
কোরিয়ার গ্রাম দেখার ইচ্ছা ছিলো৷ সে ইচ্ছাটা পূরণ হলো৷গত ২৪ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে আনসং এলাকার গ্যাংগিওক গিল গ্রামে বেড়াতে এলাম৷রাজধানী সিউল থেকে একশ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। বিকালে রওয়ানা করে রাতে গ্রামটিতে এসেছি৷ গ্রামে কিছু বাড়িঘর আছে৷ বেশ কিছু গরুর খামারও রয়েছে৷ পাহাড়ে কিম্বা সমতলে আপেল নাশপতি আর আঙ্গুরের বাগান৷ আর ধান কেটে নেয়ার পর পড়ে আছে খালি ক্ষেত৷ গ্রামের মাঝখান দিয়ে একটা খাল প্রবাহিত হয়েছে৷ নীরব নিস্তব্ধ একটা গ্রাম৷ বাড়িতে বাড়িতে বৃদ্ধ মহিলা পুরুষের অবস্থান৷ কোরিয়ার এখন জাতীয় ছুটি চলছে৷ একটা পরিবারকে দেখলাম শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে মা বাবাকে দেখতে আসছেন৷ শীতকাল৷ প্রচন্ড ঠান্ডা৷ খালের পানির কিছু অংশে নেমে বরফের উপরে দাড়িয়ে দেখলাম৷ দুই ইঞ্চি পুরু বরফ পড়েছে উপরে৷ ঝুঁকির কারণে আর বরফের উপর হাটা হলোনা৷ একজন বয়স্ক লোককে দেখলাম বড়শি ফেলছেন খালে৷ খালপাড়েই তার গাড়ি পার্কিং করা৷ হয়ত দূর থেকে এসেছেন৷ আমাদের একজন খালের এপাড় থেকে ডাক দিয়ে জানতে চাইলেন, মাছ পেয়েছে কী না? ভদ্রলোক উত্তরে জানালেন, মাত্র এসেছেন৷ শুনলাম, মাছ ধরে তারা আবার খালেই ছেড়ে দেন৷ এটাও একটা বিনোদন বটে৷ গ্রামের সড়কে মাঝে সাঝে দুই একটা গাড়ির দেখা মিললো৷ তবে প্রতিটি বাড়ির সামনেই কুকুর বেঁধে রাখা৷ আমাদের দেখে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ ডেকে যাচ্ছে৷ তাদের ডাকে নিস্তব্ধ গ্রামের নিরবতা খানখান৷ এক বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দেখলাম কুকুরের বাচ্চা কতগুলো৷ ডাকতেই কাছে চলে এলো৷ আমাকে দেখে তাদের খুশী আর ধরেনা৷ কিছুক্ষণ খেলা করলাম তাদের সাথে৷ তারপর যখন ফেরত আসছিলাম, বাচ্চাগুলো পেছন পেছন আসছিল৷ কিন্তু তারা তাদের সীমানা জানে৷ বাড়ির সীমানাে বাইরে কোন মতেই অতিক্রম করেনি৷ সীমানায় দাড়িয়েই আমাদের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে ছিল৷
এখানে বরিশালের রিমন ভাই একটা কারখানায় চাকরি করেন৷ আমরা সিউল থেকে তিনজন এসেছি বেড়াতে৷ চারজনই বরিশালের৷ এদের মধ্যে একজন আবার রিমন ভাইয়ে আপন ভাই৷ কারখানার পেছনেই থাকার জায়গা৷ উপরে টিন শেড৷ নিচে ছোট ছোট রুম৷ বড় কনটেইনার কেটে বানানো রুম৷ গতরাতটা এরকম একটা রুমে কাটিয়েছি৷ পরে দুপুরের দিকে ঘুরতে বের হলাম৷

কিছু বাড়িতে দেখলাম মাটির বড় পাত্রে কিমচি তৈরি করা হয়েছে৷ বছরের পর বছর এগুলো থাকবে৷ পরে বের করে খাবে৷ এগুলো বিভিন্ন শাক সব্জি দিয়ে তৈরি করা হয়৷ ফার্মেন্টেশনের জন্য বছরের পর বছর বড় মাটির হাড়িতে মুখবন্ধ করে রেখে দেয়৷ অনেকটা আচারের মতো লাগে৷ ভেজিটেবলের ঝাল আচার৷ এই কিমচি নিয়েই কোরিয়ানদের যত গর্ব৷ কোরিয়ান কারো সাথে পরিচয় হলে প্রশ্ন করে কিমচি পছন্দ করি কী না৷ পছন্দ নয়, শুনলে না কি তারা মনে কষ্ট পান৷ এজন্য আমার একজন অধ্যাপক বলেছিলেন, কিমচির কথা উঠলে পছন্দ করি বলতে হয়৷ তাহলেই কোরিয়ানদের মনে স্থান পাওয়া যায়৷

