somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কে-বিউটি: ভিন্ন ধারায় মার্কেটিং

৩১ শে জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৩:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি মার্কেটিং সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলাম জাপানে। জাপানের একটা বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর ক্লাসে আসলেন। সাথে অনেক জিনিসপত্র। ড্রিল মেশিন, কসমেটিক্স কী নেই। ক্লাসের শুরুতেই আমাদের বললেন, একজন ব্যক্তি দেয়ালে ছিদ্র করবেন। তিনি দোকানে গেলেন, কী কিনবেন? আমরা বললাম, ড্রিল মেশিন কিনবেন। তিনি বললেন, ড্রিল মেশিন কিনলেন কিন্তু ছিদ্র করতে পারলেন না। আবার দোকানে গেলেন, এবার তিনি কী কিনবেন। আমরা বললাম, ড্রিল মেশিনই কিনবেন। তবে অন্য কোম্পানির। তিনি বললেন, আসলে লোকটি বারবার দোকানে ড্রিল মেশিনই কী কিনতে গিয়েছিলেন? যদি সেটাই হতো তাহলে তো একবারই যথেষ্ট ছিল। কারণ প্রথমবারেই তিনি ড্রিল মেশিন কিনেছিলেন। তিনি আসলে ড্রিল মেশিন কিনতে দোকানে যান নি। দেয়ালে ফুটো কিনতে দোকানে গিয়েছিলেন। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, দোকানে কী কসমেটিক্স বিক্রয় করা হয়? আমরা বললাম, না। দোকানি আসলে সৌন্দর্য বিক্রয় করেন। দেয়াশলাই বা গ্যাস সিলিন্ডার নয়, আগুন বিক্রি করা হয়। প্রফেসর এবার বললেন, ক্রেতাদের এই বিষয়টি যে কোম্পানি বুঝতে পেরেছে, তারাই ব্যবসায় লাভবান হয়েছে। এটা মাথায় রেখে যারা বিজ্ঞাপন তৈরি করতে পেরেছে, তারাই মার্কেটে নেতৃত্ব দিতে পেরেছে। আমরা আসলে পণ্য কিনিনা, সেবা কিনে থাকি। কোরিয়া এই বিষয়টা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে বলেই আরাম, সুখ আর সৌন্দর্যের ব্যবসায় এগিয়ে গেছে। এখানে সৌন্দর্যের মার্কেটটা বিশাল। কসমেটিক্স সার্জারি থেকে শুরু করে বিউটি প্রডাক্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। কসমেটিক্স সার্জারি নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজকে এ সৌন্দর্য ব্যবসার একটি অংশ নিয়ে এ লেখাটা লিখছি। কোরিয়ানরা যার নাম দিয়েছে কে-বিউটি।

জাপানিরা আমার নাম ভালোভাবে বলতে পারেনা। বলে, সায়েমু সান। তবে কোরিয়ানরা কাছাকাছি উচ্চারণ করতে পারে। বলে সাইম। এর পেছনে যে বিষয়টা খুঁজে পেয়েছি তা হলো- The Saem নামে কসমেটিক্সের একটা ব্রান্ড আছে কোরিয়ায়। সৌন্দর্য বিক্রয় করে এরা। মানুষের বাহ্যিক সকল অঙ্গ সুন্দর রাখার জন্য যত প্রকারের কসমেটিক্স আছে, সবই তারা বানিয়েছে। ফল, ফুল, গাছের পাতা, আর প্রাণির নির্যাস কিছুই বাদ যায়নি। আমি একটা হাতের লোশন ব্যবহার করছি শামুকের তৈরি। আমি নিজে কিনিনি। জাপানি একজন মহিলা আমাকে গিফট করেছেন। এই কোম্পানির নাম আমি দেশে বসেই জানতাম। আমাদের ক্যাডারের একজন জুনিয়র লেডি অফিসার কোরিয়া এসে এ ব্রান্ডের কসমেটিক্স কিনে নিয়ে যায়। সে বলেছিলো গুণাগুণের কথা। লিপস্টিক একবার লাগালে না কী সাত দিনেও যায়না। মানের কারণে কোরিয়া এখন আইটি না, সৌন্দর্য বিক্রিতেও অন্যতম। জাপান, চীন, থাইল্যান্ডের নাগরিকরা কোরিয়ায় পর্যটকের ভিসা পায়। এর ফলে সেখানকার প্রচুর মেয়ে কোরিয়া আসে। কসমেটিক্স কিনে লাগেজ ভর্তি করে নিয়ে যায়। জাপানি মেয়েদেরকেও কোরিয়ান মেয়েদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে দেখেছি। সৌন্দর্যই তাদেরকে কোরিয়া টেনে নিয়ে আসে। এজন্য কোরিয়ার টুরিস্ট এলাকা বিশেষ করে মিয়াংডনসহ বিভিন্ন এলাকার কসমেটিক্সের দোকানে জাপানি মেয়েদের চাকরি দেয়া হয়েছে। অথবা কোরিয়ান মেয়েদের জাপানি ভাষা শেখানো হচ্ছে। যাতে তারা জাপানিজ কাস্টমার টানতে পারে। জাপানি বাচ্চাগুলোও কোরিয়ান নায়িকাদের ভক্ত। কয়েকদিন আগে জাপান থেকে দুইটি পরিবার আমাকে দেখতে কোরিয়া আসছিলো। তাদের সাথে বাচ্চা তিনজন। তারা কোরিয়ার নায়িকা টোয়াইসের পোস্টার দেখে আর কাছ থেকে নড়েনা। টোয়াইসের পোস্টার স্টিকার তাদের চাই। এই যে কোরিয়ার সৌন্দর্যের বিরাট মার্কেট, এর পেছনে যে কয়েকটি কসমেটিক্স কোম্পানির ভূমিকা আছে, তার বড় একটা অংশ দি সায়েমের দখলে। এরা ভিন্ন কায়দায় বাজারে এসেছে। দেখেছে এবং জয়ও করেছে।

