somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই নারী প্রতিমন্ত্রীকে একধরনের "নাইস" কোটায় প্রতিমন্ত্রী বানানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ড. ইউনূসের তৈরি করা নকশা অনুযায়ী চলছে। বাঙালি সাজপোশাকে "নাইস" নারী প্রতিমন্ত্রী, এই নকশার ছোট একটা অংশ। তবে এই নকশার কোনো নীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ বা জনগণ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। পুরোটাই বিদেশি প্রভুদের স্বার্থরক্ষার নকশা, যা দুই বছর ইউনূসের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার পর একই ম্যান্ডেট এখন বিএনপি বাস্তবায়ন করছে।

যে দুইজন বাংলাদেশিকে সৌদিতে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তাঁদের একজন নারী শ্রমিক। বলা হচ্ছে, তিনি ছিলেন গৃহকর্মী। কাগজে-কলমে কথাটা ঠিকই, কিন্তু আমি জানি, আদতে তিনি ছিলেন সৌদি আরবের একজন "দাসী"।

এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনো নারীরই ফাঁসি কার্যকর হয়নি। তবে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এ দেশে ফাঁসি না হলেও ফাঁসির নানা উপসর্গ তৈরি হয়েছে। আর সেই উপসর্গগুলো মূলত অর্থনৈতিক। তবে, আমাদের দেশের নারীকে বিনা অপরাধে একটি বর্বর দেশে গিয়ে শিরশ্ছেদের মুখোমুখি হতে হবে - এই ঘটনা জাতির প্রবল অধঃপতনেরই প্রমাণ।

ডেইলি স্টারের এ বছরের মার্চ মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী গৃহকর্মীর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশের মৃত্যুর কারণ হিসবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ আছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা হয়েছে সৌদি আরবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটেছে। এইসব নারী গৃহকর্মীর অনেকে নিয়োগকর্তার নির্যাতন থেকে বাঁচতে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ ফিরেছেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়। এঁদের মধ্যে যেসব নারী লাশ হয়ে ফিরেছেন, তাঁদের পরিবারের সন্দেহ, তাঁদের স্বজনদের মৃত্যুর পেছনে নির্যাতন বা অন্য কোন ঘটনা আছে।

শিরশ্ছেদ হওয়া সেই নারীর নাম কোথাও পড়লাম সুইটি আখতার, কোথাও সিঁথি আক্তার, কোথাও বা সিতি আখতার। তাঁর বয়স কত, সেই তথ্য কোথাও নেই। তবে ধারণা করি, যেহেতু তিনি গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, তাঁর বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সুইটি আখতারের পুরুষ সঙ্গী, যাঁকে একই সাথে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তাঁর নাম নজরুল ইসলাম। এই দুই নারী-পুরুষের কী অপরাধ, সেটা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পত্রিকা গালফ নিউজ - যেটা সম্পূর্ণ সরকারি মুখপাত্রের মতো একটা পত্রিকা এবং যেখানে কোনো প্রকার স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ নেই - জানিয়েছে, তাঁরা নাকি মক্কার একটি মসজিদে "অনৈতিক ও অশালীন" কাজে লিপ্ত ছিলেন।

যে প্রতিমন্ত্রী জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পান এবং সুইটি আখতার ও নজরুল ইসলামের মতো শ্রমিকদের পাঠানো ডলার দিয়ে বিদেশের হোটেলে গিয়ে থাকেন এবং শপিং করেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিকদের শিরশ্ছেদের মতো ভয়ংকর শাস্তির ব্যাপারে কোনো প্রকার দায়িত্ব তো নিলেনই না, বরং গালফ নিউজের অভিযোগটিকে বাড়িয়ে বললেন, তাঁরা নাকি মসজিদের ভেতরে "ব্যভিচারে" লিপ্ত ছিলেন!

