somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ট্র্যাজেডি: এই জাতি সত্যিকারের মানুষ হবে কবে?

২৪ শে জুলাই, ২০২৫ সকাল ১০:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ট্র্যাজেডি: এই জাতি সত্যিকারের মানুষ হবে কবে?

জনবহুল ঢাকার রাতের ছবিটি উইকি থেকে নেওয়া।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ট্র্যাজেডি আজ আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। আমরা শোকাহত, আমরা বাকরুদ্ধ। আমাদের চোখের সামনে একদল নিষ্পাপ শিশুর প্রান ঝরে গেছে। আকাশ থেকে ভেঙ্গে পড়া বিমানের ভয়াবহ আঘাতে। যে শিশুরা স্কুলে গিয়েছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের আর ফেরা হলো না। গোটা জাতি আজ শোকাচ্ছন্ন, কিন্তু এই শোক কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে — সেটাই বড় প্রশ্ন। এই শোক থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা নিজেদের পরবর্তী দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচাতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হব?

আসলে আমরা এমন এক জাতি, যারা প্রতিটি দুর্ঘটনার পরে কিছুদিন শোক পালন করি, কিছুদিন আবেগ প্রকাশ করি, তারপর সব ভুলে যাই। একেকটি দুর্ঘটনার পরপরই টিভিতে বিশেষ আয়োজন হয়, পত্রিকায় ‘বিশ্লেষণধর্মী’ প্রতিবেদন ছাপা হয়, কখনো কখনো কালো ব্যাজ পরে শ্রদ্ধা জানানো হয় — তারপর? তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। একটা সময় সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। পুরনো হয়ে যায়। তখন কেউ আর জানতে চায় না, তদন্ত হলো কি না, দোষী শাস্তি পেলো কি না, নাকি আবার ফাইলটা ধুলোমাখা টেবিলের নিচে হারিয়ে গেলো।

এই দুর্ঘটনার পর যেসব প্রশ্ন উঠে এসেছে — সেগুলো কি শুধুই আবেগের বশে বলা? একটুও না। বরং প্রতিটি প্রশ্ন রাষ্ট্রের গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা আর দায়িত্বহীনতার স্পষ্ট দলিল। এত বছরের পুরনো বিমান এখনো কীভাবে আকাশে উড়ছে? প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাতিলপ্রায় প্রযুক্তি ব্যবহার করার সাহস কে দেয়? বিমানটির ফিটনেস সার্টিফিকেট কে দিয়েছে? কে যাচাই করেছে? সেটি কি নিয়মমাফিক হয়েছিল, নাকি বরাবরের মতো চোখ বন্ধ করে সই পড়ে গেছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — জনবহুল আবাসিক এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ানোর অনুমতি কে দিলো? কেন দিল? ঢাকার বাইরে কি ফাঁকা আকাশ নেই?

আমরা জানি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের দেওয়া হবে না। আমাদের বলা হবে — ‘তদন্ত চলছে’। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এই ‘তদন্ত’ মানেই চেপে যাওয়া, ধামাচাপা দেওয়া, এবং কালের গর্ভে হারিয়ে ফেলা। কিছুদিন পর আমরা শুনবো — “কারিগরি ত্রুটি ছিল”, কিংবা “প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে।” আর যদি খুব বেশি চাপে পড়ে যায় কর্তৃপক্ষ, তাহলে বড়জোর একজন মাঝারি স্তরের কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে দায় সারার আয়োজন করা হবে। অবশ্য, সেই ব্যক্তি যে কয়েক মাস পরেই প্রমোশনসহ আবার ফিরবেন আগের দায়িত্বে — সেটা নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায়।

এটা নতুন কিছু নয়। বরং নৈমিত্তিক এক চিত্র। প্রশ্ন হলো — কতবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে আমাদের টনক নড়বে? আর কত শিশু মরলে, আর কত ট্র্যাজেডি ঘটলে আমরা আসলেই নড়েচড়ে বসবো? কত মানুষের জীবন গেলে আমরা আমাদের সিস্টেমকে গোড়া থেকে সংস্কার করতে সচেষ্ট হব? ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশের সবকিছু কেন ঢাকা-কেন্দ্রিক হতে হবে? কেন আমরা অন্য বিভাগ বা জেলা নিয়ে ভাবতে পারি না? এই একমুখী, একচোখা এবং প্রতিবন্ধী চিন্তা থেকে আমরা কবে মুক্ত হব?

