১৯৭৬ সালে সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপন বিচারে ফাঁসি দেয়া হয় সেক্টর কমান্ডার, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব) আবু তাহেরকে। সম্প্রতি এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলেছে। খোঁজা হচ্ছে এই মামলার হারিয়ে যাওয়া গোপন নথি। চলছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শোনার পালা।
ঐতিহাসিক এই ঘটনাটির নানারকম বর্ণনা পাওয়া যায় সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের লেখালেখিতেও। এরকম একটি বর্ণনা দিয়েছেন তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন তার ‘বাংলাদেশ : রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’ শীর্ষক গ্রন্থে।
তিনি লিখেছেন: “সেদিন ৮ই নবেম্বর, রাত প্রায় নয়টার দিকে আমি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে বসা। সে সময় ব্রিগেডের সিগন্যাল অপারেটর এসে খবর দিল, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সে রাতেও বেশকিছু অফিসার নিধনের লিস্ট তৈরি করেছে।
সে যা জানাল তার বিবরণ হলো, সৈনিকদের সব দাবি মানা না হলে এ সংগ্রাম চলতেই থাকবে। সে আরও জানাল যে, অফিসার নিধনের সঙ্গে মাত্র গুটিকয়েক সৈনিকই জড়িত বিশেষ করে কিছু সিগন্যাল, ল্যান্সার আর সামরিক করনিকদের মধ্যেই ‘সৈনিক সংস্থা’ ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। তাহেরের প্ল্যান যদি কার্যকর হতো তবে সেদিন রাতে এবং পরের কয়েকদিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর ‘কমান্ড স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গে দিয়ে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা হতো। তাহের সাধারণ সৈনিকদের দলে টানে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার উছিলায় এবং অফিসারদের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবহারের অপপ্রচারের মাধ্যমে। প্ল্যান অনুযায়ী সেনাবাহিনীর স্ট্রাকচার শেষ করার পর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উপরও একই ধরনের হামলা হতো। তাতে দেশ চলে যেত এক বিশৃঙ্খল অবস্থায়। অবশেষে বিপন্ন হতো দেশের সার্বভৌমত্ব আর স্বাধীনতা। জিয়াউর রহমান তাহেরের অভিলাষ বোঝার পর থেকেই তার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রেখে সৈনিকদের নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আর ব্যক্তিত্ব, সাহস আর ত্বরিত পদক্ষেপের জন্য দু’একদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
রাত প্রায় দশটার সময় সেনাসদর থেকে কর্নেল নুরুদ্দীন খান ফোন করে ব্রিগেডের অবস্থা জানতে চান। তাকে পরিস্থিতি শান্ত বলে জানালে তিনি আমাকে সেনাসদরে চলে আসতে বলেন। বলাবাহুল্য, এ ক’দিন আমি ব্রিগেডে একা। মেজর হাফিজ ৭ নবেম্বর রাত থেকে ১ম বেঙ্গলের সম্পূর্ণ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে ভৈরবের দিকে চলে যান। পরিস্থিতির ভুল বোঝাবুঝির জন্যই ১ম বেঙ্গল সেনানিবাস ত্যাগ করেছিল। আমি বহু কষ্টে সেনাসদরে মিলিটারি অপারেশন পরিদপ্তরে পৌঁছি।
আমি সেদিনও সারারাত জেগে লে কর্নেল নুরুদ্দীন খানকে সহযোগিতা করতে বিভিন্ন ইউনিটের লোকবল আর পরিস্থিতির খবর নেয়ার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করার প্রয়াস করছিলাম। প্রায় মধ্য রাতে যশোহর সেনানিবাস থেকে লে কর্নেল আব্দুস সালামের নেতৃত্বে (পরে মেজর জেনারেল ও সিজিএস) ১২ই বেঙ্গলের সৈনিকরা ঢাকা সেনানিবাস রক্ষার জন্য এসে পৌঁছে। তাদের কমান্ডো কোম্পানিকে সেনাসদর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। সকালের দিকে আরও একটি ইনফেনট্রি ব্যাটালিয়ান ঢাকায় পৌঁছালে জিয়াউর রহমানের হাত আরও শক্ত হয়। প্রসঙ্গত ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের প্রতিটি ইউনিটই ৩রা নবেম্বরের অভ্যুত্থানের পরে মুহ্যমান হয়ে থাকে কেবল মাত্র ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট যারা জিয়াকে মুক্ত করার কৃতিত্বের দাবিদার এবং সঙ্গত কারণে তাদের আধিপত্য বজায় থাকে। প্রসঙ্গত এই ২ ফিল্ড রেজিমেন্টও ১৫ই আগস্টের বিপ্লবে রশীদের নেতৃত্বে যোগ দেয়।
