somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আশায় গুড়েবালি

০৯ ই আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গ্রামের কিশোর সিয়াম। বয়স পনের। সিয়ামদের বাড়ির চারপাশে আমের বাগান। কয়েক বিঘা জমির বাগান পরেই বিস্তৃত ফসলের মাঠ। তাছাড়া বাড়ির পেছনটাতে ছোট্ট একটা বাঁশ ঝাড়ও আছে। সারাদিন বাঁশ ঝাড়ে আর আমের বাগানে নানা কিসিমের পাখিরা কিচিরমিচির করে। তবে সকালে আর সন্ধ্যায় পাখিদের ডাকাডাকি বেশি শোনা যায়।

বৈশাখের কোনো এক দুপুরে সিয়ামদের বাড়ির পালানে আম বাগানের প্রথম গাছ তলায় মেঠো পথের ধারে বসে গল্পের বই পড়ছে। চেয়ারে যেখানে সিয়াম বসে আছে সেখানে সর্বদা বাতাস লাগে। সিয়ামের সামনে ছোট্ট এক কানি জমি। সিয়ামদের পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য সেই জমিতে সিয়ামের বাবা শাক-সবজি চাষ করে। জমিটার ঠিক পূর্বপাশে রয়েছে লাউয়ের মাঁচা। জালি-পোক্ত মিলে মোট পনের-বিশটা লাউ মাটির দিকে ঝুলে আছে।

সিয়াম বই পড়ে আর মাঝে মাঝে বাগানে ও শাক-সবজির জমিতে পাঁয়চারি করে। দেখে, কি উপায়ে আমের মুকুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করছে এবং বৈশাখের এই প্রচন্ড খড়ায় সবজির কোন গাছটা শুকিয়ে যাচ্ছে। পাঁয়চারি করতে করতে হঠাৎ এক সময় সে লাউয়ের মাচার ওখানে যায়। সেখানে সিয়াম কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাউগাছের বড় বড় পাতার আড়াল থেকে একটা ঘুঘু পাখি ফুরৎ করে উড়ে যায়। গিয়ে বসে গাছের পার্শ্ববর্তী জাম গাছের ডালে।

সিয়াম কৌতুহলি হয়ে যে দিকটা দিয়ে পাকিটা বেড় হয় সেখানে কয়েটা পাতা দু'হাত দিয়ে মেলে ধরে দ্যাখে, মুড়ি ভাজার মাটির পাতিলের মতো খড়কুঠার তৈরি বাসা। সেই বাসাতে রয়েছে ধবধবে সাদা দুইটা ডিম। সিয়াম পায়ের পাতার অগ্রভাগের উপর ভর করে একটু উচু হয়ে ডিমগুলো স্পর্শ করতেই মৃদু তাপ অনুভব করে। এমন সময় উড়ে যাওয়া পাখিটার রাগান্বিত কণ্ঠের বিরক্তিকর ডাক সিয়ামের কানে প্রবেশ করে। তাই সিয়াম ওখানটাতে বেশি দেড়ি না কোরো তার বসে থাকার নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পাখিটার দিকে চেয়ে তার গতিবিধি লক্ষ্য করে।
কিছু সময় পর পাখিটা আপন নীড়ে ঢোক এবং সেখান থেকে আর বের হয় না। সিয়াম বই পড়ায় মনোনিবেশ করে।

পরের দিন সকালে সিয়াম স্কুলে যাওয়ার আগে খেতে বসেছে। সিয়ামের মা সেফালি খাতুন তাকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল.........
- লার মাঁচায় ঘুঘু ছা তোলছে। আমি সহালে লাউ তুলতে যায়া দেকলাম। তুই জিহাদকে কোস ন্যি।
জিহাদ হলো সিয়ামের ছোট ভাই। সাত-আট বছর বয়সী দুরন্ত বালক জিহাদ পাখির ছানা দুইটার কথা জানতে পারলে তাদের আর আস্তো রাখবেনা। এটা সিয়ামের মায়ের ধারণা। আর সিয়ামের ধারণা পাখির বাসাটার কথা শুধু সে-ই জানে, আর কেহ হয়তো জানে না। কারণ, পাখির বাসাটা এমন স্থানে যেটা দৃষ্টি গোচর হওয়া মুশকিল।