যাই হোক, গতকাল এখানে আসার পর হরিণের মাংস খেয়েছি৷ জীবনের প্রথম হরিণের মাংস খাওয়া৷ মাংসের রঙটা আসলেই ইলিশ মাছের উপরের অংশের মতো দেখতে৷ ছোটবেলায় বলতাম ইলিশের মাছেই নাকি হরিণের মাংস আছে৷ হরিণ খেতে গিয়ে ছোটবেলার কথা মনে পড়েছে৷ হরিণের মাংস খাওয়ার আরো সুযোগ হয়েছিল৷ সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার গ্রাম গাবুরা৷ আমি তখন পিএটিসির ফাউন্ডেশন ট্রেনিং করছিলাম৷ মাঠে গবেষণার অংশ হিসেবে ওই গ্রামে যাওয়া৷ গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ চেয়ারম্যান বললেন, স্যার আপনারা থাকেন৷ হরিণের মাংস খাওয়াবো৷ সাথের কয়েকজন রাজি হয়ে গেলেন৷ আমি বললাম, মাথা খারাপ৷ অবৈধ হরিণের মাংস খেতে চাই না৷
কোরিয়ায় শহরে গ্রামে সবখানেই হরিণের দেখা মেলে৷ তবে বন্য প্রাণি কেউ হত্যা করেনা৷ আজকে যে হরিণের মাংস খেলাম তা ফার্মের হরিণ৷ বন্য প্রাণি হত্যার কথা না কী কোরিয়ানরা চিন্তাও করতে পারেনা৷ তবে বিদেশি যারা আছে তাদের হাতে দু চারটা মারা পড়ে৷ গোপনে৷ জানলে তার শেষ৷

আজকের রাতও এখানে থাকবো৷ যা বুঝলাম, কোরিয়ার গ্রামে খুব কম মানুষ থাকে৷ যারা থাকেন তারাও বৃদ্ধ৷ এরা সবাই কৃষক৷ কৃষি কাজ করেন প্রবীণরা৷ একদিন আমার এক প্রফেসর বলছিলেন, এই জেনারেশন মারা গেলে সামনে কৃষিকাজ করার কেউ থাকবেনা৷ তখন কী হবে? কোরিয়ানরা কী সেমি কন্ডাক্টর খেয়ে বাঁচবে৷ তারপরেও কৃষককে বাঁচাতে এখানে চালের দাম বেশি রাখা হয়েছে৷ আমদানির চালের উপর পাঁচশ ভাগ ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে৷ কোরিয়ান চাল স্টিকি বা আঠালো৷ কাঠিতেই ভাত খায় এরা৷ ভাতটা যতদিন রাখা হোক না কেন নষ্ট হয় না৷ওভেনে গরম করে নিলেই হয়৷ এজন্য দোকানে দোকানে বাটি ভরা ভাত কিনতে পাওয়া যায়৷
কোরিয়ার কৃষকদের বাঁচাতে সরকার বহু পদক্ষেপ নিয়েছে৷ এরপরেও সামনে বিরাট একটা ভ্যাকুয়াম। কোরিয়ার কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষি শ্রমিক লাগবেই। তারা কৃষি শ্রমিক নেবেও। এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি দরকার৷আগামি দিনে বাংলাদেশ থেকে কৃষি শ্রমিক যাতে আনা হয় সেজন্য এখনি উদ্যোগ নেয়া দরকার৷ এখানে বাংলাদেশের যারা শ্রমিক আছেন প্রত্যেকে মাসে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা আয় করতে পারেন৷পৃথিবীর বহু উন্নত দেশেই একজন অদক্ষ শ্রমিকের এত টাকা আয় করা সম্ভব নয়। এখানে যে সমস্যাটা আছে, সেটা ভাষাগত। শুধু ভাষাটা শিখতে পারলেই কেল্লা ফতে৷

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






