somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও দাসশ্রম

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৫:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তত্ত্বভিত্তিক ও একেবারেই একাডেমিক। এখানে বিশ্লেষণের চেয়ে তথ্য গেলানোর উপর জোর দেয়া হয় বেশি। আনুষ্ঠানিক লেখা শেখানোর উপর জোর দেয়া হয়। নামমাত্র কয়েকটি লাইব্রেরী ও ল্যাবরেটরি আছে। পিতামাতার জোরাজুরির কারণে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টিকে থাকে। দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্ধশিক্ষিত বাবা-মারা সন্তানদের পড়াশোনা দেখভাল করতে পারে না। অনুষঙ্গ যোগাতে অসমর্থ। স্কুলে বেতন দিতে না হলেও স্কুলের ইউনিফর্ম, কলম, পেন্সিল ও প্রাইভেট টিউটরের বিষয়টি গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অত্যন্ত জরুরী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাঠ্যক্রমের ক্রমাগত মান উন্নয়নের পরও যখন শিক্ষকদের বেতন বাড়ে না, শিশুদের যখন বোঝার চেয়ে মনে রাখার উপর মনোযোগ দিতে হয়, তখন তাদের শেখানোর চেয়ে গেলাতে হয় বেশি। কিন্ত জমি-জমাহীন কৃষক অথবা দিনমজুরের ছেলে মেয়ের সেই সময়টুকু নেই। আর্থিক সঙ্গতি নেই এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষাগ্রহণের জন্য যে ধরনের স্ট্যামিনা প্রয়োজন তা এইধরনের সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র খেটে খাওয়া লোকের সন্তানের থাকে না। এমনও অনেক উদাহরণ আছে যে, অনেক অবিভাবক সন্তানদের পড়াশোনার স্বার্থে তাদের আয়ের বিষয়টি (অর্থাৎ শিশুরা তাদের আয়ে যে যোগান দেয় ) বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তাদের পক্ষে শিক্ষার ব্যয়ভার বহন বা ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ যোগানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোন কোন পিতা-মাতা প্রকৃত অর্থই শিশুকে খাটিয়ে আয় বাড়াতে আগ্রহী, আবার কেউ কেউ পড়াশোনার কথায় ক্ষুব্ধ হন: কিন্তু রাষ্ট্র প্রকৃত শিক্ষার ব্যবস্থা করলে বেশিরভাগ পিতামাতাই সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেন।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে এমন অনেক এনজিও আছে যারা শিশুদের বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূলে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসকল জায়গায় শিশুদের উপস্থিতি এটা প্রমাণ করে যে গ্রামীণ, অশিক্ষিত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, উদ্দীপনা রয়েছে। যেহেতু শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক কোন ধরনের মুক্তিই সম্ভব নয়, তাই এই অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনো দাসত্বের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ শিশুশ্রম। এদেশে শিশুরা নানারকম শিশুশ্রমের সাথে জড়িত। কেউ কেউ বিভিন্ন কল-কারাখানায়, কেউ কেউ নির্মাণকারি প্রতিষ্ঠানে, কেউ কেউ আবার টোবাকো ফ্যাক্টরিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুকিপূর্ণ সব কাজ করে থাকে। আবার অনেক শিশু আছে যারা গৃহকর্মীর কাজ করে থাকে। অনেকে মনে করেন শিশু গৃহকর্মীরা অন্যান্য শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের চেয়ে কম শোষণের শিকার হচ্ছে। নিজের আবাস ছেড়ে অন্য কোথাও থাকাটাকে শিশুর জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলে স্বীকার করে নিলেও (কিছু সহিংস ব্যাতিক্রম ছাড়া) গৃহকর্তার গৃহকে গৃহকর্মী শিশুটির জন্য ঘরের বাইরের আরেকটি ঘর হিসেবে মেনে নিতে চান। এটি কি নিজেকে সদাশয় গৃহকর্তা হিসেবে মনে করতে চান এমন একজনের যৌক্তিকতাবোধ, নাকি উপায়ান্তরবিহীন শিশুদের (যারা অন্তত নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু করতে বাধ্য হয়)

তাদের বিষয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক বিশ্বেষণ; তা বলা শক্ত। তবে এটা বলতেই হচ্ছে, এইরকম মনোভাব তাদের চিন্তাশক্তির চরম অনুর্বরতাকে স্পষ্ট করে। তবে শ্রমে নিয়োগকর্তা যদি কোন শিশুকে স্কুলে পাঠান, তার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন থাকেন অর্থাৎ তার বিকাশের বিষয়টি মাথায় রাখেন তবে গৃহকর্ম তার জীবনের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আবার এটি দাসত্বের সমতুল্যও হতে পারে। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, ২৪ ঘন্টা বন্দিদশা শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্র তৈরি করে। তাছাড়া কারখানা আইনই যেখানে যত্রতত্র লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে গৃহকার্যে নিয়োজিত শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে যদি নিয়োগকর্তাদের জন্য আইন তৈরি করা হয় তবে তা কতটুকু কার্যকর হবে তা ভাবার বিষয় বৈকি। এদিকে যেসকল শিক্ষার্থী মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। একদিকে বাংলাদেশের মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষা সচেতন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। ধনী পরিবারের সন্তানেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লাখ লাখ টাকা খরচ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা জীবন বাজি রেখে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করছে। আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় ভর্তি পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বারপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয় গ্রহণ করতে হচ্ছে। এবং তাদের প্রাইভেট টিউশন দিয়ে সরকারী কলেজগুলোর শিক্ষকণ্ডলী নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তন করে চলেছেন। বেড়ে চলেছে বেকারত্ব। আর একটা কথা না বললেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর যে পদ্ধতি বর্মমানে প্রচলিত আছে তাকে অন্তত মেধা যাচাইয়ের পদ্ধতি বলা যায় না। এই পদ্ধতিতে আর যায় হোক মানুষ তৈরি করা যায় না । এহেন খোঁড়া, অথর্ব, ভোতা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশ বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারবে না। এধরনের বাজারমেুখো, প্যাকেজ শিক্ষাব্যবস্থা দ্বারা বেকারত্ব বেড়েই চলবে। দেশ থেকে মানব শক্তি বিদেশে পাড়ি জমাতেই থাকবে। না মিলবে অর্থনৈতিক মুক্তি, না ঘুচবে দাসত্বের অন্ধকার। নিজের দেশকে অন্ধকার করে রেখে বিশ্বকে আলোকিত করার মতো মূর্খামী দ্বিতীয়টি হয় না। যেসকল শিক্ষিত অভিজাত সম্প্রদায় বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার পক্ষে তাদের বোঝা উচিত যেমন তারা নিজেদের ছেলেমেয়ের বিকাশকে লংঘিত করছে সেইসাথে এদেশের দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েদের সত্যিকারের বিকাশকেও লংঘিত করছে। তাই একটি ভালো ও সমন্বিত সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা একাধারে অর্থনৈতিক, সামাজিক মুক্তি অর্জনে অপরিহার্য।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরো...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫২

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরোচ.....

বিপ্লবের লক্ষ্য কী- পরিবর্তন, নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে জেন-জি স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন- স্বৈরাচার গেছে, স্বৈরাচারী মানসিকতা কি গেছে?
যে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

হয়তো আজ টেলিফোনও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো স্মার্ট হতো!



একসময় মানুষের দূর-দূরান্তে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিফোন। মোবাইল ফোনের মতোই টেলিফোন দিয়ে কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×