somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুলসিরাত

২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দিনটা ছিল দুর্যোগময়। সকাল থেকে বৃষ্টি- জলে ঢেকে গিয়েছিল রাস্তা-ঘাট। ঢেকে গিয়েছিল ঢাকনা খোলা ম্যানহোল। পরিণত হয়েছিল অদৃশ্য মরণকূপে। এর মধ্যেই মানুষ বেরিয়েছিল কাজে। উদ্বিগ্ন আর ক্ষুদ্ধ মানুষেরা যানবাহনের খোঁজে হয়ে উঠেছিল মরীয়া। বাসা থেকে কর্মস্থল, কর্মস্থল থেকে বাসা- তিন থেকে বারো কিলোমিটার দূরত্ব বড়জোর, সেটাই যেন হয়ে উঠেছিল পুলসিরাতের মতো কঠিন এক পথ। জামা-জুতো নষ্ট করে, জলে ভিজেও যখন বাসে উঠতে ব্যর্থ হলে বাসায় ফিরতে চাওয়া মানুষগুলি অভিশম্পাত করছিল একে অপরকে। কেন অন্যেরা এই শহরে এসেছে ভীড় বাড়াতে? তারা কি গ্রামে থেকে কৃষিকাজ করে জীবন চালাতে পারত না?

এই সুযোগে ভাড়ায় চালিত বাহনগুলি ভাড়া তিন থেকে চারগুণ করে ফেলেছিল, বচসা বেঁধেছিল সেখানেও। যে শহরে চলছিল এই যুদ্ধ পরিস্থিতি, তা ছিল দেশটির রাজধানী। তাই টিভি আর সোশাল মিডিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জনদুর্ভোগের কথা প্রকাশিত হচ্ছিল। দুর্যোগের দিনের গল্পগুলির কাটতি বেশি।

এমন একটা দুর্যোগমইয় সময়ে বাসে উঠে আসন পাওয়ার চেয়ে ভালো কিছু আর হতেই পারে না! শাহীন আর আতিক, দুইজন সহকর্মী তাই বাসে উঠে পাশাপাশি বসার পর একে অপরের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির হাসি হাসল।

-উঠে তো বসলাম, কিন্তু পৌঁছাব কখন তার নাই ঠিক!
আতিক বলল।
-এখন বাজে ছয়টা ত্রিশ। আমার মনে হয় মিরপুরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্তত ১০টা বাজবে।
-১০টা তো কমই বললেন। নরমাল সময়েই মাঝেমধ্যে সাড়ে নয়টা বেজে যায়। এই সেদিনই তো, বৃহস্পতিবার রাতে এই কান্ড হইল।
-যাক, উঠে বসতে পারছি, এটাই বড় কথা। এই এত সময় দাঁড়ায় থাকাটা পেইনফুল।

তাদের আশঙ্কা সত্যি করে মতিঝিল থেকে পল্টনে পৌঁছুতেই ঘন্টা দেড়েক বেজে যায়। বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে, কিন্ত পানি নামতে শুরু করে নি। ভ্যাপসা গরমে তারা বিপর্যস্ত। এমন একটা সময়ে খোশগল্প চলে না। বের হয় শুধু অভিশম্পাত।
-আল্লাহর গজব পড়ছে এই শহরে।
বলল আতিক। কণ্ঠে তার উত্তাপ।
-হ্যাঁ, আপনারা তো পাইছেন দোষ দেয়ার মতো শুধু আল্লাহকেই। নিজেদের দোষ কিছু দেখেন না। কাল্পনিক এনটিটির ওপর দোষ চাপান। অদ্ভুত আপনারা আসলেই!

শাহীন ঝাঁঝভরা কণ্ঠে উত্তর দিলো। এমন করে না বললেও চলত তার। সে সাধারণত এসব বচসা এড়িয়ে চলে। কিন্তু এই ভীষণ স্থবিরতা তার ভেতরের জমে থাকা অগ্নিপিণ্ডকে গতি দিলো। শাহীনের এমন রূঢ় আচরণে স্বাভাবিকভাবেই আতিক ক্ষুদ্ধ হলো।

-দেখেন শাহীন, আপনি ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাস করেন না ঠিক আছে, তাই বলে এভাবে কথা বলতে পারেন না। এভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে নিজেদের খুব মানবিক ভাবেন?

