somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধুলোপথে ফুঁটে আছে আমাদের শিউলীরা...(২)

২৫ শে নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

view this link

নিজের রুমে পা রাখতে নিজেরই পা কাঁপছে।সিনিয়র আপুটা চোখ বড় বড় করেই তার কাপড়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-কিরে ,তোর জামা ভেজা ক্যান?কই ছিলি সারা রাত?
শিউলীর সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো,তাৎক্ষনিক কোন জবাব তার মনে পড়লো না।সোজা চলে গেল গোসল করতে।এর মধ্যে যা হবার তাই হলো,পুরো হোস্টেলে রোটে গেল মুখ রোচক গল্প।সত্যিটা কি তা জানার কারো প্রয়োজন নেই,মফস্বল থেকে সদ্য আসা একটা মেয়ে যার ঢাকায় কোন আত্বীয় নেই সে কিনা সারারাত গায়েব-এর চাইতে মজার গল্প আর কি হতে পারে।
কাজ খোঁজার আশা শিউলী আর করছে না।প্রতিদিন একটাই কাজ-রেলিং ধরে রাস্তার মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা।এমনি একদিন নিতু এসে দাঁড়ালো তার পাশ ঘেঁষে-কিরে কইলিনা জব পাইসিশ নাকি?
শিউলী প্রথমটা খুব রেগে গেল-এই মেয়েই তাকে ওই অফিসের এড্রেস দিয়েছিল।এ নিশ্চই সব জানে।কিন্তু এটা নিয়ে উচ্চবাচ্চ করলে হোস্টেলে থাকাই বন্ধ হয়ে যাবে,কারন সে সরকারী দলের ছাত্র নেত্রী।তাই কোন উত্তর না দিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।নিতু এই মুহূর্তে একটা সিগারেট ধরায়,শিউলীর মুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলে-শোন ,যা গেছে যেতে দে,তাতো আর ফিরে পাবি না ।সামনে কি করা যায় তাই চিন্তা কর।আফটারঅল হলের বিলটাতো শোধ করা লাগবে।
শিউলী কানের দুল গোড়ায় হাত রাখে,এটা বিক্রী করে বড় জোর দু’মাস কাটানো যাবে ।কিন্তু তারপর।
নিতু হাসে-এই কাজে প্রথম প্রথম একটু ভয় লাগে,পরে কাচা টাকা হাতে আসলে সব সহজ হয়ে যাবে।শিউলী কিছু বলে না, রুমে ঢুকে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।
কিন্তু ঘুম তার আসে না।বিনিময়ে ফিরে ফিরে আসে কালো কালো বিকট থাবা।কেউ তার মুখ চেপে ধরে ,কেউ তার পরনের কাপর খুলে ফেলে-কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সে মুক্ত হতে পারেনা-ওটা ছিল একটা ঘরের ভেতর।আর এখন পুরো সমাজ তার মুখ চেপে ধরেছে ,সে কিছুই করতে পারছেনা।কে বিশ্বাস করবে তার কথা।আর বলেই বা কি হবে?এর সমাধান কি?খবরের নিউজ হওয়া ছাড়া আর কি হতে পারে।ওরা বড় মানুষ , হাজার দুই টাকা ঢাললেই কেইস ডিশ মিশ।
প্রচন্ড হট্টগোলে শিউলীর ঘুম ভেঙ্গে গেল।লাগাতার হরতাল আরম্ভ হয়ে গেছে শহরে।সবাই বাক্স বাঁধছে নিজ নিজ বাড়ি ফেরার জন্য।হোস্টেল বন্ধ করে দিতে হবে,কোন উপায় নেই।কিন্তু শিউলী বিস্ফোরিত চোখে কেবল দেখছে-কোথায় যাবে সে?বাবার বাড়ি।সেই আগের মতোই বৈধ গৃহকর্মীর চাকরি,তারপর একসময় বিবাহ নামক শৃংখলে অচেনা পুরুষের মুঠিতে বন্দী। তবে কেন এতো দূর আসা ?
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই নিতুর আবির্ভাব-নে ওঠ,আমাদের অন্য জায়গায় যেতে হবে।
-কই যাবো?
-শোন,তেলাপোকা দেওয়ালে থাকলেও যা মাটিতে থাকলেও তা ।এর কোন রূপ বদলায় না।
নিতুর এমন কথার কোন মানে বোঝেনা শিউলী।কেবল হাত বাড়িয়ে কাপর খুঁজতে থাকে ব্যাগের ভেতর।শিউলীর পড়ার মতোন কোন কাপর নেই,যে দুটো আছে তাই কুন্ডলী পাকিয়ে নিতুর পথ অনুসরন করলো।বড় একটা মাইক্রো বাস এসে থা্মলো হোস্টেলের গেটে,ভেতরে মধ্য বয়স্ক তি্নজন যুবক।নীতু তাদের কি বললো কে জানে ,তারা দরজা খুলে শীউলীকে একদম মাঝে বসালো।এর মধ্যে একজনতো রীতিমতোন তার ঘাড়ের পিছনে হাত রেখেছে।
কিছু দূর যাবার পর বাপ পাশে বসা লোকটা তার থাইয়ের উপর হাত দিয়ে চেপে ধরল।শিউলী বাঁ হাতে হ্যাচকা টানে সরিয়ে দিতেই লোকটার অট্ট হাসি-ভাবটা এমন জানি কেউ খায় নাই এর আগে।গাড়ি ভর্তি সবাই হেসে উঠলো এক সাথে।গাড়ি থেকে নামার সময় নিতু মনে করিয়ে দিল-ম্যাডামের সামনে বেশী কথা বলবিনা,নইলে কিন্তু রাস্তার কুকুরের কাছে দিয়া দিব।
শিউলী চুপ করে ওদের কর্মকান্ড দেখছে।ভেতরের ঘরে বেশ কয়েকটা মেয়ে শাড়ি পড়ে সেজে গুজে দাঁড়িয়ে আছে।এই বাড়িটাকে দেখলে মনে হয় অনেক গুলো ভাড়াটিয়া তাদের স্বাগতম জানাতে অপেক্ষা করছে।
