
গ্রীষ্ম শেষ হয়ে এসেছে। হেমন্তের শুরু। ফুলের আবরণে চারিদিকের গাছগুলো শোভিত।
২০০৯ এর সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক।
এই সময় আলো ঝলমলে সকালে ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের আবেশে বাড়ির বাইরে থাকতে খুব ভালো লাগে সুমনার। কিন্তু আজ কাজ আছে। দুই রাস্তা পরেই মান্ট্রিয়ল জেনারেল হাসপাতাল। ওখানে যেতে হবে ডাক্তার দেখাতে। কাঁধে রয়েছে ডাক্তারকে দেখানোর জন্য কাগজপত্রের ভারী ব্যাগ। বাসা থেকে দু’কদম গেলেই মোড়। মোড় দিয়ে হেঁটে গেলে বড় একটা রাস্তা। ভেতরের দিকে রাস্তা বলে তেমন গাড়ি ঘোড়া নেই।। তবুও বাসা থেকে বেরিয়ে সাবধানে ডান বাম দেখে সুমনা রাস্তা পার হল।
সামনের ফুটপাতে পা রাখতেই পাশের ঝোপের আড়ালে ঝপাং একটা শব্দ। সুমনা চমকে তাকালো পাশের ঝোপে ঘেরা ফুটপাতের দিকে। কোথা থেকে যেন একজন সাইকেল চালক তার সাইকেল নিয়ে ঝোপের পাশে, ফুটপাতের খালি জায়গাটায় উদয় হয়েছে। এমন কড়া ব্রেক কষতে হয়েছে তাকে যে, ব্রেকের ধাক্কা না সামলাতে পেরে সাইকেল চালক নিজেই হতচকিত হয়ে পড়েছে। ব্রেকটা সে সুমনাকে দেখেই দিয়েছে। অর্থাৎ সময় মতো ব্রেক না কষলে সুমনা নির্ঘাত তার চাকার নিচে পড়তো ।
কিন্তু কিভাবে এই লোকটির উদয় হলো এখানে? রাস্তা পার হবার সময় সুমনা কাউকে তো সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখে নি। হতে পারে ঝোপগুলো খুব বড়, তাই চোখে পড়েনি । এই ব্যাখ্যার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যায় বটে, তবে সাইকেল চালকের অবস্থা দেখে মনে হল সে যেন সুমনার থেকে ইঞ্চি খানেক দূরে এসে নিজেকে কোন একভাবে থামাতে সক্ষম হয়েছে। এ একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার জানার মধ্যেই ছিলনা এখানে কোন পথচারী আছে। কিন্তু সামনে কে আছে তা সে দেখবে না?
দেখে নি কেন?
কারণ একটা হতে পারে আর তা হলো সামনে থেকে তো আসেনি। ও যে কোথাও থেকে ঝুপ্ করে পড়েছে । পড়ার পর দেখেছে নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে আছে এক আগুন্তক।
তাহলে কি ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে, যখন সে আসবার উদ্যোগ নিয়েছে আর যখন সে এসে পড়েছে – এই দুই সময় সূচির ফারাকে সুমনার অতর্কিত আগমন ঘটে গেছে যা, তার জানা ছিল না। একমাত্র আকাশ থেকে না পড়লে এটা না জানার কথা নয়।
আর এত বড় একটা সাইকেল আশপাশে না দেখেই সুমনা ফুটপাতের ওই জায়গায় পা রাখবে? রাখতেই পারে। আনমনে থাকলে কত কি হতে পারে! তাই হয়তো হয়েছে -এই ব্যাখ্যা নিজেকে দিয়েও সে হিসাব মিলাতে পারে নি। কারণ এর পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদক। আর তা হলো, সাইকেল চালকের এহেন কারবার দেখে, উল্টো দিক থেকে আসা এক মহিলা পথচারী তখন তার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলো যেন, এই দুইজন পথচারী একে অপরকে আগে থেকেই খুব ভালো চেনে। লোকটির দৃষ্টি অনুসরণ করে সুমনা মহিলার দিকে তাকাল। দুজনেই শ্বেত বর্ণের ফ্রেঞ্চ। নারীটির ভাবখানা এমন যেন, সে সাইকেল আরোহীকে বলতে চাইছে, ‘ এবার বুঝেছ তো সাইকেল চালাবার মজা?’
