এক.
রাজশাহী আসার আগেই হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (র.) এর মাজার জেয়ারতের নিয়ত করেছিলাম। আল্লাহর এই ওলী বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রা. এর নাতি। আমি সুফিদের অনেক ইতিহাস পড়েছি। হযরত মখদুম রুপোশ (র.) এর জীবনীও পড়েছি ছোটবেলায়। ওই সময় মনের ভেতরে একটা দৃশ্য ফুটে উঠতো। বিরাট নদী। তাতে বিশাল এক কুমিরের পিঠে একজন দরবেশ। আবার তিনি যখন বন জঙ্গলে, তখন বাঘের পিঠে। বাঘ তাকে নিয়ে হেটে যাচ্ছে। আজ সেই দরবেশের মাজার দর্শন করবো। এটা ভাবতে গিয়ে আবারও মনে পড়লো। আমার কাজ শেষ হয় আজ দুপুরে। বিকেলেই বেড়িয়ে পড়েছি। প্রশাসন থেকে একটি গাড়ি দিয়েছিল। ঘুরে দেখলাম রাজশাহী। বলা হয়-রাজা আর শাহীদের স্থান এই রাজশাহী। অনেকে বলেছেন, মোঘল বাদশাহ আকবরের প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহ এই শহরে এসেছিলেন। তাঁর অন্যতম খেতাব ছিল ‘ শাহী রাজ ’। তাঁর এই সফরের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই শহরের নাম রাখা হয় ‘রাজশাহী’। অনেকে বলেন, এই শহরে এত দরবেশে আর শাহ দের আগমন ঘটেছিল যে, তারা এক পর্যায়ে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়ে রাজার ক্ষমতা পেয়েছিলেন। সে কারণেই রাজশাহী। নামকরণের যেই কারণ থাকুক না কেন, শহরের পুরাতন শাহী ভবনগুলো দেখলে রাজশাহী নামকরণ স্বার্থক বলেই তো মনে হয়। প্রথম গেলাম রাজশাহী কলেজ। দেশের তৃতীয় প্রাক্তন কলেজ। ইংলিশরা যাই করুক তাতে নিজেদের ছাপ রেখে গেছে। পুরো রাজকীয় ভবন। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফেরার সময় মাগরিবের নামাজ পড়লাম হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (র.) এর মাজার সংলগ্ন মসজিদে।
দুই.
মসজিদের উত্তর পাশেই রয়েছে মাজার। মসজিদের সামনে পুকুর। মাজারটা পদ্মা নদীর একেবারেই কাছে। পদ্মা নদী সর্বনাশা। কত লোকালয় তার পেটের ভেতরে। অথচ শত শত বছরেও মাজারটির দিকে হাত বাড়ায়নি। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এ মাজার জেয়ারত করেছিলেন। তিনি নৌপথে ঢাকা যাচ্ছিলেন। পথে এই মাজার জিয়ারত করেন। আওরঙ্গজেব মাজারের খাদেমের কাছে হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) এর পুরো জীবনী জানতে চেয়েছিলেন। পরে ফার্সী ভাষায় তা লিখে বাদশাহর কাছে পাঠানো হয়। ইংরেজ আমলে দরগাহ শরীফের সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করে। এর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা হয়। মামলার প্রয়োজনে ১৮৩৮ সালে ফার্সি ভাষা থেকে তার জীবনী বাংলায় অনুবাদ করা হয়। জানা গেছে, এই বইটিই বাংলা ভাষায় প্রথম গদ্য রচনা। এর মূল পান্ডুলিপি নাকি বাংলা একাডেমীর দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থমালা সিরিজে সংরক্ষিত আছে। শুধু আওরঙ্গজেবই নয়। মাজারের বর্তমান খাদেম আমাকে জানালেন, মাজারে ঢুকতে পাথরের যে বিশাল চৌকাঠসমেত দড়জা রয়েছে সেটি দিল্লীর বাদশাহ ফিরোজ শাহ তৈরী করে দিয়েছেন। হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রহঃ) এর জীবনী ইতিহাসের পাঠ। এটা ভালোভাবেই সংরক্ষিত হয়েছে। এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। মাজারের খাদেম আমাকে একটি বই দেখালেন। শাহ মখদুম রূপোশ (রহঃ) দরগা এস্টেট বইটা প্রকাশ করেছে। বই খুলে কিছুক্ষণ পড়লাম। তাতে লেখা তিনি ১২৮৯ সালে রাজশাহী বা সেকালের মহাকালগড়ে আসেন। আর ১৩২৪ সালে ইন্তেকাল করেন। শাহ মখদুম (র.) প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল কুদ্দুছ জালালুদ্দীন। এদেশে আসার পেছনে অনেক বড় ইতিহাস রয়েছে। তার জন্ম বাগদাদে। পিতা ছিলেন বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) এর পুত্র আজাল্লা শাহ (র.)। হালাকু খান বাগদাদ ধ্বংস করলে তিনি তিনপুত্রসহ ভারতে চলে আসেন। তখন ভারতের শাসক ছিলেন নাসিরুদ্দীন শাহ। হালাকু খানের মৃত্যুর পর তিনি বাগদাদে ফিরে গেলেও তার পুত্ররা ইসলামের জন্য থেকে যান। এক পুত্র মখদুম র. নোয়াখালী গিয়ে খানকাহ স্খাপন করেন। পরে শুনতে পান মহাকলগড় এলাকায় ইসলাম প্রচাররত শিষ্য তুরকান শাহকে দৈত্যরাজরা হত্যা করেছে। এ কারণেই তিনি নোয়াখালি ছেড়ে কুমিরের পিঠে চড়ে রাজশাহীর বাঘায় আসেন।
তিন.
সে সময়ে রাজশাহী বা মহাকালগড় শাসন করতেন দৈত্যরাজ। দুই ভাই। এই দৈত্যরাজরা ছিলেন যাদু বিদ্যায় পারদর্শী। দৈত্যদের উদ্দেশ্যে নরবলি দিতেন। একদিকে প্রিয় শিষ্যকে হত্যা আর অন্যদিকে অত্যাচার। এই অবস্থায় হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রহঃ) নিপীড়িত মানুষের পাশে দাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। দৈত্যরাজদের সাথে তিনি তিনবার যুদ্ধ করেছিলেন। পরে দৈত্যরাজদের পরাজিত করে আটক করেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। অনেক গল্প। আমি এসব ভাবতে ভাবতেই মাজারে ঢুকলাম। মাজারটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট। বাংলা পিডিয়ার মতে, ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ জনৈক আলী কুলি এই মাজারটি নির্মাণ করে দেন। মূল প্রবেশপথে সেই পাথরের চৌকাঠ। কোন জোড়া নেই। মাথা সোজা করেই মাজারে প্রবেশ করা যায়। হাত দিয়ে ধরে দেখলাম। কত শত বছরের পুরানো পাথরের দড়জা। কালের সাক্ষী হয়ে আছে। ডান পাশে তার বংশ তালিকা। মোবাইল ফোন বের করে বংশ তালিকার ছবি তুলে নিলাম। দড়জা পার হলেই ভেতরে আল্লাহর এ ওলীর মাজার। পাশাপাশি দুটি কবর। পশ্চিম পাশের কবরটি তার ভাতিজা হযরত শাহনূর র. এর। বলা হয়, মৃত্যুর আগে তিনি নিজে এখানে লাঠি দিয়ে কবরের চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। বলেছিলেন, আমার ভাতিজা শাহ নুর বাগদাদ শরীফ হতে আসবেন এবং তিনিই এখানকার খলিফা পদ পাবেন। সত্যিই তিনি পরবর্তীতে এখানে এসেছিলেন। বর্তমানে মাজারটা এসি। কয়েকটা ফ্যানও ঘুরছে। নামাজ শেষে স্কুল পড়ুয়া একদল ছেলেও আমার সাথে মাজারে ঢুকেছে। তারা কবরের চারপাশে গোল হয়ে বসে প্রার্থনায় রত। কেউ মাজার ছুয়ে সালাম করছে। আমি কোনমতে জায়গা করে নিলাম। পায়ের কাছে। দাড়িয়ে সালাম দিলাম। জেয়ারত শেষে হাত তুলে সবার জন্য দোয়া করলাম। আমি উসিলায় বিশ্বাস করি। তার উছিলায় সবার শান্তি প্রার্থনা করলাম। ফেরার সময় মাওলানা রুমীর কবিতার লাইন মনে পড়ছে, জুমলা মা শু কাস্ত ও আশেক পরদাহই, জেন্দাহ মা শু কাস্ত ও আশেক মোরদাহই। এই পৃথিবীতে যা কিছু দেখছ, সবই আল্লাহর অস্তিত্বের নমুনা, সবই আল্লাহর। আল্লাহর খাঁটি আশেক যারা, তাদের পক্ষে যা কিছু দেখা যায়, সবই আল্লাহর নমুনা।
ভ্রমণের এই একটা সুবিধা রয়েছে। আল্লাহর নমুনা দেখা যায়।
কাজী সায়েমুজ্জামান
সার্কিট হাউজ, রাজশাহী
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭
রাত ১২ টা৷
মূল মাজারের বাইরের অংশ৷ মাজার গোলাকার৷

