somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজাদী বনাম স্বাধীনতা

০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
বাংলা ভাষায় তুষার সংক্রান্ত কয়টা শব্দ আছে? আমার সংগ্রহে থাকা বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী ১৬ টা। কিন্তু পৃথিবীর অনেক ভাষা আছে যেগুলোতে তুষার সংক্রান্ত শব্দের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি, আমরা যাকে শুধু 'তুষার' বলে চালিয়ে দেই সেই তুষারকেই তারা অনেকগুলো নামে ডাকে। এই মূহুর্তে পড়ছে এমন তুষার, জমে শক্ত হওয়া তুষার, হাঁটার জন্য নিরাপদ তুষার, বরফের উপর পড়া নতুন তুষার এইগুলোর আলাদা আলাদা নাম আছে।

এর মূল কারণ হচ্ছে বাস্তবতা। ভাষা বাস্তবতার প্রয়োজন থেকেই শব্দ তৈরি করে। যে সমাজে তুষার ডেইলি লাইফের অংশ না, যেখানে তুষার মানুষের জীবন মরণ নির্ধারণ করে না, সেখানে তুষারকে ঘিরে সূক্ষ্ম শ্রেণীবিভাগ করার প্রয়োজন দেখা দেয় না। আমরা নদী, বৃষ্টি, কাদা, খরা, বন্যা, এসব নিয়ে বাঁচি, তাই এই বিষয়গুলোতে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

কিন্তু বরফের রাজ্যে যাদের বসবাস, তাদের কাছে তুষার মানে চলাফেরা, শিকার, আশ্রয়, বিপদ ও বেঁচে থাকা। কোন তুষারের ওপর হাঁটা যাবে, কোনটার ওপর গেলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এই পার্থক্য জানা তাদের জন্য বাচা মরার প্রশ্ন। আর সেই বাস্তবতা থেকেই ভাষা সেখানে তুষারকে আর “একটা জিনিস” হিসেবে দেখে না, বরং বহু ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার সমষ্টি হিসেবে দেখে। তাই আলাদা নাম দেয়।

২।
বাস্তবতা যেমন শব্দের সৃষ্টি করে তেমনি শব্দও বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায় বা বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়, Language and the social construction of relality লিখে গুগলে সার্চ দিলে অসংখ্য আর্টিকেল পাবেন যেগুলো প্রমাণ এবং ব্যাখ্যা করছে কিভাবে ভাষা বাস্তবতা তৈরী করে। লেখা লম্বা হয়ে যাবে তাই আর এ নিয়ে বিস্তারিত লিখছি না।

৩।
ভাষা সংক্রান্ত যেকোনো লেখায় নোয়াম চমস্কিকে কোট না করলে লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। "It’s not that the media is lying; it’s that they are providing a framework for understanding that is so limited that you can't possibly come to a conclusion other than the one they want you to." মিডিয়া আমাদের রিয়ালিটির সেইপ দেয়, ভাষা আমাদের রিয়ালিটির সেইপ দেয়, তাই রিয়ালিটিকে যদি কেউ বদলাতে চায় তাহলে ভাষা বদলাতে হবে। রিয়ালিটি হচ্ছে 'স্বাধীনতা', কিন্তু 'স্বাধীনতার' বাস্তবতা পরিবর্তন করে 'পরাধীনতার' বাস্তবতা নির্মাণ করতে গিয়ে 'স্বাধীনতার' স্থলে 'পরাধীনতার' ব্যবহার বুদ্ধিমানের কাজ না। তো তারা কি করলো? তার সেই পরাধীনদের বা পরাধীনতার ইতিহাসে বহুল ব্যবহৃত একটা শব্দকেই 'স্বাধীনতার' স্থলাভিষিক্ত করলো, কি সেটা? 'আজাদী'।

৪।
শব্দগত অর্থের দিকে তাকালে "স্বাধীনতা” ও “আজাদী” দুটো শব্দই কাগজে কলমে ইংরেজি “freedom” এর সমার্থক মনে হলেও বাস্তব রাজনৈতিক ইতিহাসে এদের বহন করা অর্থ এক না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক লড়াই, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই পুরো আন্দোলনের ভাষা ছিলো স্পষ্টভাবে বাংলা, এবং এর রাজনৈতিক ভিত্তি ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেই ধারার প্রতিটি স্তরে “স্বাধীনতা” শব্দটি ছিল কেন্দ্রে। স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতার দাবি, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ইত্যাদি ইত্যাদি। “আজাদী” শব্দটি এই আন্দোলনের মূল শব্দভাণ্ডারের অংশ ছিল না।

এখানেই ভাষার রাজনীতি স্পষ্ট হয়ে উঠে। “আজাদী” শব্দটি উপমহাদেশে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হইছে পাকিস্তান আন্দোলনের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। উর্দুভাষিক রাজনৈতিক পরিসরে “আজাদী” ছিল একটি আবেগী স্লোগান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি নিরপেক্ষভাবে উপস্থিত হতে পারে না, এটি অবচেতনে হলেও একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ঝান্ডা বহন করে। পাকিস্তানি রাজনীতির ঝান্ডা।

ভাষার বদল মানে কেবল শব্দ বদল না, অনেক সময় তা হয়ে উঠে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলের চেষ্টা। যখন “মুক্তিযুদ্ধ”কে “আজাদীর লড়াই” বলা হয়, তখন সেটি নিছক শব্দচয়ন থাকে না, বরং মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ, ভাষাভিত্তিক ও বাঙালি পরিচয়কে সরিয়ে একটি ভিন্ন আদর্শিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হয়ে ওঠে।

আমাদের জন্ম “আজাদী” দিয়ে না, স্বাধীনতা দিয়েই। শব্দগত মিল থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুই শব্দ এক না। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “স্বাধীনতা” শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে অপরিহার্য। ভাষা এখানে নিরপেক্ষ না, এবং হওয়া সম্ভবও না। কারণ যেখানে ইতিহাস আছে, সেখানে ভাষা অবশ্যই রাজনীতির অংশ।

এটা শব্দের রাজনীতি, ভাষার রাজনীতি, ভাষার রাজনীতি না বুঝতে পারলে আবেগের বশে আজাদী, ইনকিলাব, আর ইনসাফ বলে গলা ফাটিয়ে অন্যের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আজাদী নয়, বলুন স্বাধীনতা। ইনকিলাব নয়, বলুন বিপ্লব। ইনসাফ নয়, বলুন সুবিচার।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×