গাড়ি তখন পল্টনের মোড়ের দিকে এগুচ্ছে। সিগনালটা পার হলেই রাস্তা অনেকটা ফাঁকা। কিন্তু সেই অবস্থায় হঠাৎ করে গাড়ি থামিয়ে দিলো ড্রাইভার আর কন্ডাক্টর ডাকতে লাগল রাস্তায় থাকা যাত্রীদের। বাসের ভেতর পিষ্ট হয়ে থাকা, বিশেষ করে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা হই হই করে উঠল!
“ঐ মিয়া ফাইজলামি করো!” “আর কত লোক উঠাইবা?” “ব্যাটারে ধইরা নামায় দেন তো গাড়ি থিকা” (অবশ্য ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলে কে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে সে কথা কেউ জানে না)।
এই অবস্থায় শাহীনের কাছে পুরো পৃথিবীকে শত্রুপক্ষ মনে হতে লাগল। বিশেষ করে পাশে বসে থাকা আতিককে। তার মনে হলো, তাদের ধর্মান্ধ, উগ্র মতবাদের কারণেই পৃথিবী উচ্ছনে চলে যাচ্ছে।
-হ্যাঁ, খুব অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে ফেলছি, না? এখন কী করবেন? মাইরা ফালায় দিবেন? কল্লা কাটবেন? বোমা মারবেন?
প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আগ্রহ ভরে সে জবাবের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সে জানতে চায় তাকে কী করা হবে।
-দেখেন, আপনি এইসব লোডেড প্রশ্ন কইরেন না। আমি বইলা না হয় চাইপা গেলাম কিন্তু…
-কিন্তু কী ভাই! বলেন, কিন্তু কী! চাইলেই তো একটা মব ক্রিয়েট কইরা আমারে মাইর দেওয়াইতে পারেন তাই না? তাই তো বলতে চাইতেছিলেন? স্যরি ভাই, ভুল হয়া গেছে। আর অনুভূতিতে আঘাত করমু না। মাফ কইরা দেন আমারে।

নিজেকে যুক্তিবান মানুষ দাবী করা শাহীন যুক্তির ধার ধারছে না। এমন আচরণ দেখে আতিকও চুপ রইল না। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে কীভাবে সমাজটাকে নষ্ট করা হচ্ছে পশ্চিমা মদদে, তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলো সে। শাহীনের কাছে জানতে চাইল যে সে আর কতদিন এসব ব্যাপারে অন্ধ থাকবে। কেন সে ষড়যন্ত্রগুলি খতিয়ে না দেখে আধুনিক সভ্যতার সর্বনাশা পথে দিকভ্রান্তের মতো পা বাড়াচ্ছে। জবাবে শাহীনও বাছা বাছা শব্দ দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করল আতিককে। তাকে পরামর্শ দিলো মনকে প্রসারিত করতে। জানতে চাইল, আর কতদিন স্বেচ্ছা অন্ধত্ব বরণ করে থাকবে।

এই সময়ে বাস পল্টন মোড় পার হয়ে সাবলীল গতিতে এগিয়ে যেতে থাকল শাহবাগের দিকে। বেশ হাওয়া বইতে লাগল। প্রাণ জুড়োলো তাদের। তখন তাদের মনে হলো যে অন্যের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নিয়ে জোর জবরদস্তির কিছু নেই। এসব ব্যাপারে তর্ক করাটাই বৃথা। তারা তর্ক স্থগিত রেখে আসনে মাথা রেখে ঘুমোতে চেষ্টা করল।

মাঝেমধ্যে থেমে, মাঝেমধ্যে মৃদুমন্দ গতিতে এগিয়ে যেতে লাগল বাস। এর মধ্যে তারা খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়েছে। টিকে থাকতে হলে মানুষকে বিরুদ্ধ পরিবেশে কঠিন সব কাজ করা শিখতে হয়। তারাও এমন সব কঠিন দক্ষতা আয়ত্ত করে নিয়েছে। তারা ভীড় বাসে, ঝাঁকির মধ্যে ঘুমিয়ে নিতে পারে। এমন কী মিটিংয়ের মধ্যে মনোযোগ দিয়ে শোনার ভান করেও ঘুমিয়ে নেয় অনেকসময়।

