এই শহরের পথ –ঘাট দিনের বেলায় যেমন ঝকঝকে মনে হয় রাত গভীর হতে থাকলে এর রূপ তেমন ভাবেই বদলে যায়।চেনা শহরের মানুষ গুলো ক্রমশ অচেনা হতে থাকে।গতকাল সন্ধ্যা সাতটায় আলিয়াস ফ্রোঁসেসে গেলাম নাভিডের কমেডী দেখতে,এই ধরনের হাস্যকর হাসির ভাগিদার হবার ইচ্ছে আমার কোন কালেই ছিলো না,কারন আমরা যারা মীরাক্কেল নিয়মিত দেখি তাদের কাছে এই ধরনের পারফরমেন্স কেবল মাত্র গায়ে সুড়সুড়ি দেবার মতোন।যাই হোক,সাব এডিটর বলেছিলেন বলেই মিডিয়া কভার করতে উপস্থিত হয়েছিলাম।কমেডিয়ান দের কমেডি শেষ হতে হতেই রাত নয়টা।ল্যাব এইডের সামনের বিশাল রাস্তা,কতো রঙের গাড়ি আসছে যাচ্ছে।কোনটাতেই তিল পরিমান জায়গা অবশিষ্ঠ নেই,মিরপুরের বাস গুলোতেতো সব বাদুর ঝোলা ঝুলছে।আমি আর কই ঝুলবো ।শেষটায় একটা রিক্সা নিলাম,এই লোক আবার রাস্তা তেমন চিনে না।তাকে সোজা যেতে বললাম শুধু,উদ্দেশ্য মিরপুর এক নম্বর দিয়ে ঢুকবো।রিক্সাটা এক সময় কলেজগেটের সামনে দিয়ে ক্রস করতে লাগলো,তখন ওখানে টহল পুলিশ একটি সি এন জি থামিয়ে তাদের দৈনন্দিন ডিউটি সারছিলো।এর মধ্যেই আমি হাতে ঝাটকা একটা টান অনুভব কোরলাম-আমার কোলের উপর থেকে ব্যাগটা গায়েব।মুহূর্তে আমি অন্ধকার দেখলাম-ওই ব্যাগে শুধু টাকাই না,আছে-পাসপোর্ট,ব্যাংক স্টেইটমেন্ট,DBBL Card,পেনড্রাইভ ভরা মূল্যবান তথ্য,আমার বই এবং ছোট একটা ডায়রি।আমি সাথে সাথে টহল পুলিশ কে জানালাম-আপনি বাইক নিয়ে যান,সামনের সাদা গাড়িটায় ছিনতাইকারী আছে।কলেজগেট থেকে টেকনিক্যাল ছিলো প্রচন্ড জ্যাম।কোন দিকেই বের হবার পথ খোলা নেই।কেবল যদি সে শ্যামলী দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে তাহলেই পার পাবে ,কিন্তু পুলিশ কি করলো কিছুই বুঝলাম না।আমি যখন বাসায় পৌঁছালাম তখন অলরেডি আম্মার ফোন থেকে আমার ফোনে কথা হয়েছে ছিনতাইকারীর সঙ্গে ।সে নিজে আমার ফোন থেকে কথা বলেছে,জানিয়েছে আমার পাসপোর্ট ,কাগজ তার প্রয়োজন নেই,ওগুলো খেজুরবাগানের ঝরনা ফোয়ারায় ফেলে দিয়ে গেছে।আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গে কল দিলাম-ভাই,আপনের টাকা দরকার নিয়া যান কিন্তু আমার কাগজ তো আপনার কোন কাজে আসবে না ,সেগুলো অন্তত ফেরত দিন।ওই পাশ থেকে বিষন্ন হাসি-আপা,আমিতো চোর।ওইগুলা ফেরত দিতে গেলে আপনে আমারে পুলিশে দিবেন।
-কি বলেন,আপনের ঠিক পিছনেই পুলিশ গেল ,সে কি কিছু করতে পারসোন?