হঠাত ভেতর থেকে প্রায় মধ্যবয়সী মহিলা বেরিয়ে এলেন,ছিপ ছিপে গড়ন।সিনেমায় দেখা চন্ডাল মহিলার মতোন নয়।বেশ গুছিয়েই কথা বলছেন-কি ,দুপুরে কিছু খাওয়া হয়েছে?
নিতুই উত্তর করলো-না,দুই দিন ধরেতো এই একি অবস্থা চলছে।
-ইশ ,চেহারাটার কি অবস্থা হয়েছে,শিউলী না তোমার নাম?বলেই শিউলীর থুতনী ধরে চাপ দিল।
শিউলী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
-শোন শিউলী,এখানে কেউ তোমাকে জোর করবে না।তুমি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হউ ,জি বাংলা দেখ।রেস্ট নাও।তারপর দেখবে একময় সব কিছু কেমন বোরিং লাগছে, তখন তুমিই হাওয়া বদলাতে মরিয়া হয়ে উঠবে।
শিউলী তার কথার পুরো অর্থ বুঝতে পারলো কিনা বোঝা গেল না,তবে রুমে গিয়ে চমৎকার শাওয়ার নিয়ে নিল।এমন বাথটাব সে এ জীবনে দেখেনি।
ঠিক কতোটা সময় শিউলী ঘুমিয়ে ছিল মনে করতে পারছেনা,জানালা দিয়ে যতো দূর চোখ যায় চাঁদের ঝক ঝকে আলো তার শরীরে এসে পড়েছে।তার বুঝতে অসুবিধাই হলো না এখন মধ্য রাত।রাতের আকাশের তীব্রতায় নিজেকে খুব অচেনা লাগতে আরম্ভ করলো।কি উদ্দেশ্যে সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো,আর কিবা ঘটছে তার জীবনে।এর চাইতে ঢের ভালো ছিল বাবার কথা মতোন ওই বুড়োটাকে বিয়ে করা।নিজের পরিচয় গড়তে গিয়ে যদি এভাবে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় তবে এ বেঁচে থাকার মানে কি।
সামনেই খোলা জানালা হাত বাড়িয়ে আছে,শিউলী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো –এখান থেকে লাফ দিলে কি মৃত্যূ নিশ্চিত হবে।খুব উঁচুতো না,মাত্র দুই তলা।আবার মনে হলো-কেন সে মরবে,কি তার দোষ? সে পিছিয়ে গেল।আর তখনি সেই মধ্যবয়সীর ঘরে প্রবেশ-কি সোনা,ঘুম ভালো হয়েছে?দেখো তোমাকে কি ফ্রেশ লাগছে।পুরো দুই দিন ঘুমালে।এখন খেয়ে নাও,গেস্ট আসবে।
শিউলীর প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করলো –কোন গেস্ট?যাদের পকেটে হাজার হাজার টাকা থাকে কেবল মেয়ে মানুষ নিয়ে ফূর্তি করার জন্য?
কিন্তু কিছুই সে বললো না।মহিলা বের হয়ে যাবার পর সে বিছানায় তার জন্য রেখে যাওয়া শাড়ী পড়ে নিল।নাচতে হবে কিনা সে জানে না,কোথায় যেতে হবে তাও সে জানে না।নিজের ভেতর নিয়ন্ত্রনের কাঠি যেন তার নিজের হাতে আর নেই।সে মন ভরে সেজে নিল।এমন দামী দামী অর্নামেন্টস সে তার জীবনে দেখেনি।
তারপর সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখলো –দেশি বিদেশি দুই ধরনের খদ্দের দর কষাকষিতে ব্যস্ত।ম্যাডাম তাদের জন্য আয়েশি পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করছে।
দূর থেকে একজন সাদা চামড়ার লোককে সে খেয়াল করে নিল।কাছে গিয়ে নিজেই তার পাশে বসে পড়লো।লোকটা বেশ থতোমতো ইংরেজীতে বললো-হাই,সুইটি।হাউ আর ইউ?
শিউলী ভুবন ভুলানো হাসি দিল-আই এম ফাইন,নাইস টু মিট ইউ।এই অবস্থা দেখে ম্যাডাম বেশ হক চকিয়ে গেল,তারপরো নিজেকে সামলে নিয়ে প্রস্তাব করলো-ওকে,ইউ ক্যান প্রসিড।সাদা চামড়া বলে দিল-নো,বেবি।নট হেয়ার।উই মাস্ট এ লং ড্রাইভ।
ওকে শিউর –বলেই গাল ভরা হাসি ছড়িয়ে দিল ম্যাডাম।
গাড়ি চলছে ধীর গতিতে।সাদা চামড়া নিজেই ড্রাইভ করছে।আর মাঝে মধ্যে শিউলীর বুকের দিকে তাকিয়ে দেখছে।এইসব নিয়ে শিউলীর কোন মাথা ব্যথা নাই।তার চোখ তখন প্রায় বন্ধ হতে থাকা দোকানের দিকে ।হঠাত তার কি মনে হলো,বলে উঠলো-প্লিজ স্টপ দ্যা কার, আই নিড এ মেডিসিন।
প্রশ্ন বোধক মুখ সাদা চামড়ার –হোয়াই,আর ইউ সিক?
-নো,ইটস এন আর্জেন্ট পিল।
-ওকে,আই ক্যান বাই।
-নো প্রবলেম,আই ক্যান হ্যান্ডেল ইট।
কথা শেষ করতে করতেই সে নেমে গেল একটি ফার্মেসীর সামনে।তারপর চারপাশে তাকিয়ে দেখলো এমন কোন মানুষ নেই যারা তাকে ফলো করতে পারে।
শিউলী হাঁটতে আরম্ভ করলো অন্ধকার পথ ধরে,কিন্তু কোথায় শেষ হবে এই পথ তা তার জানা নেই।সে কেবল এতো টুকুই জানে –ছোট্ট একটা ঘটনাই আস্ত জীবন না।জীবন অনেক বড়,আর এই বিশালতার মাঝেই বেঁচে থাকাটা আনন্দের।
শিউলী এগিয়ে চলে উদ্দেশ্যহীন ,পেছনে পড়ে থাকে কালো পাজেরো আর অচেনা কিছু মুখ ।

