somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

হাফেজে কুরআনের মর্যাদা ও শাফাআতের বিষয়ে কুরআন হাদিস কী বলে?

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৯:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
হাফেজে কুরআনের মর্যাদা ও শাফাআতের বিষয়ে কুরআন হাদিস কী বলে?

কুরআনুল কারিমের সুদর্শন ছবিটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা

কুরআন হিফজ ও তিলাওয়াত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। অনেক হাদিসে হাফেজে কুরআনের উচ্চ মর্যাদা ও জান্নাতে তার স্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তবে, প্রচলিত কিছু বক্তব্য অতিরঞ্জিত কিংবা প্রামাণ্য দলিলের অভাবে বিভ্রান্তিকর মনে হওয়ায় এই বিষয়ে অনেকেরই প্রশ্ন। তাই, কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়টি বিশদভাবে মূল্যায়ন করা হলো।

১. হাফেজে কুরআন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি

সহীহ দলিল:

রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ: اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا

“কুরআনের ধারককে (হাফেজ) বলা হবে: পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো, দুনিয়াতে যেমন সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করতে, জান্নাতে তোমার মর্যাদা হবে সর্বশেষ যে আয়াতটি তুমি পড়বে তার উপর।” -সুনান আবু দাউদ: ১৪৬৪, তিরমিযী: ২৯১৫

এ হাদিসে হাফেজের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, তবে সরাসরি জাহান্নাম থেকে মুক্তির কথা উল্লেখ নেই।

সতর্কতা:

রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ

“কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলিল হবে।” -সহিহ মুসলিম: ২২৩

অর্থাৎ, কুরআন হিফজ করলেই মুক্তি নিশ্চিত নয়। বরং তাকওয়া ও সৎ আমল জরুরি।

২. কবিরা গুনাহকারী হাফেজের অবস্থান

কুরআনের বক্তব্য:

আল্লাহ বলেন:

إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ

“যদি তোমরা কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, তবে আমি তোমাদের ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেব।” -সূরা আন-নিসা: ৪:৩১

সহিহ হাদিস:

রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ

“যিনাকারী যখন যিনা করে, তখন সে মুমিন থাকে না।” -সহিহ বুখারি: ২৪৭৫

অর্থাৎ, কবিরা গুনাহ করলে ইমান দুর্বল হয়ে যায়। যদি কেউ কুরআন হিফজ করার পরও বড় গুনাহে লিপ্ত হয় এবং তাওবা না করে, তাহলে সে আল্লাহর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে।

৩. হাফেজ পরিবারের ১০ জনকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে

উল্লেখিত হাদিস:

من قرأ القرآن وحفظه، أدخله الله الجنة، وشفع في عشرة من أهل بيته

“যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে ও হিফজ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং সে তার পরিবারের ১০ জনের জন্য সুপারিশ করতে পারবে।” -তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, আল-মুজামুল কাবীর – তবে হাদিসটি দুর্বল বলে চিহ্নিত

সতর্কতা:

আল্লাহ বলেন:

وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا

“সেদিনকে ভয় করো, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য কারো জন্য কিছুই করতে পারবে না।” -সূরা আল-বাকারা: ২:১২৩

অর্থাৎ, ব্যক্তির মুক্তি তার আমলের উপর নির্ভরশীল। কারো একক আমল অন্যকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিতে পারে না।

৪. কুরআনের সুপারিশের বিশুদ্ধ হাদিস

রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

اقرَءوا القرآنَ فإنَّه يأتي يومَ القيامةِ شفيعًا لأصحابِهِ

“তোমরা কুরআন পড়ো, কারণ কুরআন কিয়ামতের দিন তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে।” -সহিহ মুসলিম: ৮০৪

রাসূল (ﷺ) আরও বলেছেন:

يقالُ لصاحبِ القرآنِ يومَ القيامةِ: اقرأْ وارتقِ ورتِّلْ كما كنتَ ترتِّلُ في الدُّنيا، فإنَّ منزلتَكَ عندَ آخرِ آيةٍ تقرؤُها

“কিয়ামতের দিন কুরআন পাঠকারীকে বলা হবে: পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো, তোমার স্থান নির্ধারিত হবে সেই আয়াত পর্যন্ত, যা তুমি দুনিয়াতে পড়তে।” -তিরমিজি: ২৯১৪, আবু দাউদ: ১৪৬৪

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, কুরআনের সুপারিশ সত্য, তবে তা নির্দিষ্ট সংখ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।

মূল্যায়ন ও উপসংহার

হাফেজের মর্যাদা: কুরআন হিফজ করা বিশাল মর্যাদার কাজ, তবে এটি শর্তহীন নয়। তাকওয়া ও আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কবিরা গুনাহ: শুধু হাফেজ হওয়া মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
পরিবারের ১০ জনকে মুক্তি: এ সংক্রান্ত হাদিস দুর্বল, তাই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।
সুপারিশ: কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

সঠিক আকিদা: কুরআন হিফজ করা মহান সওয়াবের কাজ, কিন্তু তা গুনাহ থেকে মুক্তির গ্যারান্টি নয়। হাফেজদের অবশ্যই কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়তে হবে।

উপসংহার: উস্তাদের বক্তব্যের কিছু অংশ কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক, তবে কিছু অংশ অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন। তাই আমাদের কেবল সহিহ দলিলের উপর ভিত্তি করে আলোচনা করা উচিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৯:৫৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামিলীগ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫



চাঁদগাজী বলেছিলেন,
"যেসব মানুষের ভাবনায় লজিক ও এনালাইটিক্যাল জ্ঞান না থাকে, তারা চারিপাশের বিশ্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজে তাদের অবদান... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×