somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সময় তোমার কাছে

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক।
অনেকেই আমার অফিসে আসেন। সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সংখ্যাও কম নয়। এদের মধ্যে এই উপজেলার বাইরের লোকজনও রয়েছেন। এদের বেশিরভাগ আবার ফেসবুকে আমাকে দেখে আমার সংগে সাক্ষাতে আগ্রহী হয়েছেন। সাংবাদিকতায় থাকাকালে অনেক বিদেশীও এসেছিলেন আমাকে দেখতে। একজন সহকর্মী বলেছিলেন, আমার মতো কয়েকডজন দেশে থাকলে নাকি পর্যটন শিল্পের ভালোই বিকাশ ঘটতো।
দুই.
যাইহোক; ছবিতে যে বৃদ্ধ লোকটিকে দেখা যাচ্ছে, উনি প্রতিদিন একবার এসে আমাকে দেখে যান। ইনি পেশায় একজন মোহরার। আমার অফিসে কোন মোহরার স্বাগত নয়। এরপরেও তাকে বসিয়ে খবরাখবর নেই। কিছুদিন আগে ‘কতটা নষ্ট হলে’ শীর্ষক আমার একটি লেখায় তার কথা উল্লেখ করেছিলাম। একটি লঞ্চডুবি হয়েছিল গলাচিপা উপজেলায়। ওই দুর্ঘটনায় তার এক কন্যা ও স্ত্রী মারা যান। কন্যা সন্তান সম্ভাবা ছিলেন। পরদিন ছিল তার অপারেশনের তারিখ। মরণ তাদের লঞ্চে ডেকে নিয়ে যায়। ঝাকুনিমুক্ত যানবাহন হিসেবে লঞ্চকে বেছে নিয়েছিলেন পটুয়াখালী যেতে। যাই হোক আমি লিখেছিলাম, তার কন্যা ও স্ত্রীর লাশ পাওয়া যায়। আমি ঘটনাস্থলে পৌছানোর আগেই স্থানীয়রা তার কন্যার লাশ তীরে এনে রাখে। দেখা যায়, তার একটি কানের সোনার গহণা নেই। লাশ উদ্ধারের নামে লুটপাটের অংশ হিসেবে তা খোয়া গেছে। আমি পৌছানোর পর তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার সঙ্গে টাকা পয়সা পাওয়া যায়। আমি সেগুলো নিজের জিম্মায় নিয়ে নেই। এই মোহরারকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আমি তখন ইউএনও এর দায়িত্বে ছিলাম। দুই দিন দুই রাত নদীর পাড়ে ঠায় দাড়িয়ে থেকেছি। কাদার ভেতরে। দাড়ানোর মতো এক চিলতে চর ছিলনা সেখানে। নিজে লাশ ধরে পানি থেকে উঠিয়েছি। নিহতদের মধ্যে একজনের লুংগীর সঙ্গে ৪০ হাজার টাকা বাধা ছিল। তার লুংগিসহ গায়েব। পরে আমি উপস্থিত জনতার কাছ থেকে একটি জামা চেয়ে নিয়ে লজ্জাস্থানটা ঢেকে দিয়েছিলাম। জীবনে অনেক দুর্ঘটনা দেখেছি। লাশ চেয়ে মিছিলও দেখেছি। এই দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ জনের লাশ আমরা উদ্ধার করে তা যথাযথ সম্মানের সাথে স্বজনদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছি। উদ্ধারকৃত টাকা পয়সাও বুঝিয়ে দিয়েছি। মনে পড়ে বৃষ্টি থেকে বাচতেঁ ঘাটে নৌকায় লাশ বেধে নদীর পাড়ে চায়ের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে একরাত কাটিয়েছিলাম লাশের স্বজনদের সঙ্গে। নিহতদের স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করবে তো দূরের কথা-সেই বিপদের দুর্দিনে আমাকে কাছে পেয়ে এখনো আমকে দেখতে আসেন। সামনে বসে চোখের পানি ফেলেন।

