
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় একধরনের উৎসবের আমেজ ছিল। স্ট্যাটাস, পোস্ট, কমেন্ট—সবখানে একই সুর। বিএনপি দুইশো নয়টা আসন পেয়েছে, জামায়াত মাত্র সাতাত্তর, দেশ এবার ঠিক পথে যাবে। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল। মনে হচ্ছিল অবশেষে একটা পরিবর্তন আসছে। কিন্তু পরের দিন থেকে যা ঘটতে শুরু করল, তা দেখে মনে হল এই স্বস্তিটা হয়তো অকালেই এসেছে।
প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল বিজয় মিছিলের অনুপস্থিতি। কোনো রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচনে জেতে, বিশেষত যখন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পায়, তখন রাস্তায় কর্মীদের ঢল নামে। ব্যানার, ফেস্টুন, মিছিল, স্লোগান—এসব তো স্বাভাবিক। কিন্তু বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা দিল সব ধরনের আনন্দ মিছিল থেকে বিরত থাকতে। বদলে বলা হল মসজিদে দোয়া মাহফিল করতে। এই সিদ্ধান্তটা প্রথম দেখায় হয়তো বিনয় বা সংযম মনে হতে পারে, কিন্তু একটু গভীরে গেলে প্রশ্ন জাগে—দুইশো নয়টা আসন পেয়ে কেন একটা দল তার কর্মীদের উদযাপন করতে নিষেধ করবে? এটা কি শুধুই সংযম, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন, দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে, দোয়া করবেন যাতে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারি। এই বক্তব্যের টোনটা একজন বিজয়ী দলের মহাসচিবের জন্য বেশ অস্বাভাবিক। সাধারণত বিজয়ের পর আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় বক্তব্য আসে। কিন্তু এখানে যেন একধরনের সতর্কতা, এমনকি অনিশ্চয়তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেন তিনি জানেন সামনে যা আসছে তা মোকাবেলা করা সহজ হবে না।
তারপর এলো আরও বড় একটা খবর। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে যাবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায়। সময়সূচিও ঠিক করা—রোববার সন্ধ্যা সাতটায় শফিকুর রহমানের বসুন্ধরার বাসায়, আটটায় নাহিদ ইসলামের বেইলি রোডের বাসায়। এই খবরটা পড়ে অনেকেই চমকে গেছে। কারণ রাজনীতির সাধারণ শিষ্টাচার অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়লাভের পর বিজয়ী দলের কাছে অন্যরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসে, উল্টোটা নয়।
এই ঘটনাটা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, তারেক রহমান যাচ্ছেন এমন দুজনের কাছে যারা নির্বাচনে তার প্রতিপক্ষ ছিল এবং যারা মাত্র সাতাত্তরটা আসন পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই সাক্ষাৎ হচ্ছে মন্ত্রিসভা গঠনের ঠিক আগে—মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইতোমধ্যে জানিয়েছেন আঠারো ফেব্রুয়ারির মধ্যে শপথ হবে। তৃতীয়ত, এটা প্রকাশ্য কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, বরং ব্যক্তিগত বাসায় সন্ধ্যাবেলা সাক্ষাৎ। এসব মিলিয়ে যে চিত্রটা তৈরি হয়, তা হল—এটা কোনো সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আলোচনা বা সমঝোতা।
এখানে একটা তুলনা করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগ বিগত পনেরো বছর জোর করে দেশ শাসন করেছে ২০০৮ সালের দুইশো ঊনত্রিশটা আসনের গরমে —যা বিএনপির বর্তমান আসনের প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু সেই পনেরো বছরে আওয়ামী লীগ কখনো কোনো ছোট দলের কাছে মন্ত্রিসভা গঠনের আগে অনুমতি নিতে যায়নি। তারা একক ক্ষমতায় ছিল, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। অথচ বিএনপি, প্রায় সমান আসন পেয়েও, কেন এমন আচরণ করছে যা একটা দুর্বল অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়?
প্রধান উপদেষ্টার তিনজনকে—তারেক রহমান, শফিকুর রহমান এবং নাহিদ ইসলাম—ফোন করাটাও তাৎপর্যপূর্ণ। যদি তারেক রহমান দুইশো নয়টা আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে থাকেন, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার স্বাভাবিকভাবে শুধু তাকেই ডাকার কথা ছিল সরকার গঠনের জন্য। অন্য দুজনকে সমান গুরুত্ব দিয়ে ডাকার মানে হল—এই তিনজনের ভূমিকা প্রায় সমান হবে আগামী সরকার পরিচালনায়। এটা একটা সংকেত যে ক্ষমতা শুধু নির্বাচনী ফলাফলের উপর নির্ভর করছে না, অন্য কিছু ফ্যাক্টরও কাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এটা হয়তো একটা ঐক্যের নজির, সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ পরিচালনার উদ্যোগ। কিন্তু ঐক্য যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তার একটা স্বচ্ছ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থাকা উচিত। সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় কনসেনসাস বৈঠক, যেখানে সংবাদমাধ্যম থাকবে, জনগণ জানতে পারবে কী আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু রাতের বেলা ব্যক্তিগত বাসায় গোপন সাক্ষাৎ—এটা ঐক্যের চেয়ে দরকষাকষির মতো দেখাচ্ছে বেশি।
যে তরুণ প্রজন্ম গত বছর রাস্তায় নেমেছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, যারা স্বপ্ন দেখেছিল একটা গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি বিভ্রান্তিকর। একদিকে মনে হচ্ছে জামায়াত নির্বাচনে পিছিয়ে গেছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে তারেক রহমান নিজে তাদের নেতাদের কাছে যাচ্ছেন। তাহলে আসল ক্ষমতাটা কার হাতে? যে দল দুইশো নয়টা আসন পেয়েছে, নাকি যে দল সাতাত্তরটা পেয়েছে কিন্তু যাদের অনুমোদন ছাড়া মন্ত্রিসভা গঠন হচ্ছে না?
এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে যে বিএনপির কর্মীরাও নীরব। তারা বিজয় উদযাপন করছে না, মিছিল করছে না, স্লোগান দিচ্ছে না। যেন তারাও বুঝতে পারছে এটা একটা অসম্পূর্ণ বিজয়। অথবা হয়তো তাদের বলা হয়েছে চুপ থাকতে। কিন্তু কেন? একটা রাজনৈতিক দল যখন পনেরো বছর পর ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়, তখন তার কর্মীদের উৎসাহ ধরে রাখা অসম্ভব হওয়ার কথা। তবুও যদি তারা নীরব থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এর পেছনে কোনো বাধ্যবাধকতা আছে।
আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়—শপথ অনুষ্ঠানের তারিখ নিয়ে যে তাড়াহুড়ো। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে শপথ হয়ে যাবে। এত তাড়াতাড়ি কেন? সাধারণত নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনে একটু সময় নেওয়া হয়, যাতে সঠিক মন্ত্রী নির্বাচন করা যায়, দায়িত্ব ভাগ করা যায়। কিন্তু এখানে যেন একটা চাপ আছে দ্রুত শেষ করার। এবং ঠিক সেই চাপের মধ্যেই তারেক রহমান যাচ্ছেন শফিকুর রহমান আর নাহিদ ইসলামের কাছে। মনে হচ্ছে তাদের সম্মতি না পেলে শপথ এগোবে না।
এই পুরো পরিস্থিতি একটা প্রশ্ন তৈরি করছে—নির্বাচনে জেতার মানে কি শুধু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নাকি সত্যিকারের ক্ষমতা? তারেক রহমান হয়তো প্রধানমন্ত্রীর পদ পাবেন, কিন্তু সেই পদে বসে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? মন্ত্রিসভায় কারা থাকবে, কোন নীতি প্রণয়ন হবে, কোন আইন পাস হবে—এসব কি তিনি একাই ঠিক করবেন, নাকি শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামের সাথে পরামর্শ করে? যদি পরামর্শ করতে হয়, তাহলে সেটা কি পরামর্শ, নাকি অনুমতি?
অনেকে হয়তো বলবেন, এটা একটা জোট সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জোট সরকার তখনই গঠিত হয় যখন কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। বিএনপি তো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তাহলে জোট কেন? জোট হলে বিরোধি দল কে হবে ? আমরা আর কোনো আপা-জাপার নতুন ভারশন দেখতে চাই না ।
ধরা যাক, পরবর্তী কয়েক মাসে সরকার ভালোভাবেই চলছে। কিছু উন্নয়ন হচ্ছে, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। তাহলে কৃতিত্ব কার? তারেক রহমানের, নাকি সেই তিনজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার? আর যদি কিছু ভুল হয়, কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে দায় কার? প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়ী হবেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি নিয়ে থাকেন শফিকুর রহমান বা নাহিদ ইসলাম, তাহলে? এই অস্পষ্ট ক্ষমতা কাঠামো ভবিষ্যতে অনেক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
যে মানুষগুলো নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, তারা ভেবেছিল তাদের ভোট একটা পরিষ্কার ম্যান্ডেট দেবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই ম্যান্ডেট অস্পষ্ট। তারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু পাচ্ছে একটা মিশ্র সরকার যেখানে বিএনপির নেতা আছেন ঠিকই, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অন্যরা। এটা কি গণতন্ত্র, নাকি গণতন্ত্রের একটা বিকৃত রূপ?
আরও চিন্তার বিষয় হল, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কোথায় নিয়ে যাবে। যদি তারেক রহমান শুরু থেকেই দুর্বল অবস্থানে থাকেন, তাহলে পরবর্তীতে তিনি কি সেই অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবেন? নাকি এই দুর্বলতা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, এবং একসময় তিনি শুধুই একটা প্রতীকী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন, যার নামে সরকার চলবে কিন্তু আসল কাজ করবেন অন্যরা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। হয়তো তারেক রহমান প্রমাণ করবেন যে তিনি শক্তিশালী নেতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অথবা হয়তো দেখা যাবে যে এই আশঙ্কাগুলো সত্যি, এবং একটা নিয়ন্ত্রিত সরকার গঠিত হচ্ছে যেখানে প্রকাশ্য নেতা এক কিন্তু আসল ক্ষমতা অন্যদের হাতে।
যেটা নিশ্চিত, তা হল এই পরিস্থিতি সাধারণ নয়। এবং যারা মনে করছেন বিএনপির জয় মানেই সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে, তাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা উচিত। কারণ রাজনীতিতে প্রথম দৃষ্টিতে যা দেখা যায়, তা সবসময় সত্যি নয়। এবং এই ক্ষেত্রে, প্রথম দৃষ্টিতে যেটা বিজয় মনে হচ্ছে, সেটা হয়তো আসলে একটা জটিল সমঝোতা, যার শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