দুজনের যোগাযোগের ভাব দেখে সুমনার বুঝতে বাকী রইলো না এই দুই ব্যক্তি এই রিয়্যালিটির কেউ নয়। এদের একজন আজ পৃথিবী ভ্রমণকালে রাস্তার এক পথচারীর সাথে ধাক্কা থেকে কোন ভাবে নিজেকে বাঁচিয়েছে। ঘটনা সামলে নেবার পর হতবিহবল হয়ে পড়েছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও সেই অভিব্যক্তির চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছে তারই আরেক সংগী। পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে, প্রতিটা মুহূর্তে দৃশ্যমান হোক বা না হোক, ET রা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে পার্থিব চেহারা নিয়ে মনুষ্য রূপে রক্ত মাংসের শরীরে অথবা মাঝে মাঝে নন ফিজিক্যাল রূপে। এরাই তারা।
কখন কোন পোর্টাল বেয়ে ঝুপ করে ফুটপাতের মধ্যে তার আসার ক্ষণে সুমনার আগমণ ঘটবে, এমন কি সে জানত?
নাহ্।
কারণ এই অংশটুকু যে প্রকৃতি ঠিক করে রেখেছে। তার পোর্টাল উন্মুক্তের ক্ষণে তার হিসাবের পাশ কেটে সুমনা রাস্তা থেকে ফুটপাতে উঠবে। অদ্ভুত ভাবে পরস্পরের উপস্থিতির উপরিপাতন ঘটবে। মানে সঙ্গঘর্ষ হবে। সুমনার এক্কেবারে মাথার উপরে হয়তোবা এই সাইকেল চালকটি তার সাইকেল নিয়ে পড়বে , না হয় তার পাশ ঘেঁষে ধাক্কা লাগাবে।
কিন্তু না, সে সামলে নিয়েছে। সামলাতে যদিও তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে। সুমনা নিজেই তা দেখেছে। তার দুর্দান্ত গতিশীল অবস্থা থেকে সামলে নিয়ে হঠাৎ থামিয়ে ফেলার ঘটনাটা চালকের মুখে আতংক ও আর্তনাদ সৃষ্টি করেছে। সুমনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে শিস্ দেবার সুরে শব্দ করে উঠেছে। এই শব্দই সুমনা শুনেছে। অসম্ভব গতির পর ব্রেক কষার কোন শব্দ সে শুনেনি।
এখনো তার মনে পড়ে –আচমকা কি যেন উদয় হলো ঝোপের পাশে। সামনা সামনি পথচারীকে অতর্কিতে দেখার পর সাইকেল চালকের ক্ষীণ আর্তনাদ। চালকটি অবাক হয়ে ভেবেছিল ঝপ্ করে পৃথিবীর ম্যাট্রিক্স –এ প্রবেশের সময় কিভাবে সুমনার এত কাছ দিয়ে তার পোর্টাল উন্মুক্ত হয়ে পড়লো? কিভাবে বিশাল সংঘর্ষ হতে গিয়েও হলো না। কিভাবে সে দক্ষতার সাথে অনিবার্য সংঘর্ষ সামলে নিল!
২
তারা তো সবসময় হেমন্ত এলে, এ গ্রহের হেমন্তের ঝলমলে দিন উপভোগ করতে আসে। রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়, সাইকেল চালায়, জীবন কেমন তা জানার জন্য মনুষ্যরূপ ধারণ করে। অন্য কোন সময় অন্য কোন রূপও তারা ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়। কত ভাবেই না এ গ্রহের জীবন যাপনের স্বাদ গ্রহণ করে। সুমনার দেশে থাকলে হয়তোবা পথের ধারে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা খাওয়ার স্বাদও গ্রহণ করত।
রাস্তার পথচারীদের মাঝে কয়জন এই বাস্তবতার আর কয়জন অন্য বাস্তবতা থেকে আগত তা কি আমরা সত্যিই জানি? তারা যখন ইচ্ছে তখন পোর্টাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে গিয়ে যদি দুর্ঘটনাও ঘটায়, তাও আমাদের অজানাই থেকে যায়।
০৭/০৯/২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




