somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রযুক্তি মিশে থাক প্রজন্মের ছন্দময় জীবনে ... -------------------------

১৪ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই পাল্লা দিয়ে শুরু হয় মিতালীর একঘেঁয়ে সকাল।এ যেন বারূদ বিহীন অন্যরকম ত্রক সাজানো রণক্ষেত্র।ছেলের স্কুলের টিফিন,সবুজের জন্যে সুগারহীন ব্ল্যাক কফি,বাড়ির ঠিকে ঝিকে ম্যানেজ করা আর নিজের জন্যে গুনে গুনে দশ মিনিট বেঁধে রাখা অফিস পথে তৈরী হবার জন্যে।
এতোগুলো কাজ এক হাতে সামলাতে পারছে কারন মা তাকে শিখিয়েছেন কি করে সময়ের কাজ সময়েই করে নিতে হয়।যেমন ,সকালে যে কাপড়টা কেউ পড়বে তা রাতেই মিতালী আয়রন করে রাখে,এমনকি বাচ্চার স্কুলের ব্যাগ এবং দিনের রান্নাটাও রাতেই সেড়ে ফেলে ।তাই ঘুমোতে যেতে দেরী হলেও বাচ্চার স্কুলে পাঠাতে একটুও দেরী করে না সে।এমন কি কর্তা সাহেবের অফিসেও এক বিন্দুও লেইট হয় না যদি না গাড়িখানা ট্র্যাফিক জ্যামে না আটকায়।তবে দেরী হয় তার নিজের,তাই বার বার ছেলেকে তাড়া দিতে থাকে-কি হলো সজীব?জুতাটা পড়ে নে।বাবাতো কখোন গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে।
ক্লাশ সেভেনে পড়া ছেলেকেতো আর এই বয়সে নিজ হাতে জামা জুতো পড়ানো যায় না।কিন্তু সজীবের হাতে সারাক্ষন মোবাইল ধরা থাকে ,তাই রাগে নিজেই হাত লাগাতে ইচ্ছে করে মিতালীর।কিযে আছে ঐ মোবাইলে?যখনি সে ছেলের সাথে মন খুলে কথা বলতে চায় সজীব মোবাইলের দিকে তাকিয়েই উত্তর করে-হুম,বলো।কি বলবা?
-কি বলবো মানে,আমার দিকে তাকা ?নাইলে বলবো কেমনে?
-উফ মা,কথা কি আমি চোখ দিয়ে শুনবো ,নাকি কান দিয়ে।
-তুই কি জানিস ,চোখ মানুষের মনের অনেক কথাই বলে দিতে পারে।
তখন ছেলে হা হা করে হেসে ওঠে –ঠিক আছে মা,তাহলে তুমি কিছুই বইলোনা,আমি তোমার চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকি।
সজীব কবে শেষ বারের মতোন তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে কথা আজ আর মনে নেই মিতালীর।সময় যতো দ্রুত যাচ্ছে ছেলেটা কেমন দূরে সড়ে যাচ্ছে।এই দোষ কি হাতে ধরে রাখা ছোট্ট যন্ত্রটার যার ভিতর দিয়ে মিতালীর এই ছোট্ট সংসারে ঢুকে পড়ছে হাজার হাজার মানুষ।সজীবের মুখেই শুনেছে –ওর ফেইসবুক বন্ধুর সংখ্যা পাঁচ হাজার প্রায় হয়ে গেছে,তার উপরে নাকি হাজার খানেক ফলোয়ার আছে।একজন মানুষের ঠিক কয়টা বন্ধুর দরকার হয় এই নিয়ে ভীষন চিন্তায় পড়ে মিতালী।
ছেলেকে কোন রকম ঠেলে ঠুলে গাড়িতে তুলে দেয়।বাড়ীর সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষন।হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ ঘোরাতেই দেখে ১৩ কি ১৪ বৎসরের একটি মেয়ে সাইকেল চালানোর চেষ্টা করছে।যেহেতু একদমই নতুন ; তাই বার বার মেয়েটা রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল,ওর পরনে ছিল ফতুয়া আর জিন্স ।রাস্তায় পড়ে যাওয়াতে ফতুয়াটা বাতাসে উঠে যাচ্ছিল আর সেই দৃশ্য প্রাণ ভরে মোবাইলে ভিডিও করে উপভোগ করছিল খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা উটকো ছেলের দল।মিতালীর বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো,উফ ছেলে গুলোর মধ্যে আবার তার নিজের নারী ছেড়া ধন নেই তো।কিন্তু এরাওতো কোন না কোন মায়ের সন্তান।