ওই পাশ থেকে একদম চুপ।তার নিশ্চুপ উত্তর আমার ভিতরে হাজার প্রশ্নের সূচনা করলো।যে চোর মাত্র এক ঘন্টা আগে আমার ব্যাগ ছিনতাই করলো সে আমার ফোন দিয়েই আবার আমার সাথে কথা বলছে।আমি কথা বলতে বলতেই থানায় ঢুকলাম ,চোর তখনো লাইনে।আমি ডিউটি অফিসারকে ইশারা কোরলাম ফোন ট্র্যাক করতে।তারা বলে দিলো-এটা মোহামমদপুর থানার বিষয়,কারন চুরিটা ওখানেই ঘটেছে।লে হালুয়া।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।এমন রাতে কাকে পাবো যে অতো দূর যাবে আমার সাথে?কিছুক্ষন পর পর চোর আমাকে ডিরেকশন দিচ্ছে-আপনার ব্যাগটা আসাদগেট আসার পথেই যে ফুলের টব আছে সেখানেই পাবেন।আমি অন্ধের মতোন তাকে বিশ্বাস করছি,কারন পুনরায় পাসপোর্ট ওঠানোর কি যন্ত্রনা তা আমার ভালো ভাবেই জানা।এলাকার পরিচিত সি এন জি নিলাম,ঝুটলাম অন্ধকার ভেদ করে।হঠাত মনে হলো একাই যাচ্ছি ওরা চারজন ছিল গাড়িতে ,এরা আমাকে হেনস্থা করতে পারে রাস্তায়।কিন্তু আমি কিছুতেই কাগজগুলোর মায়া ছাড়তে পারছিলাম না,আমার সদ্য বেরুনো গল্পের বই।আমি ছুটলাম,খেজুর বাগান - তন্ন তন্ন করে পেলাম কয়েকটা ময়লার বস্তা।তার মধ্যে অসহায় পড়ে আছে আমার নরম মিষ্টি হাত ব্যাগ।হাতে তুলতেই দেখি তাকে কেটে কুচি কুচি করা হয়েছে।কোথায় পাসপোর্ট,কোথায় ব্যাংকের কাগজ।সব মিথ্যে কথা-ওরা আমার সাথে আরো একবার মজা করলো।আমি খুব কাছ থেকে অনুভব কোরলাম-কারা মাত্র ৪০০-৫০০ টাকার বিনিময়ে বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে।আসলে এদের কোন পরিচয় নেই।এরা মানুষো না আবার পশুও বলা যায় না।
আবার ফোন দিলাম ,মজার ব্যাপার প্রতি বারি সে আমার ফোন ধরছে।যে দেশে বড় বড় ক্রাইম করলে বিচার হয় না সে দেশে সামান্য একটা ছিনতাইয়ের যে কোন শাস্তি হয়না তা তারা বুঝে গেছে অনেক আগেই।
তাইতো এতোটা নির্বিকার।আমার কাগজ পাওয়ার আশায় ক্রমাগত ভাই ভাই করতে লাগলাম-আপনের যদি আরো টাকা লাগে নিয়ে যান,তবু আমার পেনড্রাইভ আর পাসপোর্ট ফেরত দিন।
-ওই গুলা দিয়া আমি কি করুম,আমি চোর মানুষ।ওইগুলাতো আমি ফুলের টবেই রাইখা আরসি।
জানিনা নেশা করলে তাদের মস্তিষ্কের অবস্থা কি হয়,কিন্তু আমার তখন পাগল পাগল অবস্থা।আসাদ গেট গেলাম যেখানে সারা দিন টহল পুলিশ কি জানি পাহারা দেয়।আশ্চর্য রাত ১২ টা বাজে –একটা পুলিশো নাই।
এতোরাতে একা থানায় যাওয়া শোভন হবে না,তাই ফিরে এলাম বাসায়।ভাবছি আজ যাবো জি ডি করতে।এই জি ডি কেবলমাত্র পুনরায় পাসপোর্ট পাবার প্রসিডিউর মাত্র –এতে যে ছিনতাই কারী ধরা পড়বে তা কিন্তু না।কারন আমরা সবাই সাদা চোখে সব দেখতে পাচ্ছি,তাই সবার চোখে একটা আলাদা করে কালো চশমা লাগানো হয়েছে যেন আমরা লুকোতে পারি নিজেদের চোখ।সেই চোখের আড়ালে কতো কিছুই ঘটে প্রতিদিন এই জ্বলজ্বলে শহরের ওলিতে গোলিতে,বাইরের শহরের কথা না হয় বাদই দিলাম।কিছুই দেখিনা আমরা ,কারন আমাদের সব কিছু দেখতে নেই।
অফ টপিক ঃ আমি যখন এক কাপরে সেনানিবাসের কঠোর শৃংখল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তখন মেজর সাহেব আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন-এত বড় শহরে তুমি কখনোই একা ফাইট করতে পারবা না।এই প্রাচীরের বাইরে গিয়ে দেখো –দুনিয়াটা কতো কঠিন।আমি উত্তরে বলেছিলাম-তোমাদের নিজেদের তৈরি করা সৈনিক রা যখন তোমাদের পুরো পরিবারকে এই ভাবে নৃশংস হত্যা করে এবং সুনির্দিষ্ট কারো বিচারতো হয়ই না বরং অনেক অফিসারের চাকরী চলে যায়,তাহলে নিরাপত্তাটা আসলে কোথায়।যদি পুরো দেশকে কোন সরকার নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে কেবল মাত্র একটা ছোট্ট পরিধির মধ্যে নিজেকে আড়াল করবার মতোন ইচ্ছে আমার নেই।
আজ এতো বছর পর কেবল মনে হচ্ছে-আমি কি তাহলে ভুল করেছিলাম/মিথ্যে মিথ্যে সংসার খেলাটাই বুঝি ভালো ছিলো।কি দরকার –এই রোদেলা নীলার ?কি হবে এই সব ছাই পাশ লিখে?আমার চোখে দেখা সোনার বাংলাদেশ সেতো সেই কবেই ফেলে এসেছি ২০ বছর আগেই।আজ যা দেখি তাতো চোখে দেখার মতোন না,আর যা শুনি তা শুনতেও চাই না।যখন প্রয়োজন হয় ভালোবেসে বন্ধুর হাত ধরতে সে নিজেই ভয়ে এমন কুকড়ে থাকে,আত্বমর্যাদার দেওয়ালে প্রচন্ড আঘাত করে তখন।
কোনদিন করুনা চাই নি কারো,চেয়েছি কেবল বন্ধুতা।আর সেই বন্ধুতায় অবশ্যই কোন শর্ত থাকতে পারেনা।
আমার খুব কাছের কিছু মানুষ আছেন যারা কোন দিন ফেইস বুকে বসেন না তাদের আমি চির দিনের জন্যে হারিয়ে ফেললাম।অন্তত পক্ষে ফেইসের ভেতর যারা আছেন তারা আমাকে ইন বক্স করুন।আমি আমার বন্ধুদের হারাতে চাই না।

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ১২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




