somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শমীন্দ্র ঘোষ
পেশায় সাংবাদিক, লেখক, স্থির চিত্রগ্রাহক। কবি, গবেষক, গ্রন্থকার, আবৃত্তিকার, যুক্তিবাদী মানবতাবাদী আন্দোলন কর্মী। সাধারণ সম্পাদক, ভারতীয় বঙ্গসমাজ। ধর্মহীন সাম্যের সমাজের স্বপ্ন দেখি ও দেখাই।

বাঙালি স্বপূর্বপুরুষের খুনি-দুর্গাপূজক

১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ ভোর ৪:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুর্গাপূজা বাঙালির প্রধান উত্‍সব ও সামাজিক উত্‍সব -- প্রচারটা চলছে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও বহু শিক্ষিত বাঙালির দ্বারা। রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে এবং পৃষ্ঠপোষক কর্পোরেট ফাণ্ডিং-এর কল্যাণে এখন এটা হুজুকে মাত্রাছাড়া!
আবেগপ্রবণরা, ধান্দাবাজরা হুজুকে মাতুক। আমরা বরং সত্যটা জেনে নেই,
আসুন--
বাঙালির প্রায় অর্ধাংশ অ-হিন্দু। পশ্চিমবঙ্গেও সব বাঙালি হিন্দু নয়। তাই দুর্গাপূজাও সব বাঙালির নয়। বরং হিন্দুদের বা হিন্দুবাঙালির পূজা। তাই নয় কি?
দুর্গাপূজাটাকে সামাজিক বলে প্রচার চালাচ্ছে উগ্রহিন্দুবাদী ও রাজনৈতিক দলও। এখন অনেক মুসলমানও বাধ্য হয়ে এই পূজাতে অংশ নেয়। যেন 'টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলতলায় বাস'! তবু তারা এভাবেই ইসলামবিরোধী।
বঙ্গসমাজে আছে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, উপজাতিধর্ম সরণা, ইহুদি, পার্শী প্রভৃতি ধর্মের মানুষ। এদের সিংহভাগই বাংলাভাষী এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিই। এরাও অংশ নিতে বাধ্য হয়। বাংলার জনসমাজ শুধু হিন্দুদের দ্বারা গঠিত নয়। তাই, এই পূজা সার্বিক সামাজিকও নয়। তাই নয় কি?
এরপরও বাঙালি নাস্তিক-ধর্মহীন-যুক্তিবাদী-মানবতাবাদীরা আছে বঙ্গভূমে। তাই, দুর্গাপূজা বাঙালির এবং সামাজিক পূজা ও উত্‍সব কিছুতেই হতে পারে না। বরং তা শুধুমাত্র হিন্দুদের পূজা।

ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে হয় অনেক সময়। এখন শিবানীর গীত গাইতে হবে দুর্গা ভানতে। তাই, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস গবেষণায় প্রাপ্ত নতুন তথ্য জানাচ্ছি।
প্রগ্বৈদিক ধর্ম দেবীপ্রধান। নারীকে সৃজনীশক্তির আধার ভেবে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসে পূজা শুরু।
বৈদিকধর্মে নারী পূজিতা নয়। এরা পুরুষ দেবতার সঙ্গীনী। ঋগ্বেদে দুর্গা নেই। দুর্গা পৌরাণিক। বৈদিক ও প্রাগ্বৈদিক ধর্মসংশ্লেষে হিন্দুধর্মের উত্‍পত্তির চরম পর্যায়ে দুর্গার আমদানি করে বৈদিকরা। সংশ্লেষের শুরু প্রাগ্বৈদিক বিষ্ণুকে ঋগ্বেদে অন্তর্ভূক্ত করে বৈদিক ছাপ দিয়ে। নামটা বৃষ্ণি থেকে বিষ্ণু। এরপর শিবকে বৈদিক রুদ্রর সঙ্গে সমীকরণ করে। রুদ্রও ঋগ্বেদে নবীন, শেষের দিকের।
চরম পর্যায়ে প্রাগ্বৈদিক দেবীদের বৈদিকরা স্বীকৃতি দিতে থাকে নাম রূপ কর্ম ইত্যাদি নিজেদের ছক মতো পরিবর্তন সমীকরণ করে করে। ততদিনে ঋগ্বেদের ইন্দ্র, মিত্র, অগ্নি, বরুণ, বায়ু, পর্জন্য প্রভৃতি পুরুষ দেবতারা পিছু হটেছে। এই অভাব পূরণে এল প্রাগ্বৈদিক দেবীরা। কারণ, জয় করতে হবে অজেয় অগম্যভূমি নারীপূজক পূর্বভারতকে। দ্বারবঙ্গ থেকে কিরাতভূমি হলো বঙ্গভূমি। চলছে বৈদিক তথা হিন্দুভক্ত গুপ্তযুগের শাসন। তখন এঅঞ্চলে সমাজের সঙ্গে ধর্ম সম্পৃক্ত, জ্যোতিষে আক্রান্ত। ব্যক্তি সমাজবদ্ধ, ধর্মভীরু। আর্থসমাজ দুর্বল হচ্ছে। গোদের উপর বিষফোঁড়া প্রবল নাস্তিক্যবাদ। তখনই দুর্গা ও তার সঙ্গে সমীকরণ করে বহুদেবী এল পুরাণে; বাসন্তী, চণ্ডী, পার্বতী, গৌরী, মহালক্ষ্মী, কালী, বিন্ধ্যবাসিনী, পার্বতী ইত্যাদি। আরও পরে মনসা, শীতলা, পর্ণশবরী, চণ্ডিকা, বাশুলী ইত্যাদি এলো মঙ্গলকাব্য যুগে। এই চণ্ডীর সঙ্গে দুর্গাকে সমীকরণ করা হয়েছিল পুরাণে।
মঙ্গলকাব্য যুগ একদিকে বৈদিক ও প্রাগ্বৈদিক সংশ্লেষের শেষ পর্যায়; যেখানে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। এবং হিন্দু-মুসলিম সংশ্লেষ শুরুর পর্যায়; যা যুক্তসাধনা। এখানে এল ওলাবিবি, বনবিবি, কালুপীর, ধর্মগাজন, সত্যপীর ইত্যাদি। এই সত্যপীর শেষে হলো সত্যনারায়ণ। এভাবে ধর্মীয় সংশ্লেষের চরম পর্যায়টি হয় বঙ্গভূমেই।
তখনও বঙ্গভূমি প্রাগ্বৈদিক ধর্ম ও নাস্তিক্যে সম্বৃদ্ধ। মূলস্রোত নাস্তিক্যবাদ। বঙ্গের সাংস্কৃতিক মান ও ভাষাজ্ঞান দক্ষিণ এশিয়ায় সুউন্নত ও সম্বৃদ্ধ। হিন্দুকুশ পেরনোর পরে দীর্ঘ প্রায় ১৫০০বছরে বৈদিকরা এই বঙ্গে দাঁত ফোঁটাতে পারেনি। বরং বঙ্গসংস্কৃতিকে একশ্রেণির বৈদিক শ্রদ্ধা করত। তারা তীর্থদর্শনে আসত ও ফিরে গিয়ে পুনোষ্টোম যজ্ঞ করে শুদ্ধ হতো। বাকি বৈদিকরা বঙ্গের শক্তিকে সমীহ করত ও ঘৃণাও করত। বৈদিক সাহিত্যে এর উদাহরণ প্রচুর।
বৈদিক-হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলোতে পরস্পর বিরোধিতা চরম।

