somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি চিংড়ি ভাঁজা ও শূন্য পকেট......

০৫ ই আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ১২:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছেলেটি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের কাছে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভ্যানে করে ভাঁজতে থাকা চিংড়ি মাছ ভাঁজা দেখছে, কিভাবে বেশ বড় বড় চিংড়ি মাছ কিভাবে ধুয়ে, লবন-মরিচ ও অন্যান্য মশলা মেশাচ্ছে, তারপর ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী উত্তপ্ত উনুনে, বেশ বড় ঢাউস আকৃতির লোহার করাইয়ের ভিতর ফুটতে থাকা তেলের মাঝে ছেড়ে দিচ্ছে, সেটা সে দেখতে পাচ্ছেনা, কিন্তু চিংড়ী তেলে ছেড়ে দেবার পর, সেই ভাঁজার শব্দ সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।

এভাবে দাড়িয়ে ছিল, চিংড়ীটা ভাঁজার পরে, হাতলে উঠে না আসা পর্যন্ত, কতক্ষণ জানেনা, তবে বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর, উঠে এলো মচমচে ভাঁজা, ধোঁয়া ওড়া, বাদামী রঙয়ের একটি চিংড়ী ভাঁজা! দেখেই জিভে জল! কিন্তু পকেট শূন্য... বেশ কিছুটা অপেক্ষা করে সাহস আর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে চিংড়ী বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, যে চিংড়ী ভাঁজার দাম কত?

তিন টাকা! হাঁয়, তিন টাকা? ছেলেটির কাছেতো তিন পয়সাও নেই, একটাকা বা এর আশেপাশে হলে না হয়, দিন মজুর বাবার কাছে তাও চাওয়ার সাহস করতো, কিন্তু তিন টাকা! এই টাকাতে তো বাসার সবার এক বেলার তরকারী হয়ে যাবে! এই টাকা চাইলে শুধু মার নয়, নিশ্চিত ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে! তাই চোখ দিয়ে চিংড়ী খেয়েই সেদিন ধীরে ধীরে বাড়ির ঘরের পথ ধরলো। কিন্তু ফিরে যেতে-যেতে বারে-বারে পিছন ফিরে ছেলেটি চিংড়ী ভাঁজা দেখতে থাকলো......

একদিন, দুইদিন, তিনদিন কেটে গেল, কিন্তু ছেলেটির চোখ আর মাথা থেকে চিংড়ী ভাঁজার ছবি আর সরেনা! বারে-বারে, স্বপ্নে-ঘুমে-জাগরণে ছেলেটি চিংড়ী ভাঁজার ছবি-ই দেখতে থাকলো। তাই খেতে না পারুক একটু দেখে দেখে খুশী হবার জন্য সে আবার সেই চিংড়ী ভাঁজার ভ্যানের কাছে একটু আড়ালে দাঁড়ালো, যেন চিংড়ী বিক্রেতা আবার দেখতে পেয়ে দূর-দূর করে তাড়িয়ে না দেয়!

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই ছেলেটি চিংড়ী ভাঁজা দেখতে আসতে লাগলো, সেই ভাঁজা দেখতে-দেখতে একসময় ওটা খেতে চাওয়ার বাসনাও তৈরি হল, এবার আর দেখে মন ভরছেনা, এবার সে খেতে চায়, যেভাবেই হোক, চিংড়ী তাকে খেতেই হবে! তাই সে এটা ভাবে, ওটা ভাবে, এদিক তাকায়, সেদিক তাকায় আর কিভাবে তিন টাকা পেতে পারে তার উৎস খুঁজে বেড়ায়?

এই ভাবতে-ভাবতে আর চিংড়ী ভাঁজা খাবার অদম্য ইচ্ছাকে পূরণ করতে, একদিন সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে চলে গেল, নিজের অজান্তেই! এর আগে এই টার্মিনালের আসে-পাশে ছেলেটি বেশ কয়েকবার এলেও, একদম টার্মিনালে এই প্রথম, তাও একা, তাই এতো বড় টার্মিনাল আর অনেক বড় বড় লঞ্চ-ইস্টিমার দেখে কিছুটা ভড়কে গেল, ভঁয় আর আতঙ্কও পেয়ে বসলো তাকে।

