somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৃত্যু যদি জীবনেরে রেখে যায়, তুমি তারে জ্বেলে রেখো চোখের তারায়

০৩ রা অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ১০:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্বের পর.

এক।
গত ২৫ মে রাতে ঢাকাগামী ঝড় কবলিত একটি লঞ্চে বসে মৃত্যু নিয়ে একটি লেখা পোস্ট করেছিলাম। ওই লেখাটি পড়ে বন্ধুদের অনেকে ফোন করে কান্নাকাটি করেছেন। কেউ সারারাত আমার সাথে জেগে ছিলেন। ভেবেছিলাম মৃত্যু নিয়ে আরও লিখবো। কিন্তু কান্নাকাটি দেখে একটু দমে যাই। মৃত্যু নিয়ে আমার মোটামুটি লেখাপড়া রয়েছে। আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম-মানুষ রহস্যের আধার মৃত্যুকে কিভাবে অনুভব করে। অনুভবের দিক থেকে কবিরাই শ্রেষ্ঠ। কবির জীবনের বাহ্যিক অভিজ্ঞতা, আবেগ, ঘৃণা তার মননে আর আত্মায় মেধার বহুমাত্রিক আঘাতে সৃষ্ট প্রতিভাস একেকটি সম্মোহনী শব্দের জন্ম দেয়। তাদের প্রতিটি যন্ত্রণাই মধুর শব্দ হয়ে ঝড়ে। এমন বোধ মৃত্যুকে করেছে মহিমান্বিত। এ কারণে আমার মৃত্যু বিষয়ক পড়ালেখা আসলে কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

দুই।
আমার সবচেয়ে ভালোলাগা কবির নাম মাওলানা রুমী। এই রুমী, হাফিজ, খৈয়াম আর সাদীকে জানার জন্য ফারসি শেখার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। মৃত্যুচিন্তা মাওলানা রুমীকে কবি বানিয়েছিল। পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন আকাংখার পূর্ণতা পায় এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এই আকাঙ্খার নাম সুফিবাদ। আমার নিজেরই একসময় রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো মাওলানা রুমীর কবিতার ভাবানুবাদ মনে হতো। আসলে সুফিবাদ একই রকমের। সাদৃশ্য বিদ্যমান। সীমার সঙ্গে অসীমের মিল। ঠিক বেঠিকের বাইরে গিয়ে তৈরী সম্পর্ক। যা কোন ছাচে বেধেঁ ফেলা যায়না। একজন দরবেশ শামস তিবরিজি রুমির মধ্যে মৃত্যুচিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পথ বেয়ে জীবনের কাছে চলে যাওয়ার যেই আনন্দ তাই তিনি শিখেয়েছিলেন রুমিকে। একদিন মাওলানা রুমির অনুসারীরাই শামস তিবিরিজিকে হত্যা করে। আর সেই থেকেই রুমির কবিতায় মৃত্যু নিয়ে কত অভিমান গাথাঁ হয়ে যায়। আমি রুমির একটি কবিতার অনুবাদ করেছি। এভাবে-
যেদিন আমি মরে যাব, আমার কফিন এগিয়ে গেলে
ভেবোনা সেদিন আমার অন্তর এইধামে গেছে ফেলে।
হাহুতাশ করোনা, অযথা তোমাদের অশ্রু যেনো না ফেল
কখনো যেন মনে না হয় –হায়রে এভাবে লোকটা চলে গেল’
আমার সমাধি যেন না হয় অশ্রুজলে কর্দমাক্ত করার পাত্রি।
শুধু জেনে রেখো আমি মহামিলনের মহাযাত্রার অভিযাত্রী।
কবরে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ কখনোই জানাবেনা শোয়াল
আমি জেনেছি কবর হলো দুই কালের মাঝখানে এক দেয়াল।
অনন্ত আশীর্বাদের ফোয়ারা দেখতে আমার এই আরোহণ
কখোনই ভেবোনা এই আমার শেষযাত্রা-আমার মরণ সন্তরণ।
সূর্য ডুবে গেলে চাঁদ উঠে আসে কখনোই হারিয়ে যাওয়া নয়।
আমরা যাকে বলি ডুবে গেছে আসলে সেটা পুনরায় উদিত হয়।

