somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

থ্যালথ্যালি ও ময়নার গল্প

০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে রাতে আমাদের বাড়িতে থ্যালথ্যালি হানা দিল, সেই রাতে মাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম।
আব্বার কণ্ঠ শুনে ঘুম ভাঙলো।
"এই আব্দুল! কী হইচে রে?"
চোখ মেলে দেখি অন্ধকার। আব্বার হাতে টর্চলাইট। তিন ব্যাটারির স্টিলের টর্চলাইট। সেটা জ্বালানোর চেষ্টা করছে। হালকা আলো মশারিতে পড়ছে। আমি চেচামেচি শুনতে পেলাম। পশ্চিমপাশে আব্দুল চাচার ঘর। সেখানে মনে হয় অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। নারী পুরুষ, ছোট বড় অনেকের কণ্ঠ। কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।
আব্দুল চাচা বাইরে থেকে জোরস্বরে বলল, "বাইরে আইসো বাই।"
আমি ফিসফিসিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মা, কী অইছে? এতো মানুষ ক্যা?"
মা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো।
"কিচু না। গুমাও।"
আমি মাকে জড়িয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।
আব্বা টর্চলাইট জ্বালিয়ে বাইরে গেল। দরজা খোলার শব্দ শুনলাম।
কয়েকজন আমাদের ঘরের কাছাকাছি এসেছে৷ আব্বার সাথে কথা বলতে। আমি কিছুটা ভয় নিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছু শুনতে চাচ্ছি না। আব্বার কন্ঠ তবু শুনছি৷ ভরাট কণ্ঠ। জোর গলায় কথা বলে আব্বা। "কেডো? কাহে ধরচে? "
একটি নারী কণ্ঠ, আমি যেন চিনি, বলল, "আঙ্গের ময়না। খুব বয় খাইচে ছেড়ি।"
"স্বপ্ন দেখছে। নও দেহি।" আব্বার কণ্ঠ এগিয়ে চলে গেল। আর শুনতে পেলাম না। অন্ধকার। মশারিও দেখা যায় না। আর প্রচন্ড গরম। মা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে যাচ্ছে। সেই ঘুমের সময় গল্প বলতে বলতে হাতপাখা ঘুরাচ্ছিল। সেই হাত চলছেই। মাও যেন গভীর ঘুমে। বাইরে চিৎকার চেচামেচি মাকে টানছে না। কিংবা হয়তো আমাকে রেখে যাচ্ছে না। সারাদিন মা অনেক পরিশ্রম করে। অনেক ধানের কাজ।
আমি ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো।
সুফিয়া এসে বললো, "বাইয়া, ওটো৷ রাইতে কী অইছে জানো?"
আমি চোখ ডলতে ডলতে বললাম, "কী অইছে?"
"রাইতে থ্যালথ্যালি আইচিলো!" ভয়মাখানো স্বরে ও বললো। ছোট্ট একটা মানুষ। আচরণ অনেকটা বড়দের মতো। সবাই ওকে বুড়ি বলে ডাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, "কী! থ্যালথ্যালি?"
তারপর মনে পড়লো রাতের কথা। মাঝরাতে অনেক মানুষের চেচামেচি, আব্বার বাইরে যাওয়া, আমার মাকে জড়িয়ে ঘুমানোর কথা।। রাতে তাহলে থ্যালথ্যালি এসেছিল? এইজন্যে সবাই ভয়ে একসাথে জড়ো হয়েছিল? কাকে ধরেছিল? কী ঘটেছিল? জন্মের কৌতুহল তৈরি হলো।
বুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, "কাহে দরচিলোরে?"
বুড়ি চোখে মুখে রহস্য আনে৷ কিন্তু সেও রহস্য ধরে রাখতে পারে না বেশিক্ষণ।
"ময়নাহে! বাইয়া, অর কাচে যাইয়ো না!"
আমার আবছা মনে পড়ল। রাতে ময়নার কথা বলছিল কেউ একজন।
থ্যালথ্যালি ময়নাকে ধরেছিল? বিশ্বাস হতে চাইছে না। তীব্র কৌতুহল কাজ করছে। মনে হচ্ছে, এখনি দৌড়ে ময়নার কাছে যাই। জিজ্ঞেস করি, কিভাবে ধরেছিল ওকে।

