বেশ কিছুদিন আমার নানী অসুস্থ হয়ে আমাদের বাসায় ছিলেন। তাছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নিজের এবং বিভিন্ন রুগীর অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছি। তাই কারো সাথে মিলে গেলে ধরে নিবেন কাকতাল বা কোকিলতাল ছাড়া আর কোন কিছুই নয়।
অসুস্থ হননি এরকম মানুষ পৃথিবীতে বোধকরি একটাও পাওয়া যাবে না। আবার অসুস্থ হলে কাছের মানুষরা আপনাকে দেখতে আসবে এটাও খুব স্বাভাবিক। তবে অনেক সময় এসব দর্শনার্থীই রুগী বা রুগীর পরিবারের মাথা ব্যথার কারন হয়। আসুন আমরা দেখে আসি এরকম সম্ভ্যাব্য কিছু দর্শনার্থীর প্রকারভেদ—
সর্ব রুগের ডাক্তার দর্শনার্থীঃ এই বিশেষ প্রকারের দর্শনার্থীর কাছে আপনি সব রোগের চিকিৎসা পাবেন। মনে করেন এরা এসেই ছিল্লাপাল্লা শুরু করে দিবে এটা কর অটা কর। বলবে অমুক হসপিটালের অমুক ডাক্তারের কাছে গিয়ে তার নাম বলতে। তাহলে ঠিক হয়ে যাবে। আপনি যদি বলেন তার কাছে চিকিৎসা নিয়ে ভাল হচ্ছেন না তখন আরেক ডাক্তার দেখিয়ে দিবে। সেই ডাক্তারের কাছে আগেই চিকিৎসা নিয়েছেন শুনলে একটু থামবে না। একটা না একটা উপায় বলতে থাকবে। তবে এদের চিকিৎসা শেষ হয় এই বলে “আগামী শুক্রবার অমুক মাজারে গিয়ে ১০ টা টাকা দিয়ে আসিস আর কিছু পানি পড়া নিয়ে আসিস। ভাল হয়ে যাবি”।
ঝামেলাময় দর্শনার্থীঃ এরা হয় এক প্রকার খালা, মামি, চাচি, ভাবি যাদের ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী সন্তান আছে। ইনারা রুগী দেখতে আসলেও এদের সন্তানদের কাজ হয় গোটা বাড়ি দৌড়ে বেড়ানো। আর ইনারা থাকবেন এই বর্ণনায় “কি আর বলব আমার ছেলেটা না যা দুষ্টু হয়েছে”। তবে এই প্রকারের দর্শনার্থী বাসা থেকে যাওয়ার আগে কি হবে জানেন? হ্যাঁ একটা গ্লাস অথবা একটা কাপ অথবা এরকম একটা কিছু উনার আদরের সন্তানেরা ভেঙ্গে যাবেন। আর উনি খুব আদর করে উনার সন্তানকে বকে দিবেন।
খাদক টাইপ দর্শনার্থীঃ এটা পড়লে আপনি হয়তো আমাকে মিন ভাবতে পারেন। তবে ভাবুন আর নাই ভাবুন এটা সত্য এমন কিছু দর্শনার্থী আছেন মনে করেন এক কেজি আপেল নিয়ে আসলেও যাওয়ার সময় দেখবেন খেয়ে গেছে দুই কেজি।
রুগী টাইপ দর্শনার্থীঃ এরা আসবে ঠিকই। কিন্তু এদের হাঁটতে গেলে পায়ে ব্যথা, বসতে গেলে কোমরে ব্যথা। খেতে গেলে দাঁতে ব্যথা, বলতে গেলে মুখে ব্যথা। এরা বাথরুমে গেলে লাগবে গরম পানি। এদের পেটে থাকে গ্যাস্ট্রিক প্রব্লেম তাই চা খাবে না। খাবে কি? জুস। অথবা স্যুপ অথবা এরকম কিছু। হ্যাঁ আপনাকে আপনার রুগী ফেলে এদেরই যত্নআত্তি করতে হবে।
