somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

সিন্ডিকেটের খপ্পরে দেশ: ঘোর অমানিশায় স্বাস্থ্যসেবা

১৯ শে আগস্ট, ২০২৫ সকাল ১০:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
সিন্ডিকেটের খপ্পরে দেশ: ঘোর অমানিশায় স্বাস্থ্যসেবা

অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

কল্পনা করুন—একটি সাধারণ দিন। হঠাৎ খবর এলো, আপনার প্রিয়জন একটি ভবনের ছাদে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে পড়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে তিন তলা থেকে ধপ করে নিচে আছড়ে পড়লেন তিনি। মেরুদণ্ড ভেঙে গেল, শরীরের নানা হাড় চূর্ণবিচূর্ণ, বিদ্যুতের আগুনে পুড়ে গেল দেহের একাধিক অংশ। এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন—যা দুর্ভাগ্যক্রমে গত সপ্তাহে আমার পরিচিত একজনের জীবনে বাস্তবে রূপ নিল। তাকে দ্রুত নেওয়া হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক)—দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল, যেটি সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বলে পরিচিত। কিন্তু সেখানে যা ঘটল, তা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নগ্ন, নৃশংস প্রতিচ্ছবি।

এক দিন অপেক্ষার পরও মেলেনি একটি বেড। মেলেনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা। হতাশ ও দিশেহারা স্বজনদের ঠিক তখনই ঘিরে ধরল একদল দালাল। তারা মধুর ভাষায় প্রলোভন দেখাল— “স্যার, এখানে চিকিৎসা পাবেন না। এখানে থাকলে রোগীকে বাঁচাতে পারবেন না। সময় নষ্ট না করে আমাদের ক্লিনিকে নিয়ে চলুন। আমাদের ওখানে ২৪ ঘন্টা ডাক্তার পাবেন। রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে।” মমতার টানে প্রিয়জনের জন্য মরিয়া পরিবার দালালদের ফাঁদে পা দিল। হাসপাতাল থেকে নাম কেটে রোগীকে নেওয়া হলো এক কথিত প্রাইভেট ক্লিনিকে।

তারপরের গল্প? কেবলই অমানিশার ইতিহাস। একটি মাত্র অপারেশনের জন্য গুনতে হলো ৯০ হাজার টাকা! সাথে যোগ হলো সিট ভাড়া, চিকিৎসকের ভিজিট, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। হতদরিদ্র ও নিঃস্ব এই পরিবারটিকে সাহায্যের জন্য হাত পাততে হচ্ছে নানানজনের কাছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছে অনুনয় বিনয় করে, ধারদেনা করেও পরিশোধ করতে পারছে না বিপুল এই অর্থ। অন্যদিকে, এত সর্বস্ব উজাড় করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত সেই চিকিৎসার মানের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ক্লিনিকের নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি, নেই যথাযথ দক্ষ চিকিৎসক। কিন্তু একবার দালাল সিন্ডিকেটের কবলে পড়লে আর রক্ষা নেই।

এটি শুধু একটি পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতা নয়—এটি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সেখানে বেড সংকট, চিকিৎসকের অভাব এবং দালালদের অবাধ দৌরাত্ম্য মিলিয়ে সেই অধিকার পরিণত হয়েছে এক নির্মম প্রহসনে। ঢামেকের মতো হাসপাতালে রোগী ভর্তির প্রথম মুহূর্ত থেকেই সক্রিয় থাকে দালাল চক্র, যাদের পেছনে থাকে অসাধু হাসপাতাল কর্মচারীদের ছত্রছায়া।

শুধু দুর্ঘটনার রোগী নয়—প্রসব, ডায়ালাইসিস এমনকি সাধারণ জ্বরের রোগীকেও এরা টার্গেট করে। আরও ভয়াবহ হলো অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যখন মানুষের শেষ ভরসা, তখন এই চক্র সেই দুর্বলতাকেই ব্যবসায় পরিণত করে। অতিরিক্ত ভাড়া, জোরপূর্বক তাদের গাড়ি ব্যবহার করানো, এমনকি লাশ বহনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়—সবই তাদের নিত্যকার ‘ট্রেড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শোকাহত পরিবারকে বলা হয়, “অন্য গাড়ি লাশ নেবে না”—এমন হুমকি মানবিকতার সব সীমা অতিক্রম করে।

