সোরাবুদ্দিনের ঘটনা অবশ্যই প্রকাশ্যে আসা উচিত । মায়ের ইনকলাব পড়ার সূত্রে সুযোগটা এসে গেল আমার কাছে । কী এক তাড়নায় চলে গেলাম স্থানীয় সাইবার শপে । সোরাবুদ্দিন সংক্রান্ত যাবতীয় লিঙ্ক থেকে জানা গেল, সিবিআই এ-ব্যাপারে তদন্ত করেছে এবং গুজরাতের একজন শীর্ষস্থানীয় আই.পি.এস অফিসার অভয় চুদাসামা গ্রেপ্তার হয়েছেন । চুদাসামাকে আমি চিনতাম । মাত্র এক বছর আগেই গুজরাত বিস্ফোরণ মামলায় তাঁর এক প্রধান সাক্ষীর স্বীকারোক্তি আমি প্রকাশ করার পর টেলিফোনে আমাকে হুমকী দিয়েছিলেন তিনি । গুজরাত বিস্ফোরণের তদন্তের মূল দায়িত্বে ছিলেন চুদাসামা, যে বিস্ফোরণের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান মজাহিদিন’ নামক গ্রুপটি যুক্ত ছিল ।রাজ্যের সব থেকে স্পষ্টবাদী ও মিডিয়াঘনিষ্ঠ অফিসারদের একজন ছিলেন চুদাসামা । শোনা যেত, তিনি নাকি গুজরাতের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন । তবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠা অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন চুদাসামা । আমরা পরে দেখব, চোর-জোচ্চোর ও হাওলা সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি । এবং সোরাবুদ্দিন তাঁর সহায়ক হয়ে উঠেছিল ।
যাবতীয় প্রিন্ট আউট আর নোট তৈরি করে, এই ঘটনা এবং এটি নিয়ে লেখালেখির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে দিল্লিতে আমার দুই সম্পাদক সোমা চৌধুরী ও তরুণ তেজপালের কাছে একটা চিঠি পাঠালাম । মনে মনে জানতাম, আমার স্ব-আরোপিত বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার এটাই একমাত্র উপায় । দুই সম্পাদকই প্রচুর উৎসাহ দিলেন । আবার আমেদাবাদ রওনা দিলাম আমি । এই আমেদাবাদ যাত্রা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছিল ।
ওখানে যাওয়ার একমাসের মধ্যেই দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আনি আমি । কয়েকজন অফিসারের সাহায্যে কলরেকর্ড আর বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নোট ঘেঁটেই কাজটা করতে পেরেছিলাম । এই অফিসারদের নাম আমি উল্লেখ করব না । খুব সতর্কভাবে তাঁদের সাহায্য চাই, জানতাম তাঁরাই আমার একমাত্র আশা । কিন্তু গুজরাতের মতো একটা রাজ্যে বিশ্বাস অর্জন করা আদৌ সহজ নয়, যেখানে কর্তব্যনিষ্ঠ অফিসারদের সরকারের রোষের শিকার হতে হয় । তাছাড়া এঁদের মধ্যে বেশিরভাগ সেই প্রথম দেখলেন আমাকে । বিষয়টা আরও জটিল ছিল এই কারণে যে, আমি হচ্ছি তেহেলকা সাংবাদিক, অর্থাৎ ধরেই নেওয়া যায় যে-কোনো সময় আমার কাছে একটা স্টিং ক্যামেরা থাকতেই পারে ।
গুজরাতে আমি যে বিষয়টার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা অবশ্য শুধু গুজরাতকেন্দ্রিক বিষয় ছিল না । সৎ পুলিশ অফিসারদের নামে মামলা রুজু করে হেনস্তা করাটা উত্তরপ্রদেশ আর মণিপুরেও একেবারে জলভাত হয়ে উঠেছে—এই দুটি রাজ্য সম্বন্ধে বিস্তৃত রিপোর্টিং করেছি আমি । এ-ও বুঝেছিলাম যে এই হেনস্তা করার ব্যাপারটাই আমার রক্ষাকর্তা হয়ে উঠবে । সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য যে-অফিসার জানিয়েছেন, দেখা গেল তিনি আসলে এমন কোনো অফিসারের সহপাঠী ছিলেন, যাঁর সম্বন্ধে কিছু রিপোর্ট করেছি আমি । এভাবেই বরফ গললো । মানবাধিকার কর্মী ও তথ্য-যোগানো অফিসারদের সহায়তায় বছরের সবথেকে চাঞ্চল্যকর একটা ঘটনা ফাঁস করতে সক্ষম হলাম আমি । এটা ছিল সংঘর্ষ চলাকালীন তৎকালীন গৃহমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে উচ্চপদস্থ অফিসারদের ফোনে কথাবার্তার কলরেকর্ড । কলরেকর্ডের সঙ্গে ছিল অভ্যন্তরীণ ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ সংক্রান্ত একটা অত্যন্ত নিন্দাজনক নোট । মন্ত্রীর কার্যকলাপের দিকে নজর রেখেছিল সিআইডি এবং ওই নোটে বলা হয়েছিল, সংঘর্ষ হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষদের হত্যা করার ও তাদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার এক কুৎসিত চক্রান্ত ।
এই রিপোর্ট রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলল । সিবিআই থেকে ‘তেহেলকা’র দপ্তরে বাবার বার ফোন করে বলা হতে লাগল কলরেকর্ডগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক—পরে সুপ্রিম কোর্টের সামনে রেকর্ডগুলো পেশ করা হয়েছিল ।....(ক্রমশঃ)


সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