মেয়েটি একদিকে সাইকেল চালাতে পারছিল না ,অন্যদিকে ওই ছেলেগুলোর অযাচিত উল্লাশ তাকে আরো বেশি সংকীর্ন করে তুলছিল।শেষ অব্দী মেয়েটার মা এসে তাকে ভেতরে নিয়ে যায় ধমক দিয়েই।আহা ,মেয়েটি আর সাইকেল চালাতে পারবে না ,মন ভরে পানিতে সাঁতার কাটতে পারবেনা,গাছে উঠে কাঁচা আমের স্বাদ নিতে পারবেনা।আর যদি কখনোই সে রাস্তায় বের হয় এমনো হতে পারে এই মানুষের পয়দাগুলো কুকুরের মতো তাকে খুবলে খাবে।আর সমস্ত দোষ গিয়ে পড়বে তার পরনের পোষাকের উপর।পরদিন ফলাও করে শিরোনাম আসবে-মেয়েটির শরীরে্র কোন কোন স্থানে কয়টি ক্ষত ছিল আর কি কাপড় পরিহিত ছিল।আর এরি মধ্যে মেয়েটির উপর পাশবিকতার দৃশ্য জাহির হয়ে যাবে পুরো বিশ্বে তাও আবার ইন্টারনেটের কল্যাণে।
আজ আর অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না ,রিমোট হাতে নিজেকে সোফায় এলিয়ে দিল মিতালী।ওমনি বূয়া এসে ঘাড়ের কাছে ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন শুরু করলো-আপায় কি ঘুমাইবেন,তাইলে রিমুট আমারে দেন।স্টার পেলাসে একটা সিরিয়াল আসে,ঐটা শেষ কইরাই কাপড় ধুইতে যামু।
ভাবীদের মধ্যে একটা বানী প্রচলিত আছে-“বর গেলে বর পাবিরে ময়না ,কিন্তু বূয়া গেলে বূয়া পাবিনা।“
মিতালী বিনা বাক্য ব্যয়ে হাতের রিমোট দি পাওয়ারফুল লেডির হাতে দিয়ে চলে এলো চিলে কোঠায়।এই জায়গাটা তার সব চেয়ে আপন মনে হয়।মিতালী খুব প্রয়োজন না হলে মোবাইল বা ট্যাবলেট হাতের কাছে রাখে না।যেহেতু অফিসে যায় নি তাই মোবাইলটা হাতেই ছিল,সবুজ খুব যত্ন করে কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত ওর ফোনে দিয়ে দিয়েছিল।কারন রাতে সজীব স্কাইপেতে অফিসের কাজ করে(কি করে তা সে নিজেই ভালো জানে)।অহেতুক বউয়ের সাথে বিবাদে যাওয়া তার পছন্দ না,তাই এই ব্যবস্থা।মিতালী গান শুনতে শুনতে ঘুমায়,আর সবুজ অনলাইন চ্যাটিং করতে করতে ঘুমায়।এই মোবাইল নামক যন্ত্র দিয়ে যে স্কাইপে,ভাইবার বা হোয়াটসঅ্যাপ করে নিজের যাবতীয় কথা বন্ধুদের জানান দেওয়া যায় তা মিতালী জানতো না।সে কেবল দরকার হলে এস এম এস করে অথবা গান শোনে।আজ যে গানটা বেশি রকম টানছিল তা বাজিয়ে দিয়ে সে চিলেকোঠার সিঁড়িতেই বসে পড়লো-দিন গুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না ...
বাবার সরকারী চাকরীর সুবাদে মিতালী বেশ কয়েকটা বড় বড় জেলা শহরে বড় হয়েছে,পড়েছেও নামকরা স্কুলগুলোতে।নানান ধর্মের ,নানান বর্নের বন্ধু,তার মধ্যে ছেলে বা মেয়ের কোন তারতম্য ছিল না।এক সাথে বৌচি ,দাড়িয়া বান্ধা,গোল্লাছুট ,আরো কতো কি নাম না জানা খেলা।কই তখনোতো মেয়েরা ফ্রক পড়েই খেলতো, কিন্তু ছেলেরা কেন এমন হায়েনার দৃষ্টিতে তাকাতো না?নাকি তাদের দৃষ্টির মধ্যে নগ্নতার বাড়তি রসদ দেবার উপাদান তখনো আবিষ্কার হয়নি।ক্লাশ ফাইভ থেকেই মিতালী সাঁতার কাটা ,গাছে চড়া ,এমনকি সাইকেল চালানো রপ্ত করে ফেলেছিল তাও আবার শহরে থেকেই।একটা বাড়তি সুবিধা ছিল যে তখন এমন সব বিল্ডিং হয়নি,খেলার জন্যে ছিল প্রচুর মাঠ।কিন্তু এখনকার মাঠ গুলোতে ছেলেরাই চান্স পায় না,আর মেয়েরা খেলতে নামলেই বিরাট সাইজের পাইক পেয়াদা ঠিকাদার রাখতে হবে।
