১.
‘‘Just Gonna Stand There Watch Me Burn,,,,I Like The Way You Lie’’বিকট শব্দে মোবাইল বাজতেছে। ভাইব্রেশন দেয়া তাই বালিশ ভেদ করে মাথার ভিতর ঝিন ঝিন আওয়াজ শুরু হয়েছে।ফারহানের ফোন, না ধরলে নির্ঘাত মার খাব পরে। অনিচ্ছা সত্তেও ফোন ধরতে বাধ্য হলাম।
-হ্যালো
- নবাবের পোলার ঘুম ভাঙছে! কয়ডা কল দিছি দেখতো!
- কি কইবি কয়। আজাইরা পেচাল ভাল্লাগেনা।
- রফিক মামার দোকানে আয় জলদি। আজাইরা পেচাল কারে কয় তরে আমি শিখামু খাড়া! হালার***
কলটা কেটে দিয়ে কল লগে গিয়ে দেখলাম ফারহানের নাম্বার থেকে ৭ টা মিসকল! আজকে আর মাইর খাওয়া মিস নাই আমার! ইনবক্সে দেখি ৩টা আনরিড মেসেজ, সব গুলাই এয়ারটেল অফিস থেকে! হারামিগুলার মেসেজ পাঠানো ছাড়া আর কোনো কাম নাই মনে হয়, হুদাই মেসেজ পাডাইয়া কাস্টমারগো ইনবক্স ভইরা ফেলায়!
বেড থেকে উঠে রান্না ঘরে গেলাম। টেবিলের উপর নাশতা নাই! আম্মুর রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি কাজের মেয়েসহ গভীর মনযোগ দিয়ে আম্মু স্টার জলসা’তে সিরিয়াল দেখতেছে।
- নাশতা দিবা না। না দিলে কও, বাইরে খাইয়া নিমু।
- ঘড়ির দিকে তাকাইয়া একটু দেখতো কয়টা বাজে?
প্রবল বিরক্তি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের এক কোনায় রাখা ১৯৮৫ সালের ঘড়িটার দিকে তাকালাম। আব্বু-আম্মুর বিয়ের সময় কে যেন উপহার দিসিল মান্ধাতার আমলের এই ঘড়িটা। জাপানি কোম্পানির ঘড়ি, নষ্ট হবার নাম গন্ধও নাই! প্রবল বিক্রমে আজও ঘরের কোনার দিকে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছে সে। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম ঘড়িতে বাজে ১১:১৭! চোখ কচলিয়ে আবার তাকালাম, এবার বাজে ১১:১৮। আমি তো চশমা ছাড়া কিছুই দেখি না তাহলে ঘড়ির কাটা দেখলাম কিভাবে! জগত মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে ফাজলামি করে এটাও হয়তো এই টাইপের কিছু হবে! চশমাটা পরতে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলাম। যেতে যেতে শুনলাম আম্মু কাজের মেয়েটারে বলতেছে, ‘‘ফাতেমা, ফ্রিজ থেকে খিচুরি আর মাংশটা নামিয়ে গরম করে আনতো। আর শোন, পেয়াজ দিয়ে ডিম ভাজি করবি, নবাব সাহেব আবার পেয়াজ ছাড়া ডিম খায় না!এই ছেলের জ্বালায় আর বাঁচিনা’’
