
হঠাৎ বৃষ্টি নামছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ।
আমি শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় বসে আছি এক মগ কফি হাতে নিয়ে সামনে ভেজা আকাশ। বাতাসে কেমন কাঁচা মাটির গন্ধ। এই গন্ধটা অদ্ভুতভাবে মানুষকে অতীতে ফিরিয়ে নেয়।
আমার শ্বশুর বাবা মারা গেছেন এ বছরের প্রথম ফাল্গুনে তাকে ছাড়া এ বছর প্রথম কুরবানীর ঈদ; আজও মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না মানুষটা নেই। আমার নিজের বাবাও তো এমন করেই চলে গেলেন।
এমনভাবে মানুষ হারিয়ে যায় কেন? হঠাৎ পৃথিবী থেকে মুছে যায় তারপর সারাজীবন শুধু আফসোস বাকি থাকে। মনে হয়, ইশ যদি আরেকটু কথা বলতাম! আরেকটু পাশে বসতাম!
আমার মেঝো ভাই ছাড়াও দুটো ঈদ পার করলাম।
ঈদের সকাল এলেই এখন বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগে। অথচ একটা সময় ঈদ মানেই ছিলো বাড়িভর্তি মানুষজন আনন্দ হাসাহাসি।
আব্বা সকাল সকাল উঠে সেমাই খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তে চলে যেতেন। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতো; বড় হাঁড়িতে গরুর মাংস, খিচুড়ি চড়িয়ে দিতেন।
খুব ছোট বেলায় ঈদের দিন আমাকে সাজিয়ে দিত মেঝো আপু; বিকট করে মেকআপ দিতো গালে এত পাউডার মাখাতো যে নিজের চেহারা নিজেই চিনতাম না, ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক চোখে মোটা কাজল।
ছোট হলেও এতটুকু তো বুঝি এমন সাজে আমাকে একদম মানায় না, আমি আপুকে বলতাম, এভাবে সাজিও না! আমার বান্ধবীরা হাসবে! আপুকে ভয়ও পেতাম একটু। তাই বেশি কিছু বলতে পারতাম না।
আপু ধমক দিয়ে বলতো, চুপ করে বসে থাক! ঈদের দিন সুন্দর করে সাজতে হয়!
এখন আয়নার সামনে বসলে মাঝে মাঝে সেই কথাগুলো মনে পড়ে। মনে হয়, মানুষ আসলে চলে যায় না পুরোপুরি। কিছু কিছু মানুষ আমাদের ভেতরেই রয়ে যায়। কোনও গন্ধে, কোনও বৃষ্টিতে, কোনও ঈদের সকালে।
আমাদের পরিবারে মেঝো আপুই সবার আগে চলে গেলো।
আজও ভাবলে অবাক লাগে। এত প্রাণবন্ত একটা মানুষ হঠাৎ করেই না থাকার দলে চলে যেতে পারে?
আচ্ছা, আপন মানুষগুলো কেন এভাবে হারিয়ে যায়?
কেন কেউ আগে থেকে বলতে পারে না, এই দেখো, আমি চলে যাচ্ছি। যত কথা আছে বলে নাও।
তাহলে হয়তো আমরা একটু কম রাগ করতাম। একটু বেশি ভালোবাসতাম, তাদের মনের শেষ ইচ্ছা গুলো পুরন করতাম, আজ বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, জীবনটা আসলে এত্ত ছোট অথচ আমরা কত সহজে ভেবে নিই, আমরা সবসময় এই পৃথিবীতে থাকবো।
তারপর একদিন জীবনের কোন এক মোড়ে এসে সেই ভেতরের ভ্রান্তিটা আর থাকে না, আমরা বুঝে যাই একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে।
অবুঝ মন তবু ভাবি, সময়টা যদি একটু ফিরিয়ে আনা যেতো! শুধু একবার, আরেকবার, সবাইকে দেখতে পারতাম।
কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। বৃষ্টিও একটু কমেছে। দূরে মসজিদ থেকে আসরের আযান ভেসে আসছে।
আমি চুপচাপ বসে আছি।
আর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে,
জীবনে সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো আমরা বুঝতেই পারি না, যতক্ষণ না সেগুলো স্মৃতি হয়ে যায়।
ছবিটা আসরের আজানের সময় তুলেছি ঠিক যেখানে বসে লিখছিলাম সেখানে বসেই,
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



