somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি জাতীয় শোক দিবসের আত্মকাহিনি

১৫ ই আগস্ট, ২০১৭ সকাল ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের সবগুলো জাতীয় দিবসই আমরা দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে একসাথে পালন করে থাকি!
একটিই মাত্র জাতীয় দিবস, যেটা আমরা কখনোই সার্বজনীনভাবে পালন করতে পারি নি! প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পারি নি?!
উত্তরটা খুবই সোজা— এ দিবসটিকে আমরা চরমভাবে রাজনীতিকরণ করে ফেলেছি!
যে দেশের 'জাতীয়' শোক দিবসে সবাই মিলিত-একাত্ম হতে পারে না, সে দেশের, সে জাতির প্রতিহিংসাপরায়ণতা কোন পর্যায়ের— সেটা বোঝাতে আর কোনো যুক্তি-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না!

একটা লোক মারা গেল, তার জন্য আমরা 'জাতীয়' শোক পালন করতে যাবো কেন??
দেখুন, 'একটি লোক' ব্যাপারটা কিন্তু বড় দুশ্চিন্তার; কারণ, আপনার কাছে যিনি 'একটি লোক', আরেক জনের কাছে তিনি 'একটি দেশ'; আপনার কাছে যিনি 'একটি দেশ', অন্য জনের কাছে তিনিও 'একটি লোক'ই! ব্যাপারটা পরিপূর্ণরূপেই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে! একটি জাতীয় দিবস ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে— আমাদের জাতিগত সংকীর্ণতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে ভাবতে পারেন?!!
আপনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনকে বা ধরে নিলাম বঙ্গবন্ধুকেই, পছন্দ না-ই করতে পারেন; আমার মধ্যেও তাঁর ব্যাপারে কিছু অভিযোগ-অভিমানের ব্যাপার রয়েছে— এটা একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাপার!
কিন্তু দেখুন, আপনি যে দেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠছেন, যে ভূমিতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, রাত্রে ঘুমাচ্ছেন, দিনে অর্থোপার্জন করছেন, যে দেশের জাতীয়তা ধারণ করে পৃথিবীর একজন 'নাগরিক' হিসেবে পরিচিতি অর্জন করছেন, যে দেশ আপনাকে লালিত-পালিত করছে, সেই দেশটি 'দেশ' হয়ে ওঠার পেছনে যে মানুষটির উদ্দীপনা-প্রেরণা-আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, যে মানুষটি একাত্তরে আপনার-আমার হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ বপণ করে দিয়েছেন, যে মানুষটির আহ্বানে আমাদের পূর্বপুরুষ এ স্বাধীন দেশটি স্থাপন করেছেন— সে মানুষটির মৃত্যুদিনে তাঁর জন্য আপনার মধ্যে যদি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ-মমতাবোধ কাজ না করে, তাহলে আপনাকে আমি অকৃতজ্ঞ ও বেঈমান বলে চিহ্নিত করতে চাই!

তা বুঝলাম; তাই বলে আমার এ দিনে জন্ম হয়েছে বলে কি আমি পাপ করে ফেলেছি যে আমি আমার জন্মদিন উদযাপন করতে পারবো না?!
কে বলেছে, আপনি আপনার জন্মদিন উদযাপন করতে পারবেন না?! অবশ্যই পারবেন! তবে হ্যাঁ, ব্যক্তিগত আনন্দ যেন 'জাতীয়' শোককে ছোট করে না ফেলে, এ দিবসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে না ফেলে— সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে!
আপনি একটা কাজ করতে পারেন, পরিবারের লোকগুলোকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ছোটোখাটো করে একটা অনুষ্ঠান উদযাপন করুন, কেক কাটুন, মজা করুন! এতে জন্মদিনের আনন্দটাও হলো, আবার 'জাতীয় শোক দিবস' এর মর্যাদাও রক্ষিত হলো!

আচ্ছা, সেটাও না-হয় মানা গেল; কিন্তু এই যে, ট্রাক ভরে ভরে লোক ভাড়া করে এনে শোক দিবসের জনসভা করা হয়, এটা কেন করতে হবে?!!
এই ব্যাপারটাতে আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে একমত! একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিগতভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় শোকের দিন; এ দিনে তো ট্রাক ট্রাক লোক এক জায়াগায় এনে (সে ভাড়া করা হোক, বা অন্য কোনোভাবে) সমাবেশ করার প্রয়োজন পড়ে না! আসলে এভাবে লোক ডেকে এনে গলা ফাটিয়ে দুচারটা জ্বালাময়ী বাক্য ডেলিভারি দিয়ে শোক জাগানো যায় না! অনেককেই বলতে শুনি, 'এ শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে'! আরে ভাই, আগে শোকটা তো ভেতরে জাগ্রত হতে হবে, না-কি! শোনেন, যারা এভাবে লোক ডেকে এনে সমাবেশ-সভা করে অর্থ ও একই সাথে নিজ কণ্ঠস্বরের শ্রাদ্ধ করছেন তাঁদের বলছি, এগুলো করে কোনো জাতীয় স্বার্থ হাসিল করা যাবে না, জনতাকে এভাবে জাগানো যায় না! শোকটাকে হৃদয় থেকে হৃদয়ে পরিবাহিত করতে হবে, ট্রাকে-বাসে করে মানুষ পরিবহণ না করে বরং যিনি যে এলাকার মানুষ, তিনি সে এলাকার যুব-কিশোর সম্প্রদায়কে নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান করুন, সেখানে শোক-'উৎসব' নয়, শোক-'আবহ' নিশ্চিত করুন! দশ হাজার মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে গলা ফাটানোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, দশ জন মানুষের হৃদয়ে শোকটাকে 'প্রকৃত অর্থে' সঞ্চারিত করুন— এটাই জাতীয় শোক দিবসের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে!