আজকে ডিসেম্বরের ১ তারিখ। ৪ দিন হল কলেজে শীতকালীণ ছুটি শুরু হয়েছে, চলবে নতুন বছরের প্রথম দিন পর্যন্ত।ফ্রি টাইমে আম্মু আবার ফকরুল স্যারের প্রাইভেট ঠিক করে দিছে, দুপুর ১২-১ টা। সব বন্ধুরাই পড়ে, ওদের আব্বু-আম্মু ও আমার আম্মুর মত সচেতন কিনা! ছেলেমেয়েদের একটু ফ্রি থাকতে দেখলেই তাদের ভাত আর হজম হতে চায় না! বিরুক্তি থাকলেও কি আর করার, প্রাইভেটে যেতে হবেই।তবে, এই প্রাইভেট ছাড়া আর কোনো কাজ নাই সারাদিন। রফিক মামার দোকানে আড্ডা দিয়েই দিনের অর্ধেক সময় পার করে দেই সবাই! ফকরুল স্যার ফিজিক্স পড়ায়, ভালই পড়ায়। অন্যান্য স্যারদের মত বিরস বদনে পড়ানো স্যারের স্বভাব না- তাই ভালই লাগে স্যারকে আমার।
অনেক কষ্টে চশমাটা খুঁজে বের করে মুখ ধোঁতে গেলাম। আমার প্রিয় ভুনা খিচুরি দিয়ে নাশতাটা সেরে রুমে আসতেই দেখি আবারো মোবাইলে রিং হচ্ছে। ফারহানের ফোন।
-ওই নবাবের বাচ্চা! আজকে না আইলে কয়, আমি বাসায় যাইগা।
-আরে অস্থির হইস না, একটু দাঁড়া দোস্ত। ২মিনিট লাগব আর।
১২টা বাজার আর ৫ মিনিট বাকি আছে। স্যারের বাসা কাছেই, ১২ টার আগেই পৌঁছাতে পারব। পড়িমড়ি করে কাধে স্পোর্টস ব্যাগটা ঝুলিয়ে দৌড়ানো শুরু করলাম।
২.
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রফিক মামার দোকানে বসে আছি। ফকরুল স্যারের বাসায় প্রাইভেট আছে, আগের টার্মে ফিজিক্সে ফেল করছিলাম তাই প্রাইভেট না পরলে আর হইতেছেনা। আগের বার প্রাইভেটের নাম কইরা পুরা ১০০০ টাকাই মাইরা দিসিলাম কিন্তু ফেল করার পর আম্মু ফকরুল স্যারকে জিজ্ঞাসা করতেই আমার সব কৃতকর্ম জানতে সক্ষম হল আমার গুণধর মা! প্রচুর ধমক খাইসিলাম সেইদিন। গতকাল রাতে আবার ছোটবোন ফারিহা আমার সিগারেট খাবার কথাও বইলা দিসে! ডাবল ধোলাই খাইলাম কালও!
-তুই আমার একমাত্র বোন, তুই না কইলেও তো পারতি! তোরে কোচিংএ কে নিয়া যায় দেখুম আমি!হাহ!
আমার কথা শুনেই ফারিহার সেকি হাসি!
- তুমি না নিলে তো আরো ভাল! আম্মু নিয়ে যাবে আমাকে!
-যাহ! তোর সঙ্গে আমার আর কোনো কথা নাই!
-ঠিক আছে দেখব কত দিন আমার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারো!
- যা যা ভাগ! তোর যা পেত্নীর মত চেহারা,তোরে দেখলেই তো আমার ভয় করে! এখন চোখের সামনে থেকে যা নাইলে মাইর খাবি কইলাম!