সেই দিন সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে কালো মেঘ জুমে শুরু হয় প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড়। সিয়াম ঘরের ভেতর শুয়ে থাকে। কিছুতেই মনে শান্তি পায় না সে। পাখির ছানা দুইটার কথা তার শুধু মন পড়ে। জানালাটা একটু আলগা করে লাউয়ের মাঁচার দিকে তাকিয়ে মা-ছানাসহ পাখি গুলোকে দেখার চেষ্টা করে। যখন মাঝারী একটা আমের ডাল ঝড়ে ভেঙ্গে মাঁচার ওপর পরে, তখন সিয়ামের বুকের ভিতর ধপ করে ওঠে। ভাবতে থাকে, আমিকাল নিশ্চয় পাখি গুলোর মৃত্যু দেহ দেখতে হবে তাকে। সেই রাঁতে সিয়ামের কিছুতেই ঘুম আসে না চোখে। চোখ বন্ধ করে থাকে। আর বন্ধ করা চোখের পাতায় দেখতে পায় ছানা পাখি দুইটার প্রতিচ্ছবি। আর ভাবতে থাকে তাদের অসহায় অবস্থায় করুন মৃত্যুর কথা।

ভোর হলে, সিয়ামের ঘুম ভাঙ্গতেই বিছানা থেকে সোজা চলে যায় পাখির বাসাটির কাছে। গিয়ে দ্যাখে ওর বাবা-মা দু'জনে মিলে ঝড়ে ভাঙা লাউয়ের মাঁচাটা সংস্কার করছে। পাখির ছানা গুলোর কথা জিজ্ঞাসা করলে সিয়ামের বাবা বলে......
-দুইডা ছাওয়ের একডা মইরা গেছে, বাকীডারে ধইরা খাঁচায় ভইরা রাইখা দিছি। তয় বড় ডারে ধরতে পারি নাই।

সিয়াম দ্যাখে, মা পাখিটা অদূরে একটা গাছের মগডালে বসে আক্কেল-গুড়ুম হয়ে রোদন সুরে ছানা গুলোর জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। সিয়াম ওখানে আর দেড়ি না করে সোজা বাড়ীর ভিতর তাদের পরিত্যক্ত ঘরে গিয়ে দ্যাখে, তার বাবা ছানাটাকে আগুনে ছেঁক দিয়ে খাঁচার ভিতর তুলার ওপর বসিয়ে রেখেছে।

তারপর থেকে শুরু হয় পাখির ছানাটির ওপর সিয়াম, জিহাদ আর সিয়ামের বাবার আদর যত্নের প্রতিযোগিতা। সিয়ামের বাবা প্রতিদিন ভোরে ফযর আদায় করে পাখির ছানাটিকে খাওয়া-দাওয়া করানোর পর তাঁর দৈনন্দিন কাজে হাত লাগায়। খাঁচার ভিতর পাত্রে থাকার পরও জিহাদ আদরের ছলে দেয় বাড়তি খাবার। আর সুযোগ পেলেই খাঁচাসহ পাখির ছানাটিকে নিয়ে খেলতে বের হয় জিহাদ। আর সিয়াম শুধু পর্যবেক্ষণ করে, তার শরীর কেমন, সে পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে কি না, তার কোনো অসুখ করল নাকি, সে কতটুকু করে বড় হচ্ছে।

পাখির ছানাটাকে আদর যত্ন করার পেছনে সিয়াম, জিহাদ এবং সিয়ামের বাবা, এই তিনজনের তিন রকম উদ্দেশ্য। সিয়াম এবং জিহাদের বাবা আশরাফ আলীর ইচ্ছা, ওটা বড় আর স্বাস্থ্যবান হলে জবাই করে গমের রুটির সাথে উদরপূর্তি করা।
সিয়ামের ইচ্ছা, পাখির ছানাটিকে সারা জীবন খাঁচায় বন্দি রেখে পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলা করা। আর জিহাদের ইচ্ছা, পাখির ছানাটা যেদিন উড়তে পারবে সেদিন সবার অজান্তে আজাদ করে দেওয়া।

