কিছুদিন আগে একটা টিভি চ্যানেলের ‘টক শো’তে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রীতিমতো একটা বোমা ফাটিয়েছেন। ৪২ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন, তা চিন্তার খোরাক জোগায় এবং আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু বিষয়টা সম্ভবত অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। কারণ, সবাই টক শো দেখেন না বা শোনেন না এবং এ নিয়ে তিনি নিজেও কোনো বিবৃতি দেননি।
এটা মোটামুটি অনেকেরই জানা, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বিপুলভাবে জিতেছিলেন। ছাত্রলীগ তখন দুই ভাগ হয়ে আলাদা প্যানেল নিয়ে নির্বাচনে নেমেছিল। ডাকসুতে কেবল একটি ‘সদস্য’ পদে জিতেছিলেন ছাত্রলীগের বিদ্রোহী গ্রুপের মমতাজ বেগম। বাকি সব কটি পদ পেয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা। সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ওই সময়ে আমার দেখা ও জানা ছাত্রনেতাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন নিয়মিত ছাত্র। তখন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। লেখাপড়া শেষ করে কিংবা না করে বছরের পর বছর ছাত্র হিসেবে নাম বজায় রেখে এবং প্রায় নিখরচায় ‘হলে’ একটা সিট দখলে রেখে অনেকেই ছাত্রনেতার পরিচয় বয়ে বেড়াতেন। এমনও দেখা গেছে, ডাকসুর সহসভাপতি পদে এমন প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাঁদের একসময়ের সতীর্থরা ইতিমধ্যেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হয়ে গেছেন। ‘আদুভাই’ ছাত্রনেতাদের ভিড়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ছিলেন ব্যতিক্রম।
টক শোতে সেলিম কী বলেছিলেন, এটা বলার আগে ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনের উল্লেখ করা দরকার। ৩ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সরকার-সমর্থিত ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ প্যানেল দিয়েছিল। তাদের প্যানেলে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে নূহ-উল-আলম লেনিন (ছাত্র ইউনিয়ন) এবং ইসমত কাদির গামা (ছাত্রলীগ)। এর বিপরীতে জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক ও জহুর হোসেন। ভোট গণনার সময় দেখা যায়, মাহবুব-জহুর পরিষদ বিপুল ভোটে জিতে যাচ্ছে। হলগুলোতেও একই অবস্থা। সন্ধ্যায় ভোট গণনা যখন প্রায় শেষ, তখনই ঘটল অঘটন। লেনিন-গামা পরিষদের সমর্থকেরা গুলি ছুড়ে, বোমা ফাটিয়ে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। টক শোতে সেলিম বলেছেন, ভোটের বাক্স ছিনতাই করার কাজটি ছিল ন্যক্কারজনক। সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনের কবজায় ডাকসু চলে যাবে, এটা ঠেকানোর জন্যই এই খারাপ কাজটি করা হয়েছিল। তিনি নিজে এই ছিনতাই-ঘটনায় অংশ নেননি। কিন্তু পরদিন তিনি একটা বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগের ছেলেরাই ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক করেছে। এ জন্য তিনি অনুতপ্ত এবং ক্ষমা চান।
৪২ বছর পর অনুতাপ করা বা ক্ষমা চাওয়ায় তেমন কোনো ফল আসবে না। ক্ষতি যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। বিকাশমান গণতন্ত্রের পিঠে ছুরি মেরে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অসাংবিধানিক পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা তো বলতেই পারেন এবং বলেও যাচ্ছেন, ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি।’ তারপরও আমি সেলিমকে ধন্যবাদ দেব এবং তাঁর নৈতিক অবস্থানের প্রশংসা করব। কেননা, আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘ভুল’ স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ৪২ বছর পরে হলেও সেলিম তাঁর ‘অপরাধের’ জন্য অনুশোচনা করেছেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। একজন পরিশ্রমী, মেধাবী এবং সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁকে জানি। এখন তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।
আমরা একই হলের এবং একই বিভাগের ছাত্র ছিলাম। তিনি আমার সিনিয়র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে রাজনৈতিক কারণে তাঁর বিরোধিতা করেছি সব সময়। ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে তিনি যে উদারতার পরিচয় দিলেন, আমাদের দেশের গণতন্ত্র চর্চার ইতিহাসে তা একদিন উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এটা সবারই জানা, সরকার-সমর্থকেরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জেতেন না। ডাকসুর ইতিহাসে তার নজির নেই। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্রলীগ আর কখনোই ডাকসু নির্বাচনে জেতেনি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ভন্ডুল হয়ে যাওয়ার পর ১৯৭৮, ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম দুটিতে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিতেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান, প্রথমবার জাসদ-ছাত্রলীগের হয়ে এবং পরেরবার বাসদ-ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে। ওই সময় মান্নার কাছে বিপুল ভোটে দুবারই হেরে গিয়েছিলেন আওয়ামী-সমর্থিত ছাত্রলীগের প্রার্থী এবং বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য ওবায়দুল কাদের।