সবশেষে, শুরুতে যে বলেছিলাম, দিবসটিকে 'রাজনীতিকরণ' করা হয়েছে; সেটা কেন বললাম?
যে শ্রেণিটি এ 'জাতীয় শোক দিবস' এর প্রবক্তা, এ দিবসটিকে আসলে তাঁরাই 'সার্বজনীন' করতে ব্যর্থ হয়েছেন, অথবা, বললে বোধহয় ভুল হবে না যে, এ দিবসটি 'সার্বজনীন' রূপ পাক— এটা তাঁরা আসলে অন্তর থেকে কামনাই করেন নি! এবং এর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থহাসিলের ব্যাপারটি যে সরাসরি জড়িত— এতে কোনোই সন্দেহের অবকাশ নেই!
এই যে তাঁদের বলতে শোনা যায় ইদানিং, "এ দিনটিতে জন্মদিন পালন করবেন না; আসুন সকলে সম্মিলিতভাবে জাতীয় শোক দিবস পালন করি"; এ আসলে তাঁদের মনের কথা না, তাঁরা আদতে অন্যটাই চান! কারণ, তাতে বিষয়টা নিয়ে 'রাজনীতি' চালিয়ে যাওয়ার সুযোগটা থেকে যায় বৈ কি!

তাই, সম্পূর্ণরূপে অরাজনৈতিক একজন মানুষ হিসেবে সকলকে আহ্বান জানাই, আসুন, দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সম্মিলিতভাবে 'জাতীয় শোক দিবস' পালন করি; হৃদয়ে হৃদয়ে এ শোকের চেতনা পরিবাহিত করি; এবং অতঃপর এ শোককে শক্তিতে পরিণত করি যাতে করে নতুন করে আর কখনো কোনো শোকের উপলক্ষ এ দেশমাতৃকার বুকে সৃষ্টি না হয়!
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০০১ সালেও বিএনপিকে ডোবানোর দায়িত্ব নিয়েছিল টুকু!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৫১


ভয়াবহ লোডশেডিং। মধ্যরাতে ঢাকবাসীর হাঁসফাঁস। হঠাৎ করে এতো লোডশেডিং হওয়ার কোন কারণ নেই অথচ মধ্যরাতে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকেনা বললেই চলে। গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ার সময় আছে কিন্তু আসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বাষ্ট্রপতি নির্বাচন নাকি রাষ্ট্রীয় খরচে তামাশা!!!

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


বাংলাদেশে সম্মানিত রাষ্ট্রপতি (হবু)


নির্বাচন, এই শব্দটি শুনা মাত্র যে বিষয়টি আমাদের মাথায় আসে তা হচ্ছে ভোট প্রদানের যোগ্য ভোটারদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে একজন যোগ্য ব্যাক্তিকে দায়িত্ব অর্পণের জন্য নির্বাচিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গজব পরিস্থিতি দেশের: বিদ্যুৎ নেই বিল ডাবল

লিখেছেন অর্ক, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭



হাহাকার পড়ে গেছে দেশে। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট চরম আকার নিয়েছে, নিচ্ছে। একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অপরদিকে ভূতুড়ে বিল। অদ্ভুত ব্যাপার। বিদ্যুৎ নেই, নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই বিল কম হওয়ার কথা। সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভাড়াটে কান্নাকারী

লিখেছেন রাজসোহান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



লোকে ভাবে আমরা কান্না বিক্রি করি। আমরা কান্না বিক্রি করি না। আমরা শব্দ বিক্রি করি।

শোকসভায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নীরবতা। বক্তা বক্তৃতা শেষ করে বসে পড়লেন, পরের বক্তা এখনো মাইকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে তে কি দেখতে চাই না

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



ওপার বাংলা আর এপার বাংলা মানে কোন দেশের কোন অঞ্চল বোঝায়, সেটা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু দু'বাংলার সংস্কৃতি বেশির ভাগটাই আলাদা। শব্দ উচ্চারন থেকে শুরু করে মন মানসিকতা, পোশাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×