একজন উর্দু কবির কথা মনে পড়ছে। তিনি কবি হয়েছিলেন। তার বন্ধুরা কেউ কেউ হয়েছিলেন আমলা। তাদের ক্ষমতা প্রতিপত্তি দেখে তার মনে হয়েছিল, কয়েকদিন মৌজ মাস্তি। তারপর সব শেষ। কেউ মনেও রাখবেনা। বন্ধুদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন,
আহবাব ক্যায়া নুমাজাহ কর গ্যায়া/
বিএ কিয়া, নোকর হুয়া, সাদী কিয়া,
পেনশন মিলা ফের মর গ্যায়া/
'বন্ধুরা কি কৃতিত্ব দেখিয়ে গেলো,
বিএ করলো, চাকর হলো, বিয়ে করলো,
পেনশন শেষে মরে গেলো।'
সরকারি চাকরিজীবীকে এভাবেই দেখেন কবি সাহিত্যিকরা। জীবনের যাত্রা পথে অগণিত যাত্রী চলে। এ পথে পদচিহ্ন রেখে যাওয়ার সুযোগ অনেকেরই কম। সরকারি চাকরিজীবীরা হয়ত এ গোত্রেরই। এ নিয়ে বহু কথা আছে। হুমায়ুন আজাদ বলতে চেয়েছিলেন, এদেশে কন্যার বাবার পছন্দ চাকর। কবি নির্মলেন্দু গুণ একটা ঘটনা বলেছেন। তিনি যখন অনিশ্চিয়তার পথে ঢাকা আসছিলেন। তার বাবা তাকে এগিয়ে দিতে নেত্রকোনার রেল স্টেশনে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন, তার বন্ধুও পুত্রকে ট্রেনে তুলতে একই প্লাটফরমে। বন্ধুর বাবা কবির বাবাকে গর্ব ভরে বলছেন, তার পুত্র সরকারি চাকরি পেয়েছে। এখন যোগদান করতে যাচ্ছে। বন্ধুর বাবার মুখটা ছিল গর্বে ভরপুর। বিপরীতে কবি গুণের বাবার দীর্ঘশাস। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে জীবনের হিসাব মিলিয়ে কবি দেখেছেন, তিনি তার চাকরিজীবী বন্ধুর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন। কাজে কর্মে। অমরতায়।
চাণক্য সেন লিখিত 'পিতাকে পুত্র' বইতে প্রধান চরিত্র একজন সাংবাদিক। তিনি একটি বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক। তার বাবা ছিলেন শিক্ষক। তার ইচ্ছা ছিল পুত্র সরকারি চাকরি করবে। পরে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শের জন্য তার আত্মীয় আইসিএস অফিসার শ্রীমন্ত'র কাছে যান। শ্রীমন্ত পরার্ম দিলেন, সরকারি পেশা নয়। বরং সাংবাদিকতাই জীবনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে।
উল্লেখ্য, শ্রীমন্ত নামের একজন আইসিএস অফিসার চুয়াডাঙ্গার এসডিও ছিলেন। তিনি একটি টাউন হল নির্মাণ করেছিলেন। টাউন হলটির নাম এখনো শ্রীমন্ত টাউন হল। গুলশানেও সরকারি কর্মকর্তার নামে সড়ক রয়েছে। খুঁজলে দেশে অনেক স্থানের, সড়কের, চরের, ভবনে সরকারি কর্মকর্তার নাম পাওয়া যাবে। তারা ঠিকই মানুষের মনের বাইরে পদচিহ্ন রেখেছেন।
উর্দু কবির কবিতা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলনাম। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দেখলে কবিতাটি লিখতে গিয়ে দুবার ভাবতেন। এদেশের গণকর্মচারীরা শুধু চাকরি নয়। দেশের জন্যও অনেকে ঝুকিঁ নিয়েছিলেন। শহীদও হয়েছিলেন। গতকাল গিয়েছিলাম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সচিব স্যারের সাথে দেখা করতে। তিনি জানালেন, কত জন সরকারি চাকরিজীবী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তার একটা তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত কেউ সামরিক নন। এদের সংখ্যা ১ হাজার ৬ শ ১১ জন।
যা বলছিলাম। সকল পেশায় থেকেই স্বার্থকভাবে জীবন উৎসর্গ করা যায়৷ পদচিহ্ন রেখে যাওয়া যায়৷ বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের দেশের জন্য জীবনদানের এ তথ্য সারা দুনিয়ার তাবৎ গণকর্মচারিদের জন্য অনন্তকাল ধরে প্রেরণা উৎস হয়ে থাকবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