ফারিহা আর সাহস করল না, নিজের রুমে চলে গেল। এখন পড়া শুরু করবে আমি জানি। ফারিহা এবার এস.এস.সি পরীক্ষা দিবে। ভাল ছাত্রী, আমার মত না! টেষ্ট পরীক্ষায় জি.পি.এ-৫ পাইসে। আম্মুর আবার ওরে নিয়ে অনেক স্বপ্ন।
সকালে মামার দোকানে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬টা বেনসন শেষ করলাম কিন্তু আহনাফের এখনও আসার নাম গন্ধও নাই! আহনাফ আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, খুব বেশি ভাল ছাত্র না হলেও অনেক ভাল ছেলে। স্বভাবের দিক দিয়ে আমার সম্পূর্ণ বিপরীত হলেও ওকে কেন জানি অনেক ভাল লাগে। ক্লাস ৬ থেকেই একই সঙ্গে পড়তেছি আমরা। কতবার যে ঝগড়া হইছে আমাদের মধ্যে তার কোনো ইয়ত্ত্বা নাই! কিন্তু আবার কিভাবে যেন ওর সঙ্গেই আমার সখ্যতা হয়! আহনাফের রফিক মামার দোকানে বসা পছন্দ নয়। এখানে বসলে নাকি নিজেকে বখাটে বখাটে মনে হয় ওর! কথা খুব একটা খারাপ বলে নাই কারণ এলাকার ইভটিজিং স্পোর্ট হিসেবে রফিক মামার দোকানটা আবার সুবিখ্যাত কিনা!তারপরও আমাকে রফিক মামার দোকানে বসতেই হয়। কারন; নিশিতার বাসার গলির ঠিক পাশেই দোকানটা! নিশিতা হচ্ছে ফারিহার বান্ধবী, আমার স্বপ্নের রাজকন্যা! আজ পর্যন্ত ওরে আমার ভাল লাগার বিষয়টা বলা হয়নি, নিজের বোনের বান্ধবীরে কিভাবে বলি এটা নিয়ে আমার মনোজগতে অনেক আলোড়ন চলতেছে বেশ কয়েকদিন ধরে। ভাবতেছি আহনাফকে দিয়ে ফারিহাকে ম্যানেজ করব, ফারিহা আবার আহনাফকে খুবই মানে! কিন্তু ওই বেটারই তো খোঁজ নাই কয়েকদিন ধরে! আজও কয়েক ঘন্টা বসাইয়া রাখছে! মাইর একটাও মাটিতে পরবনা আজ! ওই তো আহনাফকে দেখা যাচ্ছে! কাঁধে আবার রিয়াল মাদ্রিদ এর স্পোর্টস ব্যাগ! মাইর ডাবল হইব তাইলে! কাল রাতে এল ক্লাসিকোতে জিতাই আজ ভাব নেওয়া শুরু করছে!
-নবাব আপনি আসছেন!
-দোস্ত পরে মারিছ! স্যারের প্রাইভেট মিস হইয়া যাইব কিন্তু!
- যাহ! তোরে মাফ কইরা দিলাম কিন্তু বিনিময়ে আমার একটা কাজ করে দিতে হইব।
-ওকে ডান।
সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে আহনাফ,রাজু, রবিনসহ সবাই ফকরুল স্যারের বাসার দিকে রওনা দিলাম।
৩.
ভাইয়াটা যে কি! কাল রাতে আম্মুকে ওর সিগারেট খাওয়ার কথা বলাতে আজ কোচিংএই নিয়ে গেল না! আম্মুর রান্না শেষ হলে আম্মুর সঙ্গে যেতে হবে। কাল আবার ভাইয়ার বার্থডে! ভাইয়া দিব্যি ভুলে আছে আমি জানি। ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। আহনাফ ভাইয়ারই প্ল্যান সব। ওর সব ফ্রেন্ডদেরকে অলরেডি ইনভাইট করা হয়ে গেছে। কাল সন্ধায় সবাই বাসায় আসবে। আহনাফ ভাইয়াকেও একটা সারপ্রাইজ দেব আমি। আহনাফ ভাইয়াকে কেন জানি আমার অসম্ভব ভালে লাগে। চেহারার মধ্যে কেমন জানি মায়া মায়া একটা ভাব। একটা মানুষ এত ভাল হয় কিভাবে? এবার ভাইয়ার জন্মদিনেই উনাকে আমার মনের কথাটা বলে দেব কিন্তু যদি উনি অন্য কাউকে পছন্দ করে থাকেন? আর ভাইয়া যদি জানতে পারে? যাই হোক আমি উনাকে আমার মনের কথা বলবই!
- ফারিহা! রেডি হয়ে যাও মা। আমার রান্না শেষ।
কোচিংএ যেতে হবে এখন। নিশিতার সঙ্গে কোচিংএ এব্যাপারে কথা বলব। সে নিশ্চই কোনো পরামর্শ দিতে পারবে!
৪.
