আপনি যে দেশে যাবেন, সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটা আপনার দায়িত্ব।
আমেরিকায় আপনি মদ কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনার বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ২১ হতে হবে। ইউরোপে হয়তো এই বয়সটা ১৮। বাংলাদেশে ১৮ এর নিচেও ছেলেমেয়েরা অনায়াসে মদ কিনতে পারে, কেউ লাইসেন্স চেক করার তোয়াক্কাও করেনা।
এখন আপনি যদি ২০ বছরের যুবক হয়ে আমেরিকান কোন বারে/লিকার স্টোর/গ্যাস স্টেশন বা গ্রোসারি শপ এমনকি রেস্টুরেন্টেও যদি মদ কিনতে চান, তাহলে বিক্রেতা অবশ্যই আপনার "ভ্যালিড আইডি" দেখতে চাইবে। যদি আপনি আইডি দেখাতে না পারেন, তাহলে আপনার কাছে সে এলকোহলযুক্ত ড্রিংক বিক্রি করবে না। আপনি যতই ইউরোপ/বাংলাদেশের দোহাই দেখান, সে রাজি হবেনা, কারন অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক কারোর কাছে এলকোহলিক বেভারেজ বিক্রির অভিযোগে পুলিশ ওকে ধরে জেলে ঢুকিয়ে দিবে। সে চাকরি হারাবে। সে যদি দোকানের মালিক হয়ে থাকে, তাহলে বিজনেস লাইসেন্স হারাবে। কাজেই ব্যাপারটা সিরিয়াস।
আর আপনি যদি আন্ডারএজ হয়ে ফেক আইডি দেখিয়ে মদ কিনেন, তাহলে আপনাকে পুলিশ ধরে জেলে ভরে দিবে।
আপনি কান্নাকাটি করতেই পারেন, ইউরোপে একই বয়সী তরুণ মদ কিনতে পারলে আমেরিকায় কেন না? বাংলাদেশে আরও ছোট অবস্থায় সে মদ কিনতো, তখনতো কেউ কিছু বলেনি, তাহলে আমেরিকা নিজেকে কি মনে করে? "টেরাম্পের পাস্সি চায়" আওয়াজ তুলতে পারেন - কিছুই যাবে আসবে না, কারন এইটা এই দেশের আইন।
আমেরিকায় বহু স্টেটে গাঁজা সেবন লিগ্যাল। আপনি যদি আমেরিকায় গাঁজা খান, সেসব স্টেটে আপনার কিছুই হবেনা। বাংলাদেশেও গাঞ্জা সেবন এখন ওয়ানটুর বিষয়। লালন আখড়ায়, বিভিন্ন মাজারে, ফকির মিসকিন থেকে শুরু করে ধনাঢ্য পরিবারেও এখন দেখা যায় গাঁজা সেবন কোন বিষয়ই না। কিন্তু মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে গাঁজা স্মাগলিং করতে গেলে আপনার ফাঁসি হয়ে যেতে পারে।
আপনি বলতেই পারেন সামান্য গাঁজার জন্য ওরা এত সিরিয়াস কেন?
এই সেদিন বাংলাদেশী এক মা মেয়েকে আমেরিকা ডিপোর্ট করেছে।
মেয়েটা লেখাপড়া করতে এসেছিল। মা এসেছিল ওকে দেখতে। এক সকালে মায়ের ইচ্ছা হলো চুরি করবে। মেয়েকে বললেন "চলো আজকে নর্ডস্ট্রমে চুরি করা যাক।"
মেয়ে বলেছে "গ্রেট আইডিয়া! চলো যাই!"
মাতা কন্যা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে দোকানে ঢুকে। নর্ডস্ট্রম হচ্ছে লাক্সারি ব্র্যান্ডের দোকান। মেসি'স ডিলারডসে যা পাওয়া যায়, ওখানে আরও দামি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। চুরিই যখন করবো, ফকির মিসকিনের থালায় কেন হাত দিব? ব্রলোকসের দোকানই লুটবো!
