
- আপা আপনাকে এমডি স্যার এই ফাইলটা দিতে বললেন।
সেঁজুতি একটু চমকে উঠে; খুব মন দিয়ে কাজ করছিলো। ও কিউবিকলের ওপাশ থেকে এগিয়ে দেয়া ফাইলটা হাত বাড়িয়ে নেয়।
- আপা আপনার কি মন ভালো নেই?
সেঁজুতি রিডিং গ্লাস খুলে অবাক হয়ে বললো “না তো...কেন বলতো?”
- নাহ...মানে ফাইলটা নেবার সময় হাসলেন না যে!!!
এবার সেঁজুতি হেসে ফেলে। “এইতো আপা...এখন মনে হচ্ছে অফিসে আর গুমোট ভাব নেই...” অন্যপাশের কিউবিকল থেকে রেহানা বলে উঠে “আজতো সেঁজুতির মন খুবই ভালো। লাঞ্চের সময় ব্রেকরুমে একটা যা মজার জোক্স বললো…আমিতো হাসতে হাসতে শেষ!!!”
- তাই নাকি? কি জোক্স? আপা বলেন না আরেকবার প্লিজ প্লিজ!!!
- আরে পুরানো কৌতুক…নিশ্চয়ই আগে শুনেছো…
- হোক পুরানো কিন্তু আপনার মতো মজা করে মনে হয় না কেউ বলেছে…আপনি যা সুন্দর করে আর মজা করে গল্প করেন!!!
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল ঝগড়া চলছে। এমনকি ঝগড়া গড়িয়েছে হাতাহাতি পর্যন্তও! এক পর্যায়ে খাটের নিচে আশ্রয় নিল স্বামী বেচারা। স্ত্রী খাটের নিচে উঁকি দিয়ে বলল, ‘বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো বলছি!’ উত্তরে মিনমিন করে বলল স্বামী, ‘আমি কি তোমাকে ভয় পাই ভেবেছ? তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আমি কিন্তু যা বলি তাই করি।’ স্ত্রী: কী বলতে চাও তুমি? কী করবে শুনি? স্বামী: খাটের নিচ থেকে বের হব না...
- হা হা হা!!! আগে শুনেছি কিন্তু আপনার মুখে শুনে বেশী মজা লাগলো।
সেঁজুতি হাসলো। আজ আসলে ওর মন খুবই খারাপ। যেদিন গুলোতে ওর মন খুব খারাপ থাকে সে দিনগুলোতেই ও সবচেয়ে বেশী হাসে। ওই যে জোক্সটা বললো সেটা নিজেকে ব্যঙ্গ করেই। বাস্তবতা এই রকম বহুল প্রচলিত কৌতুকগুলো থেকে কতো ভিন্ন তাই না? আসলেই হাস্যকর...সত্যিই কৌতুকময়!!! পৃথিবীর সবার ওর কথা ভালো লাগলেও মাহবুবের লাগে না। ও যাই বলে না কেন মাহবুবের রাগ উঠে যায়।
গতকাল অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার রেডি করে টেবিলে বসে আছে। কয়েকবার মাহবুবকে ডাকলো; রানা পর্যন্ত একবার বললো “আব্বু আমরা বসে আছি...খেতে আসো না!!!” মিনিট দশেক পরে সেঁজুতি রানাকে খেতে দিয়ে শোবার ঘরে গেল।
- “একি তুমি কি করছো? আমি আর রানা কখন থেকে খাবার জন্য ডাকছি।“
-“ফোনে কথা বলছিলাম।“
- “কার সাথে? সব ঠিক আছে?”
- “ইমরানের সাথে...হ্যা সব ঠিক আছে...এমনি গল্প করছিলাম...”
- “বাহ...এমনি গল্প হলে তো একটু পরেও করতে পারতে...আমি কখন থেকে না খেয়ে বসে আছি...”