আমাদের "নাইস" প্রতিমন্ত্রী ভেবেছেন, "তাঁরা ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলেন" - এটা বললে তাঁদের শাস্তিটাকে জনগণের কাছে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা যাবে।

প্রথমত, "ব্যভিচারের" অপরাধে তাঁদের শিরশ্ছেদ হয়নি। শরিয়া আইনে ব্যভিচারের অপরাধ প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর ঘটনাটি নিজের চোখে দেখার শর্ত রয়েছে। সন্দেহ থাকলে এই শাস্তি কার্যকর করা যায় না। তাঁদের শাস্তি হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ বা সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধে। অথচ রাষ্ট্রদ্রোহ বা সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মতো কোনো অপরাধ তাঁরা করেননি।

কোন আইনে এই দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদের মতো ভয়ানক শাস্তি হলো, প্রতিমন্ত্রী সেটা পরোয়া করলেন না। করলে হয়তো "রাষ্ট্রদ্রোহ বা সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির" অপরাধকে তিনি "ব্যভিচার" বানাতেন না।

আবার তিনি বোধহয় ভিয়েনা কনভেনশনের নিয়মকানুন সম্পর্কেও অবগত নন। সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ এবং এর আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে কোন অপরাধে বন্দি করা হলে, অপরাধীর দূতাবাসকে সেটা জানাতে হয়, যাতে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়।

কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, তাঁরা কেন মসজিদে দেখা করতে গেলেন। যেটা আমার মনে হয় তা হল, সুইটি আখতার সৌদি আরবে দাসীর জীবনযাপন করতেন এবং মনিবের অধীনে কাজ করতেন। মনিবের বাড়ি থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি তাঁর ছিল না। কেবল নামাজের কথা বলেই তিনি মসজিদে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর প্রেমিকের সাথে দেখা করার উপায় বের করেছিলেন।

মসজিদের ভেতরে তিনি কী করেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। তবে ধারণা করি, দুই বাংলাদেশি নারী-পুরুষের পক্ষে মসজিদের ভেতরে শারীরিকভাবে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যদি তাঁরা প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে দেখা করে থাকেন, যেটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তাহলে তা অনৈতিক নয়, রাষ্ট্রদ্রোহ বা সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি তো দূরের কথা।

এই সমস্ত বিষয় না জেনে দায়িত্বজ্ঞানহীন একজন প্রতিমন্ত্রী বলে দিলেন, "অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সৌদি আরবের একটি নিজস্ব আইনি কাঠামো আছে। সেই আইনি কাঠামো অনুযায়ী কেউ যদি গর্হিত অন্যায় কাজ করে, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সেই আইন অনুযায়ী সাজা হয়। ...এই মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।"

তাঁর বক্তব্য শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম, তিনি প্রতিমন্ত্রীর ভাষায় কথা না বলে সৌদি আরবের মুখপাত্রের মতো কথা বলছেন তার কারণটা বোধ হয় সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্স। সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, কোনো সরকারি বিবৃতিতে যদি এর শাসক ক্ষুব্ধ হন, তাহলে সেখান থেকে সব বাংলাদেশিকে বিতাড়িত করার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত তাঁদের পক্ষে নেওয়া অসম্ভব নয়।

কিন্তু মাস দেড়েক আগে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তখন মনে হল, বিষয়টি রেমিট্যান্সের স্বার্থ নয়, এর সাথে ভূরাজনীতির হিসাব জড়িয়ে আছে।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের করা মক্কা চুক্তিকে প্রগতিশীল ব্রিটিশ লেখক তারিক আলী "ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা জোটের" সাথে তুলনা করেছেন। আমার আশঙ্কা, ইউনূসের আমলে আমেরিকার সাথে করা সামরিক চুক্তিগুলো বাংলাদেশকেও এই প্রতিরক্ষা জোটের বলয়ের দেশে পরিণত করেছে।

একজন প্রতিমন্ত্রী যখন তাঁর দেশের নাগরিকদের শিরশ্ছেদের মতো বীভৎসতা ও বর্বরতার মধ্যে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন দেখতে না পেয়ে, বরং সৌদি আরবের শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে সেই শাস্তির বৈধতা তৈরি করে, তখন মনে হয়, এরা কি বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতিনিধি, নাকি ভূরাজনৈতিক সমীকরণে স্বার্থরক্ষাকারী ক্রীড়ানক মাত্র? এরা কি বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতিনিধি, নাকি পাপেট?
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১১
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×