somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইনোলা গে, লিটল বয় এবং মানুষের সফলতার গল্প

০৫ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভূমি থেকে ৩১,০০০ ফুট উঁচুতে বিমানটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন ত্রিশ বছর বয়স্ক কর্নেল পল টিব্বেট। গতকালই বি-২৯ বিমানটির নাম পরিবর্তন করেছেন তিনি, নতুন নাম রেখেছেন "ইনোলা গে"। ইনোলা গে কর্নেলের মায়ের নাম।

উত্তর থেকে বেতারে একটি ম্যাসেজ আসলো কর্নেলের কাছে, "...যেকোনো উচ্চতায় মাত্র তিন-দশমাংশ ঢেকে রেখেছে মেঘ। নির্দেশঃ প্রথম শিকারে বোমা নিক্ষেপ।"

সবাইকে প্রস্তুত হবার নির্দেশ দেন কর্নেল। সুদীর্ঘ রাতের অভিযান শেষ হতে যাচ্ছে। মাসের পর মাস কঠোর প্রস্তুতি এবং ইতিহাস রচনা করার রোমাঞ্চ তাদের ভেতর বয়ে আনল নতুন উদগ্রীবতা। ইনোলা গে'র প্রত্যেকেই এসেছেন সুনির্দিষ্ট মিশন নিয়ে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। পঁয়ত্রিশ মিনিট পর, শহরের সীমানার ভেতর, নির্দিষ্ট এলাকার দিকে বিমানের গতিপথ সেট করলেন কর্নেল। ইনোলার খোলের ভেতর থেকে লিটল বয়'কে বের করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে লাগলেন দলের বোমারু, মেজর টম ফেরেবী।

স্থানীয় সময় সকাল ৮:১৫। সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আইওই সেতুটি। ইনোলার ভেতর থেকে লিটল বয়'কে ছেড়ে দিলেন মেজর ফেরেবী, তীক্ষ্ণ নারকীয় চিৎকার দিয়ে পড়তে থাকে লিটল বয়। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর চোখের উপর ঘন কালো কাঁচের চশমা পরে নিলেন অভিযাত্রীরা। এ ব্যাপারের তাদের উপর কঠোর নির্দেশ ছিল উপর থেকে, যা খুব অদ্ভুত মনে হয়েছিল তাদের। কিন্তু নির্দেশটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন করলেন তারা।

লিটল বয়ের চিৎকার শুনতে পেলেন বলে মনে হলো অভিযাত্রীদের। কিন্তু সেটি ছিল তাদের কল্পনা; আসলে উৎকণ্ঠায় কাঁপতে থাকা তাদেরই হৃদস্পন্দন ছিল সেটি, কারণ বিমানের ভেতর বাইরের শব্দ আসার তেমন কোনো উপায় ছিল না।

ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটার ভেতর দিয়ে মৃত্যুর হিমশীতল বীভৎসতায় পড়তে থাকে লিটল বয়। ১৮৫০ ফুট উঁচুতে অগ্নি সংযোগ হলো তার ফিউজে। পৃথিবীর বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরা অনেক হিসেবনিকেশ করে বের করেছেন এই উচ্চতাটি, যাতে লিটল বয়ের প্রতিক্রিয়া সর্বোচ্চ হয়।

এবং সত্যি সত্যি ফিউজে অগ্নিসংযোগের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভূমি সমতলে প্রতিক্রিয়া ছিল অকল্পনীয় নৃশংস। লিটল বয়ের কেন্দ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেল ১,০০০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি, বাইরের দিকে ধাবিত হলো বিদ্যুতায়িত আয়নের চোখ ধাঁধানো আলোক বর্ণালিঃ লাল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি। ঠিক নিচে, ভূমির তাপমাত্রা দাঁড়াল ৩,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এর অর্ধেক তাপমাত্রায় লোহা গলিয়ে ফেলা সম্ভব। নিমেষের মধ্যেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল হাজার হাজার মানুষ, গলে গেল পড়ল আরো হাজার হাজার, যে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানে থেকেই। এক মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে জীবিত ও মৃত পুড়ে গেল সবকিছু, মানুষের শরীর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল পোশাক, কাগজের মোড়কের মতো শরীর থেকে চামড়া উঠে আসলো। পরবর্তীতে ৮৬,২০০ জন মৃত মানুষের কথা জানা যায়, মারাত্মক আহত আরো ৭২,০০০। আর আমরা যদি জীবনের কথাই বলি, তাহলে মানুষ, বিড়াল, কুকুর, পোকামাকড় সব হঠাৎ করে কেমন নাই হয়ে গেল!

বিস্ফোরণ-পরবর্তী ধাক্কাটি এসে পড়ল শীঘ্রইঃ প্রতি বর্গমিটারে ছয় টনের চাপটি ধাবিত হলো ঘন্টায় ৭,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে। চূর্ণ হয়ে গেল শহরটির কাঠে তৈরি অবকাঠামো, মুহূর্তে এটি হয়ে গেল প্রাগৈতিহাসিক কোনো জনপদের ধ্বংসাবশেষ। সেই সাথে ছড়িয়ে পড়ল প্রাণঘাতী নিউট্রন ও গামা রশ্মি, পরবর্তী বছরগুলিতে যারা চালিয়ে যাবে তাদের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ।

তারপর শুরু হলো অগ্নিঝড়। বায়ুর তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে অক্সিজেন টেনে উপরে চলে গেল সেটি, চারপাশ থেকে ধেয়ে আসল ভারী শীতল বাতাস। ভয়ঙ্কর গতিতে বিরতিহীন শোঁ শোঁ বইতে লাগল ঝড়টি, নিষ্ঠুরভাবে ছড়িয়ে দিতে লাগল আগুনের শিখা, ইট পাথর কাঁচের টুকরা, বহুক্ষণ ধরে।

বিমানটি দ্রুত সরিয়ে নিতে নিতে ইনোলা গের অভিযাত্রীরা বিস্ময়ে তাকালেন নিচের দিকেঃ ছয় মাইল উচ্চতার ধোঁয়ার মেঘ গজিয়ে উঠল আকাশে, বিশাল এক ব্যাঙের ছাতার মতো। কী সুন্দর! ভয়ঙ্কর সুন্দর! হঠাৎ সফলতার ক্লান্তি ভীড় করল অভিযাত্রীদের মনে, সামনে আরো ছয় ঘন্টার পথ, মারিয়ানার টিনিয়ান দ্বীপে পৌঁছতে হবে তাদের। ৯০ মিনিট পর প্রায় ৪০০ মাইল দূর থেকে গোলন্দাজ বব ক্যারন একবার তাকালেন পেছন দিকে—মাশরুম মেঘটি তখনও বিরাজ করছে হিরোশিমার আকাশে।

৬ই অগাস্ট, ১৯৪৫ সাল। জাপানের হিরোশিমাতে সময় সকাল ৮টা ১৫। বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ তার সর্বোচ্চ মেধা, জ্ঞান-বিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার এক প্রচেষ্টা চালায়। প্রথমবারের মতো তার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।



৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×