এবার একটু ভিন্ন এক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে — মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় বলছে, প্রতিবাদ করছে। কিন্তু এই প্রতিবাদ যদি সুশৃঙ্খল হয়, সংগঠিত হয়, আইন প্রণেতা মহোদয়গণসহ সুশীল সমাজ এবং দেশের কর্তা ব্যক্তিদের বিবেকের দরজায় ধাক্কা দেয় — তবেই কোনো পরিবর্তনের আশা করা যায়। নইলে এই ক্ষোভও এক সময় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আর ফেসবুকের টাইমলাইনে হারিয়ে যাবে। আমরা হয়তো আবার নতুন কোনো ট্র্যাজেডির অপেক্ষায় থাকবো — প্রতিবাদ করার নতুন কোনো উপলক্ষে।

এই দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় — রাষ্ট্রের ভেতরে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার কতটা অভাব। রাষ্ট্র যেন প্রশ্ন শুনলেই ভয় পায়। জনগণ যখন জবাব চায়, তখন রাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। বলা হয় — “এটা সেনাবাহিনীর বিষয়, কথা বলার অধিকার নেই”, কিংবা “এটা জাতীয় নিরাপত্তা, কথা বললেই রাষ্ট্রবিরোধী তকমা জুটবে।” কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না — এই রাষ্ট্র জনগণের টাকায় চলে, নৌ, সেনা, বিমান - এইসব বাহিনীর অস্তিত্বও জনগণের কল্যাণেই হওয়া উচিত। তাহলে জনগণ প্রশ্ন তুলবে না কেন? প্রশ্ন করলেই কি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়?

দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, এই প্রশ্ন তুললেই আপনাকে 'দেশবিরোধী', 'উস্কানিদাতা' বা 'অপপ্রচারকারী' বানিয়ে দেওয়া হয়। যেন সত্যের চেয়ে ভয়ই বড় হয়ে উঠেছে। অথচ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত — সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস। এই সাহস যদি রাষ্ট্র না দেখায়, তবে দুর্ঘটনা হবে। বারবার হবে। হতেই থাকবে। সুশৃঙ্খল আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য জবাবদিহিতা অপরিহার্য্য এবং অনস্বীকার্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বিপদ সংকুল দুর্বিসহ দুর্বিনীত জিঘাংসায় ঘেরা ফ্যাসিবাদ।

তবুও সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। যদি মানুষ সচেতন হয়, লেখকরা কলম ধরেন, সাংবাদিকরা সত্য খোঁজেন, জনপ্রতিনিধিরা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি দাবি করেন — তাহলে কিছু পরিবর্তন আসতে বাধ্য। তখন হয়তো কোনো মায়ের মুখে আর শোনা যাবে না — “আমার ছেলে স্কুলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।”

আমরা যারা লিখি, প্রশ্ন তুলি, ভাবি — আমাদের কাজ কেবল আবেগে ভেসে যাওয়া নয়। আমাদের দায়িত্ব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো। আমাদের কাজ প্রশ্নকে তীক্ষ্ণ করা। যেন রাষ্ট্র বুঝতে পারে — এই জাতি আর চুপ করে থাকবে না। এই শিশুদের মৃত্যু যেন কেবল শোকের কারণ না হয় — তারা হয়ে উঠুক আমাদের বিবেকের জাগরণ। আমরা যেন আর কখনও না বলি, “সব ভুলে গেছি।” বরং বুক উঁচিয়ে বলতে পারি, “এই ভুল আমরা আর কখনও হতে দেব না।”
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০২৫ সকাল ১০:৩০
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×