মিতালী যখন ক্লাশ টু’তে পড়ে তখন তাদের বাসায় কোন রেডিও ছিল না,টেলিভিশন তো অনেক দূরের কথা।কার্টুন দেখার জন্যে তারা তিন ভাই বোন উঁকি ঝুঁকি মারতো পাশের বিল্ডিং এ ।এই দেখে বাবা একদিন ১৪ ইঞ্চি সাদা কালো টিভি কিনে আনলেন।কিন্তু নির্ধারন করা থাকতো টিভি দেখার সময় –বিকেল পাঁচটায় কার্টূন ,আর রাত নয়টায় ম্যাকগাইভার।এর বাইরে যাবার সাধ্য তাদের হয় নি।সাহস হয় নি বলে যে তারা খুব অবাধ্য হয়ে গেছে বাবা মার তাও না।তিন ভাই বোন ভালো ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে গেছে।কিন্তু সন্ধ্যার সময় সজীব যখন এইচ বি ও নিয়ে বসে হাজার বকলে বা বোঝালেও সে টিভি বন্ধ করে না।খবর দেখার জন্যে অফিস থেকে ফিরে বাবা আর ছেলের মধ্যে ছোট খাটো ঝগড়া হয়ে যায় ।শেষে সজীব ঘরের দরজা বন্ধ করে ইউটিউব নিয়ে বসে।মিতালী হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে,তার নিজের মা তাদের অনেক সময় দিতেন তাই জন্যেই কি তারা সফল ভাবে সময়টাকে উতড়ে যেতে পেরেছে,আর সে নিজে বা সবুজ কেউ ঠিক মতোন সময় দিতে পারছেনা সজীবকে তাই ছেলেটা দিনের পর দিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে।মিতালী ক্রমশ নিজেকে একটা ভয়াবহ গহীন কূয়োর মধ্যে আবিষ্কার করতে থাকে।তবে কি চাকরী ছেড়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে,ওই যন্ত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে আর হারতে চায় না মিতালী।
বন্ধুর লিস্টে মায়ের নাম রাখেনা,নিজের মধ্যে তৈরী করে রেখেছে বিরাট বলয়।এক টাকা রিচার্জেই তার ভুবনে জায়গা করে নিচ্ছে ইউরোপ টু আমেরিকার নানান রঙের ফানুস।মোবাইল কোম্পানীগুলো রসের হাঁড়ি নাকের ডগায় রেখে হুলিয়া বাজাচ্ছে।প্রজন্মের সাথে প্রযুক্তির ঘটে চলেছে এক ভয়াবহ বিপর্যেয়।এটা কোথায় গিয়ে থামবে তা কে জানে।

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১২:৩৯
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

**চিঠি ০৩ : ক্যাফের চিঠি** ☕️

লিখেছেন চারাগাছ, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০৫




বহু বছর পর আজ তোমাকে দেখলাম।

একটা ক্যাফেতে।

জানালার পাশের টেবিলে বসে ছিলে তুমি। সামনে একটা বই, পাশে একটা Affogato। মাঝে মাঝে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলে, আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখছিলে।

আমি ক্যাফেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৫

বন্ধু মারফত খবর পেলাম দেশের বাজার নাকি ভারতীয় ইলিশে সয়লাব। পদ্মার ইলিশের দাম কম, তাই নিম্নচাপ উপেক্ষা করে চলে গেলাম ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে। ঘাটে এসে দেখলাম পুরা বাজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯


ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×