সিরাজগঞ্জ সম্মেলন
১৯৩২ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে এক রবিবারে সকালবেলা আমি কবির বাড়িতে গেলাম । তখন কবির বাড়িতে নেপালী দারোয়ান, গ্যারেজে দামী মোটর । বেশ শান-শওকতের সঙ্গেই তিনি ছিলেন । এ সময় তিনি ৩৯, সীতানাথ রোডে এক ভাড়াটিয়া বাড়িতে বাস করতেন ।
বেলা তখন ৯টা । আমি সোজা দোতলায় চলে গেলাম । বৈঠকখানায় গিয়ে দেখি সিরাজগঞ্জের আসাদউদ্দৌলা শিরাজী বসে আছেন । আমিও আসন গ্রহণ করলাম । কিছুক্ষণ পরেই কবি এলেন । সদ্যস্নাত এবং পরিচ্ছন্ন ধুতি-গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় সেদিন সকাল বেলায় কবিকে খুবই সুন্দর দেখাচ্ছিল । তিনি মেঝেয় পাতা বিছানায় আমাদের সাথে আসন গ্রহণ করলেন এবং বললেনঃ এই যে তোমরা কতক্ষণ থেকে বসে আছ ?
আসাদউদ্দৌলা শিরাজী অবশ্যি আমার আগে থেকেই বসেছিলেন । আমি বললামঃ এই কিছুক্ষণ হলো ।
শিরাজী সাহেব সিরাজগঞ্জে নিখিলবঙ্গ মুসলিম যুব সম্মেলন অনুষ্ঠানের ইচ্ছা ও আগ্রহ নিয়ে কবির দরবারে হাজির হয়েছিলেন । এ-কথা সে-কথার পর তিনি তাঁর প্রস্তাব পেশ করলেন । সেই আসন্ন সম্মেলনে কবিকে সভাপতিত্ব করতে হবে । কবি শুনেই তাঁর স্বভাব-সুলভ হাসির তরঙ্গ তুলে বললেনঃ তুমি আর লোক পেলে না ? আমাকে দিয়ে এসব হবে-টবে না—কি বলতে কি বলে ফেলবো । শেষটায় হয়তো কাফের ফতোয়ায় আমাকে অভিষিক্ত করবে । নিখিলবঙ্গ যুব-সম্মেলন করতে চাও—বেশ করো । কিন্তু সভাপতিত্ব করার জন্য অন্য কাউকে গিয়ে ধর—আমাকে নয় । শুনছো আসাদ, যুব-সম্মেলনে আমার বলবার কথা যথেষ্ট রয়েছে । কিন্তু তোমার দেশ তো তা চায় না ।
কবির কথাবার্তার মাঝে বেদনামিশ্রিত অভিমানের সুর আমি সুস্পষ্ট লক্ষ্য করলাম । কিন্তু শিরাজী সাহেব নাছোড়বান্দা । তিনি বার বার একান্তভাবে কবিকে অনুরোধ করেই চলেছেন । শেষ পর্যন্ত কবি রাজী হলেন ।
আলাপ আলোচনার মাঝে তখন বেলা একটা বেজে গিয়েছে । ভেতর থেকে কবির খাওয়ার জন্য তাগিদ এলো । শীর্ণকায় রাম (চাকর) এসে যখন খাবার কথা বললো, তখন আমি আর শিরাজী সাহেব উঠে দাঁড়ালাম, বললামঃ কাজী দা তাহলে আজকের মতো আসি । কাজীদা বললেনঃ না বসো । এটা খাবার সময়, আর তোমরা খাবে না—না খেয়ে চলে যাবে, তা হয় না ।
তিনি আবার রামকে ডাকলেন । এলো তালপাতার সেপাই রাম ! কবি বললেনঃ সামনের বারান্দায় জায়গা পরিষ্কার করে তিনজনের খাবার নিয়ে এসো ।
রাম বালতি ন্যাকড়া এনে জায়গা নিকিয়ে কাঠের পিঁড়ি তিনখানি এনে পেতে দিলে । তারপর এলো খাবার । তিনজন খেতে বসলাম । কাঁসার থালা, পিতলের পেয়ালা, গ্লাস—এক কথায় নিখুঁত হিন্দুয়ানী পরিবেশ, কায়দা-কানুন, পরিবেশনের ধারা ইত্যাদিও ।
তিনজনে গল্প করছি আর খাচ্ছি । খাবার আয়োজন ছিল ভাল । কিন্তু বিশেষ করে আজো যা আমার মনে পড়ছে তা হচ্ছে—সেই কাঁসার থালায় লাল নটেশাকের অপূর্ব সুন্দর রঙ—যেন মেঝেটার রঙকেও হার মানায় । সেদিন খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বেলা প্রায় আড়াইটার সময় আমরা কবির বাড়ি থেকে বের হলাম । (ক্রমশঃ)


সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ১০:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




