১ ছেলেটি…...
ছেলেটি একটু লাজুক , চুপচাপ । প্রয়োজনে কথা ভালোই বলতে জানে , প্রয়োজন ছাড়া একদম নির্বাক । সবচেয়ে বড় যে সমস্যা , সেটা হল নতুন কেউ বা বিশেষ করে মেয়েদের সাথে কথা বলায় সে একদম অপটু । তালগোল পাকিয়ে ফেলে । অবসরে নিজের মনে গান লেখে , তাতে সুর দেয় আর দোতালার বারান্দায় রেলিঙে বসে গিটারের তারের ছোঁয়ায় তার সেই গানকে পূর্ণতা দেয় । তার গানের একমাত্র শ্রোতা একটি গোল্ডফিস , যার আবাস বারান্দার রেলিঙের পূর্ব-কোন । কখনো কখনো হয়তো সন্ধ্যায় মা কফির কাপ হাতে ছেলের গান শোনেন ।
সামনের ফ্ল্যাটে থাকে একটি মিষ্টি ও দুষ্টু মেয়ে । সমবয়সী তারা , এগার বছর বয়স থেকে প্রতিবেশী । মেয়েটির সাথে ছেলেটির যমজ বোনের অনেক খাতির । তাদের বাসায় প্রায়ই আসে মেয়েটি ।ছেলেটি যে মেয়েটিকে নিয়ে কবে থেকে নিজের মনের সাথে নিজেই লুকোচুরি খেলছে তা নিজেও জানেনা । তার সকল গানেই মেয়েটির অবয়ব অস্পষ্টভাবে খেলতে থাকে । কিন্তু সে যে নিভৃতচারী , তাই তার মনের কথা মনের গহীনেই থেকে যায় । মনের কথাটি বাস্তব রূপ না পেয়ে মনের ভেতর পাক খায় আর গানের কলির মাঝে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় । এভাবেই চলছিল । তার ডায়েরি আর সে নিজে ছাড়া এই সত্য কেউ জানত না । ছেলেটির নাম হৃদয় ।
২ মেয়েটি......
ছটফট আর দুষ্টুমি মেয়েটির প্রধান বৈশিষ্ট্য , কিন্তু কেন জানি এতে কেউ বিরক্ত হয়না । শ্যামবর্ণ মিষ্টি এই মেয়েটির আছে দুষ্টামি ভরা ডাগর দুটি কাজল কালো চোখ , যার দিকে তাকালে যে কেউ বলবে “এই মেয়ে যদি চঞ্চল না হয় তবে কে হবে’’ ? । মেয়েটি গান শোনে , ছবি আঁকে , বাসায় সারাদিন হইচই করে , কিন্তু পাশের বাসার ছেলেটি যখন বারান্দায় বসে উদাসী গলায় গান গায় তখন মেয়েটি অস্বাভাবিক রকমের শান্ত হয়ে যায় । মেয়েটি জানালার পর্দা টেনে দিয়ে পর্দার এপাশ থেকে চুপ করে গান শোনে । দিনের বেলা হয়তো অস্পষ্ট শোনা যায় , কিন্তু গভীর রাতে ছেলেটির মৃদু গলার সুর মেয়েটিকে অন্য এক অপার্থিব পৃথিবীর মাঝে নিয়ে যায় । মেয়েটি এমন এক জাদুর মায়াজালে আবদ্ধ হয় যে এত ছটফট মুখরা মেয়েটি ও ছেলেটির সামনে গেলে কেমন জানি আড়ষ্ট হয়ে যায় । লজ্জায় মাথা তুলে রাখা কষ্টকর কয়ে দ্বারায় । পরে এর জন্য নিজের উপর অনেক রাগ লাগে মেয়েটির , কিন্তু কিছু করার নেই । ছেলেটিকে দেখলেই সেই সুর এসে মেয়েটির বাস্তবতা-বোধ বিলুপ্ত করে দেয় । পারতপক্ষে মেয়েটি তাই লজ্জায় হোক বা অন্য কারণে হোক , ছেলেটিকে দেখলেই পালায় । কিন্তু মনের কোনে ছেলেটিকে নিয়ে অনেক স্বপ্নের মহল গড়ে মেয়েটি , যেখানে ছেলেটিকে দিয়েছে সে রাজপুত্রের আসন । মনে মনে সেই রাজপুত্রের সাথে মেয়েটি ঝগড়া করে, হাসে , কাঁদে , ভালবাসে । কল্পনায় তারা অনেক অনেক গল্প করে , অথচ বাস্তবের রাজপুত্র সেই ছেলেটির তা অজানাই থেকে যায় । বলব বলব করেও মেয়েটির আর বলা হয়না মনের কথা । অব্যক্ত থেকে যায় তার স্বপ্ন । মেয়েটির নাম চন্দ্রা ।
৩ গল্প............
পুস্প , হৃদয়ের যমজ বোন । আজ তার মন খুব খারাপ । দুই বছর আগে এই দিনে সে হারিয়েছে তার সবচেয়ে প্রিয় কাছের বন্ধুটিকে , আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী । চুপচাপ হৃদয়ের ঘরে বসে আছে সে । ঘরটি খুব সাজানো গোছানো , প্রচুর বই , একপাশে একটা গিটার। পড়ার টেবিলের পাশেই একটি কম্পিউটার । ঘরটির গত দুই বছরে কোন পরিবর্তন হয়নি , পুস্প হতে দেয়নি । হৃদয় যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনই আছে । পুস্প জানে হৃদয় আর কখনো এই ঘরে ফিরে আসবেনা । সে চলেগেছে অনন্তপারে , না ফিরে আসার দেশে , দুই বছর আগে আজকের এই দিনে ।
চোখে পানি নিয়ে হৃদয়ের বইগুলির দেখছিল সে , হাতে নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছিলো আর তাতে খুঁজে ফিরছিল হৃদয়ের সৃতি । ভাগ্যের পরিহাসে একসময় হৃদয়ের ডায়রিটা হাতে আসলো তার । পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করল তার ভাইয়ের লুকানো ভালবাসার অজানা এক জগত । কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ল সে , নিয়তির নির্মমতা দেখে ।
৪ পরিশেষ......
ডায়েরিটা পুস্প চন্দ্রার হাতে তুলে দিয়েছিল । কে জানে , হয়তো এতেই হৃদয়ের আত্মা শান্তি পাবে । সেদিন সন্ধ্যায় চন্দ্রা এলোচুলে চুপচাপ ছাদে বসে ছিল , ডায়েরিটা সামনে আধখোলা , আকাশে তখন গুড়গুড় শব্দে মেঘ ডাকছে । যে কোন সময় অঝোর ধারায় ভেসে যাবে পৃথিবী । চন্দ্রা অপেক্ষায় আছে , মনে ক্ষীণ আশা হয়তো তার মনের চাপা কষ্ট ধুয়ে যাবে শ্রাবণের বর্ষণে । বৃষ্টির প্রথম ফোটাটি নিচে নেমে এসে মিলিত হল চন্দ্রার চোখের জলের সাথে । উপরের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে , বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক ফিসফিস হাহাকার “ তুমি যেখানেই থাক , আমি জানি তুমি শুনছ । শুধু জেনে রেখ চন্দ্রা আজও তোমায় ভালবাসে , ভালবাসবে সারাজীবন ’’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


