আমার বাবা একজন শিক্ষক ছিলেন। বাংলাদেশের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সরকারী একটি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। যতদিন সরকারি চাকরী করেছেন সুনামের সহিত তার নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন।
জীবনের শেষ কয়েকটি দিন ঢাকার একটি নামকরা কলেজে ছিলেন। কি করলেন সে তার সরকারী চাকরী জীবনে না বাড়ি না গাড়ি। এতদিন আমরা ঢাকাতে থাকি আমাদের ঢাকা কেন সারা বাংলাদেশও এক ফোটাও সম্পত্তি নেই। গ্রামে পৈতৃক সুত্রে পাওয়া অল্প কিছু আছে যা আমরা নেয়নি।
২০০৫ এ দেখলাম আমার বাবা মুখে কালো করে একটা ক্রেস্ট সহ বাসায় ঢুকলো। ঐদিন বাবার এলপিআর ছিল। ২০০৬ এ পেনশনে যাবার আগে বাবা মৃত্যু বরন করলেন। জায়গা হল আজিমপুর কবরস্থানে।
বাবার পেনশন নিয়ে বিস্তর দৌড়াদৌড়ি করা লাগলো। শিক্ষক বাদেও বাবার একটি আলাদা পরিচয় ছিল ( কোন রাজনৈতিক দলের নেতা না , পরিচয় বলাও যাবেনা) ।
মৃত্যুর পর কত আত্মীয়স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষী দাড়িয়ে গেলো। আরে রথি বাবা মারা গেছে তা কি হয়েছে আমরা আছিনা। কোন চিন্তা করবে না। অথচ এই লোকগুলো এখন কোথায়। বাবা বেচে থাকতে বাবার সামনে এসে স্যার স্যার করে জিব্বা দিয়ে ফেনা তুলে ফেলতো। আর তারা এখন মরীচিকা।
ঠিকমতো পড়াশুনা করতাম না, বাবা বলতো এখন তো বুঝবানা যখন মারা যাবো তখন বুঝবা। বাবা সত্যি তুমি কি ছিলে এখন বুঝি? তুমি আমাদের মাথার উপর বিশাল এক ছাতার মতো ছিলে তাও বুঝি। কোনোদিন তোমার দুঃখ কষ্ট চাওয়া পাওয়া বুজতে চাইনি বা বুঝার চেষ্টা করিনি। শুধু নিজের আবদার করে গেছি। কিন্তু তুমি কত কষ্ট করে আমাদের এই আবদার পূরণ করেছো বা পূরণ করার চেষ্টা করেছো কি করে করেছো তা কোনদিন জানতেও চাইনি।
মনে করতাম, আরে বাবা ধুর বাবা মানেই ডিস্ট্রাব। বাবা মানে সব কিছুতে না করা বাবা মানে কাজে বাঁধা দেওয়া। এখন বুঝি বাবা তোমার কথা না শুনে কি ভুলে করেছি।
আমি এখনো ভুলতে পারিনা যখন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সিটিউট এর আইসিইউ তে তোমাকে রাখা হয়েছে একটার পর একটা ঔষধ দিয়ে যাচ্ছে ডাক্তার তোমাকে বাচানোর জন্য। তুমি আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলে সেই দৃষ্টি সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিলোনা। বাবা তুমি কি ঐ মুহূর্তে আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলে। আমি বের হয়ে গেছি তোমার ঐ দৃষ্টি দেখে আমি সহ্য করতে পারছিলামনা। তারপর শুনলাম তুমি নেই। পুরো পৃথিবী আমার মাথার উপর ভেঙে পড়লো।
যাহা আমি জীবনে কল্পনা করতে পারিনি যে আমার বাবা এই পৃথিবীতে থাকবেনা। মনে আছে তোমাকে কত বার বলতাম আরে ধুর তোমার যা ফিগার তুমি আরো ৮০ বছর বাচবে।
যখন হৃদরোগ ইন্সিটিউট থেকে তোমার লাশ বের করছে তুমি স্ট্রেচারে নিথর শুয়ে আছো তোমার মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে আমি ভয়ে তোমার কাছে যেতে পারছিলামনা। যখন তোমাকে গোসল করানোর সময় আমাকে ডাক দেওয়া হল তোমাকে দেখে মনে হল আরে আমার বাবাতো এখনো বেচে আছে। এতো লম্বা তাগরা ফিগার এই লোক কিভাবে মারা যায়। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে আছে।
যখন তোমার জানাজা হল তখনও আমি ঘোরের মধ্যে। সন্ধ্যার সময় তোমার লাশবাহিত কফিন নিয়ে আজিমপুরে ঢুকছি। তখনও আমার মন বলছে আমার বাবা বলবে এই তোরা আমাকে নামা আমি তো মারা যাইনি।
তোমাকে যখন কবরে শোয়ালাম আমার আর একবার ইচ্ছে করছিলো তোমার মুখখানা একবার দেখি। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি।
কবর দেওয়া শেষে রাত্রে যখন বাসায় আসলাম তখনও আমার আশা আমার বাবা আবার ফিরে আসবে। কিন্তু না আর কোনদিন আসেনি। আর আসবেনা।
বাবা তোমাকে শেষ একটিবারের মতো দেখতে চাই তোমার পা ধরে মাফ চাইতে চাই। বাবা তুমি ফিরে আসো।
তোমরা কি কেউ আছো ভাই আমার বাবাকে ফেরত দিতে পারবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