কাঠের জানলা দিয়ে সকালের কড়া রোদ ঢুকেছে ঘরে। এসে পড়েছে বিছানায়৷ তাই বেশিক্ষণ আর বিছানায় থাকা হল না। আলসেমি ঝেড়ে নেমে এলাম।
ঘর থেকে বের হয়ে দেখি, উঠানে কাচা আম পড়ে আছে অনেক। আটি হয় নি। আমগুলো ঝরে পড়ছে। রাতে মনে হয় প্রবল বাতাস হয়েছে।

উঠানের দক্ষিনের ঘরটা আম্মার। দাদিকে আমরা আম্মা বলে ডাকি। টিনের চাল৷ বাশের চাটাইয়ের বেড়া৷ তার পিছনে বড় আমগাছ। গতকাল সন্ধ্যায়ও ময়না আর আমি ঐ ঘরটার পিছনে কাচা আম কুড়িয়েছি। ময়নার পরনে একটা সুতি ফ্রক ছিল। সেই ফ্রক গুটিয়ে অনেকগুলো কাচা আম ধরেছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এতো গোনা দিয়া কী অইবো?"
ও বলেছিল, "নারায়ন ভূতেহে দিমু!"
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, "আম্মার ভূতের হাতে তোমারও কতা অয়?"
ময়না রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বললো, "কতা অয় নাই। কিন্তুক দেকচি।"
"কিবা কইরা?"
"মা যহুন নমাযে বইচিলো, তহুন আইচিলো। আজক্যা বিকালবেলা!" ফিসফিস করে বলল।
"বয় নাগে নাই?"
"আরে না! মায়ের পালা ভূত। বয় কিসের?"

ময়নার মা, আমাদের আম্মা। তার আছে এগারটি ভূত। আমরা সবাই জানি। এর মধ্যে হিন্দু ভূতও আছে। গত কালিপূজায় ভূতের গুড়া এনেছিল। খুব ঝাল। আসলে চালভাজার গুড়া। কিভাবে আম্মাকে দিয়ে গিয়েছিল, সেও এক রহস্য। কিন্তু আমরা ছোট বড় সবাই জানি। কেবল আম্মা নিজে স্বীকার করে না। তাহলে ভূতের গুড়া কিভাবে আসলো? সে জবাব আম্মা দেয় না। গম্ভীর হয়ে থাকে সবসময়। আমরা ছোটরা ভয়ে ভয়ে থাকি। কেবল ভয় পায় না ময়না।
অথচ, গত রাতে ওকেই এসে থ্যালথ্যালি ধরেছিল। কী অদ্ভূত। এতো সাহসী একটি মেয়ে।