কাওরানবাজারে এসে দুজনের ঘুম ভাঙল। বৃষ্টিটা আবার জোরে নেমেছে। আর তার জের ধরে রাস্তায় আবারও গাড়িগুলি স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কেন গাড়ি থামানো হলো তা নিয়ে যাত্রীদের সাথে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়েছে বাসের স্টাফদের। এরমধ্যে ঘুম ভেঙে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দুইজনই। তাই এসব দেখে তারা বিরক্ত হয় না। বরং ঘটনার পরিণতি কোনদিকে যেতে পারে তা দেখার জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। দুজনের মধ্যে তখনও বজায় আছে শীতলতা। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। কিন্তু মিরপুর পৌঁছুতে আরো অন্তত ঘন্টাদুই লেগে যেতে পারে, তাই দুইজনের পক্ষে এভাবে কথা না বলে ঠায় বসে থাকাটা বিব্রতকর এবং বিরক্তিকরও বটে। আতিক সদালাপী মানুষ। সে ঠিক করে কাওরানবাজার সিগন্যাল পার হলেই কিছু একটা ছুতো বের করে নেবে কথা বলার। ছুতো পেয়েও গেল সে। তখন বাসে আমড়া নিয়ে ঢুকে পড়েছিল একটা চটপটে ছেলে। আমড়া খাবার প্রবল আগ্রহে নয়, হয়তো শুধুই একঘেয়েমী কাটানোর জন্যে যাত্রীরা আমড়া কিনতে লাগল হুড়মুড় করে।

-খাবেন না কি আমড়া?
জিজ্ঞেস করল আতিক।
-না।
সংক্ষিপ্ত এবং রূঢ় জবাব শাহীনের। তর্কাতর্কির সময় সে চমৎকার কিছু প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছে। সেগুলি বলতে পারলে আতিককে কুপোকাৎ করা যেত। কেন যে তার আসল সময়ে এসব মনে আসে না, এ নিয়ে তার দুঃখ হচ্ছে। কেটে যাচ্ছে ক্ষণিক ঘুমের আয়েশ। তার কাছ থেকে নিস্পৃহ জবাব পেয়ে আতিকের মনের উনুনেও রাগ বলক পারতে লাগল। নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিবর্জিত হয়ে ইন্দ্রিয়পরায়নতার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে কী ভ্রান্তির মধ্যে আছে শাহীনের মতো মানুষেরা সে প্রসঙ্গে বেশ কিছু কথা গুছিয়ে নিলো সে। সুযোগ পেলে বলবে গুছিয়ে। সুযোগ তো আসবেই সামনে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

কাওরানবাজার সিগনাল যেন শেষ হতে চায় না! গুমোট গরম বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে অস্থিরতা আর মেজাজের পারদ। রাস্তায় মানুষ একে অপরের সাথে খন্ড খন্ড লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তার আঁচ পড়ে বাসের ভেতরেও। বাস কেন থেমে আছে, কেন সিগনাল ভেঙে চলে যাচ্ছে না, এ নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে কিছু যাত্রী। তারা ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে থাকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই। সিগনাল ভেঙে চলে যেতে বলে। কমবয়সী কন্ডাক্টরটা এতে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানালে আবারও শুরু হয় কলহ।

কাওরানবাজার থেকে গাড়ির আর নড়াচড়ার নাম নেই। এর মধ্যে প্রকৃতি তার বিভিন্ন রকম রূপ দেখাতে শুরু করল। কখনও বৃষ্টি বাড়ে, কখনও কমে, কখনও হাওয়া এসে শরীরে স্পর্শ দিয়ে যায়, আবার কখনও বাড়ে গুমোট ভাব। এর মধ্যে কেটে গেছে আড়াই ঘন্টা। আতিক আর শাহীনের মধ্যে আর কথাবার্তা হয় নি। দুজনেই ক্ষুধার্ত। বাদামওলা উঠেছে একজন। স্বাস্থ্যকর এই খাবারটা খাবার জন্যে পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল শাহীনের। কিন্তু নিজে খেলেই তো হবে না, আতিককেও দিতে হবে। পাশে বসে থাকা সহকর্মীকে নিশ্চয়ই সে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে পারে না! সে কি নিজের অংশ থেকে আতিককে দিবে, না কি দুইজনের জন্যে দুটো আলাদা কিনবে? মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে শেষপর্যন্ত মানুষকে মিলেমিশেই থাকতে হয়।
-বাদাম খাবেন না কি?
আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞাসা করল সে।
-না।
এককথায় রূঢ়ভাবে উত্তর দিলো আতিক।