তিন.
এই গলাচিপায় একজন বাক প্রতিবন্ধী আছেন। আমাকে দেখলেই তার চিৎকার চেচামেচি শুরু হয়ে যায়। অদ্ভুত শব্দে হাসেন। আমি আমার অফিসের সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করি, এনি এ রকম করেন কেন? সহকর্মী বলেন, স্যার, আপনার কথা বাইরে শুনেন তো। এজন্য আপনাকে দেখলে তার খুশী এভাবে প্রকাশ করেন। লিখলে অনেক কথাই লিখতে হয়। গতকাল আসলেন গলাচিপা থানার এসআই নজরুল। বলেন, স্যার বাইরে আপনার অনেক সুনাম শুনি। দেখতে এলাম। নিজের মতো একজন মানুষ দেখতে কে না চায়। পরে জানলাম, পুলিশের এই এসআই আমার মতোই। এখনো ঘুষ ছুয়ে দেখেননি। কয়েকজন চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারা বললেন, এর বিরুদ্ধে কারো কোন অভিযোগ নেই। পারলে থানার লকআপেও সাহায্য করেন। ভুয়া মামলাবাজদের কাছে তিনি এখন আতংক। দেশে পুলিশের একজন এসআই আছেন, তাও আমার থানায়, সবাই তার সততার প্রশংসা করছে, দেখে ভালো লাগছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মীজানুর রহমান পিএটিসির একটি ক্লাশ নিতে গিয়ে বলেছিলেন, দেশে বড় বড় অফিসার আছেন। তাদের তুলনায় পুলিশের একজন এসআই অফিসার হিসেবে খুবই ক্ষুদ্র একজন। অথচ ইনি ইচ্ছা করলে চাকুরী জীবনে যত মানুষের চোখের পানির কারণ হতে পারেন, অন্য চাকুরীজীবীদের সাতজন্মেও তা সম্ভব নয়। আর এদের কেউ ভালো হলে, এক জীবনে মানুষের যে উপকার করতে পারেন- অন্যদের ১৪ জন্মেও তা করা সম্ভব নয়। কথাটা আবারও কানে বেজে যায়। সত্যি এই এসআই নজরুলের কাছে আমার নিজেকেও অনেক ছোট মনে হয়।

চার.
এবার আজকের সকালে আমাকে যিনি দেখতে এলেন, তিনি একটি পেঁচা। কাকের ধাওয়া খেয়ে আমার কক্ষে ঢুকে সামনে চেয়ারে তার স্থান নিয়েছেন। লোকজন আসছে, কিন্তু আমাকে তার দেখা শেষ হয়না। নির্বিকার, দুশ্চিন্তামুক্ত নিরাপদ মনে বসে আছে। তার দুচোখে আমি আশ্রয় দেয়ার কৃতজ্ঞতা দেখি। আমি কাজ করছি আর সে আমকে দেখে যাচ্ছে। নীরব ভালোবাসা! আসলে এত ভালোবাসার প্রতিদান দেয়ার ভাষা আমার জানা নেই। বেশি ভালোবাসা পাওয়াটাও একপ্রকার কষ্টের। চোখের কোনে এর টের পাই। এ কষ্টটা কত যে আনন্দের তা বুঝাবার সাধ্য আমার নেই। আমার জন্য এত ভালোবাসা সময় তোমার কাছে সপে দিলাম।

সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়
কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি।
সেই সব একদিন হয়তো বা কোনো এক সমুদ্রের পারে
আজকের পরিচিত কোনো নীল আভার পাহাড়ে
অন্ধকারে হাড়কঙ্করের মতো শুয়ে
নিজের আয়ুর দিন তবুও গণনা করে যায় চিরদিন;
নীলিমার কাছ থেকে ঢের দূরে সরে গিয়ে,
সূর্যের আলোর থেকে অন্তর্হিত হয়েঃ
পেপিরাসে-সেদিন প্রিন্টিং প্রেসে কিছু নেই আর;
প্রাচীন চীনের শেষে নবতম শতাব্দীর চীন
সেদিন হারিয়ে গেছে।
(জীবনানন্দ দাশ)

গলাচিপা, ০৫.০২.২০১৫


সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মে, ২০২০ সকাল ৮:১৫
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকা: তাদের জন্যে আজকের পোস্ট

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



এমন এক সময় ছিল, ছেলে বা মেয়ে ডিভি লটারীতে স্বপ্নের দেশে গেছে, বাপ মায়ের পাড়া প্রতিবেশী গর্বে কথা বলাই মুশকিল। সেখানে গিয়ে OC(Office Cleaner) নাকি DC(Dish Cleaner) হবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×