[২০১১ সালে বিবিসিতে প্রচারিত হয় মহানবীর (সা) জীবনীভিত্তিক ডকুমেন্টারি ‘দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ’। তিন পর্বের এই ডকু-ফিল্মটি সম্প্রচারের পর পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক আলোচিত হয়। এই প্রথম কোনো পাশ্চাত্য মিডিয়া মহানবীর (সা) জীবনীর উপর পূর্ণাঙ্গ কোনো অনুষ্ঠান সম্প্রচার করলো। ডকুমেন্টারিটির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ব্রিটিশ স্কলার জিয়াউদ্দীন সরদার। উপস্থাপনা করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক রাগেহ ওমর। ক্রিসেন্ট ফিল্মস নির্মিত ডকুফিল্মটির পরিচালনা করেছেন ফারিস কেরমানী। মহানবীর (সা) জন্মস্থান মক্কা, হেরা গুহাসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে উপস্থাপক দর্শকদের নিয়ে গেছেন। পক্ষ-বিপক্ষের স্কলারদের প্রচুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। মহানবীর (সা) জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পাশ্চাত্য একাডেমিয়াতে সাধারণত যেসব প্রশ্ন তোলা হয়, এখানে ধরে ধরে সেসব ‘আপত্তি’ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।]
বিদায় হজ্জের ভাষণ ১০ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হজ্জ পালনকালে আরাফাতের ময়দানে ইসলাম ধর্মের শেষ রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত খুৎবা বা ভাষণ। হজ্জ্বের দ্বিতীয় দিনে আরাফাতের মাঠে অবস্থানকালে অনুচ্চ জাবাল-এ-রাহমাত টিলার শীর্ষে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (সাঃ) জীবিতকালে এটা শেষ ভাষণ ছিলো, তাই সচরাচর এটিকে বিদায় খুৎবা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে এই ভাষণে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিলো।
[নিচের বাকীটুকু ডকুমেন্টারির অনুবাদ থেকে নেয়া]

মোহাম্মদ (সা) যা যা চেয়েছিলেন, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ তার প্রায় সবই তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি আরবে একটি পর্যায় পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যা সেখানে খুবই দুর্লভ ব্যাপার ছিলো। তিনি ইসলামের ভিত্তি ও আইনকানুনগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। একটি নতুন মুসলিম সমাজের ভিত্তিও তিনি গড়ে গেছেন। এসব করতে করতে তিনি একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধে পরিণত হয়ে পড়লেন। ক্রমে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। সে বছরই তিনি শেষবারের মতো মক্কায় আসেন এবং প্রথম ও শেষবারের মতো হজ পালন করেন। হজে আগত হাজীদের উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ হিসেবে পরিচিত।
বিদায় হজের ভাষণ
আরাফাতের ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে একটি উটের উপর বসে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তাঁর কথাগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য পুরো ময়দান জুড়ে ঘোষক নিয়োজিত ছিলো। মহানবী (সা) নিজেই পরবর্তীতে বলেছেন, এটি ছিলো গভীর আবেগময়ী একটি ভাষণ। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ যা কিছু অর্জন করতে পেরেছেন বলে তিনি মনে করতেন, তার একটি সারসংক্ষেপ এই ভাষণে তিনি তুলে ধরেছিলেন।
হে জনমণ্ডলী! মনোযোগ দিয়ে শোনো। আগামীবার তোমাদের মাঝে ভাষণ দেয়ার জন্য আমি নাও থাকতে পারি। তাই যা বলছি, সতর্কতার সাথে তা শুনে রাখো। আজকে যারা এখানে উপস্থিত নেই, তাদের কাছে আমার কথাগুলো তোমরা পৌঁছে দিও।
– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে
এ ব্যাপারে আব্দুর রহীম গ্রীন (একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম) বলেন,
"বিদায় হজের ভাষণ পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন, এটি ছিলো মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহানবীর (সা) হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জানানো আহ্বান ও সতর্কবার্তা। মুসলমানদেরকে তিনি কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বিগ্নতা আপনার চোখে পড়ার কথা। এই ভাষণ মুসলমানদেরকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা উচিত। কারণ, এতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে"।
নিজের দাসদাসীদের উপর অবিচার করো না। মনে রেখো, একদিন তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজ কৃতকর্ম সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সতর্ক হও। আমার মৃত্যুর পর তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ো না।
– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে
ওয়াশিংটনের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদির অধ্যাপক জন এসপোসিতো বিদায় হজের ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দেন,