তা এইসব দোকানের দামি জিনিসে সিকিউরিটি ডিভাইস লাগানো থাকে।
মাতা কন্যা তাই নিজেদের ব্যাগে করে কেঁচি, ছুরি ইত্যাদি নিয়ে গেছে সেইসব ডিভাইস কাটার উদ্দেশ্যে।
তারপরে ধরা খেয়েছে।
পুলিশের কাছে অনেকক্ষন আজাইরা কথাবার্তা বলছিল। বলছিল ওরা এমনিতেই ব্যাগে ছুরি চাকু রাখে। যে ব্যাগটা ওরা মেরে দিয়েছিল, সেটাতে কোন ডিভাইস লাগানো ছিল না।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, "চাকরিতে আজই আমার প্রথম দিন না। এইসব বুলশিট আমাকে বলে লাভ নাই।"
তা পুলিশি জেরায় মাতাকন্যা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন।
বাংলাদেশের জন্য পরম সুনাম বয়ে আনার কারনে ওদেরকে দেশ থেকেই বের করে দেয়া হয়েছে।
লক্ষ্য করুন, যে মেয়ে আমেরিকায় পড়তে এসেছে, এবং মা মেয়েকে ভিজিট করতে এসেছে, সে নিশ্চই ফকির মিসকিনের বাড়িতে জন্মায়নি। টাকা পয়সার অভাব থাকার কথা না। চুরির জন্যও বেছে নিয়েছে নর্ডস্ট্রম মল। টার্গেট/ওয়ালমার্ট না।
এখন এই একই কাজ বাংলাদেশে ঘটালে নিজেদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে হয়তো পুলিশি হেফাজত থেকে সহজেই মুক্তি পেত। নেটওয়ার্ক না থাকলে ভিন্ন কথা। পাবলিকের হাতের মাইর খেতো নিশ্চিত।
সৌদি বা মিডল ইস্টের যেকোন দেশে এই কাজ করলে হাত খোয়াতো।
আপনি একজন বাংলাদেশী হিসেবে বলতে পারেন "সামান্য চুরির জন্য হাত কেটে ফেলা! দেশ থেকে বের করে দেয়া! এ কেমন কথা!"
আবারও বলি, যে দেশের যে আইন। আইনটা কতটা ন্যায্য, কতটা যৌক্তিক ইত্যাদি প্রসঙ্গ আমাদের বিষয় না। ওটা সেখানকার নাগরিকদের, আইনপ্রণেতাদের বিষয়।
এই পর্যন্ত ক্লিয়ার?
তাহলে এখন আসি সৌদি আরবে বাঙালি যুবক যুবতীর শিরোচ্ছেদের ঘটনায়।
আমরা প্রথমেই "বাঙালি" এবং "সৌদি" শুনে মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে যেহেতু সৌদি আরব জালিম, নিশ্চই ছেলেটি নির্দোষ এবং এখানে কোন ঘাপলা ঘটেছে। এই ধারণা আরও জ্বালানি পায় যখন বাংলাদেশ এম্বেসী জানায় যে ওদেরকে কিছুই জানানো হয়নি।
কথা এগুবার আগে ডিসক্লেইমার দিয়ে দেই। কারন বেশিরভাগ পাঠকই ধরে নিবে, সৌদি আরবের পক্ষ নিচ্ছি। ওদের পক্ষ নেয়ার কোন ভিত্তিই নাই। আমি সৌদিতে থাকিনা। ওদের খাইও না, পড়িও না। ওদের "ওয়াহাবিজম" আমার ধর্মমতের সাথে মিলে না। মক্কা-মদিনা ওদের দেশে পড়ার মানে ওদের সরকারের গোলামী করতে হবে। সৌদি রাজ পরিবার ইসলামের স্তম্ভ না। আপনি ওদেরকে গালাগালি করলেও খাঁটি মুসলিমই থাকবেন।
কাজেই "সৌদির দালাল" জাতীয় মূর্খামি ট্যাগিং দিয়া নিজের ভাগ্যে গালাগালি টানিয়া আনিবেন না।
সৌদি কর্তৃপক্ষ যে অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট দিয়েছে সেখানে ঘটনার ডিটেইল জানা যায়না।