একদিন আমরা বাড়ির বাহিরের উঠানে খেলছিলাম। কাঠাল গাছতলায়। তখন সন্ধ্যা হবে৷ আমি, সুফিয়া আর ময়না। হঠাৎ দেখি, আমাদের টিনের ঘরের বাইরের জানলার নিচে একটি আগুনের দলার মতো কিছু একটা। লাফাচ্ছে। আমরা এইতো চার পাচ হাত দূরে। আর কেউ নেই। মাগরিবের আজান হয়ে গেছে।
দেখি একটি ছোট মার্বেলের সমান আগুনের দলা। লাফাচ্ছে আর একটু করে বড় হচ্ছে। ঠিক গোলাপের কলির মতো। যেন ধীরে ধীরে পাপড়িগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে ভাবলাম, আমিই বোধহয় দেখেছি।
ময়নাকে জিজ্ঞেস করলাম, "ওইডো কী?"
ময়না একবার ওদিকে তাকিয়ে, আমার দিকে ফিরলো। "সফি, তুই বুড়িক নিয়া বাইত্তে যা। তাত্তাড়ি!"
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "ক্যা? কও আগে, ওডো কী?"
ততক্ষনে সুফিয়াও দেখেছে। আমার কাছে এসে হাত ধরে টেনে ধরলো। "বাইয়া বাইত্তে নও। আমার বয় নাগতিচে!"
আমি সুফিয়াকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢোকার জন্য রওনা দিলাম। এর মধ্যে দেখি, ময়না, আলোটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমি যেতে যেতে বললাম, "ময়না! যাইস না। বাইত্তে আয়।"
দৌড়ে আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। দেখি, বারান্দায় মা। ভাতের থালা নিয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছে। মাকে আমরা সব বললাম।
মা সাথে সাথে বাড়ির বাইরে এলো। আমিও পিছনে পিছনে। সুফিয়া এলো না।
এসে দেখি, ছোট্ট মেয়ে ময়নার হাতে একটা আগুনের দলা। যেন লাল গোলাপ ফুল। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আলো ছড়িয়ে পড়েছে ওর মুখে।
মা ডাকলো, "ময়না!"
ময়না ফিরে তাকালো। ততক্ষনে আগুনের দলা নাই হয়ে গেছে। কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।
ময়না মাকে বললো, "ভাবী! কেইহো কইও না কিন্তুক!"
মা গিয়ে ময়নাকে টেনে বাড়িতে আনলো।
এই ঘটনা সবার মুখে মুখে রটে আরো বড় আকার ধারণ করলো। ময়নাকে ভূতে ধরেছে। আম্মার কোন একটা ভূতই ওকে ধরেছে। ময়নার আচরণেও অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। ও কেমন গম্ভীর আর বড়দের মতো ব্যবহার করা শুরু করলো। কেবল আমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করে।

আমি আম্মার টিনের ঘরটির দিকে তাকালাম। আমাদের দাদি। দাদিকে আম্মা ডাকি। কেন জানি না। ওই ঘরটির পিছনে বড় আমগাছ। টিনের চালের উপর এসে ডাল পড়েছে।
আম্মার ঘরের আসল কৌতুহল হল ময়না। এই ঘরে ময়না থাকে। আম্মার সাথে। কাল রাতে এই ঘরেই থ্যালথ্যালি এসেছিল। নিশ্চয়ই ময়না এখনও ঘুমাচ্ছে।
দৌড়ে ঘরের দরজার কাছে গেলাম। কাঠের দরজার দুই কপাট। অনেক পুরনো। ঘুনে ধরা। দরজা লাগানো। ঠেলে খোলার সাহস পেলাম না। ফাক দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। তখনই আম্মা দরজা খুললো।
একটা পুরনো শাড়ি পরা, মুখে পান৷ আম্মাকে কখনো পান ছাড়া দেখি নি। এইজন্য কথা বলে চিবিয়ে চিবিয়ে।
আমাকে দেখে বলল, "বেহানবেলাই আসা নাগবো? যাও। পরে আইসুনি। ময়না গোমায়।"
আমি আম্মাকে ভয় পাই না। অন্য বাচ্চারা ভয় পায়। আম্মার নিয়ন্ত্রনে আছে এগারটি ভুত। এর মধ্যে কয়েকজন হিন্দু। গত কালিপূজায় আমরা ভূতের গুড়া খেয়েছি। খুব ঝাল। চালের গুড়া মূলত। আম্মার একটি হিন্দু ভূত দিয়ে গেছে।
ভয় পাবার আর একটি কারণ, আম্মার শরীর থেকে কেরোসিন তেলের গন্ধ আসে। অনেকের ধারনা আম্মা কেরোসিন তেল খায়। আমার অবশ্য ধারনা না, আমি জানি৷ আমাকে দিয়ে তেল কিনে আনে মাঝেমধ্যে। একদিন আমার সামনেই ঢক ঢক করে তেল খেয়ে ফেলেছিল।
আম্মা আমাকে খুব পছন্দও করে। তার বড় ছেলের একমাত্র ছেলে সন্তান আমি।
আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আম্মা। থ্যালথ্যালি সত্যিই আইচিলো?"
"না রে গ্যাদা। মিছা কতা। ময়না স্বপ্নে ভয় পাইছে। যাওচেন এহুন। পরে হুইনো নি।"

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×