
দেশে রুগির চেয়ে ডাক্তার, নার্স বা সরকারী সেবা প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা অনেক কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯ জন। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জনমিতি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে পল্লী চিকিৎসকের (Rural Medical Practitioners বা Village Doctors) আনুমানিক সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও জনমিতি জরিপ অনুসারে, যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২% থেকে ১৫% মানুষ কোনো না কোন কারনে রুগী বা চিকিৎসকের সরনাপন্ন হয়। সে হিসেবে দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রতিদিন ডাক্তারের কাছে যান। অর্থাৎ গড়ে একজন ডাক্তারের বিপরীতে ২২৭ জন রুগি বাংলাদেশে বিদ্যমান।
বাস্তবতা হল, সব রুগি ডাক্তারের কাছে যান না। তাদের কেউ আগের প্রেসক্রিপশন ফলো করে, কেউ ডিসপেনসারী থেকে অন্যের উপদেশ মত ওষুধ কিনে খায়, কেউ আছে টাকা বা অন্য কোন কারনে ডাক্তারের কাছে যায়-ই না। সে হিসেবে একটি বেসরকারী জরিপ বলছে, একজন ডাক্তারের কাছে গড়ে প্রতিদিন ৩৫-৪৫ জন বা গানিতিক ভাবে ৪০জন রুগী প্রতিদিন একজন ডাক্তারের কাছে যান।
একজন সরকারের নিবন্ধনকৃত ডাক্তার দিনে ৭ ঘন্টা সেবা দেবার কথা। বস্তবতা হল ওনারা গড়ে ৩ ঘন্টাও দেন না। আবার দিনে রাতে ৬ ঘন্টা ঘুমানোর সময় পান না। তাহলে বাকি কর্ম ঘন্টা কি করেন?
৭ ঘন্টা না হোক ৫ ঘন্টা সেবা দিলেও ৪০ জন রুগি সরকারী হাসপাতালে গড়ে ৮ মিনিট সময় পান। বাস্তবতা হলো, কোন রুগি ২ মিনিটের উপর সময় পান না। আউটডোরের রুগি ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকে আর বারায়। ওর্য়াডে রাউন্ড দিতে গিয়ে ২০০ রুগি দেখে ২০ মিনিটে। ডাক্তাররা সময় মত হসপিটালে না আসুক, সময় মত বেরিয়ে যান, সেটা দুপুর দুটা বা বিকেল ৪ টা তাদের রুটিন অনুযায়ী।
এর ফাঁকে তারা মেডিকেল রিপ্রিজেনটিভদের সময় দেন, কেউ কেউ বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসেন, কেউ কেউ নাস্তা খান, ফোনে লম্বা সময় আলাপ করেন, অফিসিয়াল মিটিং সারেন, বা অন্য কলিগের রুমে গিয়ে আড্ডা দেন। অন্যদিকে যদি ব্যক্তিগত ক্লিনিক থাকে, ভিআইপিদের ফোন কলে দৌড় দেন।
এদিকে ইন্টারনি ডাক্তাররা নাইট ডিউটি পেলে বেশির ভাগ দারুন খুশি। কারন রাতে কাজ কম। সারারাত মুভি দেখা, ফেসবুকিং বা কলিগদের সাথে আড্ডা আর প্রেমালাপে ভালই কাটে।
শহর বা নগরের হসপিটাল / ক্লিনিকে চাপ সত্যিকার অর্থেই অনেক বেশি। কারন থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নার্স থাকে না। থাকলেও প্রয়োজনে পাওয়া যায় না। সবগুলো যদি সচল করা যেত এবং জবাবদিহিতার অধীনে আনা যেত, তাহলে শহরের চিকিৎসালয়ে চাপ কমত। সেই সাথে শহরের ডাক্তারদের ব্যক্তিগত প্রাকটিস কমিয়ে আনা দরকার। তাদের ইনকামে লাগাম টেনে ধরা দরকার। দেশে বর্তমানে ৪০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা ভিজিটের ডাক্তার আছে। কারও কারও কাছে ৩ মাস আগে সিরিয়াল নিতে হয়।
শহুরে ডাক্তারের উপর চাপ বাড়লে, মানসিক বিকারগ্রস্ত হবেই, ধৈর্য্য হারাবেই। ডাক্তাররাও মানুষ। যেহেতু বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন সহজে হবে না। রুগীর স্বজনরা ধৈর্য্য হারিয়ে ডাক্তারদের উপর চড়াও হবেই। বরং দিনকে দিন বাড়বে। রাগ উঠলে ঝি কে মেরে রাগ মেটানোর মত ইন্টার্নি ডাক্তাররা পিটন খেয়েছে। সামনে সিনিয়ররা খাবে।
নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। রাস্তায় চলার সময় টমটম এসে আমাকে আঘাত করে। তাতে হাত কেটে যায়। ৬টা সেলায় লেগেছিল। সিলেট ওসমানি মেডিকেলের এক ইন্টার্নি ডাক্তার আমার সেলাই করতে গিয়ে একটা সুই বেকে ফেলে, ২য় একটা সুই দিয়ে সেলাই (স্টিচ) করার সময় তার হাত বৃদ্ধ মানুষের মত কাঁপছিল। এই যদি ইন্টার্নি ডাক্তারদের অবস্থা হয়, আর তাদের জরুরি বিভাগে বসিয়ে রাখা হয়, তাহলে কত ক্ষণ আপনি ধৈর্য্য ধরে রাখবেন?

গতপরশু বগুড়া জিয়ায়ূর রহমান মেডিকেল কলেজে, ইন্টার্নি ডাক্তাররা সংবাদ সম্মলনে বলল, মৃত রুগির স্বজনরা হামলা করেছে। কিন্তু পুলিশ গিয়ে দেখল, রুগির স্বজনরা আহত। দুজনের হাত ভেঙ্গেছে, ৪ জনের কেটে ছিড়ে গেছে। কারও গায়ে কাপড় নেই, মারধোরে ছিড়ে গেছে। কিন্তু কোন ইন্টার্নি ডাক্তার তেমন আহত হয়নি। তাহলে বুঝুন এই সব ইন্টার্নি ডাক্তাররা কতটা বেপরোয়া, সেবা না দিয়ে মারধোর করে বেড়ায়। সবচেয়ে অমানবিক কাজ হল, গত ২ দিন হল তারা কর্মবিরতিতে আছে। আমার কাছে এরা হল ট্যালেন্ট অমানুষ নির্লজ্জ বিবেগহীন ইন্টার্নি ডাক্তার। যাদেরকে নিজের হাতে বিচার তুলে নেয়া এবং কর্মবিরতিতে যাওয়ার জন্যে আইনের আওতায় শাস্তি দেয়া খুব জরুরি। নচেৎ এটাকে উদাহরন হিসেবে নিয়ে, সারা বাংলাদেশের ডাক্তার সমাজে এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়বে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