এই দড়জাটা পার হলেই ভেতরে শাহ মখদুম র. চির শয়নের স্থান৷মাজারের খাদেমের দাবী দিল্লীর ফিরোজ শাহ এটি বানিয়ে পাঠিয়েছেন৷

হযরত শাহ মখদুম র. ছিলেন হযরত অাবদুল কাদের জিলানী র. এর নাতি৷ বংশ লতিকা৷

মাজারের মূল পথে পাথরের চৌকাঠ৷ বিশাল এক পাথর কেটে এটা বানানো হয়েছে৷

দৈত্যরাজা এখানেই দৈত্যদের নামে নরবলি দিতেন৷

নরবলি দেয়ার বেদিটাও একটা বিশাল পাথরে প্রস্তুত৷ বলির পর রক্ত গিয়ে এর পাত্রে জমা হতো৷

শাহ মখদুম র. এর হুজরা মোবারক৷ তিনি এখানে বসেই ইবাদত বন্দেগী করতেন৷ এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন৷

হযরত শাহ মখদুম র. এর বাহন কুমির মারা গেলে এখানেই দাফন করা হয়৷ এই কুমিরের পিঠে চড়েই তিনা নদী পারাপার হতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে৷

মাজারের সামনে পুকুর৷ কুমির এই পুকুরেই থাকতো৷

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৮:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




