somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মসজিদের ভেতরে "অনৈতিক কাজের" অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ কেউ দেখেনি, রায়ের কপিও কেউ দেখেনি।

এরপর বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকাটা আরও বিস্ময়কর। জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেল নিজেই স্বীকার করেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে কিছু জানায়নি। কনস্যুলেট জেনেছে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়ে। তারপর তারা একটি কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। যাঁদের জীবন বাঁচানোর কথা ছিল, তাঁরা মারা যাওয়ার পর ব্যাখ্যা চেয়ে কার কী লাভ হলো?

মাসের পর মাস কোথায় ছিলেন কর্মকর্তারা?
মৃত্যুদণ্ডের মামলার রায় এক রাতে হয় না। গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার, রায়, আপিল, তারপর অনুমোদন, এই পুরো পথ পাড়ি দিতে মাসের পর মাস লাগে। এত দীর্ঘ সময়ে একজন কর্মকর্তাও কি খোঁজ নেননি, বাংলাদেশের দুজন নাগরিক কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন?

ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে আটক ব্যক্তিকে তাঁর কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার জানাতে হয়। তিনি চাইলে কনস্যুলেটকে খবর দিতে হয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও নেই:

** এই দুজনকে সেই অধিকারের কথা বলা হয়েছিল কি না
** তাঁরা সহায়তা চেয়েছিলেন কি না
** বিচারের সময় কোনো আইনজীবী বা অনুবাদক তাঁদের পাশে ছিল কি না
** কনস্যুলেট আদৌ জানত কি না যে তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন

[sb]উইং আছে, ভাতা আছে, প্রটোকল আছে; খোঁজ নেই
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসে ডিপ্লোমেটিক উইং আছে, ডিফেন্স উইং আছে, লেবার ওয়েলফেয়ার উইং আছে, আরও কত কী। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে চলা দেশের কূটনীতিকরা এসব উইংয়ের নামে গাড়ি, ভাতা আর প্রটোকল ভোগ করেন। অথচ দুটো মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলেন, আর এই "সম্মানিত" কর্মকর্তারা টেরই পেলেন না।

হয়তো যুক্তি আসবে, কেউ নালিশ করেনি, তাই জানা যায়নি। কিন্তু নালিশ না এলে খোঁজ নেওয়া যাবে না, এই যুক্তিতে চললে ওই দপ্তরের দরকারটাই বা কী? প্রবাসে বাংলাদেশি নাগরিকের শাস্তি কার্যকরের খবর যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পায় মিডিয়া থেকে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের কাজটা কী?

[sb]শ্রীলঙ্কা পারল, আমরা পারলাম না
শ্রীলঙ্কার নাগরিক অনোজন শিবারসা সৌদিতে নবী অবমাননার অভিযোগে ধরা পড়েন, যে অভিযোগ ওই দেশে সবচেয়ে স্পর্শকাতর। ঘটনাক্রম ছিল এরকম:

** জুলাই: গ্রেপ্তার
** প্রথম রায়: পাঁচ বছরের কারাদণ্ড
** সেপ্টেম্বর: আপিল আদালতে সেটা বদলে মৃত্যুদণ্ড
** এর মধ্যে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়

অবস্থা বাংলাদেশের দুজনের চেয়ে কোনো অংশে সহজ ছিল না। তবু কলম্বো কূটনৈতিক যোগাযোগ চালাল, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আইনি দল পাঠাল, সৌদি আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিকার চাইল। ১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে দিল। শ্রীলঙ্কার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে দুই দেশের সরকার, কূটনীতিক ও আইনি দলকে ধন্যবাদ জানালেন।

এক দিন পরই বাংলাদেশের দুজনের গর্দান গেল। একটা দেশ নাগরিককে ফিরিয়ে আনার লড়াই করল, আরেকটা দেশ লাশের পরের নোট লিখল।

বাংলাদেশ আগে পেরেছে
বাংলাদেশের নিজের ইতিহাসেও এর উল্টো উদাহরণ আছে। ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশিকে সৌদি সরকারকে প্রায় এক কোটি টাকা "ব্লাডমানি" দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অর্থাৎ এই দেশের কূটনীতি একসময় পেরেছে। দরজা বন্ধ ছিল না। ক্ষমা চাওয়ার পথ, আপিলের সুযোগ, দণ্ড মওকুফের আবেদন, সবই খোলা ছিল।

তাহলে বিএনপির সময়ে এই সক্ষমতা কোথায় গেল? কূটনৈতিক সংস্কৃতিটাই কি নষ্ট হয়ে গেছে, নাকি এই বিভাগের কাউকে জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতেই হয় না?

[sb]বয়সের প্রশ্ন: শিশু অধিকার সনদ কী বলে?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি এখনো বাকি। এর মধ্যে প্রমাণ মিলেছে যে অভিযুক্ত তরুণের বয়স অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সময় আঠারোর নিচে ছিল। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আঠারোর কম বয়সে সংঘটিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ।

[sb]তাহলে প্রশ্ন ওঠে:
** সরকার কি এই বয়সের বিষয়টা জানত?
** জন্মসনদ, পাসপোর্ট, নথি, কিছুই কি যাচাই করা হয়েছিল?

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তা'জিরের আওতায়, যেখানে শাস্তির ধরন ও মাত্রা বিচারকের বিবেচনায় নির্ধারিত হয়, হুদুদ বা কিসাসের মতো নির্দিষ্ট নয়। বিচারকের এমন বিবেচনাধীন শাস্তির মামলায় আইনজীবীর ভূমিকা আরও বেশি জরুরি ছিল। সেই আইনজীবী কি ছিলেন? অনুবাদক কে ছিলেন?

শেষ কথা
এসব না জেনেই কি সরকার "ব্যাখ্যা চাওয়ার" নোট পাঠিয়ে দায় সারল? রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের দাম যদি এটুকুই হয়, তাহলে "সম্মানিত" কর্মকর্তাদের জবাব দিতে হবে। দুটো প্রাণ আর ফেরানো যাবে না, কিন্তু জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে, যাতে তৃতীয় কোনো নাগরিককে একই পরিণতি বরণ করতে না হয়।
.

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×