somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শুধু ভাষাটা শিখতে পারলেই কেল্লা ফতে

৩০ শে জানুয়ারি, ২০২০ দুপুর ২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কোরিয়ার গ্রাম দেখার ইচ্ছা ছিলো৷ সে ইচ্ছাটা পূরণ হলো৷গত ২৪ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে আনসং এলাকার গ্যাংগিওক গিল গ্রামে বেড়াতে এলাম৷রাজধানী সিউল থেকে একশ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। বিকালে রওয়ানা করে রাতে গ্রামটিতে এসেছি৷ গ্রামে কিছু বাড়িঘর আছে৷ বেশ কিছু গরুর খামারও রয়েছে৷ পাহাড়ে কিম্বা সমতলে আপেল নাশপতি আর আঙ্গুরের বাগান৷ আর ধান কেটে নেয়ার পর পড়ে আছে খালি ক্ষেত৷ গ্রামের মাঝখান দিয়ে একটা খাল প্রবাহিত হয়েছে৷ নীরব নিস্তব্ধ একটা গ্রাম৷ বাড়িতে বাড়িতে বৃদ্ধ মহিলা পুরুষের অবস্থান৷ কোরিয়ার এখন জাতীয় ছুটি চলছে৷ একটা পরিবারকে দেখলাম শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে মা বাবাকে দেখতে আসছেন৷ শীতকাল৷ প্রচন্ড ঠান্ডা৷ খালের পানির কিছু অংশে নেমে বরফের উপরে দাড়িয়ে দেখলাম৷ দুই ইঞ্চি পুরু বরফ পড়েছে উপরে৷ ঝুঁকির কারণে আর বরফের উপর হাটা হলোনা৷ একজন বয়স্ক লোককে দেখলাম বড়শি ফেলছেন খালে৷ খালপাড়েই তার গাড়ি পার্কিং করা৷ হয়ত দূর থেকে এসেছেন৷ আমাদের একজন খালের এপাড় থেকে ডাক দিয়ে জানতে চাইলেন, মাছ পেয়েছে কী না? ভদ্রলোক উত্তরে জানালেন, মাত্র এসেছেন৷ শুনলাম, মাছ ধরে তারা আবার খালেই ছেড়ে দেন৷ এটাও একটা বিনোদন বটে৷ গ্রামের সড়কে মাঝে সাঝে দুই একটা গাড়ির দেখা মিললো৷ তবে প্রতিটি বাড়ির সামনেই কুকুর বেঁধে রাখা৷ আমাদের দেখে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ ডেকে যাচ্ছে৷ তাদের ডাকে নিস্তব্ধ গ্রামের নিরবতা খানখান৷ এক বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দেখলাম কুকুরের বাচ্চা কতগুলো৷ ডাকতেই কাছে চলে এলো৷ আমাকে দেখে তাদের খুশী আর ধরেনা৷ কিছুক্ষণ খেলা করলাম তাদের সাথে৷ তারপর যখন ফেরত আসছিলাম, বাচ্চাগুলো পেছন পেছন আসছিল৷ কিন্তু তারা তাদের সীমানা জানে৷ বাড়ির সীমানাে বাইরে কোন মতেই অতিক্রম করেনি৷ সীমানায় দাড়িয়েই আমাদের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে ছিল৷

এখানে বরিশালের রিমন ভাই একটা কারখানায় চাকরি করেন৷ আমরা সিউল থেকে তিনজন এসেছি বেড়াতে৷ চারজনই বরিশালের৷ এদের মধ্যে একজন আবার রিমন ভাইয়ে আপন ভাই৷ কারখানার পেছনেই থাকার জায়গা৷ উপরে টিন শেড৷ নিচে ছোট ছোট রুম৷ বড় কনটেইনার কেটে বানানো রুম৷ গতরাতটা এরকম একটা রুমে কাটিয়েছি৷ পরে দুপুরের দিকে ঘুরতে বের হলাম৷


কিছু বাড়িতে দেখলাম মাটির বড় পাত্রে কিমচি তৈরি করা হয়েছে৷ বছরের পর বছর এগুলো থাকবে৷ পরে বের করে খাবে৷ এগুলো বিভিন্ন শাক সব্জি দিয়ে তৈরি করা হয়৷ ফার্মেন্টেশনের জন্য বছরের পর বছর বড় মাটির হাড়িতে মুখবন্ধ করে রেখে দেয়৷ অনেকটা আচারের মতো লাগে৷ ভেজিটেবলের ঝাল আচার৷ এই কিমচি নিয়েই কোরিয়ানদের যত গর্ব৷ কোরিয়ান কারো সাথে পরিচয় হলে প্রশ্ন করে কিমচি পছন্দ করি কী না৷ পছন্দ নয়, শুনলে না কি তারা মনে কষ্ট পান৷ এজন্য আমার একজন অধ্যাপক বলেছিলেন, কিমচির কথা উঠলে পছন্দ করি বলতে হয়৷ তাহলেই কোরিয়ানদের মনে স্থান পাওয়া যায়৷


