মনে হ'ল দুষ্কৃতিটি ধরা পড়েছে কিনা তার খোঁজ নেওয়ার জন্য ওই মাঝরাতেই তদন্তকারী অফিসারকে মেসেজ পাঠানো দরকার। মেয়েটি সুস্থ হ'ল কিনা জানার জন্য পরের দিন হাসপাতালে গেলাম। নানারকম সংক্রমণ ঘটেছে তার শরীরে, ক্ষতস্থানে মাছি বসছে, ছোট্ট কবজিতে ছুঁচ ফোটানো রয়েছে। তার মা-বাবাকে চোখে পড়ছে না। অফিসে পৌঁছে আমার উর্ধ্বতনকে বললাম বিষয়টায় বিশেষ গুরূত্ব দেওয়া দরকার, যাতে অপরাধী ধরা পড়ে এবং তার বিচার হয়। একটু হেসে নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আমার বস্ বললেন, এর বদলে আমি যেন মিলান সাবওয়ে আর বৃষ্টির দিকে মন দিই এবং বন্যার কিছু ভাল ছবি জোগাড় করি।
'এ-সব করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়', মিলান সাবওয়ের দিকে যাওয়ার পথে মাকে ফোন করে চেঁচিয়ে বললাম আমি। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত বর্ষার মরশুমে এই জায়গাটা আলোকচিত্রীদের খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। বুকের মধ্যে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ছে। সারাদিন কিছু খেতে পারলাম না। ঘটনার তিনদিন পর পারিবারিক চিকিৎসক আমাকে ঘুমের ওষুধ দিলেন। সম্পাদককে ফোন করে বললাম, আমার এক সপ্তাহ ছুটি চাই। ছোট্ট মেয়েটির ঘটনার আগে স্টুডেন্টস্ ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (সিমি) সম্বন্ধে একটা অন্তর্তদন্তমূলক কাজ করছিলাম আমি। কাজটা করার সময় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নীতিবোধ নিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে জোরদার তর্ক হয়েছিল আমার। আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে তিনি এমন কিছু বলেছিলেন, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি।
যে বিষয় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করা দরকার একজন ভাল সাংবাদিকের এবং তাকে বাস্তববাদী হতে হবে। এই কৌশল আয়ত্ত করে উঠতে না পারার জন্য আজও দুঃখ হয় আমার। সেটা আরও এই কারণে যে এই কৌশল প্রায়শই ব্যবহৃত হয় বানিজ্যিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলির নির্দেশে কোনও ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার অজুহাত হিসেবে।...(ক্রমশঃ)
২০১০এর গ্রীষ্মকালটা সাংবাদিকতার নতুন সংজ্ঞা ঠিক করে দিল আমার জন্য। নিজেকে একজন পরিশ্রমী, মধ্যমেধার সাংবাদিকই মনে করতাম আমি, যে তার পুরোনো ঘরানার সাংবাদিক পিতার কাছ থেকে কিছু আদর্শ পেয়েছে। কিন্তু ওই সময়ে নিজেকে এমন এক সংকটের মুখোমুখি দেখতে পেলাম, তেমন সংকটে যেন কোনো সাংবাদিককে পড়তে না হয়।
অসুস্থতাজনিত দীর্ঘ ছুটির পর ২০১০ সালের কোনো এক সময়ে আবার 'তেহেলকা'-র কাজে যোগ দিয়েছি। সারা দেশের চিকিৎসকরা সঠিকভাবে আমার রোগ নির্ণয় করতে পারেননি। কিছুদিন আগে গড়চিরোলির নকশালপন্থী কার্যকলাপের কেন্দ্রভূমিতে একটা রিপোর্টিং-য়ের কাজ সেরে ফিরেছি। তার ঠিক পরেই ঘটল আমার জীবনের সবথেকে মর্মান্তিক একটা ঘটনা। খুন হয়ে গেল আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু শাহিদ আজমি। ফৌজদারি আইনে দেশের সবথেকে বিচক্ষণদের একজন আজমি-র খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আমার জীবনে। যেদিন সন্ধ্যায় ও খুন হয়, সেদিনই ওর সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল সেইসব আদিবাসী ও বুদ্ধিজীবীদের মামলা নিয়ে আলোচনা করার জন্য, যাদের নকশাল নামে চিহ্নিত করেছে সরকার এবং মিথ্যে মামলায় যারা জেলে পচছে।
কিন্তু ভবিতব্য অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল। ভাইঝির আবদারে বাড়িতেই থেকে যেতে হল আমাকে। সেদিন ওর সতেরতম জন্মদিন। এদিকে আমার ফোনে কয়েক ডজন মিসড কল্ এসেছে, মেসেজ পাঠিয়ে অনেকেই জানতে চেয়েছে 'শাহিদের ব্যাপারে শেষ কোনো খবর' আমি জানি কিনা। এগুলো আমি পরে দেখেছিলাম। বাকিটুকু জানলাম বন্ধুদের লাগাতার ফোনে এবং নিউজ চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ থেকে। 'জাতীয়তাবিরোধী' ব্যক্তিদের মামলা হাতে নেওয়ার জন্য শাহিদকে তার অফিসেই গুলি করে মেরেছে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা। কিছুদিন আগেই শাহিদের সওয়ালের জোরে ৭/১১-র মুম্বই ট্রেন বিস্ফোরণের নিরপরাধ অভিযুক্তরা মুক্তি পেয়েছিল। ওর মৃত্যুর পর ২৬/১১-র মুম্বই হামলায় দু'জন অভিযুক্তকে মুক্তি দেয় মুম্বই কোর্ট। শাহিদের হত্যার পিছনে মূল ষড়যন্ত্রী কে (?) তা আজও রহস্য রয়ে গেছে, অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে।...(ক্রমশঃ)

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১৯ রাত ১১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