এইজন্যেই! এইজন্যেই এদের সাথে তার বনে না। এরা প্রচণ্ডরকম বদ্ধ মনের এবং কূপমুন্ডক। শান্তি বা সম্প্রীতি এই ধরনের মানুষেরা বোঝে না। তারা বোঝে শুধু দ্বন্দ্ব আর হানাহানি। এই লোকের সাথে প্রতিদিন অফিসে দেখা হয়, বাসে একসাথে বসতে হয়, এটা তার জীবনের জন্যে প্রবঞ্চনাময়। জীবনে উন্নতির জন্যে এই ধরনের মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে যতটা সম্ভব। কাজের বাইরে আর একটা কথাও নয়। কত্ত বড় স্পর্ধা, বাদাম খাবে না!

শাহীনের মনের মধ্যে রাগের রেলগাড়ি ছুটতে লাগল আবার পূর্ণ গতিতে।


ফার্মগেটের জট খোলার পর গাড়ি এবার দাঁড়াল আসাদ গেটে। গত কয়দিনে এখানকার অবস্থা ভয়াবহ। সিগনাল পেরিয়ে যেতে না পারার হতাশায় মূহ্যমান হয়ে গেল বাসের যাত্রীরা। তাদের পক্ষে আর ড্রাইভারকে গালাগাল করারও শক্তি ছিল না। বসে বসে গজগজ করতে লাগল সবাই। তারা অপেক্ষা করছে আমড়া, বাদাম, বড়ই বা ঝালমুড়িওলার। মুখের মধ্যে কিছু পুরে দিয়ে চিবুনো ছাড়া আর কীই বা করার আছে!

(২)

সেইসময় গাড়িতে উঠল একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। ভাঙাচোরা চেহারা তার। পরনে একটা ত্যানা হয়ে যাওয়া শার্ট আর মোটা কাপড়ের প্যান্ট। ঘামে না বৃষ্টিতে, কে জানে, সিক্ত তার শরীর। তার শরীর এবং পরিধেয় বস্তু, প্রতিটাই বলে দিচ্ছে সে পরাজিত, সে বিদ্ধস্ত এবং জীবন তার কাছে একটা বিশাল ভারী পাথরের মতো। বয়ে নিয়ে যাবার শক্তি কতদিন থাকবে কে জানে!

লোকটা বিক্রি করছে “ছোটদের নামাজ শিক্ষার বই।” তাকে দেখে মনে হয় সে স্বল্প বেতনে কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরি করে। হয়তো বেতন পায় না ঠিকমতো। অফিস শেষে বাড়তি আয়ের জন্যে এই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা ধরেছে। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। তার কথায় জাদু নেই, কন্ঠে কোমলতা নেই, এমন কী পণ্য বিক্রয়ের উপযোগী পোষাকও পরে নেই সে। একটা পাঞ্জাবী আর টুপি পড়লে কি নামাজ শিক্ষা সংক্রান্ত পণ্যের ব্যবসা সম্পর্কে তার কথাগুলি আরো প্রাসঙ্গিক শোনাতো না?

লোকটা নীরস কণ্ঠে বলে চলছে নামাজ শিক্ষার বইয়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে। “শিশুদের নামাজ শেখানোর জন্যে এই বইটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিশুদের এখন থেকেই নামাজ শেখানো উচিত। তাদের নামাজের দোয়া কবুল হয়।” শুকনো কণ্ঠে বলে যাচ্ছে সে। কিন্তু কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না তার দিকে। ইতোমধ্যে সে কন্ডাক্টরের ধমক খেয়েছে। নেমে যেতে বলা হচ্ছে তাকে। ধমক খেয়ে সে যেন আরো ভেঙে, সংকুচিত হয়ে গেল। কিন্তু সংকুচিত হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যাবার ক্ষমতা তো নেই তার। তার চোখে যেন সেই আকুলতাই। নামাজ শিক্ষার বই বিক্রয়ের বদলে যদি সে মিলিয়ে যেতে পারত পরম শূন্যে?