অভিধানমতে, দুর্(দুঃখ) গম্(গমন করা, জানা)+অ(কর্মবাচ্যে/কারকে)= দুর্গ+আ= দুর্গা(স্ত্রীলিঙ্গ)। যাঁকে দুঃখে জানা যায়। যিনি দুর্গ অর্থাত্‍ সঙ্কট থেকে ত্রাণ করেন।
তন্ত্রে দ্=দৈত্যনাশ-সূচক, উ=বিঘ্ননাশ-সূচক, র্=রোগনাশ-সূচক,গ্=পাপঘ্নবাচক, আ=ভয়বাচক ও শত্রুনাশ-বাচক।
পুরাণমতে দুর্গ নামক অসুর বিনাশকারী হলেন দুর্গা। মহাশক্তি মহামায়া দুর্গা।

নৃতাত্ত্বিক আলপীয়রাই অসুরজাতি। এরাই বাঙালির অন্যতম পূর্বপুরুষ। অসুর ছাড়াও বঙ্গভূমে এসে এরা শিব-শিবাণী, ষাঁড়-মহিষ পূজাও করত। যদিও দেব-দেবতা অসুর প্রভৃতি ঐশ্বরীক সবই কল্পনা। ঋগ্বেদে এদের অসুর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ভাষাও মাগধি-প্রাকৃত-অস্ট্রিকের সঙ্গে সংশ্লেষিত হয়ে বর্তমান বাংলায় আছে। বাঙালির ভাষাকে সেইসময়ে "অসুরজাতির ভাষা" হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বৈদিকরা। বাঙালির বাহন ষাঁড়, মহিষ, বলদ প্রধান। ষাঁড়-মহিষ নিয়ে উপজাতিদের মধ্যে এখনও বহুল প্রচলিত বাঁধনা পরব। বাঙালির আদি দেবতা শিবের বাহন ষাঁড়। অসুরজাতির প্রতীক হিসেবে মহিষাসুরকে, অর্থাত্‍ 'মহিষ পালক অসুরজাতি'কে বধের গল্প দিয়ে বৈদিক বেশ্যা "আনা"কে দুর্গা নামে বাঙালির মধ্যে প্রচার করা হয়। উদ্দেশ্য বৈদিক তথা হিন্দুত্বে বশ্যতা স্বীকার করানো। প্রাগ্বৈদিক-বৈদিক ধর্ম ও সামাজিক আচার সংশ্লেষের চূড়ান্ত পর্যায়। এরপর হিন্দুব্রাহ্মণরা প্রচার শুরু করে। প্রাথমিক সময়ে অসুর হিসেবে উপজাতিদের চিহ্নিত করে ও দুর্গাকে দুর্গতিনাশক হিসেবে বোঝানো হয় বাকি বাঙালিকে। পরে রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় রমরম করে চলতে থাকে বঙ্গে। দুর্গাদালানেই এপূজা হতো। বাঙালি মুখস্থ করে নেয়, দুর্গতিনাশক মাতৃত্বের প্রতীক দেবী দুর্গা ও অসুর হলো অনুন্নত, কদর্য, ঘৃণ্য জীব; যেমনটা ভাবত বৈদিকরা।
কথিত আছে মৈমনসিংহের জনৈক স্থানীয় জমিদার কংসনারায়ণ রায়চৌধুরী এই পূজার প্রচলন করেন। কিন্তু এটা সঠিক নয়।
এই পূজা বঙ্গে দশ-এগারো শতকে হত, এর প্রাচীন প্রমাণ আছে। চৌদ্দশতকে আন্দুলে ও পনেরো শতকে রংপুরে দুর্গাপূজা হয়। কলকাতায় শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭-তে এপূজার প্রবর্তক। বারোয়ারির শুরু হুগলীর গুপ্তিপাড়ায় ১৭৬১ বা ১৭৯০-তে।
শমীন্দ্রঘোষ
১৫/১০/১৫

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ ভোর ৪:৩১
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি রাজনৈতিক বাস্তববাদী?

লিখেছেন Sujon Mahmud, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৮

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তিনি কি সত্যিই ইসলামপন্থী ছিলেন, নাকি ইসলামকে মূলত রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×