তিন।
আগেরবার নেরুদা কথা বলেছিলাম। এবার ফার্সি থেকে ফরাসি শার্ল বোদলেয়ার। রুমি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের অানন্দে পুনরায় উদয়নের স্বপ্নে বিাভোর ছিলেন সারা জীবন। আর বোদলেয়ার মৃত্যূকেই করেছেন তার ভ্রমণ কবিতার কান্ডারী। মৃত্যু তার কাছে বেঁচে যাওয়ার স্বাধীনতা।
হে মৃত্যু সময় হলো!এই দেশ নির্বেদে বিধুর।
এসো, বাঁধি কোমর,নোঙর তুলি,হে মৃত্যু প্রাচীন।
কাণ্ডারী,তুমি তো জানো অন্ধকার অম্বর, সিন্দুর
অন্তরালে রৌদ্রময় আমাদের পুলিন।
ঢালো সে-গরল তুমি, যাতে আছে উজ্জীবনী বিভা!
জ্বালো সে অনল, যাতে অতলান্ত খুঁজি নিমজ্জন!
হোক স্বর্গ,অথবা নরক,তাকে এসে যায় কী-বা,
যতক্ষণ অজানার গর্ভে পাই নূতন নূতন।’
জানিনা জীবনানন্দ দাশ কি মনে করে আট বছর আগে একদিন কবিতাটি লিখেছিলেন। যখন লিখেছিলেন, তখনওকি ভেবেছিলেন তাকেও একদিন ওই লাশকাটা ঘরের হিম শীতল জায়গায় লাশ হয়ে যেতে হবে। ট্রামের চাকার নিচের মৃত্যু তাকে ঠিকই ওই ঘড়ে টেনে নিয়ে যায়।
শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে- ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ।
বধু শুয়েছিলো পাশে- শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিল, আশা ছিল- জ্যোৎস্নায়,- তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল- লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার ।

চার।
মৃত্যু যে ঘুম এতে কারো দ্বিমত নেই। নিউটনের শেষ কথা ছিল- “মৃত্যুকে জয় করো একটি নিঃশ্বাস দিয়ে।” শুধু একটু নি:শ্বাস। এটিই জীবন মৃত্যুর নির্ধারক। মৃত্যুর রোমান্স নি:শ্বাসকে টেনে নিয়ে যায়। সবার জীবনেই এমন একদিন আসবে। সূর্য দেখা হবেনা। কিম্বা চাঁদ। তার জোৎস্না। শিশিরে পা ভেজানোর অনুভব-সবকিছু অতীত স্মৃতি হয়ে যাবে। এ কেমন রহস্য। আর রহস্য বলেই মৃত্যু আসলে রোমান্সের দারুন একটি স্থান। এর চেয়ে বড় অভিমানের জায়গাও যে আর নেই। শুধু এর আলোটা কারো চোখে দিয়ে যেতে হয়। তাহলেই তা জীবন হয়ে জ্বলতে থাকে আজীবন। হায় ! আমি এখনো সেই চোখ দুটির খোজঁ করে যাচ্ছি। ঘুমুতে যাওয়ার আগে যেন পেয়ে যাই।
জীবনের মুখে চেয়ে সেইদিনও র’বে জেগে,-জানি!
জীবনের বুকে এসে মৃত্যু যদি উড়ায় উড়ানি,-
ঘুমন্ত ফুলের মতো নিবন্ত বাতির মতো ঢেলে
মৃত্যু যদি জীবনেরে রেখে যায়,-তুমি তারে জ্বেলে
চোখের তারার ’পরে তুলে লবে সেই আলোখানি!
(প্রেম- জীবনানন্দ দাশ)

ডাকবাংলো, গলাচিপা।
১ জুন, ২০১৫, রাত ১:২৫

‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে, আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।'
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ১০:২০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×