(৩)

শূন্যতায় বিলীন হয়ে যাবার আগে শাহীনের সাথে চোখাচোখি হয় তার। তার নিস্পৃহ, রাগী চোখকে পরোয়া না করে বলে,
-লাগবে স্যার? দেই একটা ছোটদের নামাজ শিক্ষার বই?
বিষণ্ণ আর ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে সে।
শাহীন তাকায় লোকটার দিকে। তার চোখের গহীন শূন্যতা কৃষ্ণগহবরের মতো গিলে খেতে থাকে শাহীনের যুক্তি, জেদ আর অহমিকা।
-হ্যাঁ লাগবে। দাম কত?
শাহীন বলে।
-২০ টাকা।
উত্তর দেয় লোকটা। এই প্রথম তাকে হাসতে দেখা যায়। এই মেটে, ঘোলাটে আলোর আবদ্ধতায় আটকে থাকা বাহনে তার হাসি যেন জ্বেলে দেয় শত ওয়াটের আলো! হয়তো এই ২০ টাকা দিয়ে তার আজকের রাতের খাবার হয়ে যাবে কিংবা কে জানে, হয়ত কিনতে পারবে কোনো জরুরী ঔষধ, কিংবা সন্তানের জন্যে কিনে নিয়ে যাবে চকলেট!
-আপনারও লাগবে না কি একটা আতিক?
শাহীন জিজ্ঞেস করে।
আতিক নামাজ পড়তে জানে। তার বাসায় নেই কোনো শিশু। তারপরেও সে আন্তরিকভাবেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-হ্যাঁ, লাগবে। দেন একটা।

দুইটি “ছোটদের নামাজ শিক্ষা বই” বিক্রয় করে ভেঙে চুরে পড়া লোকটা আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে আর পিছন পর্যন্ত না গিয়ে নেমে গেল বাস থেকে। শাহীন আর আতিক চেয়ে থাকল তার গমনপথের দিকে।

তারা আবার গল্প করতে লাগল। কথার উষ্ণতায় গলে গেল দ্বিমতের বরফ। সারাদিনের অগুরুত্বপূর্ণ নানারকম কাজ তাদের কাছে অর্থবহ মনে হলো ভীষণ। রাতের খাবারটা বাইরে খেয়ে নেবে বলে ঠিক করল দুজনে।

বাস চলে যাচ্ছে মানিক মিয়া এভিনিউ দিয়ে। কোনো এক উপলক্ষ্যে সংসদ ভবন সাজানো হয়েছে ফুল আর আলো দিয়ে…
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:০৭
৬টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আর কত দিন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বাংলাদেশের শিল্পী সমাজ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৩



কথা হচ্ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সাবেক ডীন প্রফেসর নিসার হোসেইন স্যারের সাথে। আমি কিছু চিত্রকর্ম কিনেছিলাম। সেইগুলোর কয়েকটি নিয়ে আমার মনে সন্দেহ তৈরী হওয়ায় তাঁর সাথে যোগাযোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জিনিস মানেই খারাপ।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



আমার নানী ৫ বোন ও এক ভাই। এই ৫ বোনের মধ্যে একজন নানী আছে; যার ধ্যান ধারনা পুরানা আমলের। তিনি নতুন জিনিস পছন্দ করতেন না। যেমন: তার মেয়ের জামাই ট্রলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাব ইয়াদ রাখহা জায়েগা

লিখেছেন শূন্য সময়, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫২

বিডিআর ম্যাসাকারের বিচার জীবনেও হবেনা। হলফ করে বলতে পারি।
কার বিচার করা হবে? হাসিনার? তাপসের? শেখ সেলিমের? সর্বোপরি, ভারতের?
কে করবে বিচার? বিচিহীন বিএনপি যে ভারতের পারমিশনে দেশে ফিরেছে? যার মুরোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান কীভাবে মুখে মুখে ছড়িয়ে দেওয়া যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৮



বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সরকারের প্রথম কাজ কি হতে পারে? আমার মতে – দেশের দরীদ্র জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই সবার আগে সরকারের প্রথম টার্গেট হওয়া উচিৎ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলসিরাত

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪


দিনটা ছিল দুর্যোগময়। সকাল থেকে বৃষ্টি- জলে ঢেকে গিয়েছিল রাস্তা-ঘাট। ঢেকে গিয়েছিল ঢাকনা খোলা ম্যানহোল। পরিণত হয়েছিল অদৃশ্য মরণকূপে। এর মধ্যেই মানুষ বেরিয়েছিল কাজে। উদ্বিগ্ন আর ক্ষুদ্ধ মানুষেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×