যাই হোক, গতকাল এখানে আসার পর হরিণের মাংস খেয়েছি৷ জীবনের প্রথম হরিণের মাংস খাওয়া৷ মাংসের রঙটা আসলেই ইলিশ মাছের উপরের অংশের মতো দেখতে৷ ছোটবেলায় বলতাম ইলিশের মাছেই নাকি হরিণের মাংস আছে৷ হরিণ খেতে গিয়ে ছোটবেলার কথা মনে পড়েছে৷ হরিণের মাংস খাওয়ার আরো সুযোগ হয়েছিল৷ সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার গ্রাম গাবুরা৷ আমি তখন পিএটিসির ফাউন্ডেশন ট্রেনিং করছিলাম৷ মাঠে গবেষণার অংশ হিসেবে ওই গ্রামে যাওয়া৷ গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ চেয়ারম্যান বললেন, স্যার আপনারা থাকেন৷ হরিণের মাংস খাওয়াবো৷ সাথের কয়েকজন রাজি হয়ে গেলেন৷ আমি বললাম, মাথা খারাপ৷ অবৈধ হরিণের মাংস খেতে চাই না৷
কোরিয়ায় শহরে গ্রামে সবখানেই হরিণের দেখা মেলে৷ তবে বন্য প্রাণি কেউ হত্যা করেনা৷ আজকে যে হরিণের মাংস খেলাম তা ফার্মের হরিণ৷ বন্য প্রাণি হত্যার কথা না কী কোরিয়ানরা চিন্তাও করতে পারেনা৷ তবে বিদেশি যারা আছে তাদের হাতে দু চারটা মারা পড়ে৷ গোপনে৷ জানলে তার শেষ৷


আজকের রাতও এখানে থাকবো৷ যা বুঝলাম, কোরিয়ার গ্রামে খুব কম মানুষ থাকে৷ যারা থাকেন তারাও বৃদ্ধ৷ এরা সবাই কৃষক৷ কৃষি কাজ করেন প্রবীণরা৷ একদিন আমার এক প্রফেসর বলছিলেন, এই জেনারেশন মারা গেলে সামনে কৃষিকাজ করার কেউ থাকবেনা৷ তখন কী হবে? কোরিয়ানরা কী সেমি কন্ডাক্টর খেয়ে বাঁচবে৷ তারপরেও কৃষককে বাঁচাতে এখানে চালের দাম বেশি রাখা হয়েছে৷ আমদানির চালের উপর পাঁচশ ভাগ ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে৷ কোরিয়ান চাল স্টিকি বা আঠালো৷ কাঠিতেই ভাত খায় এরা৷ ভাতটা যতদিন রাখা হোক না কেন নষ্ট হয় না৷ওভেনে গরম করে নিলেই হয়৷ এজন্য দোকানে দোকানে বাটি ভরা ভাত কিনতে পাওয়া যায়৷

কোরিয়ার কৃষকদের বাঁচাতে সরকার বহু পদক্ষেপ নিয়েছে৷ এরপরেও সামনে বিরাট একটা ভ্যাকুয়াম। কোরিয়ার কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষি শ্রমিক লাগবেই। তারা কৃষি শ্রমিক নেবেও। এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি দরকার৷আগামি দিনে বাংলাদেশ থেকে কৃষি শ্রমিক যাতে আনা হয় সেজন্য এখনি উদ্যোগ নেয়া দরকার৷ এখানে বাংলাদেশের যারা শ্রমিক আছেন প্রত্যেকে মাসে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা আয় করতে পারেন৷পৃথিবীর বহু উন্নত দেশেই একজন অদক্ষ শ্রমিকের এত টাকা আয় করা সম্ভব নয়। এখানে যে সমস্যাটা আছে, সেটা ভাষাগত। শুধু ভাষাটা শিখতে পারলেই কেল্লা ফতে৷

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১:৫২
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ শুধু আমরাই নেই আর আগের মত

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:০০




স্যোশাল মিডিয়ায় তুমি এখন জনপ্রিয় ফুড ব্লগার
এই আমি ছোট্ট শহরের সামান্য কানাই মাস্টার।

তোমার আছে বাড়ি, আছে গাড়ি বেড়াচ্ছো খাচ্ছো দেদার
আর এদিকে টিকে থাকবার, নিরন্তর প্রচেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে-সব সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনা একেবারেই নাই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২

এ দলটি ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা! ছবি।

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৮ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০০


কত দিন হয়ে গেলো....................


এ মাসেতো একটাও পোস্ট দেওয়া হলো না........................


ইদে গ্রামের বাড়ি গিয়ে কিছু ছবি তুলেছিলাম।







আজকের ছবি ব্লগে থাকছে সেই ছবিগুলো।








---------------------------------------------------






























... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন মুহুর্তেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×