
আমি তার কথার উত্তরে যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক ভূমিকা দেব। ‘আহলে হাদিস’ বলে একটা ভ্রান্ত দল আছে। যারা কোরআনে কী আছে ধার ধারে না, হাদিসে যা আছে সেটাই সঠিক বলে গলা ফাটায়। যদিও কোরআন-হাদিস কখনোই সাংঘর্ষিক নয়। হাদিসে যা আছে, মূলত এটি কোরআনেরই ব্যাখ্যা। কিন্তু তথাকথিত এই আহলে হাদিসরাও পূর্ণাঙ্গ হাদিস মানে না। নিজের প্রয়োজনমাফিক অপব্যাখ্যা দিয়ে ইহুদি-খ্রিস্টানদের মতো কাটছাট করে ‘বাইবেল’ বানিয়ে নিয়েছে হাদিসকে।
সাম্প্রতিক লক্ষ করছি, আরেক দল বেরিয়েছে। যাদের এককথায় ‘আহলে কোরআন’ বলা যায়। যদিও তারা প্রয়োজনমাফিক কোরআনকে ইসতেমাল করে আর বাকি সময় তা গোল্লায় যাক। ‘হাদিস-কালাম মানি না, কোরআন কী বলে’—এই হলো তাদের বক্তব্য।
প্রথমে প্রশ্ন করা হলো, নামাজ আর সালাত এক জিনিস কিনা? সালাতকে ঠিক বিরিয়ানি দিয়ে খাওয়ার একটা অপপ্রয়াস চালাতে চেয়েছিল হয়ত। এ কারণে বড় গলায় বলতে চেয়েছিল—দেখো না, কোরআনে কোনো নামাজের কথাই নেই!
এখানে আহলে হাদিসরা নামাজকে সালাত বলে। সালাত দ্বারা নামাজকেই তারা বুঝে। যদিও নামাজের পদ্ধতিগত কিছু মতানৈক্য তারা দেখায়, কিন্তু এ কোন আহলে কোরআন, যারা সালাত বলতে নামাজ বুঝে না। সালাতের অর্থ তারা করে প্রার্থনা। সেটা পাঁচওয়াক্তে নির্দিষ্ট কায়দায় হবে কেন, এই হলো তাদের অভিযোগ! মূলত সালাত শব্দটি আরবি। কোরআন যেহেতু আরবি ভাষায় নাযেল হয়েছে, তাই নামাজকে সালাত বলা হয়েছে।
এবার আসল উত্তরে আসি। কোরআন হাদিস একে অপরের সম্পূরক। কোরআন একটি শ্বাশ্বত বিধান। যেখানে শুধু মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। ব্যাখ্যায় রয়েছে নবীজির বাণী কিংবা হাদিস। বাসর রাতে কী কী করতে হবে, প্রথমে কী করবে, তারপর তারপর করে পর্যায়ক্রমে বিস্তারিত কোরআনে বলা হলে কোরআন হয়ে যেত হাজার হাজার পৃষ্ঠা। সব ক্ষেত্রেই কোরআন শুধু মূলনীতি বলে গেছে। রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান, সমাজ, মহাকাশ, গ্রহ, চন্দ্র-সূর্য কোনো বিষয় বাদ দেয়নি কোরআন।
কোরআনে শুধু বিয়ের কথা বলা হয়েছে। বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, বাসর রাত এসবের ব্যাখ্যা রয়েছে হাদিসে। ঠিক তেমনি পাঁচওয়াক্ত নামাযের কথাও কুরআনে আছে। কিভাবে পড়তে হবে তা রয়েছে হাদিসে। তথাপি কোরআনে কিছু মূলনীতি বলা হয়েছে। যেমন- ‘ওয়া-কূমু’ দ্বারা কিয়াম বা দাঁড়ানো, ‘ওয়া-রকায়ু’ দ্বারা রুকু, ‘ওয়া-সাব্বিহু’ দ্বারা তাসবীহ পাঠ, ‘ওয়া-সজুদু’ দ্বারা সেজদা এবং ‘ওয়া-সাল্লিমু’ দ্বারা সালামের মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে।
প্রমাণ :
পাঁচওয়াক্ত নামাজ পবিত্র কোরআন দ্বারা প্রমাণ করার আগে ওয়াক্তমতো নামাজ পড়া সম্পর্কে একটি আয়াত উল্লেখ করলাম :
“নিশ্চয় নামায মুসলমানদের ওপর ফরজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।” (সূরা নিসা : ১০৩)
এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই নির্দিষ্ট ওয়াক্ত কখন? উত্তরে আল্লাহ কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় পাঁচওয়াক্তের কথা বলেছেন। যেমন লক্ষ করুন :
ফজর ও এশা : “ওহে মুমিনেরা, তোমাদের দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি নেয়- (১) ফজরের নামাযের পূর্বে, (২) দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখো, (৩) এবং এশার নামাযের পর।” (সূরা নূর : ৫৮) এ আয়াতে ফজর আর এশার নামাযের কথা বলা হয়েছে।
যোহর : “তোমরা (নামাযের মাধ্যমে) আল্লাহর পবিত্রতা স্মরণ করো সন্ধ্যায় ও সকালে এবং অপরাহ্নে ও মধ্যাহ্নে। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে কেবল তারই প্রশংসা।” (সূরা রুম : ১৭-১৮) এখানে ‘মধ্যাহ্নে’ বলতে যোহরের ওয়াক্তকে বুঝানো হয়েছে।
আছর : “সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে।” (সূরা বাকারা : ২৩৮) এখানে মধ্যবর্তী বলতে আছরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে।
মাগরিব : “সূর্য ঢলে পড়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৭৮) এ আয়াত দ্বারা মাগরিব নামাযের ওয়াক্তও প্রতীয়মান হয়।
এছাড়া কুরআনে কারিমে পাঁচওয়াক্ত নামাজের কথা এক আয়াতেই আছে। যেমন : “সুতরাং তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করো সন্ধ্যায় [মাগরিব ও ইশার নামায দ্বারা] ও প্রভাতে [ফজর নামায দ্বারা] এবং অপরাহ্নে [আসরের নামাযের দ্বারা] ও মধ্যাহ্নে [যোহরের নামায দ্বারা]।” {সূরা রূম-১৭-১৮}
সূরা রূমের উক্ত আয়াতে একই সাথে ৫ ওয়াক্ত নামাযের সময় আল্লাহর পবিত্র ও মহিমা প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর পবিত্রতা ও মহিমা প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম যে নামাজ, একথা সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। {তাফসীরে রূহুল মাআনী-৮/২৯, মাআরিফুল কুরআন-৬ খন্ড, ২১ পারা, পৃষ্ঠা- ৪০}
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১৮ রাত ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