ফকরুল স্যারের প্রাইভেট শেষে সবাই আবার রফিক মামার দোকানে বসল। সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়া উড়তে লাগল চারপাশে। ওদের মধ্যে কেবল আহনাফই সিগারেট খায় না। কিছুক্ষন আড্ডা দেবার পর দোকানে রইল কেবল ফারহান আর আহনাফ। ফারহান আহনাফকে নিশিতার ব্যাপারে সব খোলে বলল আর ফারিহাকে ম্যানেজ করতে বলল। বন্ধু বলে কথা! আহনাফ এক বাক্যেই রাজি হয়ে গেল। সে সিদ্ধান্ত নিল কাল ফারহানের জন্মদিনেই ফারিহাকে নিশিতার ব্যাপারে সব বলে নিশিতাকে ফারহানের পছন্দ করার ব্যাপারে বলবে। নিশিতাও ওই অনুষ্ঠানে আসবে-সো নো প্রব্লেম! এখন নিশিতা রাজি থাকলেই হয়!
এত সব ভাবতে ভাবতে ওরা যার যার বাসায় চলে গেল। দুপুরের কড়া রোদে রফিক মামার দোকানে শূণ্য কয়েকটা বেঞ্চ পরে রইল।
রাতে ফারিহা ফোন দিল আহনাফকে। সচরাচর আহনাফকে ফোন দেয় না সে। তারপরও আহনাফ খুব বেশি অবাক হল না, কারণ কাল ফারহানের বার্থডের ব্যাপারেই কথা বলতেই বোধহয় ফোন দিয়েছে ফারিহা। বার্থডে নিয়ে বিভিন্ন কথার পর হঠাৎ করেই ফারিহা বলে উঠলঃ
-ভাইয়া, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
ফারিহার এমন আচরনের সঙ্গে আহনাফ ঠিক সেভাবে পরিচিত নয়, কিছুটা অবাক হল সে।
- হ্যাঁ,কর। আমারও কিছু কথা বলার আছে তোমাকে!
- নাহ থাক! কালই বলব।
- আচ্ছা ঠিক আছে। বাই।
ফারিহাও অনেক অবাক হল আহনাফের কথা বলার ভঙ্গিতে। আহনাফ সবসময় তাকে ‘তুই’ বলেই সম্বোধন করে, কিন্তু আজ তুমি করে বলল কেন? এতসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।
অপরদিকে আহ নাফের মনোজগতে চলছে দ্বিমুখী দ্বন্ধ। ফারিহাকে নিজের অজান্তেই কখন যে ভালা লাগা শুরু হয়েছে সে নিজেও জানে না! কাউকে কিছু বলতেও পারছেনা। এভাবে আর কতদিন?
২রা ডিসেম্বর;
প্ল্যান অনুযায়ী ফারহানকে সারা বিকেল বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত রাখা হল। সন্ধায় ক্লান্ত ফারহান বাসায় আসতেই দেখে পুরো বাসা অন্ধকার। আশেপাশের সব বাসায় কারেন্ট আছে তাহলে ওদের বাসা অন্ধকার কেন? কলিং বেল টেপে ভিতরে ডুকতেই সবাই সমস্বরে “ হ্যাপি বার্থে ডে টু ইউ, ফারহান’’ বলে চিৎকার করে উঠল। ফারহানের অনুসন্ধানি চোখ খোঁজে বেরাচ্ছে নিশিতাকে! ওই তো নিশিতা, নীল সেলোয়ার কামিজ পরে এসেছে আজ। স্বপ্নের রাজকন্যাকে আজ ঠিক নীল পরীর মত লাগছে দেখতে!
ফারহানকে একের পর এক বিস্ময় উপহার দিয়ে ফারহানের জন্মদিনটা স্মরনীয় করে রাখল ওরা!
একটু রাত হতেই আস্তে আস্তে সবাই বাসায় চলে যেতে লাগল। নিশিতাকে নিতে ওদের গাড়ির ড্রাইভার এসে গেছে।ফারহান অস্থির হয়ে গেল। আহনাফকে কাছে ডেকে বলল;
- ফারিহারে বলছিলি কথাটা?
- নাহ!
- কবে কইবি হারামজাদা! নিশিতার বিয়ার পরে কইবি নাকি!!