শরীয়তপুরে সম্প্রতি অক্সিজেনের অভাবে একটি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার দায় স্পষ্টভাবে এই সিন্ডিকেটের কাঁধেই যায়। ঢাকা মেডিকেলের চারপাশে অ্যাম্বুলেন্স চালক, কর্মচারী, এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এই চক্র প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে জিম্মি করে রাখছে। সরকারি বাজেটে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হলেও, বাস্তবে তার সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। বিনামূল্যে চিকিৎসার নামে হাসপাতালের গেটে বড় বড় ব্যানার টানানো হয়, অথচ ভেতরে প্রবেশ করলেই শুরু হয় সিন্ডিকেটের খেলা। সরকার ঘোষণা দেয় “বেড নাই, ডাক্তার নাই”—এমন অজুহাতে রোগীদের ঠেলে দেওয়া হয় দালালদের হাতে।

আমাদের স্বাস্থ্য খাত আজ ভয়ংকর এক দুষ্টচক্রের কবলে পড়েছে। এখানে মানবিকতার জায়গা দখল করে নিয়েছে টাকা আর মুনাফার নেশা। দালাল চক্র, ভুয়া ক্লিনিক আর অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, তারা প্রতিদিন হাজারো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখছে। যদি এখনই এই দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করা যায়, তাহলে স্বাস্থ্যসেবা আর মৌলিক অধিকার থাকবে না—বরং ধনী মানুষের জন্য একটি বিলাসবস্তু হয়ে দাঁড়াবে। গরিব মানুষ তখন হাসপাতালের দরজা পর্যন্ত পৌঁছালেও চিকিৎসা পাবে না, শুধু প্রতারণা আর হয়রানির শিকার হবে।

এখন প্রশ্ন খুবই সোজা—এই দেশ কি সত্যিই সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলছে, নাকি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে আছে? সময় এসেছে এই অমানিশার অন্ধকার ভেঙে দেওয়ার। সময় এসেছে দালাল চক্র ও সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার। স্বাস্থ্যসেবা কোনো ব্যবসা নয়—এটি প্রতিটি মানুষের অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে সাধারণ মানুষ চিরকাল এই অমানবিক সিন্ডিকেটের খপ্পরেই বন্দি হয়ে থাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০২৫ সকাল ১০:৪৩
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আর্কাইভ থেকে: ঈশ্বর ও ভাঁড়

লিখেছেন অর্ক, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:১০




বিরাট কিছু চাইনি। পরিপাটি দেয়ালে আচানক লেগেছিলো একরত্তি দাগ। কোনও ঐশী বলে মুছে যেতো যদি—ফিরে পেতাম নিখুঁত দেয়াল। তাতে কী মহাভারত অশুদ্ধ হতো কার! (সে দাগ রয়ে গেছে!)

পাখিদের মতো উড়বার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতভেদ নিরসন ছাড়া মুসলিম আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৩



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা তাদের মত হবে না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা….

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬



আজ সকালে ল্যাপটপ খুলেই উপরের চিত্রটা দেখলাম। দেখে মনটা প্রথমে একটু খারাপই হয়ে গেল! প্রায় একুশ বছর ধরে লক্ষাধিক ব্লগারের নানারকমের বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমৃদ্ধ আমাদের সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু গল্প

লিখেছেন মোগল সম্রাট, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



(এক)
দশম শ্রেণির ছেলে সাদমান সারাদিন ফোনে ডুবে থাকত। বাবা-মা বকাঝকা করলে প্রায়ই অভিমান করে ভাত খেতো না। একদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ। ভোরে দরজা ভেঙে সবাই স্তব্ধ। খবরের কাগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প - ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫



আমার সাথে একজন সাবেক সচিবের পরিচয় হয়েছে।
উনি অবসরে গেছেন, ১০ বছর হয়ে গেছে। এখন উনি বেকার। কোনো কাজ নাই। বাসায় বাজার করেন অনেক বাজার ঘুরে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×