৯ই নবেম্বরের সকালের দিকে বিভিন্ন ইউনিটের খতিয়ান নিতে থাকলে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও সৈনিকদের কিছু কিছু খবর আসতে থাকে। তাদের সঙ্গে জেএসডির সম্পর্ক, সমগ্র বাহিনীর মধ্যে নাশকতামূলক তৎপরতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের নীলনক্সারও খবর প্রকাশ পেতে থাকে। এদিকে মীর শওকত আলী সিজিএস হওয়ার পর থেকেই সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তৎপর করে তোলেন এবং সুচতুরতার সঙ্গে সৈনিকদের বিশৃঙ্খলা কিভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করতে পারে তার একটা বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হন। তার এ ধরনের প্রচারণা সৈনিকদের অতিদ্রুত সংঘবদ্ধ হতে সহায়তা করে।
প্রায় সপ্তাহখানেক পরে লে কর্নেল এ জে এম আমিনুল হক ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে যোগদান করেন। এ কয়দিন আমি একাই ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার সামলাই তখনও অবশ্য রুটিন কাজ তেমন শুরু হয়নি। ভিতরে ভিতরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্ররোচনা তখনও চলছে। বিশেষ করে সৈনিকদের ১২ দফা দাবি সরকারিভাবে গৃহীত হয়নি কারণ এসব দাবি-দাওয়ায় সম্মত হতে সরকারের বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই জেএসডির (জাসদের) জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ আ স ম আব্দুর রব, মেজর জলিল, হাসানুল হক ইনু প্রমুখ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে সৈনিকদের সঙ্গে ওয়াদা খেলাপ করার দোষারোপ করে বিবৃতি দিতে থাকেন। জিয়াউর রহমানও জেএসডিকে ৭/৮ই নবেম্বরের অফিসারের হত্যায় সৈনিকদের প্ররোচিত করার জন্য সরাসরি দায়ী করেন। শুধু তাই নয়, তিনি নবেম্বরের মাঝামাঝি আবার রেডিওতে ভাষণ দিয়ে দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দান করেন। এদিকে সমগ্র সেনাবাহিনীতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যগণকে শনাক্ত করা শুরু হয় এবং তাদের অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করে জেএসডির অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নাম পাওয়া যায়। স্মরণ থাকে যে, ৭ নবেম্বরেই জেএসডির অনেক নেতাকে জেল থেকে ছাড়া হয়েছিল যার মধ্যে পূর্বোক্ত অনেক নেতাই ছিলেন। এর মধ্যেও বিভিন্ন সেনানিবাসে বিভিন্ন সময়ে লিফলেট বা প্রচারপত্র তাহেরের ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার’ নামে বিলি করা হয়। বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যগণকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। এসব ব্যবস্থার ফলে ধীরে ধীরে জিয়াউর রহমান সৈনিকদের নিজের আয়ত্তে এনে অফিসারদের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। অতি অল্প সময়ে সমগ্র দেশে তাঁর ভাবমূর্তি গড়ে উঠে যদিও নামমাত্র রাষ্ট্রপতি তখনো একজন আলাদা ব্যক্তি কিন্তু জিয়াই হয়ে উঠেন অঘোষিত রাষ্ট্রপতি। ২৩ নবেম্বর থেকে জিয়া জেএসডির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে থাকেন। প্রথম পর্যায়ে জেএসডির জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আ স ম আব্দুর রব, মেজর জলিল, হাসানুল হক ইনু, ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খান এবং তাহেরের বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার পরের দিন তাহেরকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে সিপাহী বিপ্লবের ইতি হয়।
এর দু’দিন পর আবু তাহের এবং অন্যদেরকে ছাড়াবার উদ্দেশ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে বন্দি করার এক প্রচেষ্টায় জেএসডির কর্মীরা তার অফিসে তার উপরে হামলা চালায়। হামলার সময় তার দেহরক্ষীদের গুলিতে চারজন হামলাকারী নিহত হয়। জিয়াউর রহমান এ ঘটনার সম্পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন এবং সারাদেশে অভিযান চালিয়ে জেএসডি’র প্রায় দশ হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসবের মধ্যে দিয়ে তিনি দিনে দিনে নিজেকে বাংলাদেশের একমাত্র শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে লাগলেন।
