হয়তো আজ টেলিফোনও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো স্মার্ট হতো!

একসময় মানুষের দূর-দূরান্তে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিফোন। মোবাইল ফোনের মতোই টেলিফোন দিয়ে কথা বলা যেত, তবে অধিকাংশ টেলিফোন তারের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকত। যেমন এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ তার দিয়ে বাসা বা অফিসে পৌঁছায়, তেমনি একসময় টেলিফোনের সংযোগও তারের মাধ্যমে গ্রাহকের বাড়ি বা অফিসে পৌঁছাত। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, তার দিয়ে সংযুক্ত থাকায় টেলিফোনকে মোবাইলের মতো সঙ্গে নিয়ে যেকোনো জায়গায় যাওয়া যেত না।
টেলিফোন বুথ ও শার্লক হোমসের স্মৃতি
একসময় ঢাকার মতিঝিল এলাকায় কয়েকটি টেলিফোন বুথ দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে। টেলিভিশনেও অনেক টেলিফোন বুথ দেখেছি। বিশেষ করে লন্ডনের লাল রঙের টেলিফোন বুথ দেখলে আমার শার্লক হোমসের কথা মনে পড়ে।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের গল্প *The Sign of the Four* ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। সেই সময়ের লন্ডনের পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং টেলিফোনের ব্যবহার কল্পনা করলে পুরোনো দিনের প্রযুক্তির প্রতি আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হয়।
একসময় টেলিফোন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক
বাংলাদেশে একটা সময় টেলিফোনের ব্যবহার মূলত সরকারি অফিস, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সচ্ছল পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, আইজি-ডিআইজির অফিস, ক্যান্টনমেন্ট ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে টেলিফোন ব্যবহৃত হতো।
ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোন সংযোগ নেওয়া সহজ ছিল না। মধ্যবিত্ত পরিবারের কারও বাড়িতে টেলিফোন থাকলে সেটি অনেক সময় পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হতো। আবার কোনো পরিবারের আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে টেলিফোন সংযোগ নেওয়ার আগ্রহও দেখা যেত।
বিদেশে ফোন করার জন্য সাধারণত আন্তর্জাতিক কল সুবিধা বা ISD সক্রিয় থাকার প্রয়োজন হতো। সব টেলিফোন সংযোগে এই সুবিধা থাকত না।
ঢাকার বাইরে জেলা শহরের সরকারি অফিসগুলোতেও টেলিফোন ছিল। তবে প্রত্যন্ত গ্রামের অবকাঠামো তখন অনেক পিছিয়ে ছিল। অনেক জায়গায় পাকা রাস্তা পর্যন্ত ছিল না। সেখানে টেলিফোনের তার পৌঁছানো যে কতটা কঠিন ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
মোবাইল ফোনের আগমন ও টেলিফোনের জনপ্রিয়তা হ্রাস
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে মোবাইল ফোন ছিল মূলত ধনী ও সচ্ছল মানুষের হাতে। পরে প্রযুক্তির উন্নতি এবং দাম কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছেও মোবাইল ফোন পৌঁছে যায়।
একসময় পরিবারের একজনের হাতে মোবাইল থাকলেও ধীরে ধীরে পরিবারের প্রায় প্রত্যেক সদস্যের হাতে মোবাইল ফোন চলে আসে। মানুষ ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে কিংবা ভ্রমণের সময়—যেকোনো জায়গা থেকে যোগাযোগ করতে পারত।
ফলে তারযুক্ত টেলিফোনের ওপর নির্ভরতা কমতে থাকে। ব্যক্তিগত টেলিফোন সংযোগের চাহিদাও হ্রাস পায়। মোবাইল ফোনের সুবিধার কাছে প্রচলিত টেলিফোন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে।
আমার নানার সেই তারবিহীন টেলিফোন
২০০৯ সালের একটি স্মৃতি আমার বেশ মনে পড়ে। আমার নানা একটি টেলিফোনসদৃশ ডিভাইস কিনেছিলেন। দেখতে সাধারণ ল্যান্ডফোনের মতো হলেও এতে টেলিফোনের তার সংযোগ করতে হতো না। ডিভাইসটিতে অ্যান্টেনা ছিল এবং এটি টাওয়ার থেকে সিগন্যাল গ্রহণ করে কাজ করত।

পরবর্তীতে ChatGPT-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে জানতে পারি, ডিভাইসটি সম্ভবত Fixed Wireless Phone (FWP) বা Wireless Local Loop (WLL) প্রযুক্তির ফোন ছিল।
আমার নানা PeoplesTel নামের অপারেটর থেকে ফোনটি কিনেছিলেন। আমাদের মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায় এটি ব্যবহার করা যেত। অর্থাৎ, সাধারণ তারযুক্ত টেলিফোনের মতো সংযোগের জন্য বাড়ি পর্যন্ত তার টানার প্রয়োজন ছিল না। টাওয়ারের সিগন্যালের মাধ্যমেই ফোনটি ব্যবহার করা যেত।
আমার মনে আছে, ২০১২ সালের আগেই এ ধরনের ছোট অপারেটরগুলোর সেবা ও লাইসেন্স নিয়ে পরিবর্তন এসেছিল। বিটিআরসি এদের সবার লাইসেন্স বাতিল করে। এর পরে আর কিছু জানি না।
তবু আমার কাছে বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়। মোবাইল ফোন জনপ্রিয় হওয়ার সময়েই এমন একটি ডিভাইস আমাদের গ্রামের বাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা দেখতে ল্যান্ডফোনের মতো হলেও চলত তারবিহীন প্রযুক্তিতে।
আজ যদি মোবাইল ও টেলিফোন সমান জনপ্রিয় থাকত?
