রাজনীতির মাঠে অতি-উৎসাহ কখনো কখনো যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে, দলবল নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে তাণ্ডব চালানো হলো—তা কোনো দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি বা প্রতিমন্ত্রীর আচরণের সাথে কোনোভাবেই মেলে না। ভিডিওতে যেভাবে সাধারণ মানুষকে লাথি মারা, ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলে হুমকি দেওয়া এবং খোদ প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র উঁচিয়ে ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে, তা কেবল আইনি ব্যত্যয়ই ঘটায়নি, বরং খোদ সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে চরম অস্বস্তির মুখে ফেলে দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন করে এমনভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়াটাই ছিল সময়ের স্বাভাবিক দাবি। এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে মিরপুরের ঘটনার দায়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মাথায় ইশরাকের এই বিদায় স্পষ্ট করে দেয় যে, দলীয় বা সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে হাইকমান্ড আর কোনো রাজনৈতিক ছাড় দিতে রাজি নয়।
তবে পদত্যাগের ঘোষণার পর ইশরাকের ফেসবুক পোস্টটি কিন্তু বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। সেখানে তিনি নিজেকে একজন 'বিএনপি কর্মী' হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন, 'সুশীল' সমাজকে তোপ দেগেছেন এবং দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির দোহাই দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানের অন্তরালে কি অন্য কোনো হিসেব-নিকাশ কষা হচ্ছে?
আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, এই পদত্যাগ ইশরাকের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি হতে পারে একটি নতুন কৌশলী চাল! সামনেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের লড়াই। সেখানে জামায়াত অলরেডি সাদিক কায়েমকে মাঠে নামিয়েছে এবং এনসিপি থেকে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর মতো তরুণ মুখগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত। ঢাকা দক্ষিণ কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবেই এক বিশাল ও জটিল রাজনৈতিক পরাশক্তি। এখানে সাদিক কায়েম বা নাসির পাটোয়ারীর মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে বিএনপিকে এমন একজনকে দাঁড় করাতে হবে, যার মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা যেমন আছে, তেমনই এক ধরনের 'রাফ অ্যান্ড টাফ' বা মারমুখী নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতাও রয়েছে।
ইশরাক হোসেনের পারিবারিক ঐতিহ্য, ঢাকা দক্ষিণে তাঁর নিজস্ব বলয় এবং রাজপথের অকুতোভয় ভাবমূর্তি—সব মিলিয়ে জাতীয়তাবাদী শিবিরের জন্য তিনি কিন্তু বেশ শক্ত এক বাজি হতে পারেন। মন্ত্রিসভার পদ হারিয়ে তিনি হয়তো সচিবালয়ের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হলেন, কিন্তু এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ ঢাকার রাজপথে যদি তাঁকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে নামিয়ে দেওয়া হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আইনি ঝক্কি আর বিতর্ক সামলে ইশরাক কি সত্যি নিজেকে ঢাকা দক্ষিণের নগর ভবনের দৌড়ে প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, নাকি ভুল রাজনীতির মাশুল গুনে মাঠের সাধারণ কর্মী হয়েই তাকে দিন কাটাতে হবে? উত্তরটা হয়তো সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে আছে, তবে ঢাকার রাজপথের এই নতুন খেলা যে জমজমাট হতে চলেছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