হার্ট এট্যাকার টাইপ দর্শনার্থীঃ এই টাইপের দর্শনার্থী এসে একদম কোন কথা বলবেনা। আপনাকে দেখবে ভাল করে, রিয়ালাইজ করতে চাইবে কি হল। গুরু গম্ভীর হয়ে থাকবে এবং কোন কিছু বলবেনা। যাওয়ার ঠিক আগেই হি/শি ওয়িল স্ত্রাইকস। কি বলবে জানেন? “আমাদের পাশের বাসার ওই যে রহমান ভাই আছেন না, উনার ছেলের আর কি এরকম অসুখ হয়েছিল। পুরো তিন তিনটে দিন এরকম ছিল!! চতুর্থ দিন তো ভাল হয়ে গিয়েছিল একদম। আরে আমার বাসায় এসে চা নাস্তাও খেয়ে গেসে (মোটেও না)। কিন্তু পঞ্চম দিন কি হল! ধুপ করে পরে মারা গেল”। আপনার হার্ট এট্যাক হওয়ার কোন চান্স না থাকলেও এটা শুনার পর নিশ্চিত এর কাছাকাছি চলে যাবেন আপনি।
দুনিয়া উদ্ধার টাইপ দর্শনার্থীঃ রুগী দেখতে আসা এদের মুখ্য কাজ নয়। এরা এসেই রুগীকে দেখবেনা। ড্রইং রুমে বসে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি থেকে শুরু করে মূলনীতি, দুর্নীতিসহ সব নীতির কথা বলে এক বৈঠকে দেশ উদ্ধার করে ফেলবে। খেয়ে দেয়ে যাওয়ার ঠিক আগে রুগীর পাশে গিয়ে বলবে আসি, নিজের যত্ন নিও।
তাবিজ-কবজ দর্শনার্থীঃ এদের দুনিয়ার কোন চিকিৎসাতে বিশ্বাস নাই। কি এলপ্যাথি কি হোমিওপ্যাথি। এদের সব চিকিৎসা তাবিজ-কবজ, পানি পড়া, হুজুর, মাজার, বৈদ্য ইত্যাদি।আপনার কান ঝালাপালা করে ফেলবে এসব বলে। এরা এমন ভাবে বলবে প্রচলিত চিকিৎসার উপর আপনার বিশ্বাসই উঠে যাবে। অবশ্য যাওয়ার আগেই এরা আবার এলপ্যাথির উপর পূর্ণ আস্থাবান হয়ে বলবে “একটা ব্যথার ট্যাবলেট থাকলে দেও তো, আসার সময় রিক্সা এমন ঝাঁকি দিসে উফফ কোমর শেষ আমার”।
হারামি টাইপ দর্শনার্থীঃ টাইপ পড়েই হয়তো বুঝতে পেরেছেন এরা কারা হতে পারে। হ্যাঁ এরা হয় বন্ধু বান্ধব দোস্ত ইয়ার টাইপের গুলা। মনে করেন আপনার হাত পা বা অন্য কোথাও ব্যথা পাইছেন এদের কাজ হবে সেই ব্যথাময় জায়গায় ধাক্কা গুতা মারা। এরপর জিগাইব “লাগসে মাম্মা? এই হাতে না, এই হাতে না ওইডা করসিলা?”। এদের মধ্যে আরেক টা টাইপ থাকে এসেই বলবে “দোস্ত তুই তো মারা যাবি তোর গার্লফ্রেন্ডরে আমার কথা বইলা যাইস, হাজার হোক দায়িত্ব আছে না একটা”। কিছুদিন আগে আমার এক ফ্রেন্ড এর অ্যাপেনডিকস অপারেশান হল। আরেক দোস্ত গিয়ে হাঁসি হাঁসি চেহারা কইরা তার সাথে সেলফি তুলে এফবিতে আপলোড করল। তবে ছবির চেয়ে মারাত্মক ছিল ক্যাপশন “ চিলিং ওয়িথ প্রেগন্যান্ট বয়, ফিলিং আঙ্কেল”।
রুগী দেখতে যাওয়া নাকি সওয়াবের কাজ। তবে নিজে সওয়াব কামাতে গিয়ে যেন সেই সওয়াব আরেকজনের জন্য আজাব হয়ে না যায়। মনে রাখবেন আপনি দেখতে গেলে রুগী যেমন খুশি হয় তেমনি আপনার দায়িত্বশীল আচরণ বা দর্শন একজন রুগীকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে সাহায্য করে।
বিদ্রঃ আপনাদের কোন টাইপ জানা থাকলে শেয়ার করতে পারেন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


