somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তির মোহে বন্দি জীবন: এক যান্ত্রিক সভ্যতার আর্তনাদ

১৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বর্তমানে আমাদের চারপাশের জীবনযাত্রা যেন এক ধূসর পাণ্ডুলিপি। আমাদের প্রতিদিনের যাপন ক্রমেই রুক্ষ হয়ে উঠছে, যেখানে ব্যস্ততার বেড়াজালে আটকা পড়ে আছে মানুষের সহজ-সরল আবেগগুলো। আমরা যাকে 'উন্নত জীবন' বলছি, তা আসলে স্বার্থপরতার এক সূক্ষ্ম আবরণে ঢাকা যান্ত্রিক অস্তিত্ব মাত্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পরিবর্তনটুকু স্বাভাবিকভাবে হয়নি; বরং এক সুনিপুণ পরিকল্পনায় আমাদের জীবনকে যান্ত্রিক করে তোলা হয়েছে।

আপনার পেশা চাকরি হোক বা ব্যবসা—তা আপনার ২৪ ঘণ্টার সিংহভাগ সময় গিলে খাচ্ছে। সেই চিরাচরিত '৯টা-৫টা' অফিস আজ কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ। এক অদৃশ্য চাপে আপনাকে বাধ্য করা হচ্ছে রাত ৮টা কিংবা ৯টা পর্যন্ত শ্রম দিতে। বিনিময়ে হয়তো অতিরিক্ত পারিশ্রমিক মিলছে না, মিলছে কেবল কিছু 'মরীচিকা'—যেমন 'Employee of the Year' এর তকমা, পদোন্নতির প্রলোভন কিংবা বিদেশ ভ্রমণের রঙিন মুলা। আর যদি তাতেও কাজ না হয়, তবে 'চাকরিচ্যুতি'র খড়গ তো ঝুলেই আছে।দিনশেষে জ্যামের বিষাক্ত নিঃশ্বাস পেরিয়ে যখন আপনি ঘরে ফেরেন, তখন আপনার ভেতরে আর কোনো 'মানুষ' অবশিষ্ট থাকে না। রান্নাবান্না, সন্তানদের সঙ্গে কিছুটা নিবিড় সময় কাটানো কিংবা তাদের নৈতিকতার পাঠ দেওয়া—এর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা বা শারীরিক সক্ষমতা নিভে যায় অফিসিয়াল কলের যন্ত্রণায়। আপনার রাতের ঘুমটুকু তখন কেবল প্রশান্তি নয়, বরং পরের দিন আবার ঘানির টানে ফেরার এক বাধ্যগত প্রস্তুতি।

বিচ্ছিন্ন শৈশব ও শিকড়হীন প্রজন্ম
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে আমাদের সন্তানদের জীবনে। বাবা যখন জীবিকার সন্ধানে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন, সন্তান তখন হয়তো গভীর ঘুমে। সন্তানের স্মৃতি থেকে পিতার অস্তিত্ব আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যেতে থাকে। বাবা ব্যস্ত ক্যারিয়ারের সিঁড়ি ভাঙতে, আর সন্তান পিষ্ট হচ্ছে স্কুল, কোচিং আর হোমওয়ার্কের পাহাড়ের নিচে।
আমাদের সন্তানদের আজ অফুরন্ত শৈশব নেই, আছে এক 'ঘরবন্দি কারাগার'। তাদের চিন্তার আকাশে ডানা মেলার সুযোগ নেই, কারণ তারা ডুবে আছে ফ্যান্টাসি গেমস আর মারপিটের কার্টুনে। আমরা তাদের শেখাতে পারছি না ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস, নবী ও সাহাবীদের বীরত্বগাথা কিংবা মনীষীদের আদর্শ। কারণ আধুনিকতার মোহে এসব আজ 'ব্যাকডেটেড'। ফলে তাদের হিরো আজ উমর (রাঃ) কিংবা খালিদ বিন ওয়ালিদ নন, বরং স্পাইডারম্যান বা ডোরেমন—যারা কাল্পনিক এবং অন্তঃসারশূন্য। এই ভার্চুয়াল জগত তাদের কল্পনা করতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায় না।



সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও সুনিপুণ নিয়ন্ত্রণ
অন্যদিকে, অবসরের নাম করে পরিবারে ঢুকে পড়েছে ভিনদেশি সিরিয়াল আর অসুস্থ বিনোদন। শিশুরা সেখান থেকে শিখছে কুটনামি, মিথ্যে আর কৃত্রিমতা। আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয়েছে যাতে আমরা নিজেদের জীবন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা আধ্যাত্মিক বিকাশ নিয়ে ভাবার সামান্যতম ফুরসত না পাই।এই যে আমাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ রুদ্ধ করা এবং আমাদের কেবল 'ভোক্তা' হিসেবে গড়ে তোলা—এসবই এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। কারণ যারা গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে না, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তারা হবে মেরুদণ্ডহীন এক জেনারেশন, যারা কেবল অন্যের নির্দেশে চলবে। মিডিয়া আর কর্পোরেট জগত আমাদের এক অদ্ভুত মায়ার জগতে আবিষ্ট করে রেখেছে, যেখানে আমরা বিশ্বাস করি—এটাই স্বাভাবিক জীবন।

আসলে আমরা এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই ঘুম ভাঙার সময় হয়তো এখনো আসেনি। আমাদের জীবনযাত্রা আজ এমন এক বিন্দুতে দাঁড়িয়েছে যেখানে আমাদের সত্তাকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দিনশেষে আমাদের পরিস্থিতি আজ অনেকটা এমন:

"Say what they want you to say, think what they let you think, eat what they provide you, lead a daily life as a routine made by them and Before Going to sleep repeat after them " I am modern and free man" '"



আসলে কি আমরা স্বাধীন? নাকি এক সুশৃঙ্খল দাসের নামই বর্তমানের 'আধুনিক মানুষ'? এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার সময়টুকুও আজ আমাদের কাছে নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা সবাইকে ❤️

লিখেছেন সামিয়া, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪০



নরম রোদের স্পর্শ পেয়ে
পুরনো দিনের ক্লান্তি ক্ষয়,
বুকের ভাঁজে জমে থাকা
অভিমানগুলো ভেসে যায়।

পহেলা বৈশাখ এল যখন,
রঙিন হাওয়ায় মেলা বসে,
বৈশাখী ঢাকের তালে তালে
মনটা নাচে হাসিমুখে।

শুভ নববর্ষ ডাকে ধীরে,
যাক পুরাতন স্মৃতি সব,
যাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গুদের সমস্যা কি ইসরায়েল নিয়ে?

লিখেছেন অর্ক, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:২৮



ফিলিস্তিন দেশ না হলেও তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো আছে। এক ধরনের ছায়া সরকারের মতো ব্যাপার আরকি। ইয়াসির আরাফাত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এখন মাহমুদ আব্বাস। সে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভার্সন আঘাবেকিয়ান শাহিন সম্প্রতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

এহসানুল হক মিলন: টাইম মেশিনে আটকে থাকা এক শিক্ষামন্ত্রী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১০


বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সাদা-কালো টেলিভিশন আর ল্যান্ডফোনের জামানায় এহসানুল হক মিলন যখন হেলিকপ্টারে চড়ে আকাশ থেকে নকলবাজ ধরার মিশনে নামতেন, তখন লোকে তাকে ‘বাংলার জেমস বন্ড’ ভেবে হাততালি... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীলিমা, তুমি চলে যাবার পর থেকে

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৩৪

নীলিমা, তুমি চলে যাবার পর থেকে
আমার হৃদয়জুড়ে কেবলি দহন !
মেঘের ঘোমটা সরিয়ে আমি কতবার
রূপালি চাঁদের সেই মায়াবিনী মুখচ্ছবি
... ...বাকিটুকু পড়ুন

-প্রতিদিন একটি করে গল্প তৈরি হয়-৪৯

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩





---------------------------------------------------------
সবাইকে নতুন বাংলা বর্ষের-১৪৩৩ এর শুভেচ্ছা।




বৈশাকের সকালে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবী উপহার পাঠালেন বিন্নি চালের মিষ্টি ভাত। খেতে দারুন। চট্টগ্রামে এই দিনে বিন্নি ভাত, মধু ভাত খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।




তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×