক পেইজ থেকে লেখাটি সংগৃহিত এবং ইষৎ সংশোধিত ও পরিমার্জিত। জানাজার নামাজে অংশ নেয়া সেই ভদ্রলোকের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, যিনি লেখার কারণেই আমরা শিক্ষনীয় এবং সুন্দর এই ঘটনাটি জানতে সক্ষম হয়েছি। আল্লাহ তাআ'লা তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