১৯৮৮ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অনেক নেতা-কর্মী যখন জেনারেল এরশাদের দলে যোগ দেওয়ার দৌড়ে শামিল, তখন আওয়ামী-সমর্থিত ছাত্রলীগ, জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যৌথভাবে নির্বাচন করে ডাকসুতে জিতেছিল। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ডাকসুতে বেশির ভাগ আসনে জিতেছিল। সেটাই ছিল ডাকসুর শেষ নির্বাচন। দল সরকারে থাকলে তার সহযোগী ছাত্রসংগঠন হারে। কারণ হলো ক্ষমতাসীন দলের জনসমর্থনে ভাটা পড়া এবং তার সহযোগী ছাত্রসংগঠনের বাড়াবাড়ি আচরণ, হল দখল, টেন্ডারবাজি ও নানা রকমের সন্ত্রাসী কাজ। ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র নতুন করে ফিরে আসার পর কোনো সরকারই ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার সাহস পায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো পালা করে দেশ শাসন করেছে। কিন্তু ক্যাম্পাসে ‘গণতন্ত্র’ চালু করার হিম্মত দেখায়নি। ১৯৭৩ সালের উদাহরণটি সম্ভবত তারা মনে রেখেছে যে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনের কপালে কী জুটতে পারে।
ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। এ সুযোগে অবশ্য অনেকেই শিক্ষক রাজনীতি চুটিয়ে করছেন। ওখানে নানা রঙের দল আছে—সাদা, নীল ইত্যাদি। একসময় গোলাপিও ছিল। গোলাপিরা পরে কেউ সাদায় গেছেন, কেউ নীলে মিশেছেন। যখন যে দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন সরকারি দলের সমর্থক শিক্ষকেরা কেমন করে জানি শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে জিতে যান এবং সমিতির সভাপতি ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটিও পেয়ে যান। ‘ছাত্ররাজনীতি’ নিয়েও সমস্যা আছে। ছাত্রনেতারা সবাই ছাত্র নন। ছাত্র হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানে নাম লেখানো থাকলেও তাঁরা অনেকেই ব্যবসাপাতি করেন। অনেকেই টাকাপয়সা খরচ করে কমিটিতে ঢোকেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো তাঁদের কথাবার্তায় ছাত্রদের বা শিক্ষাবিষয়ক সমস্যার উল্লেখ নেই বললেই চলে। প্রধান কাজ হলো সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষ দলের সদস্যদের ঠ্যাঙানো, প্রতিপক্ষের প্রধান রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর পূর্বসূরিদের চরিত্র হনন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কাজের ঠিকাদারি নেওয়া। এ কাজ করতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই বোমাবাজি করেন, গুলি চালান এবং প্রয়োজনে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বীকেও খতম করে দেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়মিতভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে। ছাত্রদের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্যান্য সৃজনশীল কাজে অধিক মাত্রায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা খুবই দরকার। কথায় কথায় শিক্ষক, প্রভোস্ট বা উপাচার্যকে ঘেরাও, তাঁদের পদত্যাগ দাবি করা, এসব নেতিবাচক ‘কর্মসূচি’ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ সুস্থ ও সুন্দর রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবদান রাখতে পারেন। ছাত্র সংসদগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও ছাত্রদের মধ্যে সেতুর মতো কাজ করতে পারে।
ছাত্র সংসদগুলোকে পুনরুজ্জীবন দেওয়ার জন্য তো সরকারের নির্দেশের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এখানেও ঝুঁকি আছে। তাঁদের অনেকেই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন। তাই বলে তাঁদের মধ্যে এমন কেউ কি নেই, যিনি ঝুঁকি নিয়ে হলেও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এবং ছাত্রদের সৃজনশীল নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি করার জন্য পদক্ষেপটি নেবেন?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক, গবেষক।
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১০:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



