
তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের রাত।
বরফ পড়া শুরু হয়নি। মন্ট্রিয়লের রাস্তা জনাকীর্ণ। বাড়ি থেকে বের হলে কো-দ্যেনিশ রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা লাইব্রেরি আছে। তার পরে আছে একটা সুপার মার্কেট। মার্কেটের পাড়ে বিশাল মাঠ শহরের শেষ প্রান্ত নির্দেশ করে।কারণ বিশাল মাঠ পেরিয়ে বেশ দূর পর্যন্ত নির্জন এলাকা শেষ হলে শুরু হয় অন্য পাড়া। তবে স্কুলের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পায়ে হেঁটে মাঠ পেরিয়ে তাদের পাড়ায় চলে গেলেও সাধারণের চলাচলের জন্য কোন রাস্তা নেই।
বাসা হতে এই লাইব্রেরি পর্যন্ত যেতে রুমার মিনিট বিশেক সময় লাগে। আজ বিকেল করে রওনা দিয়েছে বলে লাইব্রেরি থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। শীত কাছে এসে পড়েছে। সন্ধ্যার পর রাত পৌনে আট-টা যেন মনে হচ্ছে অনেক রাত। তাই আলো ঝলমলে রিসেপশান থেকে বের হয়ে রাস্তার নিয়ন আলো যেন খুব ম্রিয়মান মহে হচ্ছে রুমার কাছে। চারিদিকের অন্ধকার দেখে অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘আজ এতো দেরী করে ফেললাম? এখন যে বেশ রাত।’
ঝিরিঝিরে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা রুমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু এত ঠান্ডা লাগালে খেসারত দিতে হবে চরম ভাবে, রুমা তা জানে। অথচ লাইব্রেরি থেকে বের হতে যে এত দেরী হবে তা তার খেয়াল ছিল না। আসলে বইয়ের রাজ্যে এলে রুমা সবকিছু ভুলে যায়। তারপরও লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে রাস্তায় পা রেখে এবার জোর কদম পা চালালো। বাড়ি ফিরতে হবে। গলায় কোন স্কার্ফ বা মাফলার নেই। ঠান্ডাটা প্রথমে গলায় –ই লাগে। তাছাড়া বৃষ রাশির জাতিকা বলে কথা। গলা তো তাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। গলাবন্ধনিটা সাথে রাখাই উচিত ছিল। কেন যে সাথে আনে নি। ঠান্ডা ঝাপটার দাপুটে ভাব নিয়ে কখন যে প্রকৃতি অবির্ভুত হবে তা তো জানা নেই।
আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতে বেশ জোর কদমে হাঁটছে। সাদার ওপর নীল ফুলের ছাপা একটা জামা পড়েছে। দেশে থাকতে তার বাবার সাথে কিনেছিল কাপড়টা। বেশ পাতলা কাপড়টা। কিন্তু ঠান্ডা তেমন লাগছে না ,তবে রাস্তায় বেশীক্ষণ সময় ধরে এভাবে হাঁটতে থাকলে ঠান্ডা লাগা অবধারিত হয়ে উঠবে। আর এই ভাবনাটুকু যেন ঠিক ধরে ফেলে হেসে ফেললো, সামনের দিক থেকে হেঁটে আসা এক পথচারী । তাকিয়ে আছে তার দিকে আর হেঁটে আসছে । মধ্যবয়সী হালকা পাতলা গড়নের মাঝারী লম্বার ফ্রেঞ্চ একজন মহিলা। রুমার প্রথমে খেয়ালে এসেছে কে যেন হেসে ফেলেছে তাকে দেখে, তার মনের ভাবনাগুলোকে পড়ে ফেলে। প্রথমে চোখে পড়েছে তার হাসি। তারপর তার মুখখানা। হাসিটা এমন যেন তিনি রুমার মনের সব ভাবনা চিন্তাকে স্বচ্ছভাবে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি নিজ কানে, রুমার মনের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছেন।এজন্যই হেসে ফেলেছেন। রুমাকে দেখে হাসিটা এমন ভাবে দিলেন, যেন তিনি জানেন রুমা এ পথ দিয়েই যাবে। তাকে তিনি চিনেন আর চিনেই তার পাশ দিয়ে হেঁটে আসার বাহানা করেছেন।এবং মুখোমুখি হবার পর হাসি আর ধরে রাখতে পারেননি। রুমা তাকে এক সাধারণ পথচারী হিসাবে ভেবেছে, যতক্ষণ না তার হাসিটা তার মনে দাগ কেটেছে। টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ করার ক্ষমতা রুমার নেই। তবুও যেন সেই সময়ে রুমাকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি চিনি তোমাকে । আমি চিনেই এসেছি তোমার সামনে।’
কিন্তু কোথা থেকে এলেন উনি?
চলার পথে কোথায় যে কখন পোর্টাল উন্মোচিত হয়ে আমাদের হায়ার –সেলফ্ বা কোন কোন সময়ে গার্ডিয়ান –অ্যাঞ্জেল, মানবরূপে ঝুপ্পুস করে সামনে এসে পড়ে আর সাধাসিধে ভাব দেখিয়ে এগিয়ে এসে আসন্ন বিপদে আগলে রেখে তা থেকে রক্ষা করে আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তৎক্ষণাৎ তো তা বুঝেও ওঠা যায় না।
কিন্তু ঐ শীতের রাতে ভদ্র মহিলার সেই হাসি যেন রুমাকে মনে মনে কিছু কথা বলে গিয়েছিল।
রুমাও যেন কিভাবে, কে জানে, তার নিজের অজান্তে বুঝে নিয়েছিল মহিলার বার্তা, ‘গলায় স্কার্ফ পর নাই কেন? ঠান্ডা লাগলে কি হবে এবার?’
কে ইনি?
রুমা ভাবছে, ইউনিভার্স থেকে নিযুক্ত তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল না তো ইনি? কিভাবে এরকম মনোসংযোগ সম্ভব হলো ইনার সাথে?
কে ইনি ?
কি ভাবে পারলেন ভাবনা চিন্তার সকল আদান প্রদান নিমেষেই করে ফেলতে?
সেদিন রুমাকে যেন ইনি বুঝাতে এসেছিলেন, এই রিয়্যালিটিতে, এই জগতে সে মোটেই একা নয়। সে কখনোই একদম একা থাকে না। সামনে নির্জন শীতের রাস্তায় লোক চলাচল আরো হালকা হবে। ঠান্ডা ঝাপটার মাঝ দিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অনেকটা পথ একা যেতে হবে । কিন্তু সে একাকী হবে না কখনোই। তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল থাকবে তার আশে পাশেই। সর্বক্ষণ। মানুষরূপে প্রতিভু হবে, যখন প্রয়োজন।
.........
০৭/০৯/২০২৬
পোর্টাল - ১ সাইকেল চালক
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