- বলতেছি দাঁড়া।
কিন্তু ওই দিন আর কথাটা বলা হয়নি আহনাফের। চারিপাশের ব্যাস্ততার মাঝে কথাটা বলার চ্যান্সই পাইনি সে!
০৩ ডিসেম্বরঃ
আজ ফকরুল স্যারের প্রাইভেটে আসেনি ফারহান। প্রাইভেট শেষে বের হয়েই আহনাফ ফোন দিল ফারহানের নাম্বারে।
- হ্যালো। আজ়কে আহস নাই কেন?
- আররে দোস্ত মন অনেক খারাপ। আব্বু ট্রান্সফার হয়ে গেছে। ৩ দিনের মধ্যে নতুন জায়গায় জয়েন করতে হইব!
- কি কস এগুলা!!
- তোর বাসায় আসতেছি। একটু ওয়েট কর।
- ওকে আয়,আমি বাসায়ই আছি।
তড়িঘড়ি করে একটা রিক্সা নিয়ে আনাফ ফারহানের বাসায় গেল। গিয়ে সব বিস্তারিত শুনল। ওরা ৫তারিখ নতুন জায়গায় শিফট হয়ে যাবে। কথা বলার মাঝখানে আহনাফের চোখজোড়া কেবল ফারিয়াকেই খোঁজে বেরাচ্ছিল। কিন্তু কোথাও দেখতে পেলো না ওকে। শরীর খারাপের কথা বলে দুপুরে খাবার টেবিলেও আসল না ফারিহা। বিকেলের দিকে বিরস বদনে বাসায় ফিরে আসল আহনাফ। এরই মাঝে নিশিতাকে সরাসরি প্রপোজ করার কথা আহনাফকে জানালো ফারহান। রাতে ফারিহার নাম্বারে কল দিল কিন্তু ১০-১২বার কল হওয়া সত্ত্বেও রিসিভ করল না ফারিহা। মনের মধ্যে তীব্র হাহাকার নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘‘ময়ূরাক্ষি’’ উপন্যাসটা পড়া শুরু করল। আহনাফের গত বার্থডে’তে ফারিহা হুমায়ূন আহমেদের ৩টা উপন্যাস গিফট করেছিল তাকে। সে বইয়ের পোকা নয় বিধায় বইগুলো তাদের বরাদ্ধকৃত স্থান শেলফেই অবস্থান করেছে গত ১১টি মাস! উপন্যাস পড়া শেষে অদ্ভুত এক ধরনের অনভূতি গ্রাস করল তার মন প্রাণ। হিমু হবার প্রবল ইচ্ছে মনে চেপে গভীর রাতে ঘুমুতে গেলো সে।
৪ ডিসেম্বরঃ
সারাদিন কোনো রকমে কাটলো আহনাফের কারণ বাসার জিনিসপত্র গোছানো নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত ফারহান। রাতে আবারও পড়তে শুরু করল হিমু বিষয়ক আরো একটি উপন্যাস। সম্পূর্ণ অজানা এক ঘোরলাগা জগতে নিয়ে গেলো তাকে এই হিমু, যে জগতে পাঠক আর হিমু ছাড়া আর কারো প্রবেশাধিকার নেই! এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল। ফারিহার কল।
-হ্যালো।
-আপনি ওইদিন এমন করলেন কেন?(ওপাশ থেকে কান্নার এক টানা শব্দ)
-কি করছি বলবা তো। না বললে কিভাবে বুঝব?
-আপনি আমাকে না বলে চলে আসলেন কেন?
-আচ্ছা সরি। এখন বল কি বলতে চাইছিলা সেদিন?
-আপনার মাথা! আচ্ছা আপনি এমন কেন? আপনি কি বুঝেন না কিছু?( আবারো কান্নার শব্দ)
ঠাস করে ফোনটা কেটে গেলো। আহনাফ কল দিতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর মহিলার কন্ঠস্বর ভেসে উঠল,The number you have dailed is not available right now”!