কখনো কখনো ভাবি, যদি আজও মোবাইল ফোন ও প্রচলিত টেলিফোনের সমান জনপ্রিয়তা এবং গ্রাহক থাকত, তাহলে টেলিফোনের রূপ কেমন হতো?
আমার ধারণা, টেলিফোনও হয়তো আজকের অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো স্মার্ট হয়ে উঠত।
হয়তো টেলিফোনে থাকত—
- অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম
- টাচস্ক্রিন ও ভিডিও কল
- প্রিপেইড ও পোস্টপেইড সেবা
- Wi-Fi ও Bluetooth সংযোগ
- ইন্টারনেট ব্রাউজিং ও অনলাইন সেবা
- রাউটার হিসেবে কাজ করার সুবিধা
এসএমএস দেওয়া।
BTRC-এর নিয়ন্ত্রণে টেলিফোন অপারেটরগুলো হয়তো প্রিপেইড প্যাকেজ, ডেটা প্যাকেজ এবং সাশ্রয়ী কল রেট চালু করত। বাসা বা অফিসের একটি টেলিফোন দিয়েই কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার এবং Wi-Fi বিতরণের সুবিধা পাওয়া যেত।
অবশ্য এগুলো আমার কল্পনা—বাস্তবে টেলিফোনের বাজার ও প্রযুক্তি কোন পথে বিকশিত হতো, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
Wi-Fi রাউটারও কি টেলিফোনের একটি জাত?
সম্প্রতি আমি ও আমার আব্বু গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। গ্রামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ থাকলেও তখনও Wi-Fi ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়নি। আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন ব্রডব্যান্ডের লাইন ব্যবহার করতাম।
এক রাতে আব্বুর সঙ্গে Wi-Fi নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন আমি তাঁকে বললাম, “Wi-Fi রাউটার হচ্ছে টেলিফোনের একটি জাত। কাজ করে অনেকটা টেলিফোন ও ফ্যাক্ম -এর মতো।”
আমার কথা শুনে আব্বু অবাক হয়ে গেলেন।
অবশ্য প্রযুক্তিগতভাবে Wi-Fi রাউটার টেলিফোনের কোনো জাত নয়। তবে আমার তুলনার পেছনে একটা যুক্তি আছে।
একটি FWP টাওয়ার থেকে রেডিও সিগন্যাল গ্রহণ করে টেলিফোন নেটওয়ার্কে কথা বলার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে, Wi-Fi রাউটার ব্রডব্যান্ড বা অন্য কোনো ইন্টারনেট সংযোগ গ্রহণ করে রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে আশপাশের ডিভাইসগুলোকে নেটওয়ার্কে যুক্ত করে।
দুটির কাজ এক নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই তারবিহীন যোগাযোগের জন্য রেডিও সিগন্যাল ব্যবহৃত হয়।
শেষ কথা
প্রযুক্তির ইতিহাস নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে। একসময় যে টেলিফোন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, সেই যোগাযোগব্যবস্থাই আজ নানা রূপে আমাদের জীবনে রয়ে গেছে। মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন, VoIP, Wi-Fi এবং আধুনিক টেলিযোগাযোগ—সবকিছুই যোগাযোগের জগৎকে বদলে দিয়েছে।
আমার নানার সেই PeoplesTel ফোনটি আজ আর আমাদের কাছে নেই। কিন্তু ডিভাইসটির স্মৃতি আমাকে পুরোনো দিনের টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে শেখায়।
**আপনাদের কি মনে আছে, বাংলাদেশে একসময় কেমন টেলিফোন ব্যবহার করা হতো? কারও কি PeoplesTel-এর সেই তারবিহীন টেলিফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আছে? থাকলে মন্তব্যে জানাবেন।**
#টেলিফোন #PeoplesTel #FWP #WLL #টেলিযোগাযোগ #প্রযুক্তিরইতিহাস #বাংলাদেশ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