---------------------------------------------রোদেলা নীলা
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১:০১
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রবাদ প্রবচন ও আলী ভাইয়া, জী এস ভাইয়া, খায়রুলভাইয়া ও সত্যপথিকভাইয়াদের পোস্ট..... এই আমি অপ্সরা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২২


এই অপ্সরা শুধু একটা নিকই না। জীবনের একটা অংশের নাম। জীবনটা শুরু হয়েছিলো যবে থেকে তার পর ৫/৬ বছর থেকেই জীবনের নানা ক্ষনের নানা মানের উদ্দেশ্য বিধেয় ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

Somewhereinblog.net: বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ থেকে ডিজিটাল পাবলিশিং এ পরিনত করে সাবলম্বি করার লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তাবনা ।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯


একজন নিয়মিত ব্লগার হিসেবে প্রতিদিনই লক্ষ্য করি, Somewhereinblog.net (সামু) বাংলা সাহিত্য, অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক লেখার এক বিশাল আর্কাইভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতাও সামনে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অটো কে বন্ধ করা যাবে না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১




অনেক দিন আগের কথা। ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন আমি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় থাকি এবং অনার্সে পড়াশোনা করি। পড়তাম পাশের উপজেলা সোনারগাঁওয়ের সোনারগাঁও সরকারি কলেজে। প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×