ব্যস, এই আবেগ এবং অজ্ঞতার ফায়দা তুলতে একটা মিথ্যেবাদী হিটখোর একটা বানোয়াট গপ্প ফাঁদে। যেখানে সে ছেলে মেয়েকে বিবাহিত দম্পতি বানায়, হানিমুনের স্থলে মেয়েটির ইচ্ছায় উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়া দেখায়, মসজিদে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের সময়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে স্ত্রীর কপালে চুমু খাওয়া দেখায়, এক পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রকারী ভিলেন বানায় যে ভিডিও করে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে দিয়ে ছেলে/মেয়েকে ফাঁসায় এবং মাত্র চার মাসের মধ্যেই অতি গোপনীয়তায় ওদের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের ঘটনা দেখায়।
এতে আপনার সাবকনশাস মাইন্ড সহজেই ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত "ওমরাহ" পালনকেও ভিলেন বা নেগেটিভ অর্থে টেনে আনছে।
এনিওয়েজ, কাহিনীটা যে বোগাস সেটাতো গল্প পড়লেই বুঝা যায়। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের ব্রেনের ঐ আগে থেকেই ধরে নেয়া যে "সৌদি জালিম, বাঙালি দেশি ভাই নির্দোষ, এম্বেসী কিছুই জানেনা এবং এখানে কোন ঘাপলা আছে।" আমাদের অতি বিচক্ষণ মানুষদেরও আমি দেখেছি ভুয়া মিথ্যা কাহিনীটি প্রচার করতে।
এতে কার লাভ হলো? ঐ ভুয়া পোস্টকারীর।
না ছেলে/মেয়েটা জাস্টিস পেল, না বাংলাদেশ এম্বেসির দোষ নিয়ে কেউ কিছু বলল, না সৌদি আরব ওদের আইন পরিবর্তন করলো। এবং ভুয়া পোস্ট করায় আপনাদের ক্রেডিবিলিটি নিয়েও প্রশ্ন উঠলো। আপনারা যা শুনেন তা ভ্যারিফাই ছাড়াই পোস্ট করেন, এইটাইতো প্রমান হলো।
এনিওয়েজ, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ছেলেটা কতটা দোষী, কতটা নির্দোষী ইত্যাদি কিছুই প্রমান হয়নাই। আমি যতদূর জেনেছি, অথেন্টিক সোর্স থেকে, সেগুলো হচ্ছে,
১. ছেলেটি ২০২২-২৩ সালেই এরেস্ট হয়েছিল। মানে গত তিন সাড়ে তিন বছর ধরে আদালতে কেস চলেছে।
২. আদালতে নাকি দোভাষী হিসেবে সেখানকার স্থানীয় বাংলাদেশী ছাত্রদের ব্যবহার করা হয়েছিল।
৩. ছেলেটি বাবা মাকে ফোনে জানিয়েছিল সে এরেস্ট হয়েছিল। কেন হয়েছিল তা জানায়নি, এবং গত রবিবারেই বাবার সাথে শেষ কথা হয়েছিল।
বাবা মাও এম্বেসি/মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেনি। এইটা অতি স্বাভাবিক, ওদের শিক্ষা দীক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। কাজেই প্রসেসটা ওদের জানার কথাই না।
এখন আসি নাম্বার ওয়ান কালপ্রিট সৌদি আরবের বাংলাদেশ এম্বেসীতে।
ওখানে ওদের কাজটা কি একটু জানার চেষ্টা করেনতো।
বিশ্বজুড়েই বাংলাদেশ এম্বেসি তাঁর নাগরিকদের জন্য কতটা কি করে বলেনতো?
আমেরিকার কারাগারে কয়টা বাংলাদেশী বন্দি আছে জানেন? কয়জন বৈধ নাগরিক, কয়জন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের জন্য এম্বেসী কি করছে বলেনতো? কুইজ দিলাম। ইউরোপ-আমেরিকাতেই এম্বেসিগুলোর এই অবস্থা, সৌদি আরবেতো বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের সদস্য - ওদের জন্য এম্বেসী জীবন দিয়ে দিবে সেটা আশা করি কিভাবে?