ভঁয় পেয়ে ফিরে যাচ্ছিল, এমন সময় একটি বেস দোতালা লঞ্চ এসে থামল টার্মিনালে, সে সেই লঞ্চের মানুষ ও মালপত্র ওঠানামা দেখতে দাড়িয়ে রইলো। বেস কিছু মানুষ জন নেমে যাবার পরে, একটু ফাঁকা হতেই ছেলেটি আবার বাড়ির পথ ধরলো, এমন সময় হঠাৎ ছেলেটির চোখ আটকে গেল, তারই প্রায় সমবয়সী আর একটি ছেলের দিকে, যে ওই একটু আগে থেমে থাকা লঞ্চের ভিতর থেকেই নেমে আসছে, মাথায় কিছু মালপত্র নিয়ে, ছেলেটি সাথের যাত্রীদের কেউ নয় সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, যে কারণে সেই মালপত্র নিয়ে নেমে আসা ছেলেটিকে সে অনুসরন করলো, এবং তার ধারনা সত্যি হল, যখন ছেলেটি দেখল যে মালপত্র বহন করা ছেলেটিকে সাথের একটি লোক, আসলে ওই মালপত্রর মালিক চারটি টাকা দিল!

এবার ছেলেটির মাথায় বুদ্ধি এসে গেল, সেও এই কাজ করে চার টাকা পাবে এবং চিংড়ী ভাঁজা খাবে! তাই ছেলেটি সেই উৎসাহ আর অদম্য ইচ্ছে নিয়ে আবার লঞ্চঘাটে ফিরে গেল এবং আর একটি লঞ্চের অপেক্ষা করতে থাকলো।

বেস কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর দূরে একটি লঞ্চ দেখা গেল, এই প্রথম ওই দূর থেকে পানিতে ভেসে আসা লঞ্চ তার ভালো লাগলো, এর আগে কখনোই এইসব লঞ্চ-ইস্টিমার বা এসবের শব্দ তার ভালো লাগতোনা! অপেক্ষা আর অপেক্ষার পরে লঞ্চ এলো, থামলো এবং বেস কিছু মানুষজন নেমে যাবার পরে, একটু ফাঁকা হতে ছেলেটি লঞ্চে উঠলো, এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখে এক যাত্রী তাকে একটি কাঠের চেয়ার আর একটি টিনের বাক্স নামিয়ে দিতে বললে, ছেলেটি দারুণ উৎসাহে একটি মাথায় আর একটি কাঁধে করে অতি সন্তর্পণে নামতে থাকলো... এবং কোন বিপত্তি ছাড়াই সে সব মালপত্র নামিয়ে দিতে সক্ষম হল।

অনেক খুশী আর আনন্দ নিয়ে ছেলেটি চারটি টাকার জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু সেই যাত্রী তাকে দুইটি টাকা দিল! খুবই কষ্ট পেলেও কিছু বলার বা আরও দু-একটি টাকা চাওয়ার সাহস ছেলেটির ছিলনা। যে কারণে সে আবার লঞ্চঘাটে ফিরে গেল এবং আবারো আর একটি লঞ্চ আসার অপেক্ষা করতে লাগলো...

কিন্তু সেদিন আর কোন লঞ্চ এলোনা! কারণ তখন ওই দিনের মত লঞ্চ আসা শেষ হয়ে গেছে...! তাই ছেলেটি অনেক আহত হওয়া সত্ত্বেও সেদিনের মত ফিরে গেল আর পরের দিনের স্বপ্ন দেখতে থাকলো।

পরদিন... আবার একই সময় সে অনেক বেশী সাহসের সাথেই আগের দিনের কাজ করলো এবং এবার সে তিনটি টাকা পেল। সেই টাকা দিয়ে বিকেল বেলা ছেলেটি তার স্বপ্নের চিংড়ী ভাঁজা কিনে খেল।

এবং তার পর থেকে আর কোনোদিন কারো কাছে সে তার কোন ইচ্ছে পুরনের জন্য টাকা চায়নি!
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ১২:৫১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মুমূর্ষু কবিতা

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১১



আমি আর কবিতা লিখব না বলেও
লিখে ফেলি একটি মুমূর্ষু কবিতা–
জন্ম নেয়ার আগেই যারা অবিরাম
মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, লাথি মারছে
পদ্যের চিরায়ত চোয়ালে !
পঙক্তিতে পঙক্তিতে পথ হেঁটে
প্রচণ্ড পিপাসায় আমি পান করি
কবিতার স্নিগ্ধ জল; আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ এসেছে শরৎ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



শরৎ-প্রাতে শিউলি ঝরা ক্ষণে
দিবাকর ছড়ায় হাসি।
দিঘির জলে রক্তিম পদ্ম
ফুটেছে রাশি রাশি।

ছাতিম গাছের নিভৃত নির্জনে
সবুজ পাতার ঘ্রাণ।
সুখ আহ্লাদে ডাকছে নিসর্গ
উচাটন মন প্রাণ। 

স্নিগ্ধ  বাতাস দোলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাইনকা চিপা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬


এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণীকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×