কর্নেল (অব) আবু তাহের, যিনি গণবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য। তার উদ্দেশ্যকে ত্বরান্বিত করে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু। কর্নেল তাহের অত্যন্ত সুচতুর অফিসার ছিলেন যিনি মুক্তিযুদ্ধে একটি পা হারান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপে ভালো করায় তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট ব্যাগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ, প্যারা জাম্পের রিগারস কোর্সের জন্য মনোনীত করে পাঠালে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে ট্রেনিং সম্পন্ন করেন এবং তখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র বাঙালি অফিসার যাকে এ প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। আগেই বলেছি যে, তিনি তার বৈপ্লবিক চিন্তাধারা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করার কারণে তাকে বঙ্গবন্ধুর সময়েই সেনাবাহিনী থেকে অবসর দেয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে বঙ্গবন্ধু বিআইডাব্লিউটিসি’র ট্রেজার ইউনিটের কর্মকর্তা হিসেবে পুনঃনিয়োগ করেছিলেন।
তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে ৭ই নবেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের সূচনা করেন। শোনা যায় যে, তাহেরের বৈপ্লবিক ধ্যান-ধারণার সঙ্গে তিনিও একমত পোষণ করতেন এবং দু’জনার মধ্যে এ বিষয়ে একটা যোগাযোগও ছিল। তাহের, জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে তাঁর (জিয়াউর রহমানের) ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজস্ব পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু জিয়ার বুদ্ধি এবং কৌশলের কাছে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাহেরের পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল কিন্তু সময়ের অভাবে পরিপক্বতা লাভে সমর্থন হয়নি। এর কারণেই হয়ত খালেদ মোশারফের ব্যর্থ অভ্যুত্থান যা তাহেরকে বাধ্য করেছিল তড়িঘড়ি করে তার অভ্যুত্থানকে এগিয়ে আনতে। তবে তাহের যে মারাত্মক ভুলটি করেন সেটা হলো তিনি বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে সক্ষম হননি। এ দেশের জনগণ, সমাজ এবং ধর্ম সম্বন্ধে যত উদারই হোক না কেন বামঘেঁষা রাজনীতি কখনই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আশানুরূপ সাড়া জাগাতে আজ অবধি সক্ষম হয়নি, ভবিষ্যতেও হয়ত হবে না।
তাহের ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছিলেন বহুদিন আগে থেকে। আর বাংলাদেশে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যের শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে যে জিয়াউর রহমানের কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন, সেই জিয়াউর রহমানই তাহেরের ফাঁসির বন্দোবস্ত করেন তারই (তাহেরের) অত্যন্ত অমানবিক কার্যকলাপের জন্য। ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে দেশদ্রোহিতার অপরাধে তাহেরকে ঢাকা জেলের ভেতরেই সংক্ষিপ্ত সামরিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে ফাঁসির রশিতে প্রাণ দিতে হয়। তাহেরের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদেরকেও বিচারে দোষীসাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড দেয়া হয়। এরা সবাই তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ছিল। তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সাময়িকভাবে বিনষ্ট হলেও তার রেশ থেকে যায় বহুদিন। ফলে পরবর্তীতে সংগঠিত হয় আরও ২১টি ছোটবড় আকারের সশস্ত্র রক্তাক্ত অভ্যুত্থান। আর ২১তম অভ্যুত্থানেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রখ্যাত সেক্টর কমান্ডার, কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী, স্বাধীনতার ঘোষক বলে পরিচিত, ৭ নবেম্বরের নায়ক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রাণ হারান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তাঁরই ঘনিষ্ঠ একজন সহমুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুর, বীর উত্তমের পরিচালিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠের দশ বছর পর সেই একই শহর চট্টগ্রামে তাকে প্রাণ দিতে হলো নির্মমভাবে।
৭ নবেম্বরে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সুচতুরভাবে সিপাহী বিপ্লবের সূচনা ঢাকা সেনানিবাস থেকে শুরু করেছিল যা অন্যান্য সেনানিবাসেও একই সময়ে, বিশেষ করে যশোর, কুমিল্লা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অন্যান্য সেনানিবাসে এর আকার এবং ব্যাপ্তি ঢাকার মতো এত প্রকট ছিল না। এ বিপ্লব সেনাবাহিনীতে কিছু কিছু পরিবর্তন আনে যেমন বহুল প্রচলিত ব্যাটম্যান প্রথা বাদ দিয়ে অফিসার জেসিওদের জন্য ব্যাটম্যান ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাধারণ সৈনিকদের ভেতর থেকে যোগ্যতানুসারে কিছু ‘জেনারেল লিস্ট’ অফিসার নিয়োগ করার বিধি প্রবর্তন করা হয়। ৭ নবেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস নামকরণ করে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।
৭ই নবেম্বরের বিপ্লবে আর তার পরবর্তী ঘটনাগুলো জিয়াউর রহমানকে শক্তিশালী হবার সুযোগ করে দেয়। আর তিনি এ সুযোগে সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করে শুধু সেনাবাহিনীর শক্তিই বৃদ্ধি করেননি সে সঙ্গে তিনি নিজের অবস্থানকে সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে সুদৃঢ় করেন। অল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনীকে ৫টি ব্রিগেড থেকে ৫টি ডিভিশনে উন্নীত করায় সেনাবাহিনীতে উচ্চ র্যাংকে দ্রুত প্রমোশন দেয়া হয়। সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীর কলেবর বৃদ্ধিতে সাধারণ সৈনিকদের প্রমোশনের ক্ষেত্রও তৈরি হয়। সেনাবাহিনীতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ স্কুল স্থাপন করা হয়। প্রাক্তন রক্ষীবাহিনীর জোনাল হেডকোয়ার্টারগুলোকে সেনাছাউনিতে উন্নীত করা হয়। শুধু সেনাবাহিনীই নয়, তিনি বিমান ও নৌবাহিনীর কলেবর বৃদ্ধি করেন। চীনের সঙ্গে সুসস্পর্কের কারণে চীনের অনুদানের আওতায় সশস্ত্রবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়।
জিয়াউর রহমান সশস্ত্রবাহিনীর ভেতরে তার অবস্থানকে মজবুত করার জন্য সৈনিকদের ধর্মীয় অনুভূতিকেও চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ ছিলেন। এতে তার উদারতা এবং সেনাসদস্যদের মধ্যে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এনে দেয়। তিনি মেজর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে উপপ্রধান হিসেবে বহাল রাখেন এবং পরবর্তীতে তাঁর (জিয়াউর রহমানের) স্থলে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। তিনি প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধা অমুক্তিযোদ্ধা প্রশ্নটি কখনই প্রশ্রয় দেননি।
সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের জায়গায় নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোটের মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়াটাকে বৈধ করার চেষ্টা করেন। তিনি বাংলাদেশের খড়ি চড়ষরঃরপধষ ঈঁষঃঁৎব এর সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সশস্ত্রবাহিনীর প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ করে দেন।
৭ই নবেম্বরের মধ্যে দিয়ে তাহের তার উদ্দেশ্য যেভাবে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন তার ক্ষেত্র বাংলাদেশে তিনি (তাহের) তৈরি করতে সক্ষম হননি। ঐব ঃড়ঃধষষু সরংলঁফমবফ ঃযব সড়ড়ফ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয ৎবমধৎফরহম ধপপবঢ়ঃধহপব ড়ভ যরং নৎধহফ ড়ভ ংড়পরধষরংস রহ ধ পড়হংবৎাধঃরাব ৎবষরমরড়ঁং ংড়পরবঃু তিনি (তাহের) ১৯১৯ সালের বলশেভিক জবাড়ষঁঃরড়হ এর ধারার ব্যর্থ অনুকরণ করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি নিজের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে আর একজন উচ্চাভিলাষী অফিসারের ভাবমূর্তিকে কাজে লাগাবার চেষ্টায় চাতুর্যে পরাজিত হন। তিনি জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঈধষপঁষধঃবফ খেলার ছকের মধ্যে থেকে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হননি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাহেরের ভাবধারা ছিল অগ্রহণযোগ্য। তাহের হয়ত ভুলে গিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ কোনো নিরবচ্ছিন্ন ভূখন্ড নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চরম রাজনৈতিক অব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশের কিছু কিছু অংশে যে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে সে কথা তিনি হয়ত ভালোভাবে নিরীক্ষা করে দেখেননি। তিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রো হতে চেয়েছিলেন কিন্তু বাংলাদেশকে কিউবা বা বাংলাদেশে প্রাকবিপ্লব কিউবার পরিস্থিতি প্রস্তুত করতে পারেননি। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর কাঠামোতে যে আমূল পরিবর্তন তিনি আনতে চেয়েছিলেন তার ক্ষেত্র তৈরিতে তিনি ব্যর্থ হন। তবে তিনি যা করতে গিয়েও করতে পারেননি আর তার ফলে বহু সৈনিককে পরবর্তীতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়।”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