‘মনে করে দেখো– আদম, ইবরাহীম, মুসা, ঈসাসহ রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর সর্বপ্রথম বাণী কী ছিলো! একমাত্র পরম ও চূড়ান্ত সত্য হলো স্বয়ং এক আল্লাহ। তিনি হলেন সর্বস্রষ্টা, প্রতিপালক ও বিচার দিবসের মালিক’।
সকল মানুষ এসেছে আদম ও হাওয়া থেকে। তাই অনারবদের উপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবদের উপরও অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোদের উপর সাদাদের, কিংবা সাদাদের উপর কালোদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো খোদাভীরুতা ও সৎকর্ম।
– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে
প্রখ্যাত লেখিকা ক্যারেন আর্মস্ট্রং বিদায় হজের ভাষণ সম্পর্কে বলেন,
‘তিনি বলেছেন, সকল মানুষ এক। আল্লাহ তোমাদেরকে পৌত্তলিক গোত্রতন্ত্র এবং বংশীয় গর্ব প্রদর্শনের পৌত্তলিক রীতি থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। স্মরণ রেখো, সকল মানুষ এসেছে আদম থেকে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধূলিকণা থেকে। তারপর তিনি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, যা আমাদের সময়ের জন্য পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক – “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। তারপর আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে ভাগ করে দিয়েছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো।” পরস্পর যুদ্ধ-সংঘাত, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর জন্য এই বিভাজন করা হয়নি। একে অপরকে জানার জন্যই মানবজাতিকে এভাবে ভাগ করা হয়েছে’।
তোমরা যারা আমার কথা শুনছো, তারা অন্যদের কাছে এই কথাগুলো পৌঁছে দেবে। তারা আবার পৌঁছে দেবে আরো যারা শুনেনি, তাদের কাছে। তোমরা যারা সরাসরি আমার কথা শুনছো, তাদের চেয়ে পরবর্তী কেউ হয়তোবা আমার কথা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবে। হে আল্লাহ! সাক্ষী থেকো, আমি তোমার বান্দাদের কাছে তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি।
– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে
ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,
'তারপর তিনি উপস্থিত জনসমুদ্রের কাছে জানতে চাইলেন, ‘হে লোকসকল! হে মুসলমানেরা! তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব কি আমি পালন করতে পেরেছি?’ লোকেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ জনসমুদ্রের এই সাক্ষ্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি লোকদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি পেরেছি?’ প্রতিবারই তারা জবাব দিলো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ আমার মতে, এটি ছিলো সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় একটি মুহূর্ত'।
ডকুমেন্টারিটির স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং ব্রিটিশ স্কলার জিয়াউদ্দীন সরদার এ প্রসঙ্গে বলেন,
'এই ভাষণ ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের একটি সারসক্ষেপ। বিগত ২৩ বছরে তিনি যেসব শিক্ষা দিয়েছেন, এই ভাষণে সেসব মূলনীতির উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, আরব ও অনারবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারপর বলেছেন, নিজ পরিবারের দেখাশোনা করো। এগুলোই ছিলো তাঁর জীবনের শিক্ষা। আর কিছু না পড়লেও শুধু বিদায় হজের ভাষণও যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে মোহাম্মদের (সা) জীবনের সারনির্যাস আপনি পেয়ে যাবেন'।
লন্ডনস্থ মুসলিম ইনস্টিটিউটের পরিচালক ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,
'মহানবীর (সা) বিদায় হজের ভাষণ আধুনিক ও সমসাময়িক মুসলিম সমাজের কর্তব্য ঠিক করে দিয়েছে। কী করলে আমরা ব্যর্থ হয়ে পড়বো, ব্যর্থতা থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী, এই ভাষণে এর দিকনির্দেশনা রয়েছে। এটি ছিলো মহানবীর (সা) সমাজ পরিবর্তনের মিশনের সারনির্যাস'।
সর্বশেষ, বিদায় হজের ভাষণে মোহাম্মদ (সা) আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশগুলো দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান। এই সার্বজনীন বক্তব্য সপ্তম শতকের আরবের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, একইভাবে বর্তমান সময়ের জন্যও প্রাসঙ্গিক। মোহাম্মদের (সা) জীবনের এই শিক্ষাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বলে মনে হয়।
সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
বিঃদ্রঃ- পুরো ডকুমেন্টারি ‘দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ’ দেখতে ও এর অনুবাদ পড়তে চাইলে এই লিঙ্কে যান https://cscsbd.com/2162
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৫:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