“খানকি মাগি!!! তোর এত্তো বড় সাহস!!! আমি কখন কার সাথে কথা বলবো সেটা তোকে জিজ্ঞাসা করে বলতে হবে?” সেঁজুতি বোঝার আগেই মাহবুবের ডানহাত ওর গলা চেপে ধরেছে; এক ধাক্কায় ও বিছানার পাশের দেয়ালে। মাহবুবের আঙ্গুলগুলো সাঁড়াশীর মতো গলায় চেপে বসেছে; ও ব্যথা পাচ্ছিলো কিনা জানে না শুধু আতঙ্কে জমে গেছিলো। গলা টিপে ধরাইতো শেষ না হতে পারে; যদি অন্যদিনের মতো মারধোর করে।
মাহবুব অবশ্য আর কিছু বলেনি; ছেড়ে দিয়েছিলো। সেঁজুতি আর একটা শব্দও করেনি; স্ত্রস্ত পায়ে খাবার টেবিলে এসে বসলো। ও নিশ্চয়ই ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলো। দশ বছরের রানা বললো “মা তোমার কি হয়েছে? তুমি কি ভয় পেয়েছো?” “না বাবা আমি ঠিক আছি...তোমার খাওয়া হলো?” সেঁজুতি তাড়াতাড়ি ওড়নাটা গলায় জড়িয়ে নেয়; পরে বাথরুমে গিয়ে দেখতে হবে গলায় আঙ্গুলের দাগ বসেছে কিনা।
আজ অবশ্য ও ছাড়ানোর চেষ্টা করেনি; আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেই আঙ্গুলগুলো চেপে বসে আর গলায় দাগ বসে যায়। বেগুনী রঙের আড়াআড়ি সমান্তরাল দাগ; চারটা দাগ একপাশে, একটা একটু হালকা, কনে আঙ্গুল; অন্যদিকেটা গাঢ় বেগুনী বুড়ো আঙ্গুল। যে হলুদাভ বরফ রঙের জন্য একদিন মাহবুব ওকে পছন্দ করেছিলো সেই রঙের জন্যই এখন সেঁজুতি বড় বিপদে থাকে। একটু আঙ্গুলের চাপ খেলেই যে বরফে বেগুনী ছোঁয়া; মেকআপ দিয়ে ঢাকা বেশ কঠিন। দাগ মেলানোর সময়েও রঙের খেলা; বেগুনী থেকে কালচে নীল; হলদে নীল; শেষে হলদে রং ত্বকে মেলায়। এতো ফরসা না হলেতো এই রঙের খেলা কেউ দেখতে পেতো না; এই সময় গুলোতে শ্যামলা মেয়েদের ওর ভীষণ ঈর্ষা হয়।
সেঁজুতির চামড়ার রং বাদ দিলে দেখতে খুব আহামরি নয়। একটু বোঁচা নাক, কাজল আর লিপষ্টিক না দিলে চোখ বা ঠোঁট আলাদাভাবে চোখেই পড়ে না। তবে ও খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে; বহুবার শোনা অনেক পুরোনো গল্পও সেঁজুতি যখন হাত পা নেড়ে আগ্রহ করে বলে মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। সবসময় খুব হাসিখুশী; সাজগোজ ছাড়া ওকে খারাপ না দেখালেও হাসি ছাড়া সেঁজুতি বেমানান। হাসিটা যেন ঠিক হীরের হার; হাসলেই চারপাশ ঝলমলিয়ে ওঠে। সেঁজুতি জানে যে সৃষ্টিকর্তা ওকে এই একটাই খুব বড় অস্ত্র দিয়েছেন; দুঃখ লুকানোর অস্ত্র। করুণা যে ও নিতে পারবে না; থাক না চারপাশ হাসিতে ঝলমল; হাসির মায়াজালে কথার ইন্দ্রজালে ঢাকা পরুক বেগুনী রঙের কষ্টরা।
রাতে বিছানায় যেতে ভয় করছিলো। কোন কোন দিন এই ব্যপারগুলো কয়েকদিন গড়ায়। রানাকে ঘুম পাড়িয়ে রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে ও বেশ দেরী করেই শুতে গেলো; মাহবুব ঘুমিয়ে গেলেই ভালো। মাহবুব জেগে ছিলো “সরি!!! মেজাজ হঠাত খারাপ হয়ে গিয়েছিলো...”
- “না...ঠিক আছে...সরি বলতে হবে না...”
- “তুমি কেন যে এমন সব প্রশ্ন করো?”
- “আমি ঠিক বুঝতে পারিনি...আমি দুঃখিত...”
- “আসলে কথা না তোমার কথার টোনটা ভালো না...এভাবে কথা বললে রাগ উঠে যায়...কথার ভঙ্গী ঠিক করার চেষ্টা করবে...”
- “সরি...আমি কিছু না ভেবেই বলে ফেলেছি...এরপরে থেকে খেয়াল করে বলবো...”
মাহবুব ওকে জড়িয়ে ধরলো “লক্ষী মেয়ে...আমরা যে কেন এত্তো রাগারাগি করি?” মাহবুবের বুকের মাঝে ভয়ে কাঠ হয়ে যেতে যেতে সেঁজুতি কোনভাবে বললো “হুউউউ...”
আজ সারাদিন ওর মাথার মধ্যে কাটা রেকর্ড বেজেছে “খানকী মাগি!!” “খানকী মাগি!!” অফিসে যখনই কেউ ওর নাম ধরে ডেকেছে ওর মনে হয়েছে ওরা বলছে “খানকী মাগি!!” যখনই কেউ হেসেছে মনে হয়েছে ওরা সেঁজুতির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে “খানকী মাগি!!”
বিয়ের পরে অনেক ঝামেলা করে সেঁজুতি এম বি এ করেছে; চাকরীতেও খুব ভালো করছে। আর দু’একটা প্রমোশন হলেই ও একটা আলাদা বাসা নিতে পারবে। রানার স্কুলের খরচ চালানো একটু কঠিন হবে। কিন্তু তালাকের পরে মাহবুব নিশ্চয়ই রানার কিছুটা খরচ দেবে।
অনেক রাতে একা একা জেগে নিজের একটা জীবন ভাবতে সেঁজুতির বড্ড ভালো লাগে; সে সময়ে ও একা একা নিঃশব্দে হাসে। সেই হাসি ফরমায়েশী হাসি না; আনন্দের হাসি; মুক্ত মানুষের হাসি। অন্ধকার আলো করা সেই হাসি পৃথিবী এখনও দেখেনি।
©️ শিখা রহমান
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