একটা মেয়ে এত অভিমানী হয় কিভাবে!-এসব কথা ভাবতে ভাবতেই আহনাফ উপন্যাস পড়ায় মনযোগ দিল আবার। উপন্যাসটা এক টানে পড়ে হিমু হবার তীব্র বাসনা নিয়ে ঘুমিয়ে পরল সে।
৫ ডিসেম্বর;
১১টার দিকে ঘুম থেকে উঠেই ফারহানকে ফোন দিল আহনাফ।
-কই তোরা?
-আমরা তো চৌরাস্তার মোড়ে।
-মানে! তুই আমারে না বইলা একেবারে চইলা যাইতেছিস!
-সরি রে দোস্ত। ফারিহার শরীরটা ভাল না, সকালে ডাক্তার আঙ্কেলকে বাসায় আনতে হইছিল। বিজি ছিলাম অনেক তাই আর ফোন দেয়া হয় নাই। কিন্তু, তুই বাসায় আসলিনা কেন?
ফারিহার অসুস্থতার কথা শুনে আহনাফের মাথা হঠাৎ চিন্তা শূন্য হয়ে গেল। উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলে নাই তো আবার মেয়েটা!
-কি হইছে ফারিহার?
-তেমন কিছু না। সামান্য জ্বর ছিল আর সারাদিন কিছুই খায় নাই তো তাই অসুস্থ হয়ে পরছিল।
-ওকে দোস্ত। বাসায় পৌছাইয়া ফোন দিবি কইলাম! বাই।
-ওকে দিমু।ভাল থাকিস।
৫.
ফারহানের কলটা কাটতেই আম্মুর ডাক শোনা গেলো,’
-কিরে আজ প্রাইভেটে যাবি না
-শরীর ভাল্লাগতেছেনা। যামু না।
-আচ্ছা ঠিক আছে। নাশতা দেই?
-নাহ আম্মু! ক্ষিদা নেই। এ টু পরে খাব। পারলে ফাতেমাকে দিয়ে গরম কফি পাঠাইয়া দিয়ো।
-ঠিক আছে।
“ওই ফাতেমা সিরিয়াল পরে দেখ, তোর ভাইয়াকে গরম কফি দে এক মগ আর সঙ্গে ড্রাই কেক দিস” পাশের রুম থেকে আম্মুর আওয়াজ শোনা গেল।
ফারহান চলে গেছে এ কথাটা ভাবতেই মনটা কেমন জানি বিষন্নতায় ভরে গেলো। আর ফারিহা মেয়েটাও শেষের দিকে কিসব করল! আমি কি সত্যিই ওকে ভালবাসি? কি জানি! তবে এতটুকু বুঝতেছি যে ফারিহা চলে যাওয়াতে আমার অনেক খারাপ লাগতেছে! কে যেন নেই- এমন একচটা হাহাকার আমার সমস্ত অস্তিত্ত্ব জুড়ে। এটাই যদি ভালবাসা হয় তাহলে হয়তো আমি ফারিহাকেই ভালবাসি!!
ফাতেমা কফির সঙ্গে ড্রাই কেকও দিয়ে গেলো। কফিটা খেয়ে হিমুর ৩য় বইটা পড়া শুরু করলাম ‘ হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম”। এক টানে পড়ে শেষ করলাম। হিমুর চরিত্র আমাকে প্রবল ভাবে আকর্ষন করতে সমর্থ হল। বিছানা থেকে নেমে আলমারি থেকে হলুদ পাঞ্জাবীটা নামিয়ে গায়ে দিয়ে রফিক মামার দোকানের দিকে রওনা দিলাম।
-মামা একটা মার্লবরু দাও।
-এই নাও চা।
- আমি চা চাইসিলাম না সিগারেট? কানে কি কম শোনা শুরু করছ নাকি?!!!
- মামার কি মন বেশি খারাপ? তুমি তো সিগারেট খাও না আমি জানি।
- না। মন বেশি ভাল তাই আনন্দে সিগারেট খামু।সিগারেট দিবা না যামুগা?
-এই নাও।
জীবনের প্রথম বারের মত সিগারেট ধরালাম। একটা টান দিতেই কাশতে শুরু করলাম। তারপরও পুরো সিগারেটটা শেষ করলাম। টানা ৫কাপ চা শেষ করলাম। তারপর ও অস্থিরতা কাটতেসেনা! একেই কি বলে “ভালবাসার বেদনা”?
প্রচন্ড মাথা ধরেছে। কোনো রকমে বাসায় ফিরে আসলাম। এসেই লম্বা ঘুম দিলাম। আমার হঠাৎ এমন পরিবর্তনে আব্বু-আম্মু অনেক চিন্তিত হয়ে পরল। আমি বখে গেলাম কিনা-আব্বুকে দেখলাম এটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে। সেল অফ করে টানা ৪-৫ দিন শুধু ঘুমালাম। কিছুই ভাল লাগতেছেনা। অপেক্ষা করতে থাকলাম ১৫ডিসেম্বর পর্যন্ত! ফারিহাকে ওইদিনই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজটা দেব আমি!
১৫ ডিসেম্বরঃ
সকাল থেকেই মনটা অনেক ফুরফুরে। সব কিছুই সুন্দর লাগতেছে আজ। একেবারে ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পরলাম। আব্বু-আম্মু তো পুরাই অবাক! ফাতেমা চা দিয়ে গেলো। সবচেয়ে বাজে চা বানানোতে যদি কেউ ১ম পুরুষ্কার পায় তবে সেটা ওই পাবে! তবে আজ ওর চা’ও অনেক মজা লাগল।
-ফাতেমা,এইদিকে আয় তো।
-জ়্বী ভাইয়া। কিছু লাগবে?
-তুই তো অনেক ভাল চা বানাস! এই নে ৫০টাকা, বাজারে গিয়ে চিপস কিনে খাইস।
ওর বিস্মিত মুখটা সত্যিই দেখার মত ছিল! টাকাটা নিয়ে বলল;
-আরেক কাপ চা নিয়া আহি ভাইয়া?
-যা, নিয়ে আস। ভাল হইলে আরো ৫০ পাবি!
মানুষকে আনন্দ দেয়ার মত ভাল কাজ আর নেই! বিকেল পর্যন্ত বাসায়ই বসে রইলাম। সন্ধ্যা ঠিক ৭ টায় ফোন দিলাম ফারিহার নাম্বারে।১ম বারেই ফোন ধরল সে!
-হ্যালো!
-I LOVE YOU. DO YOU LOVE ME?
দুপাশেই নিস্তব্ধতা। সময়কে যেন কেউ থমকে দিয়েছে। অনেকক্ষন হয়ে গেলো কোনো আওয়াজ় নেই। তবে কি…….!!! বহুক্ষন পর ওপাশ থেকে ফারিহার কান্না ভেজা জমাট কন্ঠস্বরঃ
-ME TOO!
-ধুর পাগলী মেয়ে! দিসিলা তো ভয় পাওয়াইয়া! এই একটা কথা বলতে এতক্ষন লাগে!যদি হার্টবিট বন্ধ হইয়া মারা যেতাম তখন?
-আমিও মরে যেতাম তাহলে!!!
# আমার কথাঃ গল্প লেখার মত মেধা ও ধৈর্য্য কোনোটাই আমার নেই। এই অপাঠ্য হিজিবিজি লেখা পড়ার জন্য আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। মাথায় অনেকদিন ধরে এই গল্পের প্লট ঘুরছিল, এখন হাতে অনেক টাইমও পেলাম তাই জীবনের প্রথম(হয়তো শেষ) গল্প লেখার লোভ সংবরন করতে পারিনি। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তব জীবনের কারো সঙ্গে মিল খোজে পেলে তা একান্তই আপনাদের উর্বর মস্তিস্কের কল্পনা।ব্যাক্তিগতভাবে আমি চরম অ-রোমান্টিক, রোমান্টিক সিনেমা দেখলে আমার ঘুম পায়! কিন্তু, আমার জীবনে লেখা প্রথম গল্পটাই রোমান্টিক! রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন, তাইনা? জগতটা বড়ই রহস্যময়!!#
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১২ সকাল ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