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে সৌদির শ্রম মার্কেট। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আসে সেখান থেকে। মালিককে ক্ষেপাবে বাংলাদেশ এম্বেসী? লাহাওলা ওয়ালাকুওয়াতা ইল্লাহবিল্লাহ! রেমিটেন্স বন্ধ হয়ে গেলে?
সৌদি আরবে শ্রমিক মৃত্যু নতুন ঘটনা? নারী শ্রমিকদের প্রতি যৌন নির্যাতন নতুন ঘটনা? মন্ত্রণালয় বা দূতাবাস কি করেছে/করছে বলেনতো? আমি একটু জানতে চাই। ওদের নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা আছে?
আপনাকে বিষাক্ত গোখরা সাপের গর্তে কোন প্রস্তুতি ছাড়াই ঠেলে দেয়া হচ্ছে - সাপ কামড়ালে দোষ কার বেশি?
আরও একটা রিপোর্টে পড়েছিলাম বাংলাদেশ এম্বেসী নাকি ভিক্টিমদেরই উল্টো শোষণ করে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে এক নারী গেলেন কর্তৃপক্ষের কাছে। সেই নারীর কোন ব্যাকাপ নাই। দেখতে সুন্দরী। এই অবস্থায় এম্বেসির লোকটা যদি হয় লম্পট স্বভাবের, তাহলে কি হতে পারে বলে আপনার ধারণা? ঠিক এই কারণেও অনেকে যায়না বিচার নিয়ে।
সৌদিতে আমাদের কতজন প্রবাসী বাস করেন? সাড়ে তিন-চার মিলিয়নতো হবেনই। উনাদের অনেকেই ল এবাইডিং সিটিজেন। জানেন তাঁরা বিপদে পড়লে কোন বাবা মা আসবে না ওদের উদ্ধারে।
ওদের বর্বরতার খবর জেনেও কিন্তু প্রতিবছর লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি যাচ্ছেন। নারী শ্রমিকের সংখ্যা তিন লাখের বেশি। ওদেরকে কি সম্ভাব্য বিপদের ব্যাপারে অবহিত করা হয়? বিপদে যেন না পড়ে বা পড়লে কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে সেই ব্যবস্থা থাকে?
আমরা চোখ বন্ধ করে বলতেই পারি কেন যাচ্ছে? যাওয়ার কি দরকার? যাওয়ার দরকার কারন আমাদের রাষ্ট্র সেসব পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতেও ব্যর্থ। ওরা যে দেশে কিছু করে খাবে, সেই সুযোগটা আমরা দিতে ব্যর্থ। না ওদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছি, না কারিগরি শিক্ষায়। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে অমানুষিক পরিশ্রম করতে সৌদি ও আরব দেশগুলোতে ওদের যেতে হচ্ছে।
সবাই যুক্তি দিচ্ছেন আমেরিকা/ইউরোপের কোন নাগরিকের সাথে এমন করতে পারতো?
এই যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়মিত বিএসএফের জোয়ানরা পাখির মত বাংলাদেশিদের মারতো/মারে, কেন?
রিয়েলিটি মেনে নেন। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে গরিব হওয়াটা সবচেয়ে বড় অপরাধ। আপনার যদি টাকা পয়সা থাকে, তাহলে আপনি শিশু ধর্ষণ করেও আমেরিকার মতন দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন। কেউ আপনার কিছু করবে না।
যে যুবকটা মারা গেল, ওর বাবা জানালো ধারের সাত সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়ে ওরা বিপদে পড়েছে। ছেলেটাই ওদের একমাত্র কর্মক্ষম সদস্য ছিল। যদি যুবকটির প্রতি সত্যিই সহমর্মী হয়ে থাকেন, তাহলে ওর দেনা শোধের ব্যবস্থা নিন। ওর পরিবার যেন মোটামুটি একটা ভাল অবস্থায় উঠে আসতে পারে, খেয়ে পরে চলতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিন। ভুয়া বানোয়াট কাহিনী প্রচার করার চেয়ে সেটা বরং ফ্রুটফুল কিছু।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


