আন্দামান থেকে বলছি / রইসউদ্দিন গায়েন
SLOGAN (স্লোগান)
এই শব্দটির একটা যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ দরকার । তাহলে আলোচনার সুবিধে হয় । অনেকে অনেক রকম বলেছেন, অভিধানেও নানারকম—কোথাও দেখি কোনো দল বা গোষ্ঠীগত জিগির, কোথাও দলের বাঁধাবুলি, কোথাও দেখি বিজ্ঞাপনী । না, কোনোটাই পছন্দ হ’ল না । অনেক খোঁজাখুজির পর মোটামুটি পছন্দের দুটো শব্দ পেলাম । প্রথমটা ‘নীতিবাণী’ আর দ্বিতীয়টা ‘রণধ্বণি’। আর এই দুটো শব্দ নিয়ে আজকের আলোচনা শুরু করা যাক । অনেকদিন থেকে একটা স্লোগান আমার কাছে প্রশ্নসূচক হয়ে উঠেছে । পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক দল তৃণমূলের যেকোনো সভায় ‘জয় হিন্দ্’ ও ‘জয় বাংলা’ উচ্চারিত হতে শোনা যায় । নেতাজী অনুপ্রাণিত ‘জয় হিন্দ্’ স্লোগান অবশ্যই আমাদের সর্বোত্তম প্রাপ্তি । এ-প্রসঙ্গে আমার কোনো প্রশ্ন নেই । কিন্তু ‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রশ্নসূচক । প্রশ্নসূচক শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি বাংলাপ্রাণ মানুষের কাছে অবশ্যই প্রশ্নসূচক ব’লে মনে করি । আসুন, ইতিহাসের পাতায় কিছুক্ষণ চোখ রাখি—‘১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনে শিক্ষা দিবসের প্রস্তুতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মিসভায় আফতাব আহমাদ এই স্লোগান প্রথম উচ্চারণ করেন। আফতাব আহমাদের সেদিনের সেই স্লোগানের প্রথম প্রতি-উত্তর করেছিলেন চিশতি শাহ হেলালুর রহমান । ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীস্তর থেকে আকস্মিকভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত যাদের নাম পাওয়া যায় পারস্পরিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সবাইকে সুনির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না । তবে মোটামুটি নিশ্চিতদের মধ্যে আ ফ ম মাহবুবুল হক, গোলাম ফারুক, রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক, শামসুদ্দিন পেয়ারা, রায়হান ফিরদাউস মধু, ইউসুফ সালাহউদ্দিন, মোস্তফা জব্বার, বদিউল আলমের নাম উল্লেখযোগ্য । আফতাব আহমাদের ওই অংশটির নেতৃত্ব দিতেন আ ফ ম মাহবুবুল হক । ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ‘নিউক্লিয়াস’ দলের স্বাধীন বাংলার আকাঙ্ক্ষা থেকে এই স্লোগানের উৎপত্তি। এই স্লোগানের উদ্ভব ও প্রচলনের ইতিহাস খুব প্রত্যক্ষ এবং সংশ্লিষ্টদের অনেকে এখনো জীবিত আছেন, তাই বিস্মৃত হওয়ার অবকাশ নেই’।
আর একটু এগিয়ে যাওয়া যাক । ‘জয় বাংলা’ এই স্লোগানটি হয়ে উঠল মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান । এখন এটিকে পূর্বোল্লেখিত প্রতিশব্দ ‘রণধ্বনি’ বলা যথোপযুক্ত মনে করছি । পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার পর সারা পূর্ববঙ্গে মানুষের কন্ঠে ছিল ছিল এই রণধ্বনি । শুধু তাই নয়, ঢাকার বাংলাদেশের জনক মুজিবর রহমান নিজেই রমণা পার্কে প্রকাশ্য জনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের শেষ অংশে বলেন—‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম । এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম । জয় বাংলা’।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এই স্লোগানটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান । এরপর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যা সকলেরই জানা—বঙ্গবন্ধু হত্যা । ১৯৭৫ সালে এই ঘটনার পর দেশের প্রেসিডেন্ট পদে মোস্তাক আহমেদ থাকার সময় ‘জয় বাংলা’-র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ জাতীয় স্লোগান করা হয় । কিন্তু বাংলার প্রতিবাদী মানুষ সেই ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে চায়নি । দীর্ঘকাল পরে হলেও আইনজীবী বশির আহমেদ ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি বা নীতিবাণী পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ হাইকোর্টে মামলা করেন ২০১৭ সালে । তিন বছর ধ’রে শুনানি চলার পর অবশেষে ২০২০ সালের ১০ই মার্চ বাংলাদেশ হাইকোর্ট ‘জয় বাংলা’ এই রণধ্বনি বা নীতিবাণী-কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করে । এই হ’ল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।
এখন আমরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, এটা পশ্চিম বাংলার দলীয় স্লোগান কীভাবে হতে পারে ? এই প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গ’র মানুষ কেন তুলে ধরছেন না ? একদল মানুষ ‘জয় শ্রীরাম’ দলীয় স্লোগান দিচ্ছেন ব’লে, আমাদেরও কি পাল্টা ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি তুলে ধরতে হবে? আর যদি দিতেই হয় ‘জয় বাংলা’ ছাড়া আর কি কোনও কথা পাওয়া গেল না? বলা বাহুল্য, এটা অন্য একটি দেশের জাতীয় স্লোগান । আমাদের যেমন অন্য কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া উচিত নয়, তেমনি সেই দেশের জাতীয় স্লোগান এদেশে উচ্চারিত হওয়া ঠিক নয়—এ-কথা কে না জানে? এটা কি সেই দেশের জাতীয়তার ওপর আঘাত নয়? এ-প্রশ্ন’র জবাব কে দেবে?

সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ১২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