তাহলে দি সায়েম কীভাবে কোরিয়ার সৌন্দর্যের বাজার দখল করলো? আমি যে ছবিটা দিয়েছি, একটু ভালো করে দেখলেই একটা বিষয় ধরা পড়বে। এই আউটলেটটি দি সায়েম এর। মেয়েদের কসমেটিক্সের দোকান। কিন্তু দেখলে মনে হয়না। কারণ আউটলেটে মেয়েদের কোন ছবি নেই। কসমেটিক্সের দোকান বলতে মেয়েদের ছবি থাকবে। তাদের নজর কাড়া সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মেয়েরা সেইরকম সৌন্দর্য পেতে সেই পণ্য কিনবে এটাই ছিল ধারণা। এই ধারণায় আঘাত করেছে দি সায়েম। তাদের পণ্যের মডেল হলো পুরুষ। ইন্টারেস্টিং। মেয়েরা আসলে সৌন্দর্য কেনে কেন- এর উপর কোম্পানিটি তাদের মার্কেটিং কৌশল সাজিয়েছে। তারা দেখেছে, সৌন্দর্য কেনার উদ্দেশ্য হলো পুরুষের চোখে নিজেকে সুন্দর দেখাতে হবে। অনেক নারীবাদী এ বিষয়ে হয়তো একমত হবেন না। তবে সব নারীই মনে মনে চায়, কেউ একজন তাকে সুন্দর বলুক। কে বলবে, নিশ্চয়ই সে কোন একজন পুরুষ। স্বপ্নের পুরুষ। সেই পুরুষটিই বলে দিচ্ছে, কসমেটিক্সের এই পণ্যটি ব্যবহার করলে ঠোট সুন্দর হয়। গাল সুন্দর হয়। ত্বক ঝকঁঝকে হয়। তার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায়না। চিরাচরিত বিজ্ঞাপনের ছাঁচ এভাবেই এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে দি সায়েম। একারণেই দি সায়েমের দোকানে পুরুষ মডেলের ছবি। আর মেয়ে ক্রেতাদের ভিড়।

যাই হোক, আমি ২০১৭ সালে কোরিয়ার সৌন্দর্য ব্যবসার একটা চিত্র দেই। কোরিয়া কসমেটিক্সের ব্যবসায় বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। এর মার্কেট সাইজ ৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মিনটেলের এক হিসেবে দেখা গেছে, পৃথিবীতে সৌন্দর্যের পেছনে প্রতিজন গড়ে বছরে ২১ মার্কিন ডলার ব্যয় করে থাকে। ইংল্যান্ডে এই ব্যয়ের পরিমাণটা ৪৩ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ ডলার। সেখানে কোরিয়ার প্রতি জনের সৌন্দর্য ব্যয় বছরে ৪৫ ডলার। এখানে পুরুষরাও কসমেটিক্স ব্যবহার করে থকে। তারাও ঠোটে লিপস্টিক লাগায়। তথ্য দিয়ে লেখাটিকে ভারাক্রান্ত করতে চাইনা। গাড়ি, মোবাইল আর ইলেক্ট্রনিক্স ব্যবসা পড়ে গেলেও কোরিয়া কসমেটিক্সের ব্যবসা দিয়ে সে স্থান পূরণ করতে সক্ষম হবে৷ বছর বছর এই মার্কেটের পরিমাণ বাড়ছে। কারণ একটাই। আসল কথা হলো- এরা ক্রেতাদের চাহিদাটা জানে। তারা জানে, ক্রেতা শুধু ক্রিম মাখতে ক্রিম কিনেনা। সৌন্দর্য কিনতে চায়। সে অনুযায়ী মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করছে। মানের ব্যাপারে এদের কাছে কোন ছাড় নেই। এছাড়াও ভিন্ন ধারায় মাির্কেটিং করে পণ্য নিয়ে যাচ্ছে ভোক্তাদের কাছে।

কোরিয়ার কাছ থেকে আমাদের ব্যবসায়ীদের অনেক কিছু শেখার আছে।


কিউং হি ইউনিভার্সিটি
দক্ষিণ কোরিয়া
২৯ জানুয়ারি ২০২০
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১:৪৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ শুধু আমরাই নেই আর আগের মত

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:০০




স্যোশাল মিডিয়ায় তুমি এখন জনপ্রিয় ফুড ব্লগার
এই আমি ছোট্ট শহরের সামান্য কানাই মাস্টার।

তোমার আছে বাড়ি, আছে গাড়ি বেড়াচ্ছো খাচ্ছো দেদার
আর এদিকে টিকে থাকবার, নিরন্তর প্রচেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে-সব সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনা একেবারেই নাই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২

এ দলটি ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা! ছবি।

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৮ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০০


কত দিন হয়ে গেলো....................


এ মাসেতো একটাও পোস্ট দেওয়া হলো না........................


ইদে গ্রামের বাড়ি গিয়ে কিছু ছবি তুলেছিলাম।







আজকের ছবি ব্লগে থাকছে সেই ছবিগুলো।








---------------------------------------------------






























... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন মুহুর্তেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×