পয়লা বৈশাখ বাঙালির উৎসব। পয়লা বৈশাখ পালন করা যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে চিৎকার করার মূলে যে দর্শন থাকে তা হল, বাঙালি জাতিসত্ত্বা এবং মুসলিম জাতিসত্ত্বায় সংঘর্ষ আছে কিনা।
অর্থাৎ, মুসলিমের বাঙালি জাতিসত্ত্বা আছে কিনা।
আছে।
আল্লাহ বলেছেন, সরলভাবে বলছি, তোমাদেরকে আমি আলাদা আলাদা জাতি, গোত্র ও ভাষায় বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো এবং পরস্পরকে চিহ্নিত করতে পারো এবং আল্লাহর পরিচয় এভাবে জানতে পারো।
রাসূল দ. জাতিসত্ত্বাকে/গোত্রসত্তাকে মূল্যায়ন করতেন এর প্রমাণ এভাবে পাই,
ওই গোত্রে তো বিয়ের সময় গায়িকা পাঠানো এবং গান করার (শালীন) প্রচলন রয়েছে, তারা কি কনের সাথে গায়িকা পাঠায়নি?
হে আল্লাহর রাসূল দ. আমরা গেয়ে নেচে আপনাকে পাবার খুশি পালন করতে চাই। এটা আমাদের গোত্রীয় প্রচলন। রাসূল দ. এই অনুমোদন অন্তত দুবার দুই গোত্রকে দিলেন।
রাসূল দ. মক্কা ছেড়ে যাবার সময় বললেন, হে আমার ওয়াতান (পিতৃভূমি), আমি তোমাকে ভালবাসি এবং তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হচ্ছে।
দুটি হাদিস প্রচলিত রয়েছে যার সনদ এই মুহূর্তে দিতে পারছি না আর তা হল, নিজভূমের ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ (মিনাল ঈমান)/ স্বদেশপ্রেম ঈমানের অর্ধাঙ্গ (নিফসুল ঈমান)।
বাংলা নববর্ষ পালন করা, অশ্লীলতা নেই এমন লোকজ ভাব-সংগীত আধ্যাত্মিক সংগীত গাওয়া, বাঙালি পোশাক পরিধান করে বাঙালিদের একত্র হওয়া, বাঙালি সাহিত্য-শিল্প-কলার চর্চা করা, পালাগান- মঞ্চায়ন করা, বাঙালিয়ানা বিষয়ে আলোচনা করা, একত্রে পান্তা ইলিশ খাওয়া বা বৈশাখি মেলায় গমন- এসবই অত্যন্ত সুন্দর একটা বিষয়।
ধর্মের আলোকে আমরা দেখি, এইসব পালনে বাঁধা নেই।
কিন্তু অশ্লীলতা সর্বক্ষেত্রে পরিহার্য। পূজা-পার্বণভিত্তিক কাজকর্ম হিন্দু সম্প্রদায়ের কাজ হতে পারে এবং তাতে মুসলিমের বলার কিছুই নেই, অংশগ্রহণ করা অনুচিত।
আর দেশাত্মপ্রেম যদি পরিণত হয় দেশান্ধতায়, জাতিপ্রেম যদি পরিণত হয় জাত্যাভিমানে, তাহলে তা হারাম এবং সম্পূর্ণরূপে খারাপ কাজ। যেমন, আমি বাঙালি এই কারণে হিন্দিভাষী মানেই অমানুষ। আমি বাংলাদেশি এই কারণে বার্মার মানুষ মানেই খারাপ- এই হল আসাবিয়্যাহ। হিটলারের আরিয়ানপ্রেম আসাবিয়্যাহ। ব্রিটিশরা যে অন্য ণৃগোষ্ঠীগুলোকে অ্যাবঅরিজিনি বলেছিল, যার অর্থ উপজাতি অর্থাৎ উপমানব অর্থাৎ অপূর্ণ মানব- এটা হল নিকৃষ্ট আসাবিয়্যাহ্।
পৃথিবীর সব মানুষ প্রজাতিগতভাবে এবং সম্মানের দিক দিয়ে এক জাতি। পৃথিবীর সকল মুসলিম ধর্ম সম্প্রদায়ের দিক দিয়ে এক জাতি। পৃথিবীর সমস্ত বাংলাভাষী ভাষাজাতীয়তার দিক দিয়ে এক জাতি এবং পৃথিবীর সকল বাংলাদেশী দেশভিত্তিক জাতীয়তায় এক জাতি।
নিজ জাতিকে ভালবাসা কর্তব্য, নিজ পরিবারকে ভালবাসা কর্তব্য, নিজ অঞ্চল এবং নিজ গোষ্ঠী-গোত্রকে ভালবাসা কর্তব্য। কিন্তু এর বাইরের সবাইকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে এবং ধর্মীয়/নৈতিক আবদ্ধতা বজায় রেখে।
এই সুযোগে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়, এই সুযোগে কোন ধর্মকে হেয় করাও নয়। নিজের সীমানা চিনতে পারলে সবই সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে। এই কারণেই রাসূল দ. বলেছেন, আমি মধ্যপন্থী, আমার উম্মাহ ও মধ্যপন্থী। তিনি বিদায় হজ্বে বলেছেন, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, অতীতে অনেক জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।
ধর্ম এত হালকা নয়, যে পয়লা বৈশাখ পালন করলে ভেসে যাবে। আর যারটা এতই পাতলা, সে গিঁট দিয়ে রাখুক, নাহলে ভেসে যাক।
বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে। চাপটা ইলিশের উপর নয়, বরং সহাবস্থানের সমর্মীতার সম্প্রদায়-সম্প্রীতীর বৈশ্বিক উদারতার পাশাপাশি বাঙালিয়ানার উপরে, বাঙালির ঐতিহ্য আর আত্মবলিদানের ইতিহাসের উপরে বেশি থাক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