বাবা আর দুই পুত্র তিনজন তিন রকম উদ্দেশ্য নিয়ে পাখির ছানাটাকে আদর করে এবং ভালোবাসে। সিয়ামের বাবা সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকার পরেও পাখিটাকে নিয়মিত খাবার দিতে ভোলে না। বাবা আর বড় ভাই সিয়াম বাড়িতে না থাকলে, জিহাদ তার খেলার সাথীদের বাড়িতে ডেকে এনে পাখির ছানাটিকে নিয়ে খেলা করে। আর সিয়াম প্রতিদিন দুপুরে যখন স্কুল থেকে বাড়িতে এসে তাদের বাড়ির পালানে বসে হাওয়া খায় তখন পাশের একটা গাছের উচু ডালের সাথে পাখিসহ খাঁচাটা বেঁধে রাখে। যদি কখনো ছানাপাখিটার মা পাখিটাকে দেখতে আসে এই ভেবে।

কিন্তু সেই কালবৈশাখী ঝড়ে পাখিটার সবকিছু তছনছ হয়ে যাওয়ার পর মা পাখিটাকে সিয়াম আর কোনোদিন দেখেনি।

তাইতো সিয়াম মাঝে মাঝে খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছানাপাখিটাকে বলে....
- এইতো আর কয়ডা দিন অপেক্ষা করো। আর একটু বড় হলেই তুমাকে মুক্ত করে দেবো। উড়তে উড়তে চলে যাবে তুমার মায়ের কাছে।

মনুষ্য ভাষা হয়তো ছানাপাখিটা বুঝতে পারে না। তাই নিরব দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এদিকে দিন যত যেতে থাকে, স্বাভাবিক নিয়মে পাখির ছানাটা বড় হতে থাকে। শরীরের পালক পাল্টায়ে নতুন পালক ধারণ করে। দেখতে ভারি মিষ্টি আর খুবই সুন্দর হয়ে ওঠে। সিয়ামের বাবা জানায়, গলায় মালা ধারণ করলেই ডাকা শিখবে।

একদিন দুপুরে সিয়াম স্কুল থেকে বাড়ী ফিরে হাওয়া খেতে বাড়ির পালানে যাবে। নিয়ম মাফিক সেই পরিত্যাক্ত ঘরে গিয়ে দ্যাখে খাঁচা যেখানে বাঁধা থাকে সেখানে নেই। মেঝের ওপর খাঁচাটি এলোমেলো অবস্থায় পরে আছে। এমন অবস্থা দেখার পর সিয়াম অস্থির হয়ে যায়। তারপর ওর মায়ের কাছে জানতে পারে, গতরাঁতে পাশের বাড়ির হুলোবিড়াল পাখিটার একটা পা ছিঁড়ে নেওয়ার কারণে অতিরিক্ত রক্ত খড়নের কারণে পাখিটা মারা গেছে।

জিহাদ পাখিটার মৃত্যুদেহ মাটিতে পুঁতে রেখে তার বন্ধুদের সাথে বিড়ালটাকে তাড়া করতে বের হয়েছে।

এ কথা শোনার পর সিয়াম দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ঘরে বিছানায় গিয়ে ঠাস খেয়ে শুয়ে পরে। কিছুতেই চোখের পাখি ধরে রাখতে পারে না। পাখির ছানাটার এমন মৃত্যুতে সিয়ামদের পরিবারের সবাই কম-বেশি কষ্ট পায়। তবে সিয়ামের কষ্ট পাওয়ার কারণ, দুইটা ডানা নিয়ে পৃথিবীর বুকে জন্মগ্রহণ করেও পাখিটা কোনোদিন আকাশে স্বাধীন ভাবে উড়তে পারলো না।

-সোহাগ তানভীর সাকিব
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১:১১
১৩টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাহরাম নয়, এমন পুরুষকে কি একজন স্ত্রীলোক নিজের স্তনের দুধ পান করাতে পারবেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২১

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহলা বিনতে সুহাইল নবী করীম ﷺ-এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট সালেমের আসাটা আবু হুযাইফা ভালো মনে করছেন না। নবী বললেন:... ...বাকিটুকু পড়ুন

লুচ্চামি আর যৌন হতাশা এক বিষয় না।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


সম্প্রতি জামায়াতের এক লুচ্চা এমপি-র অন্তত দুইজন তরুণী নিয়ে কট খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তিনি তরুণী নিয়ে হোটেল, কোচিং সেন্টারে রুম ডেট করতেন। নেটিজেনরা তার এই লুচ্